২২ জুন ২০১২, শনিবার, ০৪:১৫:৪১ অপরাহ্ন


কথার কথকতা
মাইন উদ্দিন আহমেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৬-১০-২০২২
কথার কথকতা


দ্বিপাক্ষিক সভা হয় মিল-মহব্বত তথা সম্প্রীতি বজায় রাখা, অর্থাৎ বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য, কিন্তু অবশেষে হলোটা কি? কি হলো? সভা শেষ হবার আগেই লেগে গেলো মারামারি! এই কথাগুলো শোনার পর একজন প্রবীণ ব্যক্তি বললেন, ‘অজ্ঞতা সবই হলো অজ্ঞতার ফল’। আরেকজন বললো, ‘মুরুব্বিদের এটা একটা মুদ্রাদোষ হয়ে উঠেছে যে, সবাইকে অজ্ঞ বলবেনই’। বয়স্ক লোকটি এটা শুনে জানতে চাইলেন, এই কথাটা কে বলেছে? কলিম উল্যা বললো, দাদা, জব্বর আলী বলেছে কথাটা। প্রবীণ লোকটি কলিমকে বললেন, জব্বরকে নিয়ে আমার কাছে আসো, কথা বলবো। জব্বর ইতস্তত করতে লাগলে তিনি বললেন, আমরা ঝগড়া করবো না, গল্প করবো আর গল্পচ্ছলে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করবো যে, প্রবীণরা ঠিকই বলেন, তোমরা বুঝতে পারো না। বোঝো না আবার বোঝো না যে সেটাও জানো না, এখানেই সমস্যা। এই কলিম, জব্বর আসো, চা হবে, আমি পয়সা দেবো, গল্প হবে, আসো। আরে, লজ্জা পাবার কিছু নেই, আসো। তুমি যা বলেছো, এই কথাটি এখন বেশিরভাগ যুবকই বলে। কারণ সে যে সঠিক কথাটি বুঝতেই পারেনি সে কথাটাই তো সে জানে না। আসো, আমি তোমাদের এই ভুল বোঝাবুঝির জট খুলে দেই।

ও হ্যাঁ, এই মুরুব্বির নাম হলো আবুল হাসেম। কেউ ডাকে দাদা, কেউ বলে চাচা আর ওনার বয়সীরা বলে হাসেম ভাই। স্পষ্ট কথা বলার অভ্যেস আছে বলে উনি ‘ঠোঁটকাটা’ নামে খ্যাত। বুড়ো বসলেন, কলিম খুশি মনে বসলো আর জব্বর ইতস্তত করে বসলো। কয়েকজন উৎসুক শ্রোতারও আবির্ভাব হলো। তিনজনই এখন রাস্তার পাশে একটা খোলা চা দোকানে। বসেই মুরুব্বি বললেন, কইরে, আমাগো রে চা আর বিস্কুট দে।  জব্বরের দিকে ফিরে বললেন, এই জব্বর, শরম পাইস না, এই পাশে আয়, আমার কাছে এসে বয়, আমি তোরে ঘটনাটা খুইল্লা কই।  জব্বর পাশে এসে বসে, ওই পাশে কলিম। বিভিন্ন বয়সী অনেকে অপেক্ষা করছে এই ভেবে যে, জব্বর এখন একটা মজার ধোলাই খাবে মুরুব্বির হাতে।

প্রবীণ লোকটি খুব মিষ্টি স্বরেই কথা শুরু করলেন। এদের আজকের সভার ব্যানার লক্ষ করেছিস? তাতে কি লেখা আছে? মতবিনিময় সভা। মতবিনিময় এক শব্দে লেখা হয়েছে। এর মধ্যেও একটা রহস্য আছে। 

কেউ বলে এটা দুই শব্দ হবে আর কেউ বলে এক শব্দ। দুই পক্ষই ঠিক। মত-এর বিনিময় ‘মত বিনিময়’ বস্তুত দুই শব্দ। মতের বিনিময় সমাসবদ্ধ করলে হাইফেন দিয়ে সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে এক শব্দ হতে পারে, যে ক্ষেত্রে আজকাল হাইফেন ব্যবহার না করার প্রবণতা চালু আছে।

কিন্তু মূল সমস্যাটা এখানে নয়। ‘মত বিনিময়’, নাকি ‘মতামত বিনিময়’ এটা ঠিক করা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। এর ভেতরেও একধরনের অজ্ঞতা কাজ করে। এক ফাঁকে তিনি হেঁকে উঠলেন, এই কইরে আনোয়ার, চা-বিস্কুট দিছোস? আওয়াজ এলো, দাদা এই যে হইয়া গেছে, আনতাছি।

তিনি আবার বলতে শুরু করলেন। শোন, এইডাতো সিনেমার কাহিনি না, তোগো ভালো নাও লাগতে পারে, তবু শুইনা রাখ, আমি চোখ বন্ধ করলে কাজে লাগবো।

মত ও অমত মিলে হয় মতামত। ‘মত বিনিময়’ কথাটি ঠিক নয়, হবে ‘মতামত বিনিময়’। কারণ দুই পক্ষই যে বিষয়ে একমত তা বলবে আর যে বিষয়ে একমত নয় তাও বলবে। মতের বিষয়ে কথা হবে, অমতের বিষয়েও আলোচনা হবে। এরপর যুক্তিতর্কের পর একটা সমঝোতায় আসবে। কারণ তারা বিবাদ না করে মিলেমিশে থাকতে চায়।

বলেছি যে, ‘মত বিনিময়’ আবার নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এটা এক শব্দ, নাকি দুই শব্দ?

এটাকে অ-অন্ত্যক ত উচ্চারণ করলে (মতঅ) অর্থ হয়ে যায় অ্যাজ লাইক অ্যাজ। আবার মৎ-এর মতো করে উচ্চারণ করলে তার অর্থ হয়ে যায় মদীয়, স্বীয় বা আমার। ‘মতামত বিনিময়’ শিরোনামটিই নিরাপদ। কারণ এই ধরনের সমাবেশে এক বা একাধিক পক্ষ নিজেদের মতের মিল এবং অমিল দুটোই ব্যক্ত করেন।

এখন তোরা আমারে বল, এরা যে মারামারি লাগছে তার কারণ কি? ইয়াং গ্রুপ সমস্বরে বলে উঠলো, দাদা আপনিই বলেন। হাসেম সাহেব বললেন, ওরা সভাটি আহ্বান করেছে দুই পক্ষের মতের মিলগুলো জানার জন্য, অমতের বিষয়গুলো শোনার জন্য নয় আর এটা তারা করেছে অজ্ঞতার কারণে। মতের মিল থাকলে তো আর সম্প্রীতি গড়ে তোলার জন্য সভা করতে হয় না, অমিলগুলো দূর করার জন্যই দ্বিপাক্ষিক সভা করতে হয়। মত এবং অমতের বিষয়গুলো শোনার পর আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে বিজ্ঞজন বিবাদ পরিহার করার পথটি বাতলে দেন। দু’পক্ষকেই তখন কিছু কিছু বিষয়ে গ্রহণ-বর্জনের প্রক্রিয়ায় পাস করতে হয়। তাহলে এটা এখন পরিষ্কার যে, শিরোনামের ভুলেই দুর্নাম চলে আসে। শব্দার্থের ভুলে যে সংঘাত আসতে পারে এ কথা কল্পনা মনে হলেও তা কিন্তু ঠিক।

বিষয়টা আরো সহজ করার জন্য তোমাদেরকে পিচ্চি সাইজের দুইটা গল্প বলি। অল্প বয়সীরা একত্রেই বলে উঠলো, বলেন দাদা বলেন।

হাসেম সাহেব বললেন, তোমরা অনেক জায়গায় একটা নোটিশ দেখতে পাও যাতে লেখা থাকে- ‘এখানে প্রস্রাব করবেন না, করলে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা’। বান্দর মার্কা পোলাগুলায় করে কি, কি করে? করবেন না শব্দটার করবেন অংশের পর একটা কমা লাগিয়ে দেয় আর আগের কমাটা মুছে দেয়, তখন কথাটা দাঁড়ায়- ‘এখানে প্রস্রাব করবেন, না করলে পঞ্চাশ টাকা জরিমানা’। সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।

হাসেম সাহেব ছোট্ট আরেকটি গল্প বললেন। শুরু করার আগে বললেন, এই গল্পটা বড়দের জন্য। হেসে বললেন, যারা ছোট তারা এইডা শুইনো না।

একবার এক মেয়ের বাপ এলাকার মাদবরের কাছে এসে মেয়ের জামাইয়ের বিরুদ্ধে নালিশ করলো এই মর্মে যে, জামাই তার মেয়েটাকে প্রায় প্রত্যেক দিনই মারধর করে। মাদবর সাব শুনে একটু অবাক হলেন। কারণ যার বিরুদ্ধে নালিশ করা হলো সে একটা ভালো ছেলে, বাজে ছেলে না। তিনি সবার অজান্তে ওই ছেলেকে খবর দিয়ে আনলেন। ওনার বৈঠকখানার সবাইকে কিছু সময়ের জন্য বাইরে যেতে বললেন। ছেলেটাকে স্নেহভরে ডেকে পাশে বসিয়ে বিষয়টা জানতে চাইলেন। সে জানালো, দাদা, আমি ওরে আদর করতে চাইলে খেইপ্পা যায় আর আমার মাথা গরম হইয়া যায়। মাদবর সাব আরো কয়েকটি প্রশ্ন করার পর মূল সমস্যাটি বুঝতে পারলেন। স্বামী যখন নিজেকে নিবেদন করতে চায়, তখন স্ত্রী শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে না। তিনি ছেলেটাকে সহজ করে বুঝিয়ে দিলেন, বাবা রে, হঠাৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়লে মহব্বত হয় না, একটু হাসাহাসি করতে হয়, সময় নিতে হয়, দুই পক্ষই একমত হইতে হয়। বুঝতে পারছো? তুমি ভালো ছেলে বলেই আমার হাতে মাইর খাও নাই। খেয়াল কইরা কাম কইরো। আবার যেন নালিশ না আসে। ছেলেটা সলাজ হাসি হেসে বললো, জ্বি দাদা, আর ভুল হবে না।

মুরুব্বি হঠাৎ হেঁকে উঠলেন- কইরে, চা-বিস্কুটের পয়সা নিয়া যা। চা দোকানের ছেলেটা এগিয়ে এসে বললো- দাদা, বিল দিয়া দিছে। কে দিছে? জব্বর ভাই দিছে। মুরুব্বি বললেন, কস কি? আসলে জব্বর একটা ভালো ছেলে। মজলিস যখন শেষ হলো তখন সবার মুখে ছিলো মুচকি হাসি!

শেয়ার করুন