২২ জুন ২০১২, শনিবার, ০২:৪৭:০২ অপরাহ্ন


কঠিন ইমেজ সঙ্কটে আওয়ামী লীগ
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৫-০৬-২০২৪
কঠিন ইমেজ সঙ্কটে আওয়ামী লীগ


কঠিন ইমেজ সঙ্কটে পড়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। একদিকে দলটির সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাদের কাছে ইমেজ সঙ্কটে পড়েছে। অন্যদিকে একিই সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায়া দেশে-বিদেশে আরো ইমেজ সঙ্কটে পড়েছে দলটি ও তার সরকার। এর পাশাপাশি নির্বাচন ছাড়াও দলের ভেতরে বাইরে দুর্নীতিবাজসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িতদের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ দৃশ্যমান না হওয়াতে নানান ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব কারণে দলের শুভানুধ্যায়ীরা মনে করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন ধরনের সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি উন্নয়নের যে সফল মডেল দেখাতে পেরেছিল তা-ও এখন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। 

৭ জানুয়ারির নির্বাচন ইমেজ সঙ্কটের শুরু

এমনিতেই এবারে পশ্চিমাদের কাছে মারাত্মক ইমেজ সঙ্কটে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু অংশগ্রহনমূলক নির্বাচনসহ গণতান্ত্রিক পরিবেশের ব্যাপারে পশ্চিমাদের কঠোর নজরে ক্ষমতাসীন মহল। এরপরে ৭ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে তাদের কঠোর মন্তব্য বা অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। বলেছে ৭ জানুয়ারির নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি বলে মন্তব্য দুই পশ্চিমা শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের। নির্বাচনের পরপর যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, নির্বাচনে সব দল অংশ না নেয়ায় আমরা হতাশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের এই নির্বাচন গণতান্ত্রিক হয়নি বলে মন্তব্য করেছে আরেক শক্তিধর দেশ যুক্তরাজ্য। ৭ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার একটি বিবৃতি দিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে। তাতে আরও বলা হয়েছে- বাংলাদেশের জনগণ, গণতন্ত্রের প্রতি তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্য করেছে যে, ৭ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ। বিরোধী হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার এবং নির্বাচনের দিন অনিয়মের খবরে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে বাংলাদেশের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি, গণতান্ত্রিক হয়নি বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাজ্য। প্রায় একিই দিনে যুক্তরাজ্যের দেয়া এই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গণতান্ত্রিক নির্বাচন নির্ভর করে গ্রহণযোগ্যতা, অবাধ ও সুষ্ঠু প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অপরিহার্য উপাদান। 

ইমেজ সঙ্কট উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আছে অস্বস্তিও

তিন দফা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ায় অস্বস্তি দেখা দিয়েছে আওয়ামী লীগে। ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী না দিয়ে উন্মুক্ত নির্বাচনসহ নানামুখী তৎপরতার পরও স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে ভোটের হার বাড়াতে পারেনি। এদিকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের চতুর্থ ধাপের ভোট গ্রহণ ৫ জুন বুধবার। ভোট নিয়ে প্রার্থী ও ভোটারদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার শেষ নেই। টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে নির্বাচনি এলাকায়। পুরো উপজেলা নির্বাচনেই এমন অবস্থা দেখা গেছে যা, ক্ষমতাসীন দলটির নীতিনির্ধারক নেতাদের কাছেও উদ্বেগ ও অস্বস্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে দলীয় প্রতীক ‘নৌকা’ না রাখলেও কাজ হয়নি। এবিষয়গুলো যে পশ্চিমারা নজরে রাখছেন তা-তে কারো সন্দেহ নেই। পাশাপাশি উপজেলা নির্বাচন যে সরকারের ইমেজে ধাক্কা দিয়েছে তা-ও বলা অপেক্ষা রাখে না। 

তাহলে মনোনয়ন কারা পেলো?

সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম (আনার) কলকাতায় খুন হয়েছেন বলা গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। এর পর প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে কিন্তু নানান ধরনের কাহিনী পত্রিকার পাতা জুড়ে আছে। এনিয়ে প্রকৃত সত্যটা আসলে কি কেউ জোর গলায় বলতে পারছে না? বলা হয়ে থাকে দেশের একজন সংসদ সদস্যের বিদেশের মাটিতে তা-ও আবার ভারতে খুন হওয়া এবং মরদেহ খুঁজে না পাওয়ার ঘটনা অবিশ্বাস্য হয়ে উঠছে প্রতিদিনের পত্রিকার পাতায়। কিন্তু সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন দেখা দিয়েছে খুনের ঘটনার শিকার এমন একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েই অনেক গণমাধ্যমসহ রাজনৈতিক দলের নেতারা মাতামাতি করছে। এমনকি এমন সংবাদও গণমাধ্যমে এসেছে গত ১০ বছরে ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আনোয়ারুল আজীম আনারের নগদ টাকা বেড়েছে ২২২ গুণ। গণমাধ্যমে খবর বেশি ফোকাশ করেছে এই সংসদ সদস্যের নির্মম খুনের চেয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সোনা চোরাচালান, হুন্ডি ব্যবসা, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগগুলি, যা ক্ষমতাসীনদের বড়ো বিব্রত করেছে। এই সংসদ সদস্য ওই আসনে টানা তিনবার এমপি হলেও তার নির্মনভাবে খুনের ঘটনার পরে সহানুভুতির চেয়ে আওয়ামী লীগ ও তার পরিবার মুখোমুখি হয়েছেন বিভিন্ন বির্তকিত বিষয়ে। একারণে তার পক্ষে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলগতভাবে বড়ো ধরনের কোনো অবস্থানই নেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে শোনা যায়। গণমাধ্যমেই খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, একারণে এই সংসদ সদস্যের খুনের সুষ্ঠু বিচার ও তদন্ত চেয়ে আওয়ামী লীগ কিংবা জাতীয় সংসদ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি দেয়নি। বরং পাল্টা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য দলে নানা প্রক্রিয়া হাকডাকের পরও বিতর্কিত ব্যক্তিরা কীভাবে মনোনয়ন পান। কারা এসব করেছেন? কেনো করেছেন? এসব প্রশ্ন এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে যাচাই বাছাই করে টানা তিনবারে নির্বাচিত এই প্রার্থীর ভারতে খুন হওয়া নিয়ে প্রশ্ন না উঠে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারল আজীম (আনার) স্বর্ণ চোরাচালানকারী ছিলেন বলে গণমাধ্যমে সংবাদ হয়েছে। আর এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে মুখ খুলতে হয়। তিনি বলেছেন, তিনি কী ছিলেন, সেটা বড় কথা নয়। তাঁর জনপ্রিয়তা দেখেই দল তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগের হাই কমান্ড ইমেজ সঙ্কটে বিব্রত। 

বেনজীর-আজিজ নিয়ে আরেক ধাক্কা

এদিকে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ ও সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ নিয়েও বেকায়দায় পড়েছে ক্ষমতাসীনরা। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে দুদক, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থাকে ফাঁকি দিয়ে কীভাবে এই আলোচিত ব্যক্তি বিদেশে চলে গেলেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ? নাকি তাঁদের বিদেশ চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং এখন চলছে লোক দেখানো অনুসন্ধান ও আইনি ব্যবস্থা। একটি গণমাধ্যমে খবরে ট্রাান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, বিদেশ চলে যাওয়া বোঝাপড়ার অংশ হিসেবে ঘটছে কি না, সে প্রশ্ন ওঠা যৌক্তিক। সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থার চোখ এড়িয়ে সপরিবার বিদেশ চলে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে আলোচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। গণমাধ্যমে ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, বেনজীরকে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাঁকে যাঁরা সহায়তা করেছেন, সুরক্ষা দিয়েছেন, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। সেই সামর্থ্য কি সরকারের আছে? 

শেষ কথা

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পদ্মা সেতু শুধু ইট, সিমেন্ট, লোহা, কংক্রিটের একটি অবকাঠামো নয়। এ সেতু আমাদের অহংকার, এ সেতু আমাদের গর্ব, আমাদের সক্ষমতা, আমাদের মর্যাদার শক্তি। এ সেতু বাংলাদেশের জনগণের। বাংলাদেশে অনেক বড়ো ধরনের উন্নয়নের ব্যাপারে তা দৃঢ়তা দেশে বিদেশে প্রশংশিত হয়েছে। এমনকি দেশি-বিদেশি সব বাধা উপেক্ষা করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র আমলে। তাছাড়া এপর্যন্ত যতো নির্বাচন হয়েছে তা নিয়ে দেশে বিদেশে এমনকি পশ্চিমাদের ক্ষোভ ধমক উপেক্ষা করেও তিনি তা নির্বিগ্নেই করতে পেরেছেন। কিন্তু বর্তমানে বেশ কিছু কারণে তার দলের ভেতরে বাইরে কর্মকান্ডে ইমেজ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা পার্টির শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ হতাশার সৃষ্টি করেছে-এমনটাই মনে করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আবাব এমন ইমেজের কারণে পশ্চিমারা কি প্রতিক্রিয়া দেখায় তা নিয়েও চিন্তা আছে দলটির ভেতরে বাইরে। কেননা দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ ও পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে ইতোমধ্যে প্রশ্ন করাও হয়ে গেছে। গত ২৫ বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে তাঁদের ব্যাপারে প্রশ্নের জবাব দেন মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার। এতে আমরা স্পষ্ট করে বলেছি, দুর্নীতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেয়, উন্নয়নকে বাধগ্রস্থ করে, সরকারকে অস্থিতিশীল করে ও গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। শুরু থেকেই দুর্নীতির বিরোধিতা যুক্তরাষ্ট্রের “মূল জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ’ হিসেবে পরিণত।’

শেয়ার করুন