২৮ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ৬:৩৮:১৬ পূর্বাহ্ন


নদী বাঁচানো মানেই দেশ বাঁচানো
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৭-০৫-২০২৬
নদী বাঁচানো মানেই দেশ বাঁচানো বুড়িগঙ্গা নদী


অভীন্ন নদীর পানির অধিকার প্রশ্নে ফারাক্কা লংমার্চের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে গত রোববার নাগরিক সমাজের উদ্যোগে একটি মানববন্ধন কর্মসূচি আয়েজিত হয়েছে। এ মানববন্ধন কর্মসূচিতে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ১০ দফা দাবি তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, কৃষি ও জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৭৬ সালের ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ আমাদের শিখিয়েছে নদী বাঁচানো মানেই দেশ বাঁচানো। 

বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন প্রশ্নে বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। নদী কেবল পরিবেশ নয়, মানুষের জীবন-জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই পানি অধিকারকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। 

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশের মতো ভারতেরও কোনো উপকারে আসেনি, বরং উভয় দেশের জন্যই বিপর্যয় ডেকে এনেছে। তিনি গঙ্গা পানিচুক্তি নবায়ন, তিস্তাচুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতা ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি সামগ্রিক পানিচুক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। 

রিভারাইন পিপলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, নদীবিষয়ক চুক্তি দ্বিপাক্ষিক নয়, বরং অববাহিকাভিত্তিক আঞ্চলিক চুক্তি হওয়া জরুরি যেখানে ভুটান-নেপালসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে পানি কূটনীতি গড়ে তুলে উইন-উইন সম্পর্ক নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। 

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথ বলেন, নদীর ন্যায্য হিস্যা যেমন বাংলাদেশের অধিকার, তেমনি উজানের দেশ ভারত, নেপাল ও ভুটানের জনগণেরও অধিকার রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্র যেন মেরুদণ্ড শক্ত করে আলোচনায় যায় এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সবার স্বার্থরক্ষা করে ন্যায্য পানি বণ্টন নিশ্চিত করে। 

নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন বলেন, মাওলানা ভাসানী অনেক আগেই বুঝেছিলেন বাঁধ দিয়ে নদীর ইকোসিস্টেম ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নীতিমালা সই করলেও প্রতিবেশী দেশ তা করেনি-এ বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে তিনি অববাহিকাভিত্তিক চুক্তি, বড় প্রকল্পে জনপরামর্শ এবং নদীদখল-দূষণ রোধে ধারাবাহিক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। 

গ্রিন বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি মোসাম্মৎ সুলতানা বেগম বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশ বারবার পানির সংকট ও বন্যার শিকার হচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় ভারত-বাংলাদেশ চুক্তিতে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে। 

স্টেপ টুওয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের পরিচালক রঞ্জন কর্মকার আহ্বান জানান, জনগণের ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে নাগরিক সমাজকে একত্রিত হয়ে আওয়াজ তুলতে হবে এবং সরকারকে বাধ্য করতে হবে জনগণের অধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে। 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির সুমন বলেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় নদী ও খাল রক্ষায় সরকারের উদ্যোগকে আরো শক্তিশালী করতে হবে এবং ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করতে হবে। 

লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ তার বক্তব্যে বলেন, ফারাক্কা লং মার্চ শুধু একটি বাঁধবিরোধী আন্দোলন নয়, বরং অভিন্ন নদীর অস্তিত্ব, জীবন-জীবিকা ও উন্নয়ন দর্শনের প্রশ্ন। তিনি উল্লেখ করেন, নদীকে কিউসেক সংখ্যায় ভাগ করা যায় না, নদী একটি প্রাণসত্তা, যার নিজস্ব জীবন ও প্রবাহ আছে। তাই মওলানা ভাসানীর পানি দর্শনকে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করে অভিন্ন নদীর ওপর কোনো বাঁধ বা ব্যারেজ না দিয়ে ন্যায্য পানি বণ্টন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। 

প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষা জাতীয় কমিটির মুখপাত্র ইবনুল সাঈদ রানা বলেন, উজান থেকে পানি আটকে দিয়ে কিউসেক হিসাব দেখানো আন্তর্জাতিক আইনকে অস্বীকার করা, তাই বাংলাদেশের নদী প্রবাহ ও জনগণের জীবন রক্ষায় ন্যায্য পানি অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। 

নাগরিক সমাজের পক্ষে আরো যারা এ মানববন্ধন কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়েছে, অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ, নিজেরা করি, বেলা, ব্লাস্ট, সিসিডিবি, ইনসিডিন বাংলাদেশ, বারসিক, বাদাবন, গ্রীন ভয়েস, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বনলতা নারী উন্নয়ন সংস্থা, কেরানীগঞ্জ হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি, প্রমুখ। 

আয়োজক সংস্থাসমূহ সম্মিলিতভাবে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দশ দফা দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য দাবিগুলো ১৬ মে ঐতিহাসিক লং মার্চ দিবসকে জাতীয় পানি অধিকার দিবস হিসেবে ঘোষণা করা। গঙ্গা-তিস্তাসহ সব আন্তঃসীমান্ত নদীর ন্যায্য হিস্যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিশ্চিত করা। গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন করে গ্যারান্টি ক্লজ সংযোজন করা। বড় প্রকল্প (যেমন তিস্তা মহাপরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারেজ) গ্রহণের আগে জনপরামর্শ ও অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করাসহ অন্যান্য দাবি উল্লেখযোগ্য। 

শেয়ার করুন