শিশুদের জন্য একটি নতুন সঞ্চয় কর্মসূচির ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি নতুন সঞ্চয় কর্মসূচি চালু হতে যাচ্ছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস’। আগামী জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই কর্মসূচিটি গত বছর পাস হওয়া ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর অংশ হিসেবে প্রণীত। হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অ্যাকাউন্টের মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুদের জন্মের পরপরই সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করা এবং পরিবারগুলোকে ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করা। ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস মূলত ১৮ বছরের নিচে থাকা শিশুদের জন্য তৈরি একটি বিশেষ ধরনের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ হিসাব, যেখানে জমা রাখা অর্থ শেয়ারবাজারভিত্তিক বিনিয়োগের মাধ্যমে সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকবে। সরকারের ধারণা, ছোটবেলা থেকেই বিনিয়োগের সুযোগ পেলে শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সময় একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মূলধন হাতে পাবে, যা তাদের শিক্ষা, বাসস্থান বা উদ্যোক্তা হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ জীবনের সিদ্ধান্তে সহায়ক হবে।
এ কর্মসূচির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য যুক্তরাষ্ট সরকারের পক্ষ থেকে এককালীন ১ হাজার ডলার প্রাথমিক অনুদান। ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মার্কিন নাগরিক শিশু এই অর্থ পাবে, পরিবারের আয়ের পরিমাণ যাই হোক না কেন। অর্থাৎ ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকল নবজাতক এই সুবিধার আওতায় আসবে।কর ও আর্থিক পরামর্শকরা বলছেন, এই ‘ফ্রি মানি’ই ট্রাম্প অ্যাকাউন্টসের সবচেয়ে বড় প্রণোদনা। অনেক পরিবারের পক্ষে নিয়মিত বড় অঙ্কের অর্থ সঞ্চয় করা সম্ভব না হলেও শুধু এই ১ হাজার ডলারই ভবিষ্যতে উল্লেখযোগ্য অঙ্কে পরিণত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজারের গড় প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিলে, ১৮ বছরে এই অর্থ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যোগ্যতার দিক থেকে দেখতে গেলে, যেকোনো ১৮ বছরের নিচে থাকা মার্কিন নাগরিক শিশুর নামে ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে। তবে সরকারিভাবে দেওয়া ১ হাজার ডলারের বিশেষ সুবিধা শুধু নির্ধারিত চার বছরের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য সীমাবদ্ধ। এই অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে, এক্ষেত্রে আলাদা করে আবেদন করার প্রয়োজন হবে না বলে জানানো হয়েছে। সরকারি অনুদানের পাশাপাশি বেসরকারি খাত থেকেও এ কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের সহায়তা আসছে। সম্প্রতি দাতব্য সংস্থা ও প্রযুক্তি খাতের পরিচিত মুখ মাইকেল এবং সুসান ডেল ঘোষণা দিয়েছেন, তারা ট্রাম্প অ্যাকাউন্টসের জন্য ৬ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার অনুদান দেবেন। এই অর্থের মাধ্যমে প্রথম ২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন শিশু, যাদের বয়স ১০ বা তার নিচে এবং যারা এমন জিপ কোডে বসবাস করে যেখানে গড় আয় ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারের নিচে তারা অতিরিক্ত ২৫০ ডলার করে পাবে।
এছাড়া কিছু বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের শিশুদের জন্য সরকারের ১ হাজার ডলারের অনুদানের সমপরিমাণ অর্থ যোগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অর্থাৎ কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি শিশুর অ্যাকাউন্টে শুরুতেই ২ হাজার ডলার বা তারও বেশি জমা হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশাল তহবিলে রূপ নিতে পারে।
ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ জুলাই ২০২৬। এর আগে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগ (আইআরএস) একটি খসড়া আবেদনপত্র প্রকাশ করেছে, যার নাম ফরম ৪ হাজার ৫৪৭। এই ফর্মটি চূড়ান্ত হলে পরিবারগুলো তাদের বার্ষিক ট্যাক্স ফাইল করার সময়ই ট্রাম্প অ্যাকাউন্ট খোলার আবেদন করতে পারবে।
আইআরএস জানিয়েছে, শুধু কাগজপত্রের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকবে না। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মের মধ্যে একটি অনলাইন পোর্টাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে বাবা-মা বা অভিভাবকেরা সহজেই অনলাইনে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন। এতে করে প্রক্রিয়াটি আরো সহজ ও সবার জন্য প্রবেশযোগ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একবার অ্যাকাউন্ট খোলা হয়ে গেলে, সেখানে অর্থ জমা দিতে পারবেন বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, আত্মীয়স্বজন, এমনকি পারিবারিক বন্ধু বা নিয়োগকর্তারাও। তবে বছরে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত জমা দেওয়ার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অর্থ জমা হবে কর পরবর্তী ডলার থেকে, অর্থাৎ জমার সময় কোনো তাৎক্ষণিক কর ছাড় পাওয়া যাবে না।
এ কর সুবিধার অভাবকে কেউ কেউ ট্রাম্প অ্যাকাউন্টসের একটি দুর্বল দিক হিসেবে দেখছেন। কারণ ৫২৯ পরিকল্পনা বা কিছু অবসর সঞ্চয় ব্যবস্থায় জমা দেওয়ার সময় কর ছাড় পাওয়া যায়। তবেফাইনান্সিয়াল বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের ১ হাজার ডলারের অনুদান এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা এই সীমাবদ্ধতাকে অনেকটাই পুষিয়ে দেয়। ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস থেকে অর্থ তোলার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে। সাধারণভাবে, শিশুর বয়স ১৮ না হওয়া পর্যন্ত এই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা যাবে না। এর উদ্দেশ্য হলো, অল্প বয়সে সঞ্চিত অর্থ যেন অন্য কাজে খরচ হয়ে না যায় এবং প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষিত থাকে।
১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর, নির্দিষ্ট কিছু খাতে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে কোনো অতিরিক্ত জরিমানা ছাড়াই। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চশিক্ষার খরচ, প্রথম বাড়ি কেনা, অথবা নিজস্ব ব্যবসা শুরু করা। এসব ক্ষেত্রেই সরকার তরুণদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে উৎসাহ দিতে চায়। তবে ১৮ বছর পার হওয়ার পর এই অ্যাকাউন্টকে অনেকটাই একটি ঐতিহ্যবাহী আইআরএ-এর মতো বিবেচনা করা হবে। অর্থ তোলার সময় তা সাধারণ আয়ের মতো করযোগ্য হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে করের বিষয়টি মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস বেশ নিয়ন্ত্রিত। শিশুর বয়স ১৮ হওয়ার আগে এই অ্যাকাউন্টে জমা অর্থ অবশ্যই কম খরচের শেয়ারবাজারভিত্তিক ইনডেক্স ফান্ডে বিনিয়োগ করতে হবে, যেমন ইটিএফ বা মিউচুয়াল ফান্ড। একক কোনো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে না। বাজার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের আশ্বস্ত করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইনডেক্স ফান্ডে বিনিয়োগ মানেই পুরো অর্থনীতি জুড়ে বিনিয়োগ। ইতিহাস বলছে, দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মার্কিন অর্থনীতি সাধারণত ঊর্ধ্বমুখী প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। ফলে স্বল্পমেয়াদি ওঠানামা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে লাভের সম্ভাবনাই বেশি।
ট্রাম্প প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, যদি কোনো শিশু শুধু সরকারের দেওয়া প্রাথমিক ১ হাজার ডলারই পায় এবং পরিবার প্রতি বছর সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার করে জমা দেয়, তাহলে ১৮ বছরে সেই তহবিলের পরিমাণ ৫ হাজার ৮০০ ডলার থেকে শুরু করে ৩ লাখ ডলারেরও বেশি হতে পারে, বাজারের পারফরম্যান্সের ওপর নির্ভর করে।
তবে আর্থিক উপদেষ্টারা পরিবারগুলোকে সতর্ক করে বলছেন, ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস সবার জন্য একমাত্র সেরা সমাধান নাও হতে পারে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা, লক্ষ্য এবং কর পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। অনেক ক্ষেত্রেই ৫২৯ শিক্ষা সঞ্চয় পরিকল্পনা আরো বেশি কর সুবিধা দিতে পারে, বিশেষ করে যেসব রাজ্যে রাজ্য কর ছাড় রয়েছে।
৫২৯ পরিকল্পনার মূল সুবিধা হলো, এটি বিশেষভাবে শিক্ষা খরচের জন্য তৈরি এবং এতে করমুক্ত বৃদ্ধির সুযোগ থাকে। তবে এর সীমাবদ্ধতাও কম নয়। শিক্ষা ছাড়া অন্য কোনো কাজে এ অর্থ ব্যবহার করলে অতিরিক্ত কর ও জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে। এদিক থেকে ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস তুলনামূলকভাবে বেশি নমনীয়। শিক্ষা ছাড়াও বাড়ি কেনা বা ব্যবসা শুরু করার মতো কাজে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে। ফলে যেসব পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরো বিস্তৃত পরিকল্পনা করতে চায়, তাদের জন্য এটি আকর্ষণীয় বিকল্প হতে পারে।
অনেক আর্থিক বিশেষজ্ঞের মতে, যেসব পরিবার সরকারের ১ হাজার ডলারের অনুদানের জন্য যোগ্য, তাদের অন্তত অ্যাকাউন্টটি খুলে রাখা উচিত, এমনকি শুরুতে অতিরিক্ত কোনো অর্থ জমা না দিলেও। কারণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে পারে এবং ভবিষ্যতে অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ সব সময়ই থাকবে। কিছু পরিবার আবার দুই ধরনের সঞ্চয় ব্যবস্থার সমন্বয় করতে পারে। অর্থাৎ সন্তানের শিক্ষার জন্য ৫২৯ পরিকল্পনা এবং সামগ্রিক আর্থিক ভবিষ্যতের জন্য ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস দুটোই চালু রাখা যেতে পারে। এতে ঝুঁকি ও সুবিধার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের জন্য সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ধারণায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। সরকারের সরাসরি আর্থিক সহায়তা, বেসরকারি দাতাদের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ-এ তিনের সমন্বয়ে এই কর্মসূচি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্থিক ভিত্তি আরো শক্তিশালী করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।