ক্রুসেডার যুগের পোশাক পরা এক ব্যক্তি ফোন হাতে এক নারী ওয়ালনাট ক্রিক পার্কে শিশুদের লক্ষ্য করে মুসলিমবিদ্বেষী গালাগালি ও হুমকিমূলক বক্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছে।
টেক্সাসের অস্টিন শহরের ওয়ালনাট ক্রিক পার্কে গত ২৬ ডিসেম্বর মুসলিম পরিবারদের লক্ষ্য করে প্রকাশ্য ইসলামবিদ্বেষী হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় একটি মুসলিম সংগঠনের আয়োজনে মাসিক পটলাক অর্থাৎ সবার আনা খাবারের যৌথ ব্রেকফার্স্ট অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ফজরের নামাজ শেষে পরিবারগুলো যখন শিশুদের নিয়ে একত্র হয়ে খাওয়া-দাওয়া ও সামাজিক আড্ডায় ব্যস্ত ছিল, তখন দুজন ব্যক্তি সেখানে এসে মুসলিমবিরোধী গালি, স্লোগান ও অশ্রাব্য ভাষায় চিৎকার শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দুই ব্যক্তির একজন ক্রুসেডার যুগের পোশাক পরিহিত ছিল এবং সে একটি মেগাফোন ব্যবহার করে নারী ও শিশুদের লক্ষ্য করে মুসলিমবিদ্বেষী গালাগালি ও হুমকিমূলক বক্তব্য দিতে থাকে। এতে উপস্থিত পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে একজন কমিউনিটি সদস্য জরুরি সেবা নম্বর ৯১১-এ ফোন করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার (ফ্রি স্পিচ) কথা উল্লেখ করে মুসলিম পরিবারগুলোকে অনুষ্ঠান শেষ করে পার্ক ত্যাগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা অস্টিনের বাসিন্দা ও ইমাম মুজাম্মিল আহমদ বলেন, মুসলিম পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের নিয়ে নামাজের পর এই মাসিক পটলাকে আসে আনন্দ, প্রকৃতির সান্নিধ্য এবং পারস্পরিক বন্ধন গড়ার জন্য। শিশুদের নিরাপদে খেলার উপযোগী একটি পাবলিক স্থানে এ ধরনের হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মুসলিমরা অন্য সবার মতোই শান্তিপূর্ণভাবে বাঁচতে, কাজ করতে, সন্তান লালন করতে ও ধর্ম পালন করতে চায়। আমাদের ধর্ম পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের শিক্ষা দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব-সব ধর্মের মানুষের জন্য পাবলিক স্থানগুলো নিরাপদ ও স্বাগতপূর্ণ রাখা।
এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে মুসলিম নাগরিক অধিকার ও অ্যাডভোকেসি সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (কেয়ার) অস্টিন। একই সঙ্গে সংগঠনটি গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট, টেক্সাস অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন এবং সিনেটর জন কর্নিন (রিপাবলিকান-টেক্সাস)-এর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে-তারা যেন প্রকাশ্যে এই ঘটনার নিন্দা জানান এবং রাজ্যজুড়ে মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষ উসকে দেওয়া বক্তব্য বন্ধে কার্যকর ভূমিকা নেন।
কেয়ার অস্টিন আরো জানিয়েছে, অস্টিনের এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গরাজ্যে সংঘটিত অনুরূপ ইসলামবিদ্বেষী হয়রানির ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, যেগুলোর কিছু ক্ষেত্রে ফৌজদারি অভিযোগও দায়ের হয়েছে। সংগঠনটির অপারেশনস ম্যানেজার শাইমা জায়ান এক বিবৃতিতে বলেন, টেক্সাসে মুসলিম পরিবার ও অলাভজনক সংগঠনগুলো সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্য কর্মকর্তাদের ও বিদ্বেষী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। অস্টিনও এর ব্যতিক্রম নয়। মুসলিম কমিউনিটি ও তাদের সেবামূলক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে এসব আক্রমণ ও কুৎসা কেবল মুসলিমদের বিষয় নয়; এটি সব টেক্সানদের নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তির অনুভূতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিভাজনমূলক, ঘৃণাপূর্ণ ও হুমকিস্বরূপ বক্তব্য আমাদের সমাজের জন্য বিপজ্জনক।
তিনি আরো বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই ধর্মীয় হয়রানির অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে। সবাই যেন ভয়ভীতি ছাড়া নিজ নিজ ধর্ম পালন ও দৈনন্দিন জীবন যাপন করতে পারে। এই ঘটনার নিন্দা জানানো এবং আইনি লঙ্ঘন হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা জরুরি, যেমনটি করা হতো যদি পরিস্থিতি উল্টো হতো।
উল্লেখ্য, ঘটনাটি এমন এক সময় ঘটেছে, যখন অস্টিনের মুসলিম কমিউনিটি জানুয়ারি ২০২৬-এ শহরের প্রথম ‘অস্টিন মুসলিম হেরিটেজ মান্থ’ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই মাসব্যাপী শহর-সমর্থিত কর্মসূচির মাধ্যমে অস্টিনের মুসলিম কমিউনিটির অবদান, সংস্কৃতি ও প্রতিভা তুলে ধরার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক ঐক্য জোরদার করার লক্ষ্য রয়েছে। কেয়ার -এর মতে, এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন হয়রানি নয়; বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বাড়তে থাকা ইসলামবিদ্বেষ ও ধর্মীয় ঘৃণার একটি উদ্বেগজনক প্রতিফলন। সংগঠনটি স্থানীয় ও রাজ্য পর্যায়ের নেতৃত্বের কাছে স্পষ্ট অবস্থান ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে পাবলিক স্থানে ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়তে না হয়।