২২ জুন ২০১২, শনিবার, ০৪:৩৮:১৭ অপরাহ্ন


ভুল পরামর্শে জ্বালানি খাত গভীর সংকটে
খন্দকার সালেক
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৩-০৯-২০২৩
ভুল পরামর্শে জ্বালানি খাত গভীর সংকটে


ক্রমান্বয়ে তিন টার্ম রাষ্ট্রপরিচালনায় দায়িত্বে থেকে শেখ হাসিনা সরকার অর্থনৈতিসহ নানা খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করে দেশকে অনুন্নত অর্থনীতির দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিয়ে গেছে। কিন্তু এই উন্নয়নের কিছু অংশ একই সঙ্গে বিতর্কিত করেছে কয়েকজন দূরভিসন্ধি পরামর্শকের ভ্রান্ত পরামর্শে। সঠিক পেশাদারদের সৎ পরামর্শ উপেক্ষা করে নিজস্ব জ্বালানি আহরণ এবং উন্নয়ন না করে দুর্নীতি এবং অসৎ উদ্দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে আমদানিকৃত জ্বালানিনির্ভর করায় জ্বালানি নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বজায় রেখে সরকার ঘোষিত ২০৪১ সালে উন্নত অর্থনীতির ভিশন অর্জন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। 

সম্প্রতি জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জাতীয় সংসদে প্রশ্ন উত্তরে জানিয়েছে বিগত সাড়ে ১৪ বছরে ১০৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে শুধু ভাড়া বাবদ ১ লাখ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। এর বিরাট একটা অংশ সরকারঘনিষ্ঠ কয়েকটি কোম্পানি পেয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ। প্রশ্ন উঠেছে, দেশের বিদ্যুৎক্ষমতা ১৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট হলেও কেন বাংলাদেশ প্রায় ২৪ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতা নিয়ে বসে আছে? কেন এতো বিশাল ক্ষমতা নিয়েও বাংলাদেশকে এখনো লোডশেডিংয়ের কারণে অস্বস্তি পোহাতে হচ্ছে?

রাজধানীসহ শহরাঞ্চলে লোডশেডিং কম। কিন্তু গ্রামগঞ্জে ব্যাপক লোডশেডিংয়ে মানুষ অতিষ্ঠ। অথচ অশুভ প্রতিক্রিয়ায় বারবার জ্বালানি-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করে নিজেদের ভুলের বোঝা অসহায় ভোক্তা সাধারণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেনার দায়ে দেউলিয়া হয়ে পড়ছে জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। সরকার বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিলেও জ্বালানি ক্রয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ডলার সংকুলান হচ্ছে না। বিপুল পরিমাণ বিল বকেয়া পড়ছে আইপিপিগুলোর, আইওসিগুলোর। অথচ ভ্রান্ত জ্বালানি কৌশলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট অব্যাহত থাকায় রফতানিমুখী শিল্পকারখানাসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় সৃষ্ট সংকট কাটছে না। 

২০০৯ সালে যখন বর্তমান সরকার প্রথম টার্মে আসে তখন দেশজুড়ে ছিল অসহনীয় বিদ্যুৎ জ্বালানি সংকট। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে সীমিত সময়ের জন্য রেন্টাল অথবা কুইক রেন্টাল নামের আপদকালীন ব্যবস্থা ছাড়া বিকল্প কিছু ছিল না। দেশে প্রচলিত জাতীয় ক্রয়নীতি এড়িয়ে ৩-৫ বছরের জন্য দ্রুত বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ অ্যাক্ট গ্রহণযোগ্য ছিল। ২০১৫-২০১৬ নাগাদ সংকট অনেকটিই সহনীয় হয়ে যাওয়ার পর দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ অ্যাক্ট তুলে নেওয়া অপরিহার্য ছিল। কিন্তু অস্বচ্ছ এই ব্যবস্থার ফায়দা লোটা দুর্নীতিপরায়ণ সুবিধাবাদী আমলা গোষ্ঠী সরকারকে ভুল পরামর্শ দিয়ে জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতকে পরজীবী করে পঙ্গু করেছে। সৃষ্টি হয়েছে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে মাফিয়া চক্র। চরম অবহেলায় নিজেদের জ্বালানি উন্নয়ন খাত। অনিশ্চিত বিশ্ব জ্বালানি বাজার থেকে উঁচু মূল্যে জ্বালানি আমদানির সামর্থ নেই বাংলাদেশের ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতির। বিপুল উৎপাদন ক্ষমতা নিয়েও চাহিদামাফিক জ্বালানি সরবরাহ করতে না পারায় বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে পারছে না বিদ্যুৎ খাত। কয়লা উৎপাদনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়নি, স্থলভাবে গ্যাস আহরণ হয়েছে অতিসামান্য, বিপুল স্বভাবনাময় বঙ্গোপসাগরে গ্যাস উত্তোলন শুরু করা যায়নি। 

অথচ অলস রেখেও বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে ব্যক্তি খাতের অনেক বিদ্যুৎ কোম্পানিকে যার পরিসংখ্যান দিয়েছে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী। 

অবস্থাদৃষ্টে প্রমাণিত সরকারের কিছু উপদেষ্টা চায় না জ্বালানি বিদ্যুৎ খাত এলেও সংকট মুক্ত হোক। সংকট বজায় থাকলে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার সুযোগ থাকে। তা না হলে কেন দেশের জ্বালানি আহরণ এবং উত্তোলনের মূল প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে সম্পূর্ণ আমলা নিয়ন্ত্রণে প্রায় অকার্যকর করা হলো? কাদের পরামর্শে পেট্রোবাংলা এবং আওতাধীন কোম্পানিগুলোর পরিচালকম-লীতে আমলাদের আধিক্য? ২০১৪-২০২৩ খোদ পেট্রোবাংলায় কেন সাধারণ মানের আমলাদের চেয়ারম্যান, পরিচালক করে পাঠানো হয়েছে? দেশে গ্যাস সেক্টরে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে অনেক দক্ষ অভিজ্ঞ পেশাদার কাজ করেছেন। তাদের অনেকেই অবসর জীবনে দেশে আছেন। এদের কয়েক জনকে পেট্রোবাংলা এবং কোম্পানিগুলোর পরিচালনা কাজে সম্পৃক্ত করা গেলে পেট্রোবাংলার কর্মকা- স্থবির হয়ে পড়তো না। হয়তো কয়লা উৎপাদনের সিদ্ধান্ত হতো, গ্যাস উৎপাদন ব্যবস্থা ত্বরান্বিত হতো। জ্বালানি খাত একান্তভাবে আমদানিকৃত জ্বালানি নির্ভর হয়ে পড়তো না। সংকটের সময়েও বিপুল পরিমাণ অবৈধ গ্যাস সংযোগের দুর্নাম হতো না। 

অন্যদিকে যদি বিদ্যুৎ খাতের কথা বলি। কাদের স্বার্থে প্রকৃত চাহিদার বিষয়ে জেনেও অনেক বিপুল পরিমাণ ক্ষমতার বিদ্যুৎ ক্ষমতা অর্জন করে ক্যাপাসিটি চার্জ নামের গোলক ধাঁধায় পড়া হলো? কেন মাফিয়া সিন্ডিকেটকে বিদ্যুৎ সেক্টর থেকে বিদেশে সম্পদ পাচার করার সুযোগ দেওয়া হলো? কেন বিদ্যুৎ সেক্টর সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পরেও বিশেষ অ্যাক্ট পরিহার করা হলো না? পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ক্ষমতা খর্ব করে ওদের ঠুনকো জগন্নাথ বানানো হয়েছে। সকার নিজেই ব্যবস্থা করে আবার নিজেই নিয়ন্ত্রক। 

সামনে জাতীয় নির্বাচন, বিশ্বজ্বালানি বাজার আবারও অস্থির হয়ে আসছে। আবারও তরল জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। অচিরেই বেড়ে যেতে পারে কয়লা, এলএনজি, পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের মূল্য। সরকারের অনেক অর্জন শুধু জ্বালানি বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে প্রশ্নবিদ্ধ এটি আর অস্বীকার করার উপায় নেই। আর এই ব্যর্থতার কারণে আগামী নির্বাচনে সরকারকে হয়তো কঠিন মূল্য দিতে হতে পারে।

শেয়ার করুন