১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:১৪:৬ পূর্বাহ্ন


জনগণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বার্তা দিয়েছে
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৮-০২-২০২৬
জনগণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বার্তা দিয়েছে প্রতীকী ছবি


যে যাই বলুক শত বাধাবিপত্তি, ন্যারেটিভ আর মেটিকুলাস ডিজাইন উপেক্ষা করে বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচনে স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে করার বার্তা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অধিনায়ক, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পেয়েছে নিরঙ্কুুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ভারত বিরোধিতা আর তথাকথিত আওয়ামী ফ্যাসিজম বুলি আওড়ানো দেশবিরোধী চক্র হয়েছে প্রত্যাখ্যাত। পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আসা বিএনপির সামনে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দেশ পুনর্গঠনের বিশাল চ্যালেঞ্জ। আওয়ামী লীগসহ সব মূলধারার রাজনৈতিক দলকে মুক্ত রাজনীতির সুযোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত আদর্শে বৃহত্তর পরিসরে জাতীয় একতা সৃষ্টি এখন প্রধান কাজ। ১৯৯১-৯৬, ২০০১-২০০৬ ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিয়ে সমতা আর বৈষম্যমুক্ত দেশ গঠনে রাজনীতি থেকে প্রতিহিংসা দূর করে এখন পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভারতসহ সব দেশের সঙ্গে সৎ এবং সুষম সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনে দলমত নির্বিশেষে সৎ দেশপ্রেমিক সঠিক পেশাদারদের কাজে লাগিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক সামাজিক অবকাঠামো সৃষ্টি করতে হবে। 

অন্যতম প্রধান কাজ হবে দেশের উন্নয়নে দেশি-বিদেশি পুঁজি আকর্ষণের জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা সৃষ্টি। আর সেই কাজে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনীয় সংস্কার করে আমলাতন্ত্রের অশুভ প্রভাব মুক্ত করতে হবে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, দুর্নীতি দমন বিভাগ, বিচার বিভাগ দলীয় প্রভাব মুক্ত করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য গণমুখী করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। আরো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত জ্বালানি বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে প্রাধিকার দিয়ে নিজস্ব জ্বালানি গ্যাস, কয়লা, নবায়ণযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সংস্থান করতে হবে।

মনে রাখতে হবে ২০২৪ জুলাই আগস্ট আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, মব সন্ত্রাস করে মুক্তিযুদ্ধকে অপমানিত করেছিল। জুলাই আগস্ট ২০২৪ এবং পরবর্তী সময়ে দেশে সৃষ্ট সব অনাচারের সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ বিচার নতুন সরকারের স্থায়িত্বের জন্য অন্যতম প্রধান বাধা হবে। আশা করি নতুন সরকার সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সব চ্যালেঞ্জ সঠিকভাবে মোকাবিলা করে দেশকে গণতান্ত্রিক পন্থায় পরিচালিত করবে।

সাবাশ বাংলাদেশ, সাবাস তরুণ প্রজন্ম নির্বাচনে দেশবিরোধী চক্রকে করা বার্তা দেওয়ার জন্য। এটাও ঠিক অবাধ, নিরপেক্ষ হয়েছে সেটি তর্কসাপেক্ষ মোটামুটি সন্তোষজনক আর শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন, বিশেষত সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। বাংলাদেশের মতো শতধা-বিভক্ত সমাজ ব্যবস্থায় পুরোপুরি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ নির্বাচন করা এক কথায় অসম্ভব। আর একটি ম্যান্ডেটবিহীন নানা কারণে বিতর্কিত হয়ে পড়া অনির্বাচিত সরকারের জন্য আরো চ্যালেঞ্জিং। তবু বহুদিন পর দেশের মানুষ অপেক্ষাকৃত ঝামেলা বিহীন মুক্ত পরিবেশে উৎসব পার্বণের মতোই নির্বাচনে অংশ নিয়ে দেশবিরোধী চক্রকে লাল কার্ড দেখিয়েছে। আবারও প্রমাণিত হয়েছে দেশে বিএনপি আর আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলের জনভিত্তি নেই। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে থাকলে যেটুকু সাফল্য জামায়াত জোট অর্জন করেছে সেটিও অনেক সীমিত হতো। দেশের নানা সূত্রে নিশ্চিত হয়েছে একটি দেশবিরোধী চক্রকে নির্বাচনে জিতিয়ে আনার জন্য কিছু সূক্ষ্ম কারচুপি, কিছু ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। 

কিন্তু জনতার সচেতনতা আর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় অশুভ মহলের অভিলাষ পূর্ণ হয়নি। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের ফজলুর রহমান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রুমিন ফারহানার বিজয় উল্লেখ করার মতো। তাসনীম জারা আর বরিশালে মনীষা জয়ী হওয়াও উচিত ছিল। বিএনপি নেতৃত্ব এই দুই জনসম্পৃক্ত নারীদের কাজে লাগাতে পারে। বিএনপি জোটকে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের জন্য আন্তরিক অভিনন্দন।

নির্বাচনে জয়ী দল তাদের রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার করবে। প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে প্রশাসনিক এদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে মূল ধারা রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা। তথাকথিত আইসিটি (ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল) পুনর্গঠন করে সব হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা। মনে রাখতে হবে সরকারকে ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু জাদুঘরসহ সব মুক্তিযুদ্ধ স্মারক, স্মৃতি ধ্বংস এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান অপদস্ত করার বিচার মুক্তিযোদ্ধাদের দল বিএনপি প্রাধিকার ভিত্তিতে করবে বলে আশা রাখি। একই সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে পুঁজি করে ক্ষমতায় আসা সরকারের সময়ের সব নতুন বৈষম্যের দ্রুত সমাধান হবে আশা করি। 

সেনাবাহিনী অন্তত এ নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। তাদের তৎপরতায় একটি মহলের নির্বাচন কারচুপির অপতৎপরতা সীমিত ছিল। পুলিশসহ প্রশাসন কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সুষ্ঠু ভূমিকা পালন করেছে।

নতুন সরকার দ্রুত সংবিধান সংশোধন করে সম্মত সংস্কার করে দেশে দেশপ্রেমিক শক্তির একতা নিশ্চিত করবে আসা করি। সরকারকে প্রবাসে থাকা কিছু অশুভ কনটেন্ট ক্রিয়েটারদের অপতৎপরতা বন্ধের উদ্যোগ নিবে নতুন সরকার। দেশ থেকে অপরাধ করে পলাতক কিছু দুষ্কৃতকারী সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন প্রজন্মের এক সংস্থাকে বিভ্রান্ত করে মব সন্ত্রাস সৃষ্টি করে। বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে এদের নিবৃত করতে হবে।

নতুন সরকারের জন্য শুভেচ্ছা। আশা করি ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নতুন সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে দেশ গোড়ার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করবে। দুর্নীতি নির্মূল, তরুণ প্রজন্মকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসাবে সৃজনমূলক কাজে ব্যবহার করলে দেশে অচিরেই ঘুরে দাঁড়াবে।

শেয়ার করুন