১৪ জুন ২০১২, শুক্রবার, ০৫:১৬:৩০ অপরাহ্ন


রহস্যঘেরা ডোনাল্ড লু’র ঢাকা সফর
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১১-০১-২০২৩
রহস্যঘেরা ডোনাল্ড লু’র ঢাকা সফর যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু


১৪ জানুয়ারি রাতে ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। মার্কিন এ প্রতিনিধির ঢাকা সফর কেন্দ্র করে বাংলাদেশে রীতিমতো তোলপাড়। বিশেষ করে পাকিস্তানে ইমরান খানের দলের সরকার চ্যুতির নেপথ্যে এ মার্কিন প্রতিনিধির হাত থাকতে পারে বলে ইমরান খানের দলের বিষেশ ইঙ্গিত রয়েছে। এটা অবশ্য অস্বীকার করারও উপায় নেই, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে তিনি। এ অঞ্চলে মার্কিন নীতি বাস্তবায়ন তার টেবিল ঘুরেই হবে এটাই সত্য। ফলে সেই ডোনাল্ড লু’র রুটিন সফর হলেও এখানে কী তিনি কোনো বার্তা দেবেন?  বা তিনি কোনো বার্তা বহন করছেন? যদি তাই হয় তাহলে সেটা কী? সেটা না হলে তার আসার রহস্য কী। এমন নানা আলোচনা রীতিমতো রাজনৈতিক পাড়ায়। তার ঢাকায় আসার খবরে অনেকের মধ্যে অস্বস্তিও। 

জানা গেছে, এটা তার রুটিন সফর। এতে বাংলাদেশও পারস্পরিক স্বার্থ সম্পর্কে আলোচনা করবে। মার্কিনিরাও তাদের এ অঞ্চলের নীতির বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে আনতে পারেন আলোচনায়। দু’বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের আলোচনা, ঐকমত্যে পৌঁছা এভাবেই হয়ে থাকে। 

সন্দেহের দানা অন্যখানে 

ঢাকায় গত ১৪ ডিসেম্বর পিটার ডি হাস রাজধানীর তেজগাঁওস্থ শাহীনবাগে ‘মায়ের ডাক’ নামের (বাংলাদেশে গুম খুন ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজনদের সংগঠন) একটি সংগঠনের সদস্য পরিবারের বাসায় যান। এ পরিবারের সদস্য সাজেদুল ১০ বছর আগে গুম হয়েছিল বলে তার পরিবার অভিযোগ করেছে। সাজেদুল বিএনপি রাজনৈতিক দলের নেতা হওয়ায় তার বাসায় পিটার হাসের যাওয়া নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। এটাকে কেউ কেউ তাদের ভাষায় কূটনৈতিক শিষ্টাচার-বহির্ভূত বলেও মনে করেছেন। 

তবে পিটার হাস যে ওই বাসায় যাবেন সেটা কিভাবে জেনে গিয়েছিল নতুন করে সংগঠিত হওয়া আরেকটি সংগঠন ‘মায়ের কান্না’ (১৯৭৭ সালে বিমান ছিনতাই ঘটনার সময়, ও ডিফেন্সের বিভিন্ন নিয়ম কানুনে বা যাদেরকে কথিত বিনাবিচারে হত্যা করা হয়েছে, তাদের অত্মীয়-স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের কান্না’) শাহীনবাগে যায় এ রহস্য আজো রয়ে গেছে। কীভাবে মায়ের কান্না পিটার হাসের ওই বাসায় যাওয়ার ঘটনা কীভাবে জেনেছিল এবং আচমকা সেই বাড়িতে গিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে তাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে স্মারকলিপি দেয়ার চেষ্টা করেছিল এবং পিটার হাসের বহনকারী গাড়ি ঘিরে এ ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উষ্মা জানিয়েছেন। সেখানে কিছুটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বিদায় নিতে হয়। 

এর পর দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানারকম জটিলতার কথা শোনা যা গেছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাবে। তবে অনেকে মনে করছেন, লু’র ঢাকায় সফর অনেক বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ পিটার হাসের ওই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বাংলাদেশে নিযুক্ত তাদের রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিরাপত্তায় উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দেয়। একইসঙ্গে ঢাকাতেও পিটার হাসের ঘটনা নিয়ে কয়েকজন দায়িত্বশীল ও সুশীলসমাজের একাংশের বিবৃতি ওই দু’পক্ষের কথা চালাচালির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে ইঙ্গিত করে ঢাকাস্থ রুশ দূতাবাসের দেয়া পাল্টাপাল্টি বিবৃতি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরানকে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে তলব করেছিলেন ডোনাল্ড লু। ওই ঘটনার পরপরই তার বাংলাদেশ সফরে আসার যেহেতু শিডিউল, তাই এটা নিয়ে একরকম তোলপাড়। অনেকেই মনে করছেন এ শিডিউল পূর্বঘোষিত, কাকতালীয় মিলে গেছে এমন এক ঘটনার পরপরই। তবে বাস্তবতা জানা সম্ভব হয়নি। 

তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন ডোনাল্ড লু’র বাংলাদেশ সফর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে মার্কিন বিভিন্ন নীতির বাস্তবায়ন চান তারা। বাংলাদেশের দাবির মধ্যে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, জিএসপি পুনর্বহালসহ বেশ কিছু ইস্যু রয়েছে সেগুলোর সুষ্ঠু সমাধান যেমনটা বেশ কিছুদিন ধরেই চেয়ে আসছে। চেষ্টা করছে মার্কিনিদের তুষ্ট করে সুবিধাগুলো আদায় করে নেয়া। বন্ধুত্ব আরো জোরদার করন। তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশে আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য এবং সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠান। এছাড়াও বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের নিরাপত্তাসহ আরো কিছু দু’দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের সমাধান। 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সফরের সময় সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়গুলো হবে ১৫ জানুয়ারি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি মিটিং 

সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় এক সমন্বয় সভায় ডোনাল্ড লু’র ঢাকা সফর নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশ। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ছাড়াও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সিনিয়র প্রতিনিধিরা ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অভিন্ন সুরে কথা বলার প্রসঙ্গটি গুরুত্ব পায়। সরকারের তিন সিনিয়র মন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তার প্রসঙ্গটিও আসে। বিশেষ করে সম্প্রতি রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানস্থলে একদল লোক হঠাৎ মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসকে ঘিরে ধরাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ জানানো বিষয়টি। 

যেসব বিষয়ে পারস্পরিক আলোচনার সম্ভাবনা  

ঢাকায় বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ডোনাল্ড লু বাংলাদেশ সফরের সময় সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। দু’পক্ষের দিক থেকে বাংলাদেশের পক্ষে  র‌্যাবের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বাংলাদেশের জিএসপি পুনর্বহাল, শান্তি রক্ষা ও প্রতিষ্ঠা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, যুক্তরাষ্ট্রে পলাতক বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রাশেদ চৌধুরীর প্রত্যাবর্তন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে আলোচনা উঠে আসতে পারে। অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাংলাদেশে মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার সুরক্ষা, গুম, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, গণতন্ত্রের বিকাশ, অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। 

অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধির সম্ভব্য আলোচনার বিষয়গুলো নিয়ে দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশে নিযুক্ত পিটার হাস ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহের রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিরাও এ বিষয়ে কথা বলে আসছেন। এ সভায় সেগুলোরই প্রতিধ্বনি হতে পারে। 

বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা 

জো বাইডেনের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের বিকাশ ও টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ দিয়ে আসছে মার্কিন প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেন দায়িত্ব গ্রহণের পরই গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। সাধারণত যে সমস্ত দেশে গণতন্ত্র নেই সেসব দেশকে ওই সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যে তালিকায় ছিল মায়ানমার, উত্তর কোরিয়ার মতো দেশও। এটা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য অনেকেই ‘লজ্জা’ বলে অভিহিত করেছেন। এরপরের বছরই ডিসেম্বরে র‌্যাবের ওপরে স্যাংশন আরোপ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মানবাধিকার ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর নানারকম চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করে। এ সময় বাংলাদেশে নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন পিটার ডি হাস। পিটার ডি হাস এসেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেন অংশগ্রহণমূলক হয়, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। পিটার ডি হাস সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত সরব ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বিশেষ করে ১০ ডিসেম্বর বিএনপির মহাসমাবেশের আগে ৭ ডিসেম্বর পুলিশের সঙ্গে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সহিংসতার পর তিনি অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেন। ওয়াশিংটনও এ সময় অন্তত তিনটি বিবৃতি দিয়ে বিরোধী মতপ্রকাশ দমনের আহ্বান জানান সরকারকে। এর ধারাবাহিকতায় ছিল শাহীনবাগে যাওয়া তার ওই ঘটনা। 

উল্লেখ্য, গত ৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন মার্কিন এই পররাষ্ট্র কর্মকর্তা ডোনাল্ড লু। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি দেশটির দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

বাংলাদেশ সফর করে গেছেন লাউবাচার 

এর আগে গত শনিবার বাংলাদেশে চারদিনের সফর শেষ করে ফিরে গেছেন হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র পরিচালক আইলিন লাউবাচার। তার ওই সফরে বাইডেন প্রশাসনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। তাদের সূচিতে ছিল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ। এ ছাড়াও মার্কিন প্রতিনিধিদলটি ঢাকা আগারগাঁও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিদর্শনও ছিল সফরসূচিতে। বাংলাদেশ সফর শেষে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার কথা তাদের।

শেয়ার করুন