১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার, ০৪:৪০:২৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে যাচ্ছে বাংলাদেশ জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের জাতিসংঘ অধ্যায় আসুন এবার রাষ্ট্রকে আমরা পুনর্গঠন করি - প্রধানমন্ত্রী ‘মাননীয়’ শব্দ ব্যবহার না করার সূচনা নিজেই শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টেক্সাসে বিতর্কিত নতুন পাঠ্যক্রম অনুমোদনে মুসলিমদের ক্ষোভ ঘুষ নিয়ে নাগরিকত্ব, সাবেক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা লুকম্যান ও ওলাবি গ্রেফতার জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে তারেক-ট্রাম্পের বৈঠকের সম্ভাবনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেন ড. খলিলুর রহমান সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও স্ত্রীর সম্পদের বিষয়ে এফবিআইয়ের প্রতিবেদন দুদকে তারেকের কূটনৈতিক চালে ধরাশায়ী হাসিনা


বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে যাচ্ছে বাংলাদেশ
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৬-০৯-২০২৬
বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে যাচ্ছে বাংলাদেশ বৈদ্যুতিক ট্রেন


বাংলাদেশের রেল ইতিহাসে সংযোজিত হতে যাচ্ছে একটি নতুন অধ্যায়। দেশে প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিক ট্রেন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি—একনেকের সভায় উপস্থাপিত হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর (গাজীপুর) রুটে প্রাথমিকভাবে রুট ঠিক করে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা।

প্রকল্পের রূপরেখা

প্রায় ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথকে ঘিরে গড়ে উঠছে এই প্রকল্প, যার লক্ষ্য রাজধানী ও তার দুই পাশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে একটি দ্রুতগতির, নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা। প্রকল্পের অর্থায়নে সবচেয়ে বড় অংশীদার হচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি), যারা যৌথভাবে দেবে ২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা—অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ। প্রকল্পের বাস্তবায়ন শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩১ সালের ৩০ জুন।

প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই প্রকল্পে রেলপথের ওপর স্থাপন করা হবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওভারহেড ওয়্যার এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর গড়ে তোলা হবে ট্র্যাকশন সাবস্টেশন, যা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করবে। এর পাশাপাশি যুক্ত হবে আধুনিক ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) ট্রেন, বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন এবং কম্পিউটারনির্ভর স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা।

কেন প্রয়োজন এই প্রকল্প

প্রকল্প প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ৩ হাজার ৯৩ কিলোমিটার নেটওয়ার্কের পুরোটাই এখনো ডিজেলনির্ভর। পুরোনো ডিজেলচালিত ইঞ্জিনের কারণে ট্রেনগুলো কাঙ্ক্ষিত গতিতে চলতে পারে না, ফলে যাত্রীদের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত ট্রিপও পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যেই সম্পূর্ণ পরিচালন ব্যবস্থাকে ডিজেল থেকে বিদ্যুতে রূপান্তরের এই উদ্যোগ।

সরকারি নথি অনুযায়ী, বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু হলে জ্বালানি ব্যবহারে প্রায় ৪০ শতাংশ সাশ্রয় হবে, পরিচালন ব্যয় কমবে প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমতে পারে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে আসার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। ডিজেলের তুলনায় বৈদ্যুতিক ট্রেন দ্রুত গতি তুলতে ও দ্রুত থামতে সক্ষম হওয়ায় স্টেশনে যাত্রাবিরতির পরও অল্প সময়ে কাঙ্ক্ষিত গতিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে—ফলে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে যাতায়াতের সময় অর্ধেকেরও বেশি কমে আসার আশা করা হচ্ছে। প্রকল্প নথিতে উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেশী ভারতের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশটির ব্রডগেজ রেলপথের প্রায় ৯০ শতাংশ বিদ্যুতায়িত হয়েছে।

ঢাকার যানজট নিরসন কৌশলের একটি অংশ

এই প্রকল্পকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই—এটি মূলত ঢাকা মহানগরী ও তার আশপাশের এলাকার দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন-পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ইতিমধ্যে ২০২৬-২০৪৫ মেয়াদের একটি নতুন স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) প্রকাশ করেছে, যেখানে ৮টি মেট্রোরেল লাইন, ২টি বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) লাইন, ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে, ৩টি রিং রোড, ৮টি রেডিয়াল সড়ক এবং ২১টি মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাবের প্রস্তাব রয়েছে। এর পাশাপাশি গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও ভাঙ্গাসহ রাজধানী-সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় কমিউটার ট্রেন সার্ভিস সম্প্রসারণেরও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যাতে আশপাশের জেলার বাসিন্দারা প্রতিদিন সকালে ট্রেনে ঢাকায় এসে কর্মস্থলে যোগ দিতে ও বিকেলে ফিরে যেতে পারেন।

এই বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর বৈদ্যুতিক ট্রেন প্রকল্প একটি বাস্তবসম্মত ও তুলনামূলক দ্রুত-বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পূর্ণ নতুন মেট্রো লাইন নির্মাণের তুলনায় বিদ্যমান রেললাইনকে বিদ্যুতায়িত করা তুলনামূলক কম সময়সাপেক্ষ ও সাশ্রয়ী, অথচ যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা ও গতি—দুটোতেই উল্লেখযোগ্য উন্নতি আনতে সক্ষম। প্রতিদিন গাজীপুর, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে চলাচলকারী লাখো যাত্রীর জন্য এটি সরাসরি সুফল বয়ে আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটেও পরিকল্পনা

এই প্রকল্পের বাইরেও রেলওয়ে বিদ্যুতায়নের পরিধি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। গত ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশার কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের অন্যতম ব্যস্ততম রেলপথেও গতি বাড়বে এবং দুই বড় শহরের মধ্যে যাতায়াতের সময় কমে আসবে।

সার্বিক তাৎপর্য

সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর বৈদ্যুতিক ট্রেন প্রকল্প শুধু একটি প্রযুক্তিগত উত্তরণ নয়—এটি ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনের সামগ্রিক কৌশলের একটি বাস্তব প্রতিফলন। মেট্রোরেল, বিআরটি ও এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্কের পাশাপাশি বিদ্যমান রেললাইনের আধুনিকায়ন ও বিদ্যুতায়ন ভবিষ্যতে ঢাকা ও তার শিল্পাঞ্চল-নির্ভর অর্থনীতিতে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। আগামী বুধবারের একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে তা হবে বাংলাদেশের গণপরিবহন ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।

শেয়ার করুন