১১ জানুয়ারী ২০২৬, রবিবার, ০৩:২৬:২২ পূর্বাহ্ন


রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং নির্বাচন
সালেক সুফী
  • আপডেট করা হয়েছে : ৩১-১২-২০২৫
রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং নির্বাচন ফাইল ছবি


বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মেরুকরণ শুরু হয়েছে। জুলাই আগস্ট ২০২৪ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর নানা নাম, নানারূপে আবির্ভূত রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। মূলধারার ডান, বাম, মধ্যপন্থী অসংখ্য নিবন্ধিত দল আছে বাংলাদেশে, আছে নির্বাচনকেন্দ্রিক জোট। ১৯৭২ থেকেই দেখা যায়, নির্বাচন এলেই মুখে খই ফোটানো তথাকথিত দেশপ্রেমিক নেতা-নেত্রীদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা। নিজেদের ঘোষিত আদর্শ বিসর্জন দিয়ে শক্তিশালী জোটে বিলীন হয়ে যাওয়া। জাতীয় পার্টি, জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টির মতো দলগুলো কতভাবে বিভক্ত হয়েছে। আবার সংযুক্ত হতে চেষ্টা করেছে। মূলধারার ইসলামিক পার্টিগুলোর বাইরেও কতগুলো ধর্মভিত্তিক দল আছে। মূলত ক্ষমতা লোভী স্বার্থান্বেষী মহল রাজনীতির কারণেই বাংলাদেশে ১৯৭১, ১৯৯০, ১৯৯৬, ২০০৬ পরিবর্তনগুলো ব্যর্থ হয়েছে। সম্ভবত ব্যর্থ হতে চলেছে ২০২৪। 

নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন করে অনেক নেতা সংযুক্ত হয়েছে ক্ষমতার নেশায় বিএনপিতে, কিংস পার্টিখ্যাত জাতীয় নাগরিক পার্টি জামায়াতে ইসলামী না বিএনপি কোন মেরুতে যাবে দোদুল্যমনা থেকে জামায়াতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হয়তো এ সিদ্ধান্তের কারণে সদ্য বিকাশমান দলটিতে ভাঙন দেখা দেবে। এবার কিন্তু নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলকে নিজেদের মার্কায় নির্বাচন করা বাধ্যতামূলক করায় জোটের মূল দলের মার্কায় ভোট করার সুযোগ নেই। 

মেনে নিচ্ছি রাজনীতির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হওয়া, তবে রাজনৈতিক আদর্শ বলে একটি কথা আছে। নিজেদের দুর্নীতিবিরোধী, বাংলাদেশপন্থী বলে জাহির করা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী শুধু ক্ষমতার নেশায় আদর্শ বিসর্জন দিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে নিজেদের বিলীন করে তখন বিস্মিত হতেই হয়।

জুলাই আগস্ট ২০২৪ ছাত্রদের নিরীহ গোছের আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের অতি আগ্রাসন আর সুযোগ সন্ধানীদের মেটিকুলাস ডিজাইনে। ছাত্র যুবকদের নেতৃত্বের মূল ধারা অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্টি করে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি। আন্দোলনের অনেক নেতাই একসময় ক্ষমতাশীল আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠনের নেতা ছিল। এনসিপি সমাজ পরিবর্তনের জন্য, নতুন ব্যবস্থাপনার চটকদার কথা বলে আমি জনতাকে আকর্ষণ করতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ অবস্থা থেকে পরিবর্তিত অবস্থানে এসে অনেকেই আদর্শ বিবর্জিত হয়ে বিত্ত বৈভবের অধিকারী হয়েছে। নির্বাচন ঘিরে এনসিপি দুটি মূলধারার দল বিএনপি এবং জামায়াত দুই জোটের একটিতে যাওয়ার জন্য দরকষাকষি করে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের দিকে হেলে পড়েছে। এমনিতেই জুলাই বিপ্লবের মূল শক্তি বহুদা বিভক্ত হয়ে পড়ায় তথাকথিত আদর্শ এবং লক্ষ্য থেকে অনেক আগেই বিচ্যুত হয়েছে। এখন জামায়াতের সঙ্গে কথিত জোট গঠনের সিদ্ধান্ত শিশু দল এনসিপির বিকাশ বাধাগ্রস্ত করবে কি না দেখতে হবে।

বাংলাদেশে রাজনীতি মূলত ক্ষমতা ঘিরে। ১৯৭২ থেকে ২০২৫ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি সরকার পরিচালনা করেছে। একমাত্র আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে থেকে মূলধারার রাজনীতি করেছে। বিএনপি, জাতীয় পার্টি সামরিক শাসনের সূত্র থেকে সৃষ্ট দল। আর আছে জামায়াতে ইসলামী। মূলধারার আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপির সঙ্গে নিজেদের কৌশল অনুযায়ী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থেকে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। এর বাইরে আছে কিছু তথাকথিত বাম দল, কিছু মৌলবাদী দল। কিছু দলের একমাত্র অবলম্বন ভারত বিরোধিতা এবং ধর্মান্ধ রাজনীতি। তবে রাজনীতির মাঠে নির্বাচন হবে স্বাধীনতার পক্ষের এবং স্বাধীনতাকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টিকারী দুই ধারার মধ্যে।

শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় পরিবর্তন না হলে এবারের নির্বাচনে থাকছে না অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। এই দলের ৩০ শতাংশের অধিক কট্টর সমর্থক ভোটের ফলাফল নির্ধারণে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করবে।

সাধারণ বিবেচনায় অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে। অন্যবারের তুলনায় জামায়াত কিন্তু এখন সুগঠিত শক্তিশালী। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আছে সমর্থক গোষ্ঠী। তবে আওয়ামী লীগের সমর্থন কোন দিকে যাবে, প্রতিবেশী দেশ, আঞ্চলিক এবং বৈশিক ভূরাজনীতি ভূমিকা পালন করবে।

 প্রবাসে দীর্ঘদিন কাটিয়ে দেশে ফিরেছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া। বিএনপি এখন উজ্জীবিত। সরকারের ওপর নানামুখী চাপ আছে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার। আবার হাদি হত্যার দ্রুত বিচার করার দাবিতেও সোচ্চার ইনকিলাব মঞ্চ। আগামীর দিনগুলো কিন্তু বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার করুন