মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ
মার্কিন সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছেন মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ। নভেম্বরের নির্বাচনে তিনি জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পাবেন। মিশিগানের এই আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান দলের সাবেক কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্স। আগামী ৩ নভেম্বর ২০২৬ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আগস্টে অনুষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে এল-সাইয়েদ খুবই অল্প ব্যবধানে কংগ্রেসওম্যান হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে দলের মনোনয়ন পান। সরকারি ফল অনুযায়ী, এল-সাইয়েদ পেয়েছেন ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫২ ভোট বা ৪৮.৪ শতাংশ। স্টিভেন্স পেয়েছেন ৭ লাখ ৩১ হাজার ১৬০ ভোট বা ৪৭.৬ শতাংশ। অর্থাৎ দুজনের মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র ১৩ হাজার ৭৯২ ভোট, প্রায় ০.৮ শতাংশ পয়েন্ট। সাবেক প্রার্থী ম্যালরি ম্যাকমরো পেয়েছেন ৬১ হাজার ৫১৬ ভোট বা চার শতাংশ।
অন্যদিকে রিপাবলিকান প্রাইমারিতে মাইক রজার্স বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের মনোনয়ন পান। প্রাইমারিতে তার পক্ষে ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৩২৮ ভোট রেকর্ড হয়। ফলে সাধারণ নির্বাচনের আগে রজার্সকে কোনো রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়তে হয়নি।
সাধারণ নির্বাচনের লড়াই এখন অত্যন্ত কাছাকাছি। ওয়াশিংটন পোস্ট-শার স্কুলের ১০ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বরের জরিপে সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে এল-সাইয়েদের সমর্থন ৪৮ শতাংশ, আর রজার্সের ৪৫ শতাংশ। ব্যবধান ৩ শতাংশ পয়েন্ট, যা ওই জরিপের ৩.৯ শতাংশ পয়েন্টের মার্জিন অব এররের মধ্যে। একই জরিপে ৫৩ শতাংশ ভোটার বলেছেন, তারা চান আগামী বছর সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকুক।
এমারসন কলেজের ১২ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বরের আরেক জরিপেও এল-সাইয়েদ সামান্য এগিয়ে ছিলেন ৪৮ শতাংশ বনাম রজার্সের ৪৬ শতাংশ। সেখানে চার শতাংশ ভোটার তখনও সিদ্ধান্তহীন ছিলেন। জরিপে ১ হাজার সম্ভাব্য ভোটার অংশ নেন এবং মার্জিন অব এরর ছিল তিন শতাংশ পয়েন্ট।
তবে সব জরিপে একই চিত্র দেখা যায়নি। ৩১ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বরের ডেট্রয়েট নিউজ-গ্লেনগারিফ জরিপে রজার্স ৪৫.৮ শতাংশ এবং এল-সাইয়েদ ৪৪.৪ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন; প্রায় ৯.৪ শতাংশ ভোটার সিদ্ধান্তহীন ছিলেন। জরিপটির নমুনা ছিল ৬০০ জন এবং মার্জিন অব এরর চার শতাংশ পয়েন্ট।
সাম্প্রতিক কয়েকটি জরিপ একসঙ্গে ধরলে ব্যবধানও খুব কম। রিয়েলক্লিয়ারপলিটিকসের ৬ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জরিপগুলোর গড় হিসেবে এল-সাইয়েদ ৪৬.৯ শতাংশ এবং রজার্স ৪৪.৮ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন। ব্যবধান ২.১ শতাংশ পয়েন্ট। একই তালিকায় কিছু জরিপে রজার্স এগিয়ে এবং অন্যগুলোতে এল-সাইয়েদ এগিয়ে ছিলেন।
এল-সাইয়েদ মিশিগানের সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। তার বাবা-মা মিসর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। নির্বাচিত হলে মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হবে।
তবে তার মুসলিম পরিচয়ও এবারের নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ওয়াশিংটন পোস্ট–শার জরিপে দেখা গেছে, মিশিগানের ৪০ শতাংশের বেশি সম্ভাব্য ভোটার বলেছেন তারা মুসলিম প্রার্থীকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমর্থন করতে অনিচ্ছুক। একই জরিপে কৃষ্ণাঙ্গ সম্ভাব্য ভোটারদের ৬৭ শতাংশ এল-সাইয়েদকে সমর্থন করলেও ৮৩ শতাংশ বলেছেন তারা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চান। অর্থাৎ দলীয় পছন্দ এবং নির্দিষ্ট প্রার্থীর প্রতি সমর্থনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
দুই প্রার্থীর প্রতি ভোটারদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পার্থক্য রয়েছে। একই ওয়াশিংটন পোস্ট–শার জরিপে এল-সাইয়েদকে ৪৪ শতাংশ ভোটার ইতিবাচকভাবে দেখেছেন, রজার্সকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন ৩৯ শতাংশ। এমারসনের জরিপে এল-সাইয়েদের অনুকূল মতামত ছিল ৪৯ শতাংশ, প্রতিকূল ৪৪ শতাংশ; রজার্সের ক্ষেত্রে অনুকূল ৪২ শতাংশ এবং প্রতিকূল ৪৬ শতাংশ।
মিশিগানের এই আসনটি জাতীয়ভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি আসন রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে নিজেদের সব আসন ধরে রাখার পাশাপাশি রিপাবলিকানদের কাছ থেকে অন্তত চারটি আসন ছিনিয়ে নিতে হবে। ফলে মিশিগানের ফলাফল শুধু একজন প্রার্থীর ব্যক্তিগত জয়-পরাজয় নয়, সিনেটের সামগ্রিক ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গেও যুক্ত।
এল-সাইয়েদ জয়ী হলে শুধু মিশিগান থেকেই একজন নতুন সিনেটর নির্বাচিত হবেন না; তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবেও পরিচিত হবেন। তবে বর্তমান জরিপের ব্যবধানগুলো ছোট এবং বিভিন্ন জরিপে ভিন্ন ফল পাওয়া যাচ্ছে। তাই ভোটের আগে পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাটি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ফলাফল অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।