ব্রুকলিনের দাউদ মসজিদে ঘটানো ঘৃণামূলক হামলার সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছবি
নিউ ইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনের একটি ঐতিহাসিক মসজিদে কোরআনের পাতা ছিঁড়ে ফেলা এবং মল লাগানোর ঘটনা ঘটেছে এক নরপশু কর্তৃক । পুলিশের তথ্যমতে, ব্রুকলিন হাইটসের স্টেট স্ট্রিট ও ক্লিনটন স্ট্রিটের কোণে অবস্থিত ইসলামী মিশন অব আমেরিকা দাউদ মসজিদকে লক্ষ্য করা হয়েছে। গত ১৯ মার্চ ভোর ৪টা ৩০ মিনিটের দিকে এই ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত নরপশুটি মসজিদের সামনে কোরআনের কিছু পাতা ছিঁড়ে মসজিদের প্রবেশদ্বারে ফেলে দেয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ভ্যান্ডাল প্রথমে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছিল, কিন্তু কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে মসজিদের দরজায় মল লাগায়। এরপর তিনি পূর্বদিকে স্টেট স্ট্রিট বরাবর দৌড়ে চলে যান। মলটি মানুষের না পশুর তা এখনও নির্ধারিত হয়নি। ঘটনায় কেউ আহত হয়নি এবং এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট অভিযুক্ত ব্যক্তির সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেছে এবং জনসাধারণের সহায়তা চাচ্ছে অভিযুক্তকে চিহ্নিত করতে ও ধরার জন্য। কেউ যদি তথ্য জানে, তারা ক্রাইম স্টপার্স-এ (৮০০-৫৭৭-৮৪৭৭) যোগাযোগ করতে পারে। সব তথ্য গোপন রাখা হবে।
ইসলামী মিশন অব আমেরিকা দাউদ মসজিদ প্রায় ১০০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি মূলত সুন্নি মুসলিমদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হলেও এক সময়ে এটি আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসলামিক সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। মসজিদটি একটি রূপান্তরিত টাউনহাউসে অবস্থিত।
পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি কালো স্কালক্যাপ, কালো ফেস মাস্ক, লাল সোয়েটশার্ট, লাল সোয়েটপ্যান্ট এবং সাদা-কালো জুতা পরেছিল। তিনি একটি বাঁধা কালো ব্যাগও বহন করছিলেন। ব্রুকলিনের ৮৪তম প্রিসিঙ্কট এই ঘটনার তদন্ত করছে। পুলিশের তত্ত্বে, হামলাটি ধর্মীয় বিদ্বেষভিত্তিক। এই প্রিসিঙ্কটে ২০২৫ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এই ধরনের ঘটনার সংখ্যা ১ থেকে বেড়ে চারটি হয়েছে, যা ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করছে।
নিউ ইয়র্ক সিটি জুড়ে ঘৃণাভিত্তিক অপরাধের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক পুলিশ হেট ক্রাইমস টাস্ক ফোর্স অনুসন্ধানকৃত পক্ষপাতমূলক ঘটনার সংখ্যা ৫৮, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির ২৩টির তুলনায় ১৫২ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করছে। জানুয়ারিতে রিপোর্ট হওয়া ঘটনার অর্ধেকের বেশি ইহুদিবিদ্বেষমূলক ছিল।
স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় এবং নাগরিক অধিকার সংস্থাগুলো এ ঘটনার কঠোর নিন্দা করেছে। তারা আশা প্রকাশ করেছে যে পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করবে এবং অভিযুক্তকে শাস্তি দেবে। তারা বলছে, ধর্মীয় স্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্প্রদায়ের প্রতি সহিংসতা রোধ করা জরুরি। মসজিদটির সভাপতি এবং স্থানীয় ধর্মীয় নেতারা জানিয়েছেন, আমরা আমাদের সম্প্রদায়কে শান্তিপূর্ণ থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা আমাদের ধর্মীয় অনুশীলন চালিয়ে যাব এবং এমন কোনো ঘটনা আমাদের ভয় দেখাতে পারবে না। কোনো সম্প্রদায়কে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা পরিচয়ের কারণে হামলার শিকার হওয়া উচিত নয়।
নাগরিক অধিকার সংস্থা কাউন্সিল ফর আমেরিকান ইসলামিক রিলেশন্স ঘটনার কঠোর নিন্দা করেছে। কেয়ার-নিউ ইয়র্কের নির্বাহী পরিচালক আফাফ নাশার বলেছেন, এটি একটি ঘৃণামূলক হামলা, যা প্রার্থনার ঘরকে লক্ষ্য করেছে। তিনি আরো বলেন, আমরা দ্রুত এবং বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্তকে দায়ী করার আহ্বান জানাই। এ ধরনের হামলা আমাদের সম্প্রদায়কে আতঙ্কিত করছে এবং মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা হুমকির মুখে ফেলছে।
স্থানীয় অভিবাসী ও মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতারা ঘটনাটি ধর্মীয় বিদ্বেষের নতুন উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তারা বলেছেন, শিক্ষার প্রসার, সামাজিক সচেতনতা, এবং শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা না থাকলে এই ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এছাড়া তারা পুলিশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন মসজিদ এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়।পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত চলমান এবং তারা সিসিটিভি ফুটেজ, প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রমাণের মাধ্যমে অভিযুক্ত শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। কেউ যদি অভিযুক্তের সম্পর্কে কোনো তথ্য রাখে, তা গোপনীয়ভাবে পুলিশকে জানাতে পারে।
এ ঘটনার মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছেছে যে, ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং ঘৃণাভিত্তিক অপরাধের বিরুদ্ধে সমাজ এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত এবং শাস্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রুকলিনের ঐতিহাসিক মসজিদে এ ঘটনা স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়, নাগরিক অধিকার সংস্থা এবং পুলিশ প্রশাসনকে সক্রিয়ভাবে একসঙ্গে কাজ করতে বাধ্য করেছে, যাতে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় এবং সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
ধর্মীয় বিদ্বেষ এবং ঘৃণাভিত্তিক অপরাধ সভ্য সমাজের জন্য এক নিন্দনীয় এবং লজ্জাজনক কলঙ্ক। কেবল নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কেই নয়, পুরো মানবতার নৈতিক ভিত্তিক মূল্যবোধকে ব্যর্থ করে দেয় এ ধরনের জঘন্য হামলা। কোরআনের পাতা ছিঁড়ে ফেলা বা মসজিদের দরজায় মল লাগানো ন্যাক্কারজনক কাজগুলো সামাজিক সৌহার্দ্য ও সহনশীলতার মূলে আঘাত হানে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের শান্তিপূর্ণ জীবন ও ধর্মীয় স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলে। এ ধরনের অপরাধ চিন্তার স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ, যা সমাজের ন্যায়বিচার ও মানবিকতা অপমান করে। রাষ্ট্র, সম্প্রদায় এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সতর্ক হতে হবে, অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, না হলে ঘৃণামূলক মানসিকতা আরো প্রজন্মের মধ্যে ছড়াবে এবং সমাজের ন্যায়, সমতা ও মানবিক মূল্যবোধ শিথিল হবে।