১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বুধবার, ০৪:৪১:১৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে যাচ্ছে বাংলাদেশ জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের জাতিসংঘ অধ্যায় আসুন এবার রাষ্ট্রকে আমরা পুনর্গঠন করি - প্রধানমন্ত্রী ‘মাননীয়’ শব্দ ব্যবহার না করার সূচনা নিজেই শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান টেক্সাসে বিতর্কিত নতুন পাঠ্যক্রম অনুমোদনে মুসলিমদের ক্ষোভ ঘুষ নিয়ে নাগরিকত্ব, সাবেক ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা লুকম্যান ও ওলাবি গ্রেফতার জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে তারেক-ট্রাম্পের বৈঠকের সম্ভাবনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেন ড. খলিলুর রহমান সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও স্ত্রীর সম্পদের বিষয়ে এফবিআইয়ের প্রতিবেদন দুদকে তারেকের কূটনৈতিক চালে ধরাশায়ী হাসিনা


গণতন্ত্র সুরক্ষায় সুশাসন-সহায়ক আইনি সংস্কার অপরিহার্য
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৬-০৯-২০২৬
গণতন্ত্র সুরক্ষায় সুশাসন-সহায়ক আইনি সংস্কার অপরিহার্য বক্তব্য রাখছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান


জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তুলতে নির্বাহী বিভাগের অতিক্ষমতায়ন রোধ এবং জবাবদিহি-সহায়ক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ ও সরকারি প্রভাবমুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত “গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা” শীর্ষক আলোচনা সভায় আলোচকবৃন্দ এই অভিমত ব্যক্ত করেন। রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দল-মত নির্বিশেষে সকলের অন্তর্ভুক্তি এবং সম্মিলিতভাবে কাজ করার ওপরও জোর দেন তাঁরা।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার টিআইবির ধানমন্ডি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘তরুণদের নেতৃত্বে সকল শ্রেণিপেশাসহ সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে গণতন্ত্রের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও আমাদের রাজনীতি, নির্বাচন ও সংসদ মূলত অর্থ, পেশিশক্তি, ধর্ম, পুরুষতন্ত্র এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতন্ত্র এই পাঁচটি উপাদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান অন্তরায়। রাষ্ট্র পরিচালনায় “জয়ী দল সবকিছু পাবে” এমন একপাক্ষিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা আবশ্যক।’

তিনি উল্লেখ করেন, ‘সরকারি দলসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সকল রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী অঙ্গীকারের আলোকে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা থাকলেও, অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো নির্বাহী বিভাগকে অধিকতর ক্ষমতায়িত করা হয় এমন অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপান্তর করা হলেও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করার উপযোগী অধ্যাদেশগুলো হয় রহিত করা হয়েছে অথবা পর্যায়ক্রমে এমনভাবে আইনে পরিণত করা হচ্ছে যেনো বাস্তবে সরকারি কর্তৃত্বাধীন রাখা যায়। তাই মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিতে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য কমিশনের মত প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। গুম প্রতিরোধ আইন, সাইবার সুরক্ষা আইন ও এসআরবি আইনগুলো ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত বিচারবিভাগের স্বাধীনতাসংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলোকে অবিলম্বে পুনর্বহাল করতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের কাছে জিম্মি থাকতে পারে না। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে সকলের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সুশাসনের স্বপ্ন পূরণের জন‍্য দেশের রাজনৈতিক দল ও আমলাতন্ত্রে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত দীক্ষার ওপর ভিত্তি করে আত্মশুদ্ধি অপরিহার্য।’ 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, ‘বর্তমান সরকারের ক্ষমতার উৎস এদেশের জনগণ। দীর্ঘ স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে জনগণের রায়ে ও সমর্থনে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। বিএনপি সরকার বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার রক্ষায় আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় মদদে গুম ও খুন বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।’ তিনি আরো বলেন ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর নয়, বরং এটি আপামর জনসাধারণের। রাষ্ট্র ও ক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণ এবং একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বৈষম্যহীন দেশ গড়তে সরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং যুক্তিসংগত সমালোচনা ও পরামর্শকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত রয়েছে।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির এমপি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ পদে বসা ব্যক্তির দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বরং মূল প্রশ্নটি হওয়া উচিত যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হচ্ছে কি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘দেশ ও মানুষের প্রয়োজনে সাংবিধানিক পরিবর্তনের পাশাপাশি নিজের চিন্তা ও মানসিকতারও পরিবর্তন জরুরি। দেশের স্বার্থ রক্ষায় “সবার আগে বাংলাদেশ” স্লোগানকে ধারণ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।’

বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী বলেন, ‘বর্তমান সংসদের প্রায় ৬০ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী হওয়ায় সংসদে জনগণের থেকে বেশি বিল পাস হয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ উদ্ধারে। গণতন্ত্র আজ জনগণের বদলে “অফ দ্য বিজনেসম্যান, ফর দ্য বিজনেসম্যান, বাই দ্য বিজনেসম্যান” তথা ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে একচেটিয়া রূপ নিয়েছে। বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করা সম্ভব নয়। জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো ছাত্র-শ্রমিক-জনতার বৈষম্যহীন বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রে ঋণখেলাপিদের সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে।’

রাজনীতিবিদ ও চিকিৎসক তাসনিম জারা বলেন, ‘নির্বাচন কেবল পাঁচ বছর অন্তর আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জবাবদিহি নিশ্চিতকারী তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো কারো নিয়ন্ত্রণে থাকলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুসংগঠিতভাবে অপপ্রচার বা বট চালিয়ে রাজনৈতিক বুলিং ও ডিজিটাল সহিংসতা সৃষ্টি মূলত সংঘবদ্ধ অপরাধ। এভাবে তারা তরুণদের দমাতে চায়। কিন্তু আমাদের নিজের অধিকারের ব্যাপারে কথা বলতে হবে, সচেতন থাকতে হবে।’

আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, তরুন প্রজন্মের প্রতিনিধিসহ অন্য অংশগ্রহণকারীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সংবেদনশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা গ্রহণ, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন ও সরকারি চাকরির ভাইভা নম্বরের মতো প্রক্রিয়ায় বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান।

শেয়ার করুন