২২ জুন ২০১২, শনিবার, ০৩:০৫:২৭ অপরাহ্ন


উপরে উচ্ছ্বাস ভেতরে ক্ষোভ হতাশা আওয়ামী লীগে
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৮-১২-২০২২
উপরে উচ্ছ্বাস ভেতরে ক্ষোভ হতাশা আওয়ামী লীগে অতীত নেতৃত্বের ওপর ভর করেই সামনের পথ পাড়ি দেয়ার ঘোষণাই এসেছে ঐতিহ্যবাহি দলটির কাউন্সিল শেষে।


২৪ ডিসেম্বর। তিন বছর পর হয়ে গেলো আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় কাউন্সিল। এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ২০৪১ সালের মধ্যে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যয়। আর এ সম্মেলন উপলক্ষ্যে নেতাকর্মীদের মাঝে উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনা ছিল বলা যায় টান টান। সেদিন সকাল থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নেমে আসে সর্বস্তরের জনতার ঢল। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই কাউন্সিলের উদ্বোধন করেন দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিভিন্ন জেলা-উপজেলার নেতাকর্মীরা ভোর থেকেই ক্যাম্পাসে জড়ো হতে থাকলে কানায় কানায় ভরে কাউন্সিল চত্বর।


অনেক প্রত্যাশা ও আগ্রহ নিয়ে কাউন্সিলস্থলে প্রবেশ করেন নেতাকর্মীরা। তবে এসব আশায় খুব একটা কাজে দেয়নি। কারণ অতীত নেতৃত্বের ওপর ভর করেই সামনের পথ পাড়ি দেয়ার ঘোষণাই এসেছে ঐতিহ্যবাহি দলটির কাউন্সিল শেষে।  আর একারণে শোনা যাচ্ছে যে বেলা শেষে এই কাউন্সিলের মাধ্যমে আসা নেতৃত্বকে শীর্ষ থেকে তৃণমূলের অনেকেই মেনে নিতে পারেনি মনে মনে। আর এসব খবর জানা গেছে টানা ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে।


শেখ হাসিনাই সভাপতি.....

এবারেরও কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও সর্বসম্মতভাবে দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এ নিয়ে একটানা ১০ বার দলের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। অন্যদিকে দলের নতুন কার্যনির্বাহী সংসদে সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এই পদে হ্যাটট্রিক করেছেন। আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে গঠিত নির্বাচন কমিশন একমিটির নাম ঘোষণা করেন। ওই কাউন্সিল অধিবেশনে অংশ নেওয়া প্রায় সাড়ে সাত হাজার কাউন্সিলর দলের নতুন নেতা নির্বাচন করেন। শীর্ষ এপদে যে এমনই হবে তা সব্বাই একপ্রকার মেসেজ পেয়েই গিয়েছিলেন। 


তাই দেখা যাচ্ছে ৭৩ বছর বয়সী আওয়ামী লীগ এ পর্যন্ত ৮ জন সভাপতি পেয়েছে। সাধারণ সম্পাদক পেয়েছে ১৫ জন। এর মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন বেশ কয়েকজন। আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি শেখ হাসিনা পদে আছেন ৪১ বছর । অর্থ্যাৎ ১৯৮১ সাল থেকে। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ২০১৬ সাল থেকে। দুই মেয়াদে তিনি ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেছেন।


আসলেই ছিল না চমক..

তিন বছর পর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের এই ২২তম জাতীয় কাউন্সিলে যে চমক থাকছে না তা একটা চাওর হয়ে গিয়েছিল। ফলে আগামী তিন বছরের জন্য গঠিত নতুন কমিটিতে আসলেই তেমন কোনো চমক নেই। বিদায়ী কার্যনির্বাহী সংসদ প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বরং বিদায়ী কমিটির ছয় নেতা নতুন কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন। পদোন্নতি পেয়েছেন তিনজন। সভাপতিমন্ডলীর দুটি পদ, যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক, শ্রম ও জনশক্তি সম্পাদক এবং উপপ্রচার সম্পাদক পদে কারও নাম ঘোষণা করা হয়নি। ৮১ সদস্যের কার্যনির্বাহী সংসদের ৪৮ নেতার নাম ঘোষণা করা হয়েছে। জানা গেছে নতুন সভাপতিমন্ডলীর প্রথম বৈঠকে কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যদের নাম চূড়ান্ত করা হবে। 


যে কারণে পুরানাতেই ভরসা..

নতুন কমিটির ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাউন্সিলরদের উদ্দেশে বলেছেন, নতুন নেতৃত্ব আসা দরকার। আমারও বয়স হয়েছে। তবে সামনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ কারণেই দলের কার্যনির্বাহী সংসদে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। যদিও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে আসা শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আমি যেখানেই থাকি না কেন, আপনাদের সঙ্গেই আছি এবং থাকব। নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে হবে। এটাই তো নিয়ম। কিন্তু দলীয় সভাপতির এই বক্তব্য শুনে বুঝে ফেলেন কাউন্সিলরা। তারা সমবেত কণ্ঠে দ্বিমত পোষণ করে। তাঁরা একযোগে শেখ হাসিনাকে আবারও সভাপতি পদে নির্বাচনের দাবি জানান। 


পলিটিক্যাল পানিশমেন্ট......

নয়া কমিটিতে তেমন পরিবর্তন না হলেও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে বিদায়ী কমিটির তালিকায় পরিবর্তন এসেছে। ড. হাছান মাহমুদের নাম বিদায়ী কমিটিতে তিন নম্বরে থাকলেও নতুন কমিটিতে এক নম্বরে রাখা হয়েছে, যা একধরনের চমক সৃষ্টি করে। বিদায়ী কমিটির এক নম্বরে থাকা মাহবুবউল-আলম হানিফের নাম দুই নম্বরে এবং দুই নম্বরে থাকা ডা. দীপু মনির নাম সবার শেষে রয়েছে, যাকে অনেকেই পলিটিক্যাল পানিশমেন্টও বলে মন্তব্য করেছেন। 

 জানা গেছে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে পাঁচবার থাকা মাহবুবউল-আলম হানিফের ও ডা. দীপু মনিকে পেছনের দিকে রেখে এ পদের নেতাদের তালিকা ঘোষণা শুনে অনেকে এদিক সেদিক তাকাতে থাকেন। সভাপতি শেখ হাসিনা প্রথমে হাছান মাহমুদের নাম ঘোষণা করেন, এরপর হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম ও সর্বশেষ নাম ঘোষণা করেন দীপু মনির। উপস্থিত কাউন্সিলর-ডেলিগেটসহ অনেকেই মনে করেছেন ঘোষণায় কী ভুল হয়েছে হয়ত। 

এদিকে নতুন কমিটিতে পদোন্নতিও হয়েছে। নতুন কমিটিতে পদোন্নতি পেয়েছেন ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। তাঁকে সভাপতিমন্ডলীর সদস্য করা হয়েছে। তিনি বিদায়ী কমিটির কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ছিলেন। বিদায়ী কমিটির ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দীকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। নতুন ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক হয়েছেন আমিনুল ইসলাম আমিন। বিদায়ী কমিটিতে উপপ্রচার সম্পাদক ছিলেন তিনি। কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন বিদায়ী কমিটির সভাপতিমন্ডলীর তিন সদস্য নুরুল ইসলাম নাহিদ, রমেশ চন্দ্র সেন ও অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান। নুরুল ইসলাম নাহিদ ও অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খানকে উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য করা হয়েছে। বিদায়ী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিকও বাদ পড়েছেন। তাঁকে কোথাও রাখা হয়নি।


 যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক হারুনুর রশীদ, শ্রম ও জনশক্তি সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজও নতুন কমিটিতে স্থান পাননি। এ দুই নেতাকে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করা হয়েছে। এসবই এধরনের পলিটিক্যাল পানিশমেন্ট বলেই মনে করেন অনেকে। কেননা খন্দকার মোশাররফ প্রথমে প্রবাসীকল্যাণ, পরে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। সাবেক এই মন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ফরিদপুরে ক্ষমতার দাপট দেখানো ও অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এবার খন্দকার মোশাররফ ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদ থেকে আর কেউ বাদ পড়েননি।


পুরনোতে ভরসা কার স্বার্থে?

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার যাত্রা’ শুরু করতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এমন ম্লোগানে ক্ষমতাসীন দলের এই জাতীয় সম্মেলনে যোগ দিতে ঢল নেমেছিল নেতাকর্মীরা। দলটিতে নানান ধরনের অভিযোগ রয়েছে একেবারে শীর্ষ থেকে তৃণমূলে। বিশেষ করে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ দলটি আপাদমস্তক একটি সরকারি দলে মারাত্মকভাবে রূপ নিয়েছে। বলা যায় দেশে এখন চারিদিকে তাকালে সব্বাই আওয়ামী। যোগ দিয়ে নানান ধরনের মন মানসিকতার লোকজন। যারা আদৌ আওয়ামী লীগ কি-না সে প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।


বলা হচ্ছে দলে গণতন্ত্র নেই, বিশৃঙ্খলা, অনিয়মে চলছে । দলের নানান জায়গায় মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে অনেক কথা উঠেছে গণমাধ্যমে। এমন সমালোচনা যখন প্রায় সর্বত্রই ছিল সে সময়ে সেই পুরনোদের নিয়ে নতুন কমিটির ব্যাপারে বাস্তবে অনেকের মধ্যেই নানান ধারণের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দলের বেশ কয়েকজন নেতার সাথে একান্তে কথা বলে জানা গেছে তাদের অভিমত। তাদের মতে, সামনে নির্বাচন কে মাথায় রেখে দলের নেতৃত্বে খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি বলা হলেও এটা ঠিক করা হয়নি। কারণ ক্ষমতায় থেকে এধরণের দলকে যতটা নিয়ন্ত্রণ রাখা যেতো নতুন কমিটিতে স্থান দিয়ে, সেটা বিরোধী দলে থেকে যে হয় না তা সব্বাই বোঝে। অভিযোগ উঠেছে, সারা বছর দলে যারা সক্রিয় থেকেছেন, এবারের সম্মেলনে পদোন্নতির আশায় ছিলেন তারা নিরাশ হয়েছেন। 


এদিকে জানা গেছে, ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের বড় একটি অংশ এবারের সম্মেলনে তাদের মূল্যায়ন হবে বলে তারা ধরেই নিয়েছিল। কিন্তু তা না হওয়ায় ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মীদের একটি বড়ো অংশ হতাশ হয়েছে। আবার একি পদে দিনের পর দিন আকড়ে থাকাকেও কেউ পছন্দ করছেন না। তাছাড়া দলের হাইব্রিড নেতাদের বিরুদ্ধেও ছিল না কঠোর বার্তা। তাই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন উপরে উপরে ক্ষমতাসীন এই দলে কাউন্সিল নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও বাস্তবে অনেক হতাশা ক্ষোভ বিরাজ করছে ভেতরে। আর এমন ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলটি কিভাবে তাদের অগ্রযাত্রা সুদৃঢ করবে এর পাশাপাশি বিরাট একটি বিরোধী শিবিরকে মোকাবেলা করা হবে সে প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।

শেয়ার করুন