১৪ জুন ২০১২, শুক্রবার, ০৬:৫২:২১ অপরাহ্ন


কথার কথকতা
মাইন উদ্দিন আহমেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৮-০৭-২০২২
কথার কথকতা


নিউইয়র্কের বাংলা পত্রিকাগুলো কি এখানকার প্রশাসন এবং বাংলাদেশ এ্যাম্বেসী ও কনসুলেটে পৌঁছে? বিভিন্ন কারনে আমার সন্দেহ হয়েছে বলে আমি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিলাম বিভিন্ন সময়ে। কাজ হয়েছে বলে মনে হচ্ছেনা। শুধুমাত্র সাবওয়েতে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানোর পরামর্শটি সার্বিক পরিস্থিতির কারনে কিছুটা বাস্তবায়ন অভিমুখী প্রতীয়মান হচ্ছে। সাবওয়ে এবং সংশ্লিষ্ট বাসগুলোর সফ্টঅয়্যার এ্যাকুরেসির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আগের মতোই মনে হচ্ছে। কিউ-৮ বাস সবগুলো সামনের স্ট্যান্ড ডিসপ্লে বোর্ডে নির্দেশ করছেনা। অনেক বাসে সিস্টেমই অনুপস্থিত। দুএকটা কিউ-৫৩ বাসেও একদা এ সমস্যা দেখেছিলাম। তাছাড়া উডহ্যাভেন বুলেভার্ড-১০১ এভিন্যূর টিকেট মেশিনে প্রায়শঃই কাগজ থাকেনা, মেশিনগুলো কার্ড থেকে টাকা কেটে ধন্যবাদ দিয়ে চুপ হয়ে যায়, টিকেট দেয়না। সমস্যাটি নিউজপেপারে লিখেছি, কাজ হয়নি।

সাবওয়ে ট্রেনগুলো ইদানিং লাইনের রিপেয়ার সম্পর্কিত গতি পরিবর্তনে ভুগছে কিন্তু এগুলোর ডিসপ্লে বোর্ড সব সময় পরিবর্তনের সঠিক নির্দেশনা দিচ্ছেনা। এ বিষয়ে আগেও লিখেছিলাম কিন্তু বিষয়টি কারো মনযোগ আকর্ষণ করেছে বলে মনে হলোনা। করলেতো অগ্রগতি সাধিত হতো। অগ্রগতির কোন চিহ্ন আমাদের নজরে পড়েনি। শুক্রবার রাতে জ্যাকসন হাইটস থেকে আমার ব্রæকলিনের বাসায় আসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলে আপনারাও বিস্মিত হবেন।

সেদিন জ্যাকসন হাইটসের ‘ড্রীম লাইটার’ থেকে যখন বাসার উদ্দশ্যে রওয়ানা দেবো দেবো করছি তখন রাত সাড়ে এগারোটা। আমাকে সচরাচর গাড়িতে বাসায় লিফ্ট দেন যিনি তাঁর গাড়িটা কাছে ছিলোনা সেদিন। অন্যান্য সময়ে সিইও সাহেব উবার ভাড়া করে দেয়ার প্রস্তাব দেন। বেশির ভাগ সময় আমি না করি এবং ট্রেন ধরি। মাঝেমাঝে উবারও কাজে লাগাই। সাড়ে এগারোটা নিউ ইয়র্কের জন্য কোন জটিল সময় নয় বলে সিইও সাহেবও তেমন চাপ দেননি। আমি যথারীতি বিদায় নিয়ে রওয়ানা দিলাম। আমার হাতে দুটো পলিব্যাগ। একটাতে ফার্মেসী থেকে নেয়া ঔষধ এবং আমার বেøজার। গরম পড়ছে কিন্তু বেøজারটি পরতে হয়েছিলো বিকেলে টাইম টিভিতে একটা অনুষ্ঠান করার সময়। আরেকটি পলিব্যাগে অফিস থেকে দেয়া কিছু খাবার। বহনের কৌশল হিসেবে দুটোকে আমি গিট দিয়ে নিয়েছিলাম। আরেকটা কথা বলে রাখা ভালো যে, আমার শরীরটাও ইদানিং ভালো যাচ্ছেনা। রেগুলার চেকআপের বাইরে আলাদা একটা বøাড টেস্ট করাতে হয়েছিলো ডাক্তারের পরামর্শে। আজ সকালেই ডাক্তার সাহেব রিপোর্ট দিলেন যে, রক্তে সোডিয়াম কম। মনে পড়লো, এই সমস্যার কারণে বছর দেড়েক আগে আমাকে তিন দিন ব্রæকডেল হাসপাতালে থাকতে হয়েছিলো। কিন্তু আজকের ভ্রমণটি যে মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে উঠবে তা ভাবতেই পারিনি। তাছাড়া এখানকার ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থার উপর আমার অতি আস্থাও আমাকে খারাপ কিছু ভাবতে নিষেধ করে। তো আসুন, বাকি পথটুকু এগিয়ে যাই। আমার বয়স এবং শারীরিক অবস্থার বিবেচনায় হাতের পটলা দুটোকে মোটামোটি ভারি না বললেও হালকা বলা যাবেনা। অবশেষে ঢুকে পড়লাম পাতালপুরীতে, জ্যাকসন হাইটস সাবওয়ে স্টেশনে, ডাইভার্সিটি প্লাজার ওখান দিয়ে।

অনেক সময় অপেক্ষার পর ট্রেন এলো। এ সময় থেকে পুরো রাত ট্রেনগুলো এক্সপ্রেস না হয়ে লোকাল সার্ভিস দেবে, ধরবে সব স্টেশান। আমার ই-ট্রেনের ইলেক্ট্রনিক ডিসপ্লে বোর্ড দেখালো কানেক্টিং এ-ট্রেন পাওয়া যাবে ৫০-স্ট্রিট, ৪২-স্ট্রিট এবং ক্যানাল স্ট্রিট স্টেশানে। অনেক সময় ব্যয় করে ক্যানাল স্ট্রিট পোঁছলাম। স্টেশানের ডিসপ্লে দেখালো ১৬ এবং ২২ মিনিট পর দুটো এ-ট্রেন আসবে। কিন্তু দুটো সময়ই পার হবার পর এ-ট্রেনের সব তথ্য ডিসপ্লে বোর্ড থেকে গায়েব হয়ে গেলো। আরেক যাত্রিকে দেখা গেলো ছটফট করছেন। তিনি স্টেশানের উল্টা দিকে চলে গেলে আমিও গেলাম। ততক্ষণে আমিও ভাবছিলাম পেছনের দিকে ৪২-স্ট্রিট গিয়ে ব্রæকলিনের দিকে যাওয়া এ-ট্রেন খুঁজতে হবে। তাকিয়ে দেখি অপেক্ষমান যাত্রিটি আবার আগের সাইডে চলে গেছেন। তিনি চিৎকার করে জানান দিলেন যে, ট্রেন আসবার টাইম শো করছে। আমি আবার ওপাশে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারমুখী দুটো ই-ট্রেনের সময়সূচি দেখাচ্ছে।  অবশেষে বসে পড়লাম। অনেক সময় পরে আসা ই-ট্রেনে চেপে পরবর্তী এবং ট্রেনটির এদিকের লাস্ট স্টেশান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে গিয়ে নামলাম। ভেতর দিয়ে কিছু সময় হেঁটে আবার টিকেট সোয়াইপ করে ফুলটন স্ট্রিটে ঢোকা যায়। কিন্তু ক্যানাল স্ট্রিটে একটা ছাপানো নোটিশে দেখেছি এ-ট্রেন ফুলটন ধরবেনা তাই গেলামনা। ক্যানালে থাকতেই ঘোষণা শুনেছিলাম এ-ট্রেনের জন্য ওয়েস্ট-৪ স্টেশানে যেতে। তাই ই-ট্রেনে উল্টো দিকে গিয়ে ওয়েস্ট-৪ নামলাম। অনেক সময় অপেক্ষা করলাম, এ-ট্রেনের তথ্য সম্বলিত কোন ডিসপ্লে নজরে পড়লোনা। আবার উঠলাম উল্টোগামী এ-ট্রেনে, নামলাম ৪২-স্ট্রিট স্টেশানে। ওখানে কানেক্টিং প্ল্যাটফর্ম খুঁজে নেয়াও বেশ শ্রমের কাজ। আপনারা জানেন, এটা অনেক বড় স্টেশন। অবশেষে যথাস্থানে পৌঁছলাম। হঠাৎ করে ডাউনটাউনগামী দুটো এ-ট্রেনের স্কেজুল দেখালো, একটা ১৬ মিনিট পর, আরেকটা ২৮ মিনিট পর। কিন্তু ১৬ মিনিট শেষ হবার ৫/৬ মিনিট আগেই প্রথম ট্রেনটি চলে এলো। শক্তি পাচ্ছিলামনা, তারপরও ভাবলাম, জীবন যুদ্ধের নিউ ইয়র্ক পর্বে এসে পরাজয় বরণ করা বোধ করি ঠিক হবেনা। তাই নিজেকে টেনে হিঁচড়ে তুললাম এবং বসে পকেট থেকে ফোন বের করে এমন ভাবে ব্রাউজিং আরম্ভ করলাম যাতে কেউ ‘ক্লান্ত বুড়া’ মনে করে কোন কুমতলব না আঁটে। কতো কিছু ভাবতে হয় ভাই, ভাবার কোন বিকল্প এবং বিরতি নাই! ইদানিং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে নিউ ইয়র্কের মানুষেরা। আশ্চর্য কান্ড এই যে, এ-ট্রেনটি ১৪-স্ট্রিট এবং ওয়েস্ট-৪ দুটে স্টেশানেই থামল! 

আমার নামবার স্টেশন হলো গ্র্যান্ট এভিন্যু। খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় বলে অন্য সময়ে আমি পরবর্তী স্টেশন ৮০-স্ট্রিটে নামি, ওটি মাটির উপরে বলে সিঁড়ি বেয়ে নামতে হয় শুধু। হার্টের রোগি তাই আমার খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওঠা ডাক্তারের নিষেধ। এদিন আমি নামবার সিদ্ধান্তটি পাল্টালাম। কারন পরবর্তি স্টেশানে নামলে আমাকে হেঁটে ফোরবেল স্ট্রিট হয়ে বাসায় আসতে হবে যেখানে কয়েক মাস আগে এক বাংলাদেশী যুবক আততায়ির গুলিতে নিহত হয়েছিলো। কতো কিছু ভাবতে হয়! অবশেষে গ্র্যান্ট এভিন্যুতে নেমে, খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে, আরো পাঁচ মিনিট হেঁটে বাসায় পৌঁছে আরেকটা খাড়া সিঁড়ি বেয়ে যখন দোতলায় আমার বাসায় ঢুকলাম তখন ভোর তিনটা বেজে ঊনষাট মিনিট। প্রিয় পাঠক, আমি নিশ্চিত নই ক’জন এই কঠিন বর্ননা পাঠ করবেন। যাঁরা পড়েছেন, প্লীজ বলুনতো, এখানকার যানবাহন কেমন চলছে আর এ অধমের জীবন সংগ্রাম কেমন হচ্ছে? টিকে থাকা যাবেতো?


শেয়ার করুন