২২ জুলাই ২০১২, সোমবার, ০৯:০৬:০৫ অপরাহ্ন


খালেদার মুক্তির আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে নানা প্রশ্ন
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৩-০৭-২০২৪
খালেদার মুক্তির আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে নানা প্রশ্ন খালেদা জিয়া


বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দেয়া কর্মসূচি নিয়ে দলের অভ্যন্তরেই চরম সন্দেহ অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে। এছাড়া ক্ষমতাসীন সরকার পতনের জন্যে নেয়া সেই এক দফা’রই বা কি হবে তা নিয়েও চলছে নানা কানা-ঘুষা। এছাড়া এই ইস্যুতে বিএনপি’র সাথে সমমনা হিসাবে যে দলগুলি এক কাতারে এসেছিল তাদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে নানান ধরনের প্রশ্ন। এব্যাপারে বিএনপি তাদের রহস্যজনকভাবে পাস কাটিয়ে চলছে, রাখা হয়েছে অন্ধকারে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের। 

খালেদা মুক্তি আন্দোলন

বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে দেখা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ২৯ জুন (শনিবার) ঢাকার নয়াপল্টনে সমাবেশ করার ঘোষণা দেয় এবং তা পালনও করে দলটি। এরপর গত ১ জুলাই মহানগরগুলোয় এই ধরনের কর্মসূচি পালন করে। এর পাশাপশি ৩ জুলাই দেশের সব জেলায় সমাবেশ করার ঘোষণা দেয় বিএনপি। ৭৯ বছর বয়সী খালেদা জিয়া আর্থ্রাইটিস, হৃদরোগ, ফুসফুস, লিভার, কিডনি, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন। খালেদা জিয়া দুর্নীতির দুই মামলায় সাজা পেয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাবন্দী হন। দুই বছরের বেশি সময় তিনি কারাবন্দী ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এক নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়ার সাজা ২০২০ সালের ২৫ মার্চ স্থগিত করে তাঁকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়। তখন থেকে ছয় মাস পরপর মুক্তির মেয়াদ বাড়াচ্ছে সরকার।

প্রশ্ন এ-ই ইস্যুতে আবার কেনো রাজপথে?

সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে মির্জা ফখরুল জানান, খালেদা জিয়া গুরতর অসুস্থ, যেকোনো সময় তাঁর জীবনহানি হতে পারে। কিন্তু আদালতের দোহাই দিয়ে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। সে কারণে তাঁরা এখন রাজপথে কর্মসূচি নিয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এই ইস্যুতে বিএনপি আবারও রাজপথে নামলো বা নামছে কেনো? কারণ এই ইস্যুতে বিএনপি বহুবার বিভিন্নভাবে আন্দোলন করে একপর্যায়ে সড়ে দাঁড়িয়েছে, বুঝিয়েছে জনগণকে যে এসরকারের কাছে খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে না। কেননা বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তার সুচিকিৎসার দাবিতে কাফনের কাপড় পড়ে রাজধানীতে বিক্ষোভ করেছিল যুবদলও পল্টন থানার নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে বর্তমান সরকারকে ‘দানব’ আখ্যা দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, এ সরকারের কাছে খালেদা জিয়ার মুক্তি আশা করা যায় না। বলেছিলেন একজন মৃত্যু পথযাত্রী মানুষকে নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য প্রমাণ করে সরকার কতটা অসভ্য। এমন অবস্থায় বলা হয়ে থাকে, সাদামাটা কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চিঠি চালাচালি, আইনি লড়াই সর্বোপরি সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েও কাজ জবে বা ভেবে চেয়ারপারসনের মুক্তির আশা বিএনপি এক রকম ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু সে-ই বিএনপি কেনো তাদের ভাষায় অনড় অসভ্য সরকারেরর কাছে দাবি জানাচ্ছে খালেদার মুক্তি? এর নেপথ্যে কি?

লোকদেখানো কর্মী ধরে রাখার কৌশল?

এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তাহলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ২৯ জুন নয়াপল্টনে সমাবেশ করার ঘোষণা ও তা পালনের নামে কি চাইছে দলটি? কারো কারো মতে দল পুনর্গঠনের কথা বলে বিএনপিতে আচমকা রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক মহলের পাশাাপাশি খোদ বিএনপি’তেই বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কোনো ধরনের খোঁজ-খবর না নিয়ে দোষ চাপানো হচ্ছে মাঠের ত্যাগি নেতাকর্মীদের ওপর। বলা হচ্ছে, দলের হাই-কমান্ডের ভুল পরিকল্পনা ও সরকার বিরোধী আন্দোলনে অধিক মাত্রায় বিদেশী নির্ভরতার পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে ব্যার্থতার দায়-ভার কাধে না নিয়ে এভাবে আচমকা সংস্কারে নেমেছে। আর এমন বিষয়টি নিয়ে পত্র-পত্রিকা বেশ সরব এখন। কারো কারো মতে, বিএনপিতে আচমকা রদবদলে দলের কোমড় ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তটি-ও যে দলের হাই-কমান্ডের আরেকটি বড় ভুল তা ফুটে উঠছে সম্প্রতি বিভিন্ন ধরনের খবরে। আর হাইকমান্ডের ওপর এধরনের অভিযোগ কে ধামাচাপা দিতেই বিএনপি খালেদার মুক্তি আন্দোলনকে মাঠে নিয়ে এসেছে কি-না সে প্রশ্ন চলে এসেছে। অনেকের মতে, এমন ধারণা আভাস মিলে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের একটি বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, শুধু বক্তৃতায় খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে না। এর কয়েক বছর আগেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন সরকার বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে জীবিত মুক্তি দিবেন না। এমন মন্তব্য করে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সে-সময় বলেছিলেন আন্দোলন করে সরকারের পতন ঘটাতে না পারলে জেলগেটে নেত্রীর লাশ ফেরত নিতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। বলা হয়েছিল সরকারের পতন ছাড়া খালেদা জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন না। আরেক খবরে জানা গেছে, সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে সমমনা দল ও জোটকে সাথে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের সফলতা আসবেই ভেবে সেসময় দলের হাইকমান্ড আর খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনটি জোরদার করেননি। অভিযোগ উঠেছে ঠিক সময়ে ঠিক কর্মসূচি না দেয়ার ব্যর্থতার দায়ভার চাপা দিতে ঈদের মধ্যেই দল পুনর্গঠনের কথা বলে বিএনপিতে আচমকা রদবদল ঘটিয়ে দেয়া হয়। এতে একটি মহল ফায়দা তুলে নিয়েছে তেমনি এখন খালেদার মুক্তি কথা বলে সে-ই ব্যর্থতা ঢাকা দেয়া হচ্ছে। 

প্রশ্ন একদফা কি ত্যাজ্য

গত বছর সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে সমমনা দল ও জোটকে সাথে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে ঢাকাসহ সারাদেশে জেলা ও মহানগরে পদযাত্রা কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছি বিএনপি। নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ থেকে ’সরকারের পদত্যাগের এক দফা’ কর্মসূচি ঘোষণা করে দলের মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন যে তাদের এখন একটাই কাজ তাহলো বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া। যুগপৎ ধারায় বৃহত্তম গণআন্দোলনের এক দফা-ভোটাধিকার হরণকারী কর্তৃত্ববাদী, অবৈধ সরকারের পদত্যাগ। আর কোন দফা নেই। ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দিচ্ছি, সমাবেশে এ বক্তব্য দিয়ে মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত বছর ১৮ ও ১৯ জুলাই ঢাকাসহ সারাদেশে পদযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বিএনপির সমমনা দলগুলোও আলাদাভাবে একই ঘোষণা ও কর্মসূচি প্রকাশ করেছে। এরপর থেকে চলতে থাকে সে-ই আন্দোলন। ওই আন্দোলনকে টেনে নিয়ে যায় ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত। বিএনপি’র একেবারে শীর্ষ নেতারা সেসমসয় প্রায়শ তাদের তৃণমূল তে সব পর্যায়ের নেতা কর্মীদের বলতে শোনা গিয়েছি আগামী ২৮ অক্টোবর ঢাকায় সমাবেশের আন্দোলনের ‘মহাযাত্রা শুরু হবে। আশ্বস্থ করা হতো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারকে ২০২৪ সালে দেখাই যাবে না। কিন্তু সে-ই ২৮ অক্টোবর বিএনপি সমাবেশ পন্ড হয়ে যায় পুলিশী বাধায় । এর পর থেকে বিএনপি হরতাল অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। কিন্তু আর এর বিনিময়ে ২৮ অক্টোবরের সংঘর্ষে জড়িত থাকারা অভিযোগে ২৮ মামলা হয়। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় বেশির ভাগ নেতা হন আসামি। একাধিক মামলায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আসামি করা হয়েছে। দলের শীর্ষস্থানীয় বেশির ভাগ নেতাকে কোনো না কোনো মামলার আসামি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এসব মামলায় পুলিশকে হত্যা ও হত্যার উদ্দেশ্যে ককটেল বিস্ফোরণ, সরকারি কাজে বাধা, প্রধান বিচারপতির বাসভবনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া ইত্যাদি অভিযোগ আনা হয়। আর সারা দেশে হাজার হাজার বিএনপি’র সাধারণ নেতাকর্মী দীর্ঘদিন ঘরছাড়া হয়ে পড়ে, শিকার হয় মামলা-মোকাদ্দমার।

কিন্তু ২০২৪ সালে ৭ জানুয়ারি ঠিক সরকার নির্বাচন করে ফেলে। এর পর বিএনপি বড়ো ধরনের কর্মসূচি না নিয়ে একদফার আন্দোলনকে লিফলেট বিতরণ কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মুক্তি ও দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন বাতিলের দাবিতে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকাসহ দেশের সব মহানগরে গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ করে বিএনপি। কিন্তু ২০২৪’এর মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত দলটি সেই একদফা নিয়ে আর টু-শব্দ করেনি বা করছে না। প্রশ্ন তাহলে কি বিএননি একদফার আন্দোলন খেকে সড়ে গেছে। গত বছর সরকারের পদত্যাগের এক দফা' দাবিতে সমমনা দল ও জোটকে সাথে নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে ঢাকাসহ সারাদেশে জেলা ও মহানগরে যে পদযাত্রা কর্মসূচিরমাধ্যমে বিএনপি’র আন্দোলন শুরু হয়েছি তা-কি আবারও কোনো শক্তিধর পশ্চিমাদের পরামর্শে বাতিল? না-কি এক দফা দাবিতে সে-ই আন্দোলন একোরেই ত্যাজ্য? তাছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দেয়া কর্মসূচি দেয়ার আগে কি বিএনপি সমমনাদের কোনো ধরনের পরামর্শ নিয়েছে? কারণ না-কি যে-ই ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের বিরুদ্ধে নানান ধরনের বক্তব্য দিয়ে এখন সে-ই ক্ষমতাসীনদের আরাও পাঁচ বছরের শাসনকে মেনে নিয়েছে বিএনপি? না-কি পশ্চিমাদের পাশাপাশি ক্ষমতাসীনদের আরেক রাজনৈতিক কূটনৈতিক চালে হেরে গিয়ে একদফা থেকে সটকে পড়লো বিএনপি? এমন প্রশ্নই রাজনীতিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। কেননা প্রশ্ন হচ্ছে যখন সরকারের একজন শীর্ষ মন্ত্রী বলে বসেন এই বলে যে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা, সরকার কীভাবে তাকে মুক্তি দেবে? মামলটি রাজনৈতিক হলে তাকে রাজনৈতিক বিবেচনায় মুক্তির প্রশ্ন ছিল। তাহলে সেক্ষেত্রে বিএনপি এই ইস্যুতে আন্দোলন কেনো? রহস্য এখানেই।

শেয়ার করুন