ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)
ইউএস ইমিগ্রেশন এন্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) নতিবিহীন অভিবাসীদের সন্ধানে একটি ব্যাপক ও আধুনিকায়িত তৎপরতা চালু করেছে। এ অভিযান শুধু কাগজে বা সীমিত পরিসরে নয়, বরং এটি একটি বিশাল প্রাইভেট ঠিকাদারি, ডেটা টুলস, অনলাইন অনুসন্ধান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমন্বয়ে পরিচালিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এ নতুন আধুনিকায়িত তৎপরতা অভিবাসন প্রত্যাশীদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ফেডারেল সরকারের এই অভিযান শুধু সম্প্রসারিত হচ্ছে না, এখন এটি এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রাইভেট ঠিকাদারদের স্কিপ ট্রেসিং কার্যক্রমে নিয়োজিত করে লাখ লাখ মানুষের অবস্থান শনাক্ত করতে বলা হচ্ছে। এর ফলে দেখা যাচ্ছে যে, এটি শুধু আইসিইর কাজ নয়, বরং একটি বিস্তৃত তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান ও নজরদারি যন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
প্রথমে জানা জরুরি, স্কিপ ট্রেসিং বলতে আসলে কী বোঝায়। এটি হলো সেই পদ্ধতি যেখানে কাউকে খুঁজে বের করতে শ্বেতসুত্র বা পাবলিক রেকর্ড, বিভিন্ন ডেটাবেস, অনলাইন তথ্য, এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করা হয়। সাধারণভাবে এটি দেনা আদায়কারী, বন্ড এজেন্ট বা প্রাইভেট গোয়েন্দারা ব্যবহার করেন। কিন্তু এখন এটি হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের (ডিএইচএস) অধীনে অভিবাসন আইন প্রয়োগের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, যা নতুন আইনি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে অভিবাসীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সুবিচার, এবং সরকারের কাজের মধ্যে প্রাইভেট কোম্পানির ভূমিকা কতটা গ্রহণযোগ্য।
সম্প্রতি জানা গেছে, আইসিই ১৩টি প্রাইভেট কোম্পানিকে স্কিপ ট্রেসিং সার্ভিস যুক্তরাষ্ট্রব্যাপী প্রদান করার জন্য হাজার কোটি ডলারের চুক্তি দিয়েছে, যা দুটি বছরের মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এমনকি ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন অভিবাসী পর্যন্ত এ ডেটাভিত্তিক ও এআই সহিত পরিচালিত অনুসন্ধান কার্যক্রমে টার্গেট হতে পারে।
আইসের নতুন এ কন্ট্রাক্ট কর্মসূচি একটি বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, যেখানে শত শত ব্যক্তি বিদেশিদের খুঁজে বের করতে কাজ করবে। তারা নিয়মতান্ত্রিক রূপে নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা ও যোগাযোগ তথ্যসহ প্রত্যেক ব্যক্তির ডেটা পাবে এবং তারপর তাকে খুঁজে বের করতে শুরু করবে। প্রথমে প্রযুক্তিগত ডেটা ও অনলাইন অনুসন্ধান ব্যবহার করবে, না হলে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ যেমন বাড়ি বা কাজস্থলের সময় স্ট্যাম্প করা ছবি নেওয়া পর্যন্ত আসতে পারে।
আইসিইর কন্ট্রাক্টরের কাছে জানানো হয়েছে যে তারা প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার মামলা বা ব্যক্তির তথ্য পেতে পারে। এরপর তাদের নির্দেশনা থাকবে, প্রথম সব প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ব্যবহার করে লোককে খুঁজে বের করতে হবে, তারপর যদি সফল না হয়, তবে আউটডোরে গিয়ে নিজস্ব অনুসন্ধান সম্পন্ন করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহার হচ্ছে সরকারি রেকর্ড, বাণিজ্যিক ডেটা সোর্স ও অনলাইন তথ্য। যেসব নির্দিষ্ট ডেটাবেস ব্যবহার করা হচ্ছে বা কোনটি কতটা সঠিক তা জনগণের কাছে স্পষ্ট নয়।
আইনজীবীদের মতে, এর ফলে ন্যায়প্রক্রিয়ার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কারণ ক্লায়েন্ট বা অভিযুক্ত ব্যক্তি জানতে বা সাড়া দেওয়ার আগে আইসিইর ঠিকাদাররা তার লোকেশন বা ডেটা সংগ্রহ করে সেটি আইসিইর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এটি এমন পর্যায় যেখানে আইনগত দায়িত্ব ও ব্যক্তি গোপনীয়তার অধিকার বিপন্ন হতে পারে। আইসিইর নিজেদের নথিতে উল্লেখ আছে যে, ঠিকাদারদের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য রেইড বা গ্রেফতারসহ অন্যান্য আইন প্রয়োগমূলক পদক্ষেপকে এগিয়ে দিতে পারে।
এ প্রোগ্রামে যে কন্ট্রাক্টরগুলো যুক্ত আছে, তাদের মধ্যে কিছু এমন সংস্থা রয়েছে যারা সেনা বা গোয়েন্দা কাজে বহু বছর ধরে কাজ করেছে। যেমন ব্লুহক এলএলসি, এসওএস ইন্টারন্যাশনাল এবং গ্রাভিটাস। তারা আগে মিলিটারি, ইন্টেলিজেন্স বা গোপন অনুসন্ধানে কাজ করেছে। এ ধরনের ফার্ম গোপন নিরাপত্তা, সামরিক ডিফেন্স বা প্রাইভেট গোয়েন্দা কাজে প্রশিক্ষিত, কিন্তু এখন তারা সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে অভিবাসন এফোর্সমেন্টে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্লুহক এলএলসি গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পেন্টাগনের এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইন্টেলিজেন্স সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছে। গ্রাভিটাসইনভেস্টিগেশনস তাদের পরিষেবাকে সমন্বিত নজরদারি কার্যক্রম হিসেবে বর্ণনা করে, যা সাধারণত ধোঁকাবাজি তদন্ত বা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান এ ব্যবহৃত হয়।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঠিকাদারি সংস্থা হলো বিআই ইনকর্পোরেটেড, জিও গ্রুপ-এর একটি সহায়ক সংস্থা। জিও গ্রুপ একটি মুনাফাবিহীন কারাগার ও অভিবাসন আটক কেন্দ্র পরিচালনা করে। এখন বিআই ইনকর্পোরেটেড-এর স্কিপ ট্রেসিং কন্ট্রাক্ট তাদের জন্য একাধিক স্তরে লাভের সুযোগ খুলে দিচ্ছে। প্রথমে লোক খুঁজে বের করবে, পরে সেই লোককে যদি গ্রেফতার বা আটক করা হয়, তাহলে জিও গ্রুপ-এর সেবা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। শুধু স্কিপ ট্রেসিং কন্ট্রাক্টটি নিজেই ১২১ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি উপার্জন করতে পারে, এবং এটি তাদের ডিটেনশন অপারেশনের বাইরে আলাদা উপার্জন উৎস।
এই বিস্তৃত প্রাইভেট কন্ট্রাক্ট ও স্কিপ ট্রেসিংয়ের সরকারি ব্যবহার শুধু প্রযুক্তিগত নয়, গুরুতর নৈতিক ও আইনি প্রশ্নও তুলেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ফলে নজরদারি ব্যবস্থার পরিধি আরো বিস্তৃত হয়েছে। কিছু সংস্থা এমন এআই এজেন্ট ও বড় ভাষার মডেল বিজ্ঞাপন করে, যা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে এবং তাদের পরিবার ও পরিচিতদের নেটওয়ার্ক ম্যাপ করতে সক্ষম।
এ এআই সক্ষম সিস্টেমগুলো পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় ধরনের ডেটা একত্রিত করে এবং বিশ্লেষণ করে, ফলে আইসিইর নজরদারি আরো দ্রুত ও বিস্তৃতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তবে এআইয়ের ব্যবহার ভুলের ঝুঁকিও বাড়ায়। সম্প্রতি দেখা গেছে, ফেসিয়াল রেকগনিশন সিস্টেম যেমন ক্লিয়ারভিউ এআই ভুল শনাক্তকরণের কারণে অনেককেই ভুল গ্রেফতারের শিকার হতে হয়েছে এবং মাস ধরে আটক থাকতে হয়েছে, যদিও তারা কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কই নেই।
আরেকটি গুরুতর দিক হলো ইনসেনটিভ স্ট্রাকচার বা পুরস্কারের ব্যবস্থা। আইসিইর কন্ট্রাক্টগুলোতে ঠিকাদার সংস্থাগুলোকে গতি বা তাড়াতাড়ি লোকেশন যাচাই করার জন্য পুরস্কার বা বোনাস দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি তারা ৭ বা ১৪ দিনের মধ্যে লোকের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে, তবে তাদের বোনাস পাওয়া যাবে। এ ধরনের প্রণোদনা ব্যবস্থা, যেখানে দ্রুততা বা সংখ্যাভিত্তিক পুরস্কার কেন্দ্রীভূত, সঠিকতা, ন্যায় ও তথ্য যাচাই প্রক্রিয়াকে কম জোর করে দিতে পারে। শ্যারন ব্র্যাডফোর্ড ফ্র্যাঙ্কলিন, প্রাইভেসি ও সিভিল লিবার্টিজ ওভারসাইট বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ার, গণমাধ্যমকে বলেছেন, এরা আসলে আইসিইর বাউন্টি হান্টার। অর্থাৎ যেমন বাউন্টি হান্টাররা পুরস্কারের জন্য অনুসন্ধান করে, ঠিক তেমনি এখানে সংস্থাগুলো অর্থ লাভের জন্য লোক শনাক্ত করতে তৎপর হচ্ছে।
তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জনসমক্ষে তথ্যের অভাব এ পুরো ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা। অনেক কন্ট্রাক্টই জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা হয়নি, এবং তাদের কাজের নিয়ম, তত্ত্বাবধান, এবং দায়িত্বের কাঠামো স্পষ্ট নয়। প্রশ্ন থেকে যায় কীভাবে মূল সংস্থাগুলো তাদের সহায়ক বা সাবসিডিয়ারি সংস্থাগুলোর কর্মকা- নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনকি একটি ক্ষেত্রে ফরাসিভিত্তিক সংস্থা ক্যাপজেমিনি অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা শুরু করে যখন ফরাসি সরকার তাদের এ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং স্বচ্ছতার দাবি তোলে।
বৃহত্তর দৃষ্টিতে দেখলে, এ নতুন ধরনের স্কিপ ট্রেসিংভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা একটি বড় প্রবণতার অংশ, যেখানে ডেটা চালিত অভিবাসন আইন প্রয়োগ শুধু ফেডারেল এজেন্টদের হাতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি বিস্তৃত প্রাইভেট কোম্পানি, ডেটা ব্রোকার, স্থানীয় ও রাজ্য সংস্থার নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে গেছে। একই সময়ে জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট অংশের নজরদারি সাধারণীকৃত হচ্ছে।
স্কিপ ট্রেসিং আর শুধু কাউকে খুঁজে বের করা নয়; এটি এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করছে যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিদ্যমান আইনি ও নৈতিক উদ্বেগগুলোকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। বড় পরিমাণে ডেটা সংগ্রহ করা, বিশ্লেষণ করা, এবং তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার অভাব নাগরিক অধিকারকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যখন নাগরিকত্ব বা অভিবাসন সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলো গোপনীয়ভাবে পরিচালিত প্রাইভেট বাহিনী, এআই টুলস এবং স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে, তখন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সুবিচার, এসব মৌলিক অধিকার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। আর এই চ্যালেঞ্জগুলো এখন শুধু একটি সংস্থা বা আদেশের প্রশ্ন নয়; এটি নৈতিক, আইনগত ও নীতিগত পর্যায়ে একটি বৃহত্তর বিতর্কে পরিণত হয়েছে।