১৭ জুন ২০২৬, বুধবার, ০৮:২২:২২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :


জলবায়ু পরিবর্তনে নারীরা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকেন
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৭-০৬-২০২৬
জলবায়ু পরিবর্তনে নারীরা স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকেন প্রতীকী ছবি


বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তন, ঢাকাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: পরিবেশ আইনে নারীর সুরক্ষা বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাসুদা রেহানা। সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ডিন ও অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন পরিবেশ ও জলবায়ু কর্মী ফারিহা সুলতানা অমি, একুশে টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার শাকেরা আরজু শিমু, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং হিউম্যান রাইটস্ এ্যন্ড পিস ফর বাংলাদেশ এর সভাপতি মনজিল মোরশেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক। 

আলোচনা শেষে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বাদাবন সংঘের লিপি রহমান, কেয়ার বাংলাদেশের প্রমা ইশরাত, ওয়াইডব্লিউসিএ অব বাংলাদেশ পূরবী তালুকদার, কারিতাসের শ্যামলী রায়, কু- শাল এর অনন্যা দ্রং, প্রমুখ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের হুমায়ুন কবীর সুমন প্রমুখ।

স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাসুদা রেহানা বলেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারীর মানবাধিকার রক্ষায় বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। প্রতিরোধ ও নির্মাণের কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারীরা স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন ঝুঁকিতে থাকেন। তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। পরিবেশ আন্দোলন নারী আন্দোলনের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। নারীর সুরক্ষায় প্রণীত পরিবেশ আইন বাস্তবায়নের উপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি এসময় বলেন, পরিবেশ আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীকে সকল ক্ষেত্রে সুরক্ষা দানের বিষয়টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে করণীয় নির্ধারণের জন্য আজকের সভার আয়োজন। পরিবেশ আন্দোলনকে সকলের মাঝে যেন পৌঁছে দেয়া যায় এটি আমাদের লক্ষ্য।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে যে সকল কমিউনিটি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার মাঝে আছেন নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী। সামাজিক সুরক্ষা খাতের মাধ্যমে জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের সহায়তা প্রদান বিষয়ে অ্যাডভোকেসি করতে হবে। বাস্তুুচ্যুতদের জন্য সকল মৌলিক সহায়তা প্রদান বিষয়ে কাজ করতে হবে। নারীদের অধিকার রক্ষায় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি পলিসি তে ভালোভাবে আছে কিন্তু এর বাস্তবায়ন করতে হবে। বর্তমান পরিবেশের মান উন্নয়ন করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নিজের চাওয়া পূরণ করতে গিয়ে আমরা প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলেছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতিকে সুরক্ষিত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও লিঙ্গভিত্তিক সুরক্ষা-বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অন্যতম একটি দাবি। জলবায়ুর সংকট নিরসনের কাজের পাশাপাশি সামাজিক অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনে পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে কাজ করতে হবে। জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবেলায় নারীর যে সক্ষমতা রয়েছে তাকে কাজে লাগাতে হবে। পরিবেশকর্মী ও নারীআন্দোলনকে সমন্বয় করে কাজ করার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি এসময়। 

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ডিন ও অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত সংকট নয়, এটি মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশের নারী, বিশেষ করে উপকূলীয় ও গ্রামীণ অঞ্চলের নারীরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুরুষদের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। পানি সংগ্রহ, খাদ্য প্রস্তুত, পরিবার ও গবাদিপশুর যত্নের মতো দায়িত্বের কারণে খরা, লবণাক্ততা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব তাদের ওপর বেশি পড়ে। দুর্যোগের সময় নারীরা নিরাপত্তাহীনতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন পরিবেশ ও জলবায়ু চুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ও সুরক্ষার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জলবায়ু কৌশল ও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনাতেও নারীর সুরক্ষা ও অংশগ্রহণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি জলবায়ু ন্যায়বিচারের গুরুত্ব তুলে ধরে আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য নারীরা কম দায়ী হলেও তারা বেশি ভুক্তভোগী। তাই পরিবেশ আইন ও নীতিতে নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি, বিকল্প জীবিকা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, ভূমির অধিকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আগাম সতর্কবার্তায় নারীদের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি পরিবেশ আইনে জলবায়ু পরিবর্তন ও লিঙ্গভিত্তিক সুরক্ষা সংক্রান্ত বিশেষ বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেন। তিনি প্রবন্ধে আরো বলেন নারীদের শুধু ভুক্তভোগী হিসেবে নয়, বরং জলবায়ু অভিযোজন ও পরিবর্তন মোকাবিলার গুরুৎ¡পূর্ণ অংশীদার ও “চেঞ্জ এজেন্ট” হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। নারীবান্ধব পরিবেশ আইন, নীতি ও বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই একটি টেকসই, সমতাভিত্তিক ও জলবায়ু-সহনশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি এবং হিউম্যান রাইটস্ এ্যন্ড পিস ফর বাংলাদেশ এর সভাপতি মনজিল মোরশেদ বলেন, পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আইনের দ্বারস্থ হতে হয়। পরিবেশের জন্য থাকা আইনগুলো কার্যকর করা গেলে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এজন্য তৃণমূল থেকে কাজ করতে হবে। জলবায়ু দেশী ও আন্তর্জাতিক কারণে পরিবর্তিত হয়। ৫০ বছর আগে পরিবেশের বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। কিন্ত এখন প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয়ের পথে। নদী রক্ষার মাধ্যমে যে পরিবেশ দূষণ রোধ করা যাবে- এবিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনে নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আগে ও পরে করণীয় নির্ধারন করতে হবে; জলবায়ু ট্রাস্টের ফান্ড এর সঠিক প্রয়োগ জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবেশ ও জলবাযু কর্মী ফারিহা সুলতানা অমি বতিনি লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও সাতক্ষীরার, সুন্দরবন অঞ্চলের নারীদের জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলায় অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন জাতীয় নীতিমালা বাস্তবায়নে প্রান্তিক নারীদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এসকল নারীদের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা যেতে পারে। উপকূল, সুন্দরবন রক্ষায় যেসকল নারীরা কাজ করছেন তাদের সুরক্ষায় পরিবেশ আইনে ধারা যুক্ত হওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন। 

একুশে টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার শাকেরা আরজু শিমু বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি অনেক বিস্তৃত। নদীভাঙনের ফলে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় অনেক শিশু। এসকল শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে অভিবাসী হয়, শিশুসুলভ আচরণ ভুলে পরিবারের জন্য উপার্জনে যুক্ত হয়। অনেক মেয়েশিশুরা সহিংসতার শিকার হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকারি, বেসরকারি সংস্থাকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। পরিবেশ দূষণ রোধে,শিশুশ্রম রোধে নানা আইন থাকলেও বাস্তবে তেমন প্রয়োগ নেই। নারীদের সুরক্ষার বিষয়টি নীতিমালায় যুক্ত করতে হবে।

আলোচনা শেষে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বাদাবন সংঘের লিপি রহমান, কেয়ার বাংলাদেশের প্রমা ইশরাত, ওয়াইডব্লিউসিএ অব বাংলাদেশ পূরবী তালুকদার, কারিতাসের শ্যামলী রায়, কু- শাল এর অনন্যা দ্রং, প্রমুখ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের হুমায়ুন কবীর সুমন প্রমুখ।

তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নারী ও শিশু বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাগেরহাটে নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাল্যবিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রান্তিক নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব দিতে হবে, জেন্ডার জলবায়ু পরিবর্তনে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে, অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে, নারী পাচারের সংখ্যা বাড়ছে এসকল বিষয়ে সকলকে কাজ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে নারীর অভিযোজন প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করতে হবে, পরিবেশ ইস্যু কে সরকারি ইশতেহারে গুরত্বপূণ ইস্যু হিসেবে যুক্ত করতে হবে। আদিবাসী নারীরা পরিবেশ রক্ষার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। আদিবাসী নারীদের, প্রতিবন্ধী নারী ইস্যু পরিবেশ রক্ষায় নীতিমালায় যুক্ত করতে হবে। দেশের অর্ধেক মানুষকে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে যুক্ত করতে হবে। পরিবেশ নিয়ে অনেক ভালো ভালো আইন আছে। এই আইনগুলো বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে।

শেয়ার করুন