পুরান ঢাকা লক্ষ্মীবাজার এলাকার মোড়। এর একদিকে আছে বর্তমানে রাজধানীর বাহাদুর শাহ পার্ক বলে পরিচিত যা আগে ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে শহীদ হওয়া সৈন্যদের স্মৃতিতে এই নামকরণ করা হয়। আগে এ স্থানটি আন্টাঘর ময়দান নামে পরিচিত ছিল। এটি সিপাহি বিদ্রোহের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্নও বটে। এর ঠিক উত্তর-পূর্ব দিকে মাথা উঁচু করে এখনো দাঁড়িয়ে আছে ঢাকার প্রথম ব্রিটিশ আমলে নির্মিত পানির ট্যাংক। পায়ে হেঁটে রাস্তা পার হলে আছে ঐতিহাসিক ঢাকা মাদ্রাসা যা বর্তমানে কবি নজরুল সরকারি কলেজ। এর পাশেই আছে ডাফরিন মুসলিম হোস্টেল বা ডাফরিন হোস্টেল। ১৮৯০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত ঢাকার অন্যতম প্রাচীন আবাসিক ছাত্রাবাস হচ্ছে ডাফরিন হোস্টেল। এরই একটু কাছে রাস্তার ওপারে আছে হলিক্রস চার্জ। ১৯০০ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। ওই এলাকার প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ খ্রিস্টান উপাসনালয়গুলোর একটি। এছাড়া-ও আছে সেন্ট থমাস চার্চ। এটি ১৮১৯ সালে স্থাপিত ঐতিহাসিক উপাসনালয়। আরেকটু এগোলেই সে-ই লক্ষীবাজারেই দেখা মিলবে সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এটি বাংলাদেশের একটি ক্যাথলিক উচ্চ বিদ্যালয়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে ১৮৮২ সালে বেলজিয়ামের বেনেডিক্টাইন ধর্মযাজক গ্রেগরি ডি গ্রুট প্রতিষ্ঠা করেন। এগুলোর পাশাপাশি এখানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-তো আছেই। ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নামে এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি ২০০৫ সালে পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। আরেকটু দূরে আছে ১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত অবিভক্ত বাংলার প্রথম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়-ঢাকার শতবর্ষী 'ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল।
কিন্তু তাতে কি...
রাজধানীর পুরান ঢাকার মাত্র লক্ষীপুরের মতো এমন একটি জায়গায় এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা। এর মাধ্যমেই এলাকাটি জানান দিচ্ছে যে সূদূর অতীত থেকে এতটুকু একটি স্থান ঐতিহাসিকভাবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তাতে কি? কার এতে যায় আসে। সরকারের কোনো মন্ত্রণালয়েরই টনক নড়ে না এসব এলাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে। কিংবা এসবে পর্যটককে টেনে আসার কোনো ধরনের উদ্যোগ। সরজমিনে গিয়ে দেখা গেলো পুরো এলাকা ঘিরেই নানান ধরনের অবহেলা নোংরা পরিবেশে ভয়াবহ চিত্র। কি নোংরা পরিবেশে এসব ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো টিকে আছে তা কেউ নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করবে না।
সরজমিনে গিয়ে যা দেখা গেলো
সেভ দ্যা হেরিটেজ অব বাংলাদেশের উদ্যোগে প্রতিবছর আয়োজন ঠিক ঈদের পরে লম্বা বন্ধের দিন আয়োজন করা হয় ‘হেরিটেজ ট্যুর’। এবারেও পায়ে হেঁটে পুরান ঢাকা ঐতিহ্য সফর শীর্ষক এই সফরের আয়োজন করে। সেভ দ্যা হেরিটেজ অব বাংলাদেশের পরিচালক হচ্ছেন স্থপতি সাজ্জাদুর রশীদ। এটি ছিল ১১১তম হেরিটেজ ট্যুর। এটি ছিল দু’দিনব্যাপি। এই সফরে অংশ নিয়েছিল প্রখ্যাত স্থপতিবিদদের পাশাপাশি ডাক্তার, অধ্যাপক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, তরুণ প্রত্মতত্ত্ববিদ, কবি-সাহিত্যিকসহবিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছাড়াও সৃজনশীল মনের মানুষের পাশাপাশি পুরান ঢাকা রক্ষায় ওই এলাকার শুভানুদায়ী বাসিন্দাদের কয়েকজন।
এবারে হেরিটেজ ট্যুর গিয়ে দেখা গেলো বর্তমানে বাহাদুর শাহ পার্কটির ভেতরে বাইরে বিশ্রী নোংরা পরিবেশ। পার্কটি ঘিরে আছে নানান ধরনের অবৈধ্য স্থাপনা। এর ভেতরে থাকা বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলি আছে অযত্ন অবহেলায়। অথচ এই নোংরা পরিবেশের মধ্যেই বাহাদুর শাহ পার্কটিতে প্রতিদিন শত-শত লোক প্রাত:ভ্রমণে আসেন। এছাড়া বিকালেও এখানে একটু নির্মল হাওয়া খেতে আসেন। কিন্তু পার্কের পরিবেশ রক্ষায় কোনো সরকারের কোনো মহলের তৎপরতা দেখা যায়নি। যত্রতত্র বিভিন্ন ধরনের দোকানে সয়লাব এই বাহাদুর শাহ পার্ক ভেতর-বাহির। যার নেপথ্যে কাজ করছে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া। কারো কারো অভিযোগ সন্ধ্যার পরপরই বাহাদুর শাহ পার্ক চত্বরে চলে নানান ধরনের অসামাঝিক কার্যকলাপ।
এই তো গেলো বাহাদুর শাহ পার্কের কথা। এই পার্কের একটু কাছেই রয়েছে ঢাকার প্রথম ব্রিটিশ আমলের পানির ট্যাংক। এর একটি বিরাট অংশকে এখন মাজারে পরিণত করেছে নাম না জানা একটি গ্রুপ। এটি ঘিরে বলা যায় এর নিচে শক্ত আস্তানা গড়ে তোলা হয়েছে সস্তা ধর্মীয় অনুভুতিকে পুঁজি করে প্রশাসনেরই নাকের ডগায়। ঢাকার প্রথম ব্রিটিশ আমলের পানির ট্যাংকের নিচে আরেক পাশে গিয়ে দেখা গেলো এখানে অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে বানানা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি। নোংরা পরিবেশে বানানো এইসব মিষ্টিকে পুরানা ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার বলে হাকডাক মেরে বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া এবারের ঈদের পরের দিন ঢাকার প্রথম ব্রিটিশ আমলের পানির ট্যাংক মাত্র কয়েক গজ দূরেই দেখা গেলো আরেক কান্ড। রাস্তার সামনেই বসানো হয়েছে নৌকার আকৃতিতে মেলার চড়কি। কারা কি কারণে এটি সেখানে স্থাপনের অনুমতি দিলো সে বিষয়ে কোনো সুদুত্তর মেলেনি।
এদিকে লক্ষীবাজারের এসব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার পর যাওয়া হয় একটি দূরে থাকা ঐতিহাসিক ডাফরিন মুসলিম হোস্টেল বা ডাফরিন হোস্টেলে। এর ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেলো এর রক্ষণাবেক্ষণে কারো কোনো মাথা ব্যাথাই নেই। সেখানেও ভেতরে নোংরা পরিবেশ। যতটুকু ঐতিহাসিক স্থাপনা আছে তা রক্ষণাবেক্ষনে কারো আন্তরিকা দেখা গেলো না।
অন্যদিকে ঐতিহাসিক ঢাকা মাদ্রাসা যা বর্তমানে কবি নজরুল সরকারি কলেজে প্রবেশ মুখে দেখা গেলো ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলি তথাকথিত ‘ঝুকিপূর্ণ’ ভবনের আওয়াজ তুলে ভেঙ্গে গুড়িয়ে ফেলার প্রতিযোগিতা। অথচ এসব বাড়ি অক্ষত রেখে সেগুলোর প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য নির্ণয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে ২০১৮ সালে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। কিন্তু তা মানা হয়নি।
এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে খুঁজে মেলা ভার এর আসলে কোনটি অতীত স্থাপনা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের যে-নো মাথা ব্যাথা নেই পুরার্কীতি রক্ষার ব্যাপারে। অন্যদিকে ১৮৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত অবিভক্ত বাংলার প্রথম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়- ’ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেলা সেখানে আর কিছু বাকি আছে বলে মনে হলো না। এর পুরোনো ঐতিহ্যবাহী সব ভবনই ভেঙে ফেলা হয়েছে অত্যন্ত নির্মমভাবে, কোনো ধরনের আইনেরই তোয়াক্কা করেনি এরা।
সেভ দ্যা হেরিটেজ অব বাংলাদেশের উদ্যোগে এই দু’দিনব্যাপি এই ‘হেরিটেজ ট্যুরে গিয়ে দেখা গেলো আরও অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা। দেখা গেলো বাক্ষ্ম্য সমাজ, কোর্ট স্ট্রীট, পোগজ স্কুল, শাখারি বাজার, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, আহসান মঞ্চিল, জিন্দাবাজার জামে মসজিদ, আমিরউদ্দিন দারোগা মসজিদ, তাঁতী বাজার, মিটফোর্ড হাসপাতাল, শায়েস্তা খান মসজিদ, চৌধুরীবাড়ি, ছোট ও বড়ো কাটরা, চকবাজার মসজিদ, বাঘাবাড়ি, সাত-রওজা, পুরানা ইমামবাড়া, বেচরাম দেওড়ি মসজিদ ও মাজার, পুরানা বেচারাম দেওড়ি বাড়ি, আর্মেনিয়ান চার্চ, তারা মসজিদ,আরমানি টোলা স্কুল্।
সবশেষে হেরিটেজ প্রেমিকই এমরান ভাই
পুরানো ঢাকার (নূর বক্স লেন) ঐতিহাসিক ১৫০ বছরের পুরোনো ’সাহেব বাড়ি’ বা জমিদার বাড়িটিই হলো ইমরান’স হেরিটেজ হোম। এমরান্স হেরিটেজ হোম মূলত একটি হেরিটেজ রেস্তোরাঁ ও থাকার জায়গা, যা মুঘল ও পুরনো ঢাকা ধাঁচের খাবার এবং ঐতিহ্যের অভিজ্ঞতার জন্য পরিচিত। ২০১৮ সালে এ এম ইমরান এটি চালু করেন। এখানে দেখা গেলো কিভাবে যত্ন করে নিজেদের পুরানা বাড়িকে ব্যক্তি উদ্যোগেই ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ বজায় রেখেছেন। এই বাড়িতেই আছে পুরনো দিনের আসবাব, পিতলের পিকদান ও রুপার আতরদানির মতো প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এখানে সাধারণত আভিজাত্যপূর্ণ পরিবেশ এবং পুরনো ঢাকার ইতিহাসের অভিজ্ঞতা নেওয়ার জন্য দর্শনার্থীরা পরিদর্শন করেন ও জানতে পারেন অনেক ঐতিহাসিক বিবরণ।
শেষ কথা
পুরাকীতি বা প্রাচীন স্থাপত্য ও নিদর্শন হলো একটি জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের ধারক। এ গুলো রক্ষার প্রধান গুরুত্ব হলো-আমাদের অতীত সভ্যতা সম্পর্কে জানা, জাতীয় পরিচয় ও আত্মমর্যাদা ধরে রাখা। এর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশের গৌরবময় ইতিহাস সংরক্ষণ করা। এছাড়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো পর্যটন শিল্প ও গবেষণার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে বড় পরিচয় ঐতিহ্যের শহর। তা-ই নির্বিচারে এর পুরার্কীতি ধ্বংসযজ্ঞকে কেউ কেউ সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের একটি অশনিসংকেত বলে মনে করেন। পুরান ঢাকা রক্ষায় এইসব এলাকার সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিরা জোর গলায় বিভিন্ন সময়ে নানান আশ্বাস দিয়ে যান। বলে যান তারা এই এলাকার পুরার্কীতি রক্ষায় কাজ করে যাবেন, পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ফিরিয়ে দেবেন। অন্যদিকে নানা ধরনের আলাপ আলোচনাতে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নানান গালগপ্প শোনান এলাকাবাসীকে। তবে সমৃদ্ধ দেশ গঠনে ঐতিহাসিক স্থাপনা, পুরাকীর্তি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ জরুরি- যে কাজটি সরকারের পক্ষ থেকে সব সময় অবহেলার দৃষ্টি থেকে নেওয়া হয়। কিন্তু আশার কথা হলো সব আমলেই শাসক বা ক্ষমতাসীনদের ছত্রচ্ছায়ায় ভূমিদস্যু দখলবাজরা এভাবেই জনগণকে বোকা বানিয়ে যাচ্ছেন। তবে হাজার বছরেরও পুরোনো এই শহরের বুকে ঐতিহ্যের স্মৃতি চিহ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে অনেকেই কাজ করে যাচ্ছেন অনেকটা ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’র মতো। সেভ দ্যা হেরিটেজ অব বাংলাদেশের পরিচালক হচ্ছেন স্থপতি সাজ্জাদুর রশীদের পাশাপাশি আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী স্থপতি তাইমুর ইসলামসহ অনেকে পুরান ঢাকা পুরার্কীতি রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে, চালিয়ে যাচ্ছেন আইনী লড়াই, যা অনেকটা ওই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতই। তবে এখানেই অনেকে আশার আলো দেখছেন।