০২ এপ্রিল ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৪:৩১:১১ পূর্বাহ্ন


স্যানিটেশন গাড়ির ধাক্কায় বাংলাদেশি নিশাতের মর্মান্তিক মৃত্যু
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ০১-০৪-২০২৬
স্যানিটেশন গাড়ির ধাক্কায় বাংলাদেশি নিশাতের মর্মান্তিক মৃত্যু বাবা ও বোনের সঙ্গে নিশাত জান্নাত


ব্যস্ত নগরজীবনে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ কাজের খোঁজে, স্বপ্নের সন্ধানে রাস্তায় বের হন। কিন্তু কখনো কখনো একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু বদলে দেয়। মনে হবে যেন জীবন্ত মৃত্যু। আসলে মানুষ মৃত্যুকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে। কুইন্সের বাংলাদেশি অধ্যুষিত উডসাইডে ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঠিক তেমনই একটি ঘটনা, যা এক বাংলাদেশি তরুণীর প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি পুরো পরিবারকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে। পুরো কম্যুনিটিকে শোকে নিমজ্জিত করেছে।

১৯ বছর বয়সী বাংলাদেশি নিশাত জান্নাত, যিনি স্বপ্ন আর আশা নিয়ে জীবন এগিয়ে নিচ্ছিলেন, হঠাৎই একটি স্যানিটেশন কোম্পানির ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান। এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় এই তরুণীর মৃত্যু গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে পুরো কমিউনিটিতে। গত ২৯ মার্চ গভীর রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তিনি একটি বেসরকারি আবর্জনা বহনকারী ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হন। 

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, রাত প্রায় ১১টা ৫৫ মিনিটে নিশাত ৬২তম স্ট্রিটের উত্তরমুখী ক্রসওয়াক দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। সেই সময় রয়্যাল ওয়েস্ট সার্ভিসেস নামের একটি বেসরকারি স্যানিটেশন কোম্পানির একটি ট্রাক রুজভেল্ট অ্যাভিনিউ থেকে ডানদিকে মোড় নিয়ে ৬২তম স্ট্রিটে ওঠার সময় তাকে ধাক্কা দেয়। ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত অবস্থায় পড়ে থাকা নিশাতকে উদ্ধার করে ইএমএস কর্মীরা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

এই দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণহানির ঘটনা নয়, বরং একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ। নিশাত জান্নাতের বড় বোন নওশিন জান্নাত জানিয়েছেন, আমার বাবা-মা ভেঙে পড়েছেন। আমাদের ঘরের ভেতর এখন শুধু কান্নার শব্দ। তিনি আরো জানান, নিশাত ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত এবং আশাবাদী একজন মানুষ। তিনি সবসময় অন্যদের উৎসাহ দিতেন, আল্লার প্রতি বিশ্বাস রাখতে বলতেন এবং জীবনকে ইতিবাচকভাবে দেখার শিক্ষা দিতেন।

বড় বোন নওশিন জান্নাত নওশিনের ভাষায়, সে সবসময় বলত যে আশা হারিও না। মৃত্যু যেকোনো সময় আসতে পারে, তাই বর্তমানেই বাঁচতে হবে। এই কথাগুলো এখন পরিবারের কাছে আরো বেশি বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে, কারণ যে মেয়েটি অন্যদের জীবন নিয়ে আশাবাদী হতে শেখাত, সেই নিজেই এমন অকাল মৃত্যুর শিকার হয়েছে।

নিশাত জ্যামাইকার একটি পার্কিং গ্যারেজে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতেন, প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি রাত ১১টার দিকে কাজ শেষ করেন। কিন্তু বাড়িতে না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে তার ফোনের লোকেশন ট্র‍্যাক করে নওশিন ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং সেখানে পুলিশ ও জরুরি পরিষেবার উপস্থিতি দেখে বুঝতে পারেন ভয়াবহ কিছু ঘটেছে।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিশাত তার ৯ ও ৪ বছর বয়সী দুই ছোট বোনের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ও দায়িত্ববান ছিলেন। তাদের লালন-পালন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি সবসময় চিন্তিত থাকতেন। এমন একজন স্নেহশীল ও দায়িত্বশীল তরুণীর অকাল মৃত্যু পরিবারকে শুধু মানসিকভাবেই নয়, বাস্তব জীবনেও গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, ট্রাকটির চালক, ৩৮ বছর বয়সী এক নারী, ঘটনাস্থলেই ছিলেন এবং তিনি তদন্তে সহযোগিতা করছেন। তার সামান্য আঘাত লেগেছিল এবং ঘটনাস্থলেই তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। ঘটনাটি বর্তমানে নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগের হাইওয়ে ডিস্ট্রিক্টের সংঘর্ষ তদন্ত ইউনিট তদন্ত করছে।

রয়েল ওয়েস্ট সার্ভিসেস, যে কোম্পানির ট্রাকটি দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল, এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্য আমরা গভীরভাবে দুঃখিত। নিহতের পরিবার ও প্রিয়জনদের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই সংযোগস্থলটি যথেষ্ট ব্যস্ত একটি এলাকা। কাছেই রয়েছে উডসাইড-৬১তম স্ট্রিট স্টেশন, যা ৭ সাবওয়ে লাইন এবং লং আইল্যান্ড রেল রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজ। ফলে এলাকাটিতে সারাক্ষণই যানবাহন এবং পথচারীর ভিড় থাকে। যদিও ২০২১ সাল থেকে এখানে কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে, তবে এতদিন কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

এ দুর্ঘটনা নতুন করে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে বড় ট্রাক এবং ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রে পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আরো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার বলে মনে করছেন অনেকেই। শহরের ব্যস্ত এলাকাগুলোতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, সিগন্যাল ব্যবস্থার উন্নতি এবং ড্রাইভারদের সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

কমিউনিটির অনেকেই নিশাতের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন এবং তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমে অনেকে তার স্মৃতিচারণ করেছেন এবং এমন দুর্ঘটনা রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তুলেছেন।

নিশাত জান্নাতের এই অকাল মৃত্যু আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ব্যস্ত শহুরে জীবনের মধ্যেও সড়ক নিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ রাস্তায় চলাচল করে কেউ কাজে যায়, কেউ বাড়ি ফেরে কিন্তু সামান্য অসতর্কতা বা এক মুহূর্তের ভুল চিরতরে একটি জীবন নিভিয়ে দিতে পারে।

এ ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত শেষে স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এরই মধ্যে একটি তরুণ প্রাণের অপূরণীয় ক্ষতি, একটি পরিবারের অসীম শোক এবং সমাজের নানামুখী প্রশ্ন সব মিলিয়ে এই দুর্ঘটনা দীর্ঘদিন মানুষের মনে বেদনার ছাপ রেখে যাবে।

উল্লেখ্য, নিহত নিশাত জান্নাতের পরিবার ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ভিসায় আসেন। তার দেশের বাড়ি সিলেটের দক্ষিণ সুরমার মোগলাবাজার। আসার পর থেকে তারা উডসাইডেই থাকতেন। তার বাবা হেলাল আহমেদ উডসাইড বায়তুল জান্নাহ মসজিদে ইমামতি করেন। যে মানুষটি প্রতিদিন মুসল্লিদের সান্ত্বনা দেন, আজ তার নিজের বুকের মানিক চলে গেছে। আমেরিকায় এসে একটু ভালো থাকার স্বপ্ন বুকে বেঁধেছিলেন এই পরিবার। সেই স্বপ্নের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রদীপটি আজ নিভে গেল একটি রাস্তার মোড়ে।

নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এই মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ঢেউ বইতে শুরু করেছে। উডসাইড ও জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশি বাসিন্দারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন-প্রাইভেট গারবেজ ট্রাকের চালকদের প্রশিক্ষণ ও নজরদারি নিয়ে। নিউ ইয়র্কে বছরের পর বছর ধরে গারবেজ ট্রাক দুর্ঘটনায় পথচারীর প্রাণহানি ঘটছে, কিন্তু জবাবদিহিতা কমই হচ্ছে।

নিশাতের জানাজা ৩১ মার্চ জোহরের নামাজের পর উডসাইডের বায়তুল জান্নাহ মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে জানাজা শেষে তাকে নিউজার্সির মুসলিম কবরস্থানে সমাহিত করা হয় বলে বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিদ্দিকী জানিয়েছেন।

নিশাত জান্নাত মাত্র ১৯ বছর বয়সে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তার কলেজে যাওয়ার কথা। আর কলেজে যাওয়া হলো না, কিন্তু তার কথাগুলো রয়ে গেছে-‘বর্তমানেই বাঁচো, এ মুহূর্তের জন্য বাঁচো।’ সেই মুহূর্তে তিনি বেঁচে ছিলেন। ছোট বোনের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন। এর চেয়ে সুন্দর মুহূর্ত আর কী হতে পারে। সেই সঙ্গে আরেকবার প্রমাণিত হলো মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গন করেই আমরা চলছি।

শেয়ার করুন