যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট
দীর্ঘ সময় ধরে আটক রাখা নথিপত্রহীন অভিবাসীদের জামিন শুনানির সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে কি না, সে বিষয়ে গত ১৫ জুন একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। মামলাটির রায় দেশটির অভিবাসন নীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন দমন অভিযানের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন দুজন গ্রিনকার্ডধারী স্থায়ী বাসিন্দা, যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধে (অ্যাগ্রাভেটেড ফেলনি) দণ্ডিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের একজনকে ডোমিনিকান রিপাবলিক এবং অন্যজনকে জ্যামাইকার উদ্দেশ্যে বহিষ্কারের (ডিপোর্টেশন) উদ্যোগ নেয় আইস।
আদালতের নথি অনুযায়ী, বহিষ্কার প্রক্রিয়া চলাকালে একজনকে সাত মাস এবং আরেকজনকে প্রায় দুই বছর আটক রাখা হয়। তবে এই দীর্ঘ সময়ে তাদের কেউই এমন কোনো শুনানির সুযোগ পাননি, যেখানে বিচারক নির্ধারণ করতে পারতেন তারা পলাতক হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন কি না অথবা জামিনে মুক্তি পাওয়ার যোগ্য কি না। ২০২৪ সালে নিউ ইয়র্কভিত্তিক ইউনাইটেড স্টেটস কোর্ট অব অ্যাপিলস ফর দ্য সেকেন্ড সার্কিট রায় দেয় যে, দীর্ঘ সময় আটক থাকা অনাগরিকদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ‘ডিউ প্রসেস’ ধারা অনুযায়ী একটি বন্ড বা জামিন শুনানি অপরিহার্য। আদালত আরো বলে, আটক অব্যাহত রাখতে চাইলে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অথবা পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ রায়ের বিরুদ্ধে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে ট্রাম্প প্রশাসন। সরকারের দাবি, সেকেন্ড সার্কিট কোর্টের সিদ্ধান্ত গুরুতরভাবে ভুল নির্দেশনা এবং বিদ্যমান আইনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।
বিতর্কিত আইনে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধে দণ্ডিত অনাগরিকদের বাধ্যতামূলকভাবে আটক রাখার বিধান রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ বিধানের আওতা সম্প্রসারণ করে আরো বেশি অভিবাসীকে বাধ্যতামূলক আটক ব্যবস্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছে। এ পদক্ষেপ ইতোমধ্যে একাধিক আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত পর্যালোচনার মুখোমুখি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুই অভিবাসীর পক্ষে মামলা পরিচালনা করছে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ)। সংস্থাটি সুপ্রিম কোর্টকে মামলাটি গ্রহণ না করার অনুরোধ জানিয়েছিল। তাদের যুক্তি, মামলার একজন ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেছেন এবং অন্যজন মুক্তি পেয়েছেন। তাদের আইনজীবীদের মতে, ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) তাকে পুনরায় আটক করার কোনো চেষ্টা করেনি।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালেও সুপ্রিম কোর্ট একই ধরনের একটি মামলার শুনানি করেছিল। সে সময় বিচারপতি স্যামুয়েল অ্যালিটো লেখা বিভক্ত রায়ে আদালত বলেছিল যে, ফেডারেল আইন নিজে থেকে বন্ড শুনানির বাধ্যবাধকতা আরোপ করে না। তবে দীর্ঘমেয়াদি আটকের ক্ষেত্রে সংবিধান এমন শুনানি বাধ্যতামূলক করে কি না, সে প্রশ্নে আদালত তখন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। তখন ভিন্নমত পোষণ করে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি স্টিফেন ব্রেয়ার লিখেছিলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আইনটি যদি জামিন ও জামিন শুনানি নিষিদ্ধ করে, তাহলে সেটি সম্ভবত অসাংবিধানিক হয়ে পড়তে পারে। বর্তমান আপিলে ট্রাম্প প্রশাসন আরো চ্যালেঞ্জ করেছে সেকেন্ড সার্কিট কোর্টের সেই সিদ্ধান্তকে, যেখানে বলা হয়েছিল আটক অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে সরকারকে অধিকতর শক্তিশালী প্রমাণ দেখাতে হবে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছেন অথবা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি।
সাধারণত সুপ্রিম কোর্ট কোনো মামলা গ্রহণ করার পর উভয়পক্ষকে লিখিত যুক্তি (ব্রিফ) জমা দেওয়ার জন্য কয়েক মাস সময় দেয়। ফলে মামলাটির মৌখিক শুনানি সম্ভবত ২০২৬ সালের শরৎকাল থেকে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে, অর্থাৎ অক্টোবর ২০২৬ থেকে মার্চ ২০২৭-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত হতে পারে।
এই মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সুপ্রিম কোর্ট নির্ধারণ করবে দীর্ঘ সময় ধরে আটক থাকা অভিবাসীরা, বিশেষ করে গ্রিনকার্ডধারী বা অন্যান্য অনাগরিকরা, জামিন শুনানির সাংবিধানিক অধিকার রাখেন কি না। আদালতের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে হাজার হাজার অভিবাসীর আটক ও মুক্তি সংক্রান্ত নীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।