যাবার প্রাক্কালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তির কিছু অংশ প্রকাশ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে চুক্তির কিছু অংশ বাংলায় অনুবাদ করে পাঠানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র নির্বাহী আদেশ নম্বর ১৪২৫৭-বলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপর বিভিন্ন হারে যুক্তরাষ্ট পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। এর পরপরই বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা মার্কিন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও আলাপ আলোচনার মধ্যমে এই শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ করে। যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক আরোপের পর একটি অভিন্ন শুল্ক চুক্তির খসড়া প্রায় সব বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোকে পাঠায়। যেসব দেশ এই চুক্তির ওপর আলোচনায় অংশ নেয়— তাদের ওপর আরোপিত শুল্ক হার কমিয়ে ৩০ আগস্ট নতুন হার নির্ধারণ করে, যা বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত হয় ২০ শতাংশ।
বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক আরোপের পর পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়। গত ৯ মাস ধরে ধারাবাহিক ও গঠনমূলক আলোচনা এবং নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সফলভাবে দর কষাকষি করে পারস্পরিক শুল্কহার ১৯ শতাংশ নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ দীর্ঘ আলোচনা প্রক্রিয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নেতৃত্ব দেয়। এ কাজে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। বিভিন্ন বহুমাত্রিক বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শ গ্রহণ করে বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়।
আরটি চুক্তিতে পণ্য, সেবা, বাণিজ্য, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও বাণিজ্য সহজীকরণ, রুলস অব অরিজিন, স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ সুরক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি বাধা, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, সরকারি ক্রয়, লেবার, পরিবেশ, প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সহযোগিতাসহ বিস্তৃত বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব বিষয়ের মধ্যে বাংলাদেশ আগে থেকেই ডব্লিউটিও ট্রিপস চুক্তি অনুস্বাক্ষর করায় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিতে নতুন কোনও শর্ত আরোপিত হয়নি। অন্যান্য বিষয়ে বাংলাদেশ পূর্বেই আইএলও, ট্রিপস ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করে। পারস্পারিক বাণিজ্যচুক্তির বিধানাবলি বাস্তাবায়নে সম্মতি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে— সেসব পণ্য অন্য উৎস হতে ক্রয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য বিধায়, সে বাজার ধরে রাখার জন্য তাদের বাজার থেকে ক্রয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হবে না। শুধুমাত্র উৎসের পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের রফতানি বাজার সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চুক্তিতে ট্রেক্সটাইল ও পোশাক খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে এবং তা ব্যবহার করে তৈরী করা পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রফতানির ক্ষেত্রে শূন্য আরটি-হারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র রফতানি হওয়া মোট পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করলে পোশাক খাতে প্রত্যাশিত সুবিধা নিশ্চিত হবে। এক্ষেত্রে, ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক যোগ হবে না।
চুক্তির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ প্রায় ১৫টি দেশের সাথে পারস্পরিক শুল্ক চুক্তি সম্পাদন করেছে। ভারত ও জাপানের সঙ্গে যৌথ ঘোষণাপত্র সম্পন্ন হয়েছে, চুক্তি সই অপেক্ষমান। যেসব চুক্তি অনলাইনে উন্মুক্ত করা হয়েছে— তার মধ্যে মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ-মার্কিন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির কতিপয় মিল রয়েছে।
১. কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে বলা হয়েছে— ওই দুটি দেশ ডিজিটাল ট্রেড সংক্রান্ত কোনও চুক্তি সই করতে চাইলে সেক্ষেত্রে তাদেরকে এই চুক্তি সইয়ের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চূড়ান্তকৃত এআরটি’র খসড়ায় এ ধরনের কোনও বিধান নেই।
২. উৎপত্তির নিয়মের লেখার মধ্যে বৈদেশিক বা অভ্যন্তরীণ মূল্য সংযোজনের পরিমাণ নির্ধারিত নেই। ফলে লেখা অনুযায়ী পণ্য রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া সহজ হবে।
৩. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত তুলা এবং কৃত্তিম ফাইবার টেক্সটাইল ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য উক্ত দেশে রফতানির ক্ষেত্রে পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
উক্তরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মালয়েশিয়া এবং কেম্বোডিয়ার সম্পাদিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে উল্লেখ নেই। এখানে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।
৪. এ চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ প্রায় ২৫০০টি পণ্যের শূণ্য শুল্ক সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিপণ্য, প্লাস্টিক, কাঠ ও কাঠজাত পণ্যসহ অন্যান্য পণ্য। অপরদিকে, বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদানের ৭ হাজার ১৩২টি ট্যারিফ লাইন। এইচএস কোড-কে অফার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অফার লিস্টের এর সার-সংক্ষেপ নিম্নরূপ:
(ক) ৪৯২২টি ট্যারিফ লাইনকে চুক্তি সই দিন হতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা হবে (উল্লেখ্য, এর মধ্যে ৪৪১টি ট্যারিফ লাইনের শুল্কহার ইতোমধ্যে শূন্য রয়েছে)।
(খ) ১৫৩৮টি ট্যারিফ লাইনের শুল্কহার ৫ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে (প্রথম বছর ৫০ শতাংশ হ্রাস এবং পরবর্তী ৪ বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশকে সমানুপাতিক হারে হ্রাস করে শূন্য করা হবে)।
(গ) ৬৭২টি ট্যারিফ লাইন এর শুল্কহার ১০ বছরের মধ্যে শূন্য করা হবে (প্রথম বছর ৫০ শতাংশ হ্রাস এবং পরবর্তী ৯ বছরে অবশিষ্ট ৫০ শতাংশকে সমানুপাতিক হারে হ্রাস করে শূন্য করা হবে)
(ঘ) ৩২৬টি ট্যারিফ লাইন কে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদান করা হয়নি (এর মধ্যে জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত সিইপিএ’র অফার তালিকা এর ৮১টি ইএমএফএন ট্যারিফ লাইন কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে)।
উল্লেখ্য, অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তিতে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের চুক্তিতে ধাপে ধাপে শুল্ক হ্রাসের বিধান সংযুক্ত করা হয়েছে।
৫. এআরটি পেপারলেস ট্রেড, আইপিআর এনফোর্সমেন্ট, ই-কমার্স স্থায়ী স্থগিতাদেশ সমর্থন, নন-ট্যারিফ বাধা ও টিবিটি হ্রাস, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন, কনফর্মিটি অ্যাসেসমেন্ট সার্টিফিকেট, গুড গভর্নেন্স ও নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ক্রয় ইত্যাদি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। ৯টি আইপিআর সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি যোগদান প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করা হয়েছে।
৬. বাণিজ্য চুক্তিতে ই-কমার্স এ স্থায়ী স্থগিতাদেশকে সমর্থন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হতে মেডিক্যাল ডিভাইস ও ফার্মাসিউটিক্যালস আমদানিতে উক্ত দেশের এফডিএ’র সনদ থাকা সাপেক্ষে মার্কেট অথরাইজেশনের পূর্বানুমতি ব্যাতীত আমদানির সুযোগ, এফএমভিএসএস-কে স্বীকৃতি, রিম্যানুফেকচার গুডস আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা, খাদ্য ও কৃষি পণ্য আমদানিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এসপিএস মেজার্সকে স্বীকৃতি প্রদান, ডেইরি প্রোডাক্টস, মাংস ও পোল্ট্রি প্রোডাক্ট আমদানিতে মার্কিন সনদকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়সমূহ উল্লেখ রয়েছে।
এগ্রিকালচারাল বায়ো-টেকনোলোজি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সময়ে সম্পন্ন, উক্ত প্রযুক্তির খাদ্য ও কৃষিজাত পণ্যকে (অ-জীবিত পরিবর্তিত জীব না থাকা শর্তে) স্বীকৃতি, জীবন্ত পোল্ট্রি ও এর সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ এবং এমআরএল-কে স্বীকৃতি, উদ্ভিদ ও উদ্ভিদ পণ্যের আমদানিতে বাজার প্রবেশাধিকার প্রক্রিয়া ২৪ মাসের মধ্যে সম্পাদন, ইন্স্যুরেন্স, তেল, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগে ইকুইটি সীমা লিবারালাইজ করা, এন্টিকরাপশন সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, ডব্লিউটিও-এর এগ্রিমেন্ট অন ফিসারিজ সাবসিডিকে গ্রহণ করা ও অবৈধ অপ্রকাশিত এবং অনিয়ন্ত্রিত (আইইউইউ) এর ক্ষেত্রে সাবসিডি প্রদান না করা, পরিবেশ রক্ষায় এ সংক্রান্ত বিধি-বিধানের যথাযথ প্রয়োগ, বনজসম্পদ ও বন্যপ্রাণির অবৈধ ট্রেড বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ, আন্তর্জাতিক শ্রম সংক্রান্ত বিধি-বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের শ্রম আইন কে হালনাগাদ করার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. ডিজিটাল ট্রেড ও টেকনোলোজিতে সিবিপিআর, পিআরপি, পিডিপিও ইত্যাদি বিষয়কে স্বীকৃতি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইকোনোমিক ও ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইস্যু সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং উক্ত দেশ হতে বোয়িং ক্রয়, এলএনজি, এলপিজি, সয়াবিন, গম, তুলা, সামরিক সরঞ্জাম আমদানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা করার বিষয়সমূহ খসড়া চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
৮. কোনও দেশের পক্ষেই চুক্তি বাতিল করার সুযোগ ছিল না। বাংলাদেশ চুক্তিতে প্রস্থান ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাংলাদেশ-মার্কিন পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রঢতানিতে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ধরে রাখাসহ এবং বিশ্বের সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে মর্মে আশা করা যাচ্ছে।