ক্রেডিট কার্ড
যুক্তরাষ্ট্রে ক্রেডিট কার্ড ঋণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকানদের মোট ক্রেডিট কার্ড বকেয়া দাঁড়িয়েছে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ রেকর্ডপ্রায় ১ দশমিক ২৭৭ ট্রিলিয়ন ডলার। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কের সর্বশেষ ডেটা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে এ পরিমাণ ঋণ বেড়ে গেছে, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায়ও বেশি। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ২৩৩ ট্রিলিয়ন ডলার, যা এক প্রান্তিকে আবার বেড়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরের শেষ প্রান্তিকে সাধারণত ঋণ বাড়ে, তবে এ বৃদ্ধির হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরো তীব্র হয়েছে। ২০১৯ সালের প্রাক-মহামারি সময়ে এ ঋণ ছিল ৯২৭ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মহামারির সময় ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে ক্রেডিট কার্ড ঋণ নেমে আসে প্রায় ৭৭০ বিলিয়ন ডলারে, কিন্তু এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে তা বাড়তে থাকে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এটি প্রায় ৬৬ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চসুদের হার, মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এ ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
সাম্প্রতিক এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১১১ মিলিয়ন মানুষ বা মোট ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের প্রায় ৫০ শতাংশ এখন প্রতি মাসে পুরো বিল পরিশোধ করতে পারছেন না। দ্য সেঞ্চুরি ফাউন্ডেশন এবং ভোক্তা অধিকার সংগঠন প্রটেক্ট বরোয়ার্স-এর গবেষণায় দেখা গেছে, এ সংখ্যা পাঁচ বছর আগে ছিল প্রায় ৯৫ মিলিয়ন, যা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
গবেষকরা বলছেন, জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অনেক পরিবার এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে যেখানে মাসিক খরচ মেটাতে গিয়ে ক্রেডিট কার্ড ঋণই তাদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। জ্বালানি মূল্য হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক চাপ আরো তীব্র হয়েছে।
জুলি মারজেটা-মরগান বলেন, আমরা এমন এক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আছি যেখানে অনেক মানুষই আগেই চাপের মধ্যে ছিল। এখন জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে।
একই গবেষণায় আরো দেখা গেছে, প্রতি চারজন আমেরিকানের মধ্যে একজন বলেছেন তারা মাসিক খরচ মেটাতে গিয়ে খাবার কমিয়েছেন বা বাদ দিয়েছেন। একইভাবে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ চিকিৎসাসেবা বিলম্বিত বা এড়িয়ে গেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি করছে।
ক্রেডিট কার্ড ঋণের সুদের হারও এখন অত্যন্ত বেশি। গড় সুদের হার প্রায় ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ, যা সাধারণ মানুষের জন্য ঋণ পরিশোধকে আরো কঠিন করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চসুদের কারণে অনেক মানুষ শুধু ন্যূনতম পেমেন্ট দিয়ে ঋণ ধরে রাখছেন, ফলে মূল ঋণ কমছে না বরং বাড়ছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা ক্রেডিট কার্ড সুদ হিসেবে প্রায় ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যাংক ও কার্ড কোম্পানিগুলোকে পরিশোধ করেছেন। গবেষকদের মতে, এটি আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।
রাজনৈতিকভাবে এ ইস্যু নিয়েও আলোচনা চলছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একসময় ক্রেডিট কার্ড সুদের হার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশে সীমিত করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যাতে সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত সুদের চাপ থেকে মুক্তি পায়। তবে এ প্রস্তাব এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ব্যাংকিং খাতের পক্ষ থেকে এর বিরোধিতা করে বলা হয়েছে, এমন সীমা আরোপ হলে ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি মূল্য এবং উচ্চ ঋণসেবা ব্যয়ের কারণে আরো বেশি মানুষ আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন। অনেকেই এখন কেবল ন্যূনতম পেমেন্ট দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঋণ সংকট তৈরি করতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তিগত ঋণ সংকট আরো গভীর হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলবে।