১৪ জুন ২০১২, শুক্রবার, ০৫:৩৪:০৭ অপরাহ্ন


চরম নিরাপত্তা সংকটে গ্যাস বিতরণ সিস্টেম
খন্দকার সালেক
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৪-০৫-২০২৩
চরম নিরাপত্তা সংকটে গ্যাস বিতরণ সিস্টেম


দুর্নীতিগ্রস্ত মাফিয়া সিন্ডিকেটের কবলে থাকা তিতাস গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থা লাখ লাখ অবৈধ সংযোগ, হাজার কিলোমিটার অবৈধ পাইপলাইন নিয়ে মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে। ইতিমধ্যেই বিতরণ এলাকায় বেশকিছু গ্যাস লিকেজজনিত মারাত্মক দুর্ঘটনায় যান মালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজেই একটি ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তার দেড় বছরের কার্যকালে তিনি ইতিমধ্যেই ৫ লাখ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছেন, কয়েকশ কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস পাইপলাইন অপসারণ করেছেন, প্রায় ১০০ শিল্প গ্রাহকের অবৈধ গ্যাস ব্যবহার বন্ধ করেছেন, এমনিতেই তিতাস বিতরণ এলাকায় অনেক পাইপ লিনের বয়স ৩৫-৪০ বছর। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং তদারকির অভাবে জরাজীর্ণ, অসংখ্য ছিদ্র, তার পর প্রতিটি অবৈধ সংযোগ এবং অবৈধ পাইপ লাইনের কারণে বিতরণ ব্যবস্থা কতটা নাজুক তার প্রমাণ মিলেছে নিকট অতীতে ঢাকা মহানগরীতে ভীতি ছড়ানো গ্যাস লিকেজ থেকে। সৌভাগ্য গ্যাসের সঙ্গে ওডারেন্ট মেশানো ছিল। না হলে ভয়াবহ কিছু হতে পারতো। অন্যান্য সরকার আমলের কথা না হয় বাদ রাখলাম, এখন প্রশ্ন হলো বর্তমান সরকারের ১৫ বছরে কেন তিতাস গ্যাসের বিতরণ এলাকার গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থা এমন বিপদগ্রস্ত হলো? এর জন্য তিতাসের কেন্দ্রীয় প্রশাসন, জ্বালানি সচিবের নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী পরিচালকম-লী, পেট্রোবাংলা, ২০০৯-২০২৩ তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কি কিছু দায়দায়িত্ব নেই? 

আমি ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সাক্ষাৎকার দেখেছি, শুনেছি। শুনলাম, উনি যেসব এলাকায় অবৈধ সংযোগ বেশি, সেখানে বৈধ গ্রাহকদেরও সংযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে অবৈধ সংযোগ অপসারণ করছেন। যৌক্তিক কারণে এই কার্যক্রম সমর্থনযোগ্য না হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে অন্য বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। 

প্রতিবেদক নিজে তিতাস গ্যাসসহ পেট্রোবাংলার পাঁচটি কোম্পানিতে প্রায় তিন দশক কাজ করেছি। গ্যাস বিতরণ এলাকার বেসামাল অবস্থা দেখে সুপারিশ করবো গ্যাস ব্যবহার বিধি পুনর্বিবেচনার। নানা কারণে তিতাস, কর্ণফুলী গ্যাস, বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ এলাকায় গৃহস্থালি গ্যাস ব্যবহার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার। যে পরিস্থিতিতে বর্তমানে তিতাস গ্যাস ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন সেটি টেকসই হবে না। মাফিয়া সিন্ডিকেট নানা পন্থায় অবৈধ গ্যাস ব্যবহার চালিয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে বিতরণ ব্যবস্থা অনিরাপদ থাকবে। ঘনবসতি পূর্ণ এলাকায় নতুন করে গ্যাস বিতরণ পাইপলাইন নির্মাণ ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হবে। পুরোনো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর এলাকায় ধীরে ধীরে গ্যাস ব্যবহারকারীদের বিকল্প জ্বালানি যেমন এলপিজি, বিদ্যুৎ চুলা ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে।  

আমি হলফ করে বলতে পারি, বিতরণ পাইপলাইন নির্দিষ্ট মাত্রায় ওডারেন্ট দেওয়া হলে অসংখ্য ছিদ্র পাওয়া যাবে। এই অবস্থায় কত দিনে, কত অর্থ বিনিয়োগে বিতরণ লাইন স্থাপন করবে বিতরণ কোম্পানিগুলো? এতোদিন ডিজিটাল ম্যাপিং, জিআইএস, স্কাডা উপেক্ষিত থাকলেও এখন ভাবা হচ্ছে, ভালো কথা। তিতাস বিতরণ এলাকা থেকে কর্ণফুলী গ্যাসের বিতরণ এলাকা অনেক সুবিন্যস্ত। সেখানেও যে গ্যাসের অবৈধ ব্যবহার নেই নিশ্চিত হওয়ার কারণ নেই। তবে সেখানে এইচপি ডিআরএস, আইপি ডিআরএস মিটার সংযুক্ত করে, টেলিমেট্রি চালু হলে গ্যাস ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে। নতুন কোম্পানিগুলো পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বা সুন্দরবন গ্যাসের বিতরণ ব্যবস্থায় শুরু থেকেই ডিজিটাল ম্যাপিং এবং স্মার্ট সেন্সিং চালু থাকলে অবৈধ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। 

বাংলাদেশ ক্রমাগতই আমদানিকৃত মূল্যবান এলএনজি নির্ভর হয়ে যাচ্ছে। সাগর থেকে হোক অথবা নতুন আবিষ্কৃত কূপ থেকে হোক গ্যাসের মূল্য কিন্তু স্বল্প হবে না। আর বিতরণ ব্যবস্থার নিরাপত্তা এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সবকিছু ভেবে সাহসী কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিতাস পরিচালনা পরিষদ, পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায় এড়িয়ে চলা বন্ধ করতে হবে। প্রধান পরিদর্শক বিস্ফোরক দপ্তরকে আরো সক্রিয় হতে হবে।

মোখায় গ্যাসের চেয়েও বেশি সংকট বিদ্যুতে  

মহাআতঙ্ক ছড়িয়ে সীমিত প্রতিক্রিয়া ফেলে মোখা ঘূর্ণিঝড় চলে গেল। ঝড় যত না প্রভাব ফেলেছে, গ্যাস সংকট, বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতি হয়েছে বহুগুণ। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্নমত বিতর্ক ছিল। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ বারবার বলছিল মোখা সুপার সাইক্লোন হবে না, ঘূর্ণিঝড়ের ল্যান্ডফল বাংলাদেশের মূল ভূখ-ে আসবে না। সেন্টমার্টিন, কক্সবাজারের একপাশ দিয়ে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলে যাবে। অন্যদিকে কানাডা থেকে একজন প্রবাসী বাংলাদেশি অধ্যাপককে উদ্ধৃত করে বাংলাদেশের কিছু ইলেকট্রনিক মিডিয়া জানাচ্ছিল ঘূর্ণিঝড় সুপার সাইক্লোন হবে এবং ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র বাংলাদেশমুখী। এমতাবস্থায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সমুদ্রবন্দর থেকে সব বড় জাহাজ গভীর সমুদ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়, কক্সবাজার এবং চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করা হয়। 

সারা দেশে নৌযান চলাচল স্থগিত থাকে। এফসারুগুলোর সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী সুপার সাইক্লোনের পূর্বাভাস থাকলে এগুলো নিরাপত্তার জন্য গভীর সাগরে অথবা নিরাপদে কোথাও সরিয়ে নেয়া যায়। মার্কিন কোম্পানি এক্সসেলারেট তাদের এফসারু সরিয়ে নেয়। সামিট প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ঘূর্ণিঝড় দুর্বল হয়ে পড়ে।  স্থানান্তর করার দরকার হয়নি। কিন্তু দুটি এফএসআরইউ অপারেশন স্থগিত করায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ ৬৫০-৭০০ এমএফসিএফডি কমে যায়। এমনিতেই গ্যাস সংকট তার পর এই অবস্থায় বিদ্যুৎ সংকট গ্যাস সংকট সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। চট্টগ্রাম অঞ্চল সম্পূর্ণ গ্যাস শূন্য হয়ে পড়ে। দেশ জুড়ে ১০-১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ লোডশেডিং হয়। গৃহস্থালি গ্যাস ব্যবহারকারীরা মহাসংকটে পড়ে। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়।

ওই অবস্থায় জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী পরিস্থিতির প্রকৃত মূল্যায়ন না করেই জানান গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও ভুল তথ্যের ভিত্তিতে তার সংবাদ সম্মেলনে ডুবুরি এনে এফএসআরইউ পুনঃসংযোগের সময়ের কথা বলেন। সংযোগ পাইপলাইন বা সাবমেরিন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে থাকলে ৩-৪ দিনের বেশি সময় লাগার কথা না। হয়তো তার আগেই এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে পেট্রোবাংলা বা আরপিজিসিএল ছাড়া অন্য কারো কিছু না বলাই ভালো। ভুল কথায় আতঙ্ক ছড়ায়, যা এক্ষেত্রে হয়েছে। 

যাহোক, শেষ পর্যন্ত একটি ভাসমান টার্মিনাল অপারেশন শুরু করেছে। আর একটিও সহসাই চলে আসবে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বিষয়টি সুস্পষ্ট করেছেন। এফএসআরইউগুলো চুক্তি অনুযায়ী বছরে ২৮৯ দিন অপারেশন করার কথা। গত কয়েক বছর বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় ৯৫ শতাংশ সময় কাজ করেছে। সুপার সাইক্লোন আভাস দেওয়া হলে ওরা অপারেশন চুক্তি অনুযায়ী স্থগিত করেছে। 

সংকট হলো নিজেদের উৎপাদন ২২০০ এমএমসিএফডি এবং আমদানিকৃত এলএনজি ৬৫০ এমএমসিসিএফডি নিয়ে মোট গ্যাস সরবরাহ ২৮৫০ এমএমসিএফডি হলেও চিদা ৪০০০-৪৫০০ এমএমসিএফডি। নিজেদের উৎপাদন কমছে। ২০২৫ নাগাদ ২০০০ এমএমসিএফডির নিচে চলে যেতে পারে। এই সময়ের মাঝে যদি জ্বালানি উপদেষ্টার কথা মতো মহেশখালী এবং পায়েরায় দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে এলএনজি আসে তাহলেও সর্বোচ্চ ২৯০০-৩০০০ এমএমসিএফডি সরবরাহ পাওয়া যাবে। তারপরও ঘাটতি থাকবে ১০০০ এমএমসিএফডির ওপর। বাংলাদেশ এখনই এলএনজি কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। কয়লা, তরল জ্বালানি কিনতে ডলার জোগাড় করতে পারছে না। কি হবে ২০২৫, ২০২৬ জ্বালানি নিরাপত্তার? হয়তো তখন জ্বালানি উপদেষ্টা থাকবেন না। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণকে সরকারের ভ্রান্ত জ্বালানি পরিকল্পনার জন্য ভুগতে হবে। একমাত্র উপায় যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে নিজেদের প্রাথমিক জ্বালানি গ্যাস, কয়লা উত্তোলন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়ন। জ্বালানি বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের কাজের ক্ষেত্র। সেখানে সবার সবকিছু সব সময় না বলাই উচিত। জনগণ বিভ্রান্ত হয়।

শেয়ার করুন