বক্তব্য রাখছেন নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ
নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ ৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার ঘোষণা করেছেন, ২০২৫ সালে সিটিতে শুটিং-এর সংখ্যা রেকর্ড নিচে নেমেছে। পুরো শহরে ৬৮৮টি শুটিং-ঘটনা ঘটেছে, যা সিটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন এবং আগের রেকর্ড ২০১৮ সালের চেয়ে ৬৬টি কম। ডিসেম্বর মাসে শুটিং ৪৩ শতাংশ কমে মাত্র ৩৫টি ঘটেছে, যা কোনও মাসের জন্য সর্বনিম্ন রেকর্ড। নিউ ইয়র্ক সিটির নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে এই রেকর্ড হ্রাসের মূল কারিগর হলো প্রিসিশন পুলিশিং নীতি। টিশ জানিয়েছেন, সিটির সবচেয়ে সহিংস গ্যাংগুলোর লক্ষ্যবস্তু এবং জায়গায় হাজার হাজার অতিরিক্ত পুলিশ অফিসার মোতায়েন করে অপরাধ কমানো হয়েছে। কমিশনার টিশ বলেন, এই ঐতিহাসিক সাফল্য আকস্মিকভাবে নয়, এটি তথ্য-ভিত্তিক, পরিকল্পিত নীতির ফল। নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট বন্দুক অপসারণ, গ্যাং দমন এবং অপরাধ হ্রাসে নজিরবিহীন সাফল্য অর্জন করেছে। আমাদের শহর এখনও দেশের সবচেয়ে নিরাপদ বড় শহর। নিউ ইয়র্কবাসী এই ফলাফলে সন্তুষ্ট এবং শহরের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখতে সরকার, মেয়র ও পুলিশ তৎপর।
গভর্নর ক্যাথি হোচুলও এই অর্জনকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, আজকের এই সংখ্যা সত্যিই অসাধারণ। চার বছর আগে আমি যখন গভর্নর হয়েছি, তখন এমন কিছু কল্পনাও করা সম্ভব ছিল না। আমাদের পুলিশের জন্য ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই বিনিয়োগের ফলে সিটির নিরাপত্তা ও সাবওয়ে সিস্টেমকে আরও সুরক্ষিত করেছে। গভর্নর হচুল বলেন, আমরা নিউ ইয়র্কবাসীর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। এখন শহর বসবাস, কাজ ও ভ্রমণের জন্য আরও নিরাপদ।
নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র জোহরান মামদানি বলেন, গত বছর শহরের বন্দুক সহিংসতার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বছর ছিল। এটি পুলিশ কমিশনার টিশের নেতৃত্ব, নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট -এর উৎসর্গ এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক সংস্থার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল। তবে কাজ এখনও শেষ হয়নি। আমরা অপরাধ কমাতে এবং নিউ ইয়র্কবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ চালিয়ে যাব। মেয়র মামদানি আরো বলেন, পুলিশ কমিশনার টিশ, নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট-এর উৎসর্গ এবং কমিউনিটি সংস্থার সহযোগিতায় আমরা এই অর্জন করেছি। তবে কাজ এখনও শেষ হয়নি। আমরা অপরাধ কমাতে চলবো।
শুটিং এবং বন্দুকসহিংসতায় রেকর্ড-সর্বনিম্ন স্তর অর্জন
২০২৫ সালে নিউ ইয়র্ক সিটিতে ৬৮৮টি শুটিং ঘটেছে, যা ২০১৮ সালের ৭৫৪টি ঘটনার রেকর্ডকে ১০ শতাংশ কমিয়ে দিয়ে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২৪শতাংশ হ্রাস পাওয়া গেছে। চতুর্থ ত্রৈমাসিকে শুটিং ৩৬ শতাংশ কমে ১৩৪টি হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে শহরের সর্বনিম্ন ৩৫টি শুটিং ঘটনা ঘটেছে, যা নিউ ইয়র্ক সিটির কোনও মাসের রেকর্ডের চেয়ে কম। শুটিং-এর শিকারদের সংখ্যা ২০২৫ সালে ৫শতাংশ কমে ৮৫৬ জন হয়েছে, যা ২০১৮ সালের রেকর্ড ৮৯৭-এর চেয়ে কম। চতুর্থ ত্রৈমাসিকে শিকারদের সংখ্যা ৩৪শতাংশ কমেছে। শহরের সব পাঁচটি বরোতে শুটিং-এর সংখ্যা কমেছে, বিশেষ করে ব্রুকলিন, কুইন্স এবং স্টেটেন আইল্যান্ডে ইতিহাসে সর্বনিম্ন রেকর্ড হয়েছে। নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট-এর বন্দুক অপসারণ এবং গ্যাং ক্রাইম কমানোর কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। গত বছর পুলিশ ৫,২৯৩টি অবৈধ বন্দুক জব্দ করেছে এবং ৭০টি গ্যাং সম্পর্কিত অভিযান পরিচালনা করেছে।
মেজর ক্রাইম কমেছে সংহত হারে
শুটিং ছাড়াও নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট-এর প্রিসিশন পুলিশিং নীতি শহরের অপরাধের অন্যান্য ধরনেও হ্রাস এনেছে। ২০২৫ সালে প্রধান অপরাধে ৩% হ্রাস দেখা গেছে, মোট ১২১,৫৪২টি ঘটনা ঘটেছে, যা ২০২৪ সালের ১২৫,০২৬-এর তুলনায় কম।নিউ ইয়র্ক সিটির হত্যার হার ২০.২ শতাংশ কমে ৩০৫ হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে শহরে মাত্র ১৫টি হত্যা ঘটেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩৮% কম। চারটি বরোতে হত্যার হার কমেছে, স্টেটেন আইল্যান্ডে ৬০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং ডিসেম্বর মাসে কোনও হত্যা ঘটেনি। ডাকাতি ১০ শতাংশ কমে ১৫,০৬৫ হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ডাকাতি ১৫ শতাংশ কমেছে। চুরি এবং বাড়ি ভাঙার ঘটনা যথাক্রমে প্রায় ৪শতাংশ এবং ৫শতাংশ কমেছে। গাড়ি চুরি প্রায় ৫শতাংশ কমেছে। গ্র্যান্ড লারসনি প্রায় ২শতাংশ কমেছে।হেট ক্রাইম ১২শতাংশ কমেছে। এন্টিসেমিটিক ঘটনা ৩ শতাংশ কমেছে, তবে ২০২৫ সালের সমস্ত হেট ক্রাইমের ৫৭শতাংশ এন্টিসেমিটিক সংক্রান্ত।
ঘৃণাজনিত অপরাধ ও যৌন সহিংসতা
ধর্ষণের ঘটনা ১৬ শতাংশ বেড়েছে, যা মূলত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের আইন পরিবর্তনের কারণে, যেখানে ধর্ষণের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স-সংক্রান্ত ধর্ষণ ২৫শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শহরের মোট ধর্ষণের প্রায় অর্ধেক হিসাব করছে। নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট অক্টোবর ২০২৫ সালে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স ইউনিট চালু করেছে, যা জাতীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বড় ইউনিট এবং এতে ৪৫০ জন সম্পূর্ণ নিবেদিত তদন্তকারী আছেন। ফেলনি অ্যাসল্ট ০.৪শতাংশ বেড়েছে। এর কারণ মূলত সরকারি কর্মচারী এবং ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স সংক্রান্ত হামলা।
সাবওয়ে ও ট্রানজিট সিস্টেমে নিরাপত্তা
সাবওয়ে অপরাধ ১৬ বছরে সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে ।সাবওয়ে-তে নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ২০০৯ সালের পর সবচেয়ে নিরাপদ বছর উপহার দিয়েছে। ট্রানজিট ক্রাইম ৪ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালে পুলিশ ৭৭টি ফায়ারআর্ম উদ্ধার করেছে, যা শুটিং ও শিকার কমাতে সাহায্য করেছে। ট্রানজিট ডাকাতি ১২.৫ শতাংশ কমেছে। গ্র্যান্ড লারসনি-পিকপকেটিং প্রায় ৪৪ শতাংশ কমেছে। সাবওয়েতে অপরাধের ৭৩ শতাংশ ঘটে ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মে। তাই পুলিশদের সেখানে বিশেষভাবে মোতায়েন করা হয়েছে। গভর্নর হোচুল ৭৭ মিলিয়ন ডলার বাজেট প্রদান করেছেন সাবওয়ে নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য।
দোকান চুরি কমেছে
নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্ট -এর নতুন রিটেইল থেফট নীতি ২০২৫ সালে ১৪ শতাংশ হ্রাস এনেছে। শহরের সর্বত্র ৫২,৬৯৬টি রিটেইল চুরি ঘটেছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় কম। পুলিশ এখন প্যাটার্ন অনুযায়ী উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করছে।
এই সব কৌশল, বিনিয়োগ এবং পুলিশ মোতায়েনের মাধ্যমে নিউ ইয়র্ক সিটি ২০২৫ সালে দেশের সবচেয়ে নিরাপদ বড় শহর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বন্দুক সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড, ডাকাতি, ট্রানজিট অপরাধ-সব ক্ষেত্রে রেকর্ড হ্রাস হয়েছে। সারসংক্ষেপে বলা যায়, নিউ ইয়র্ক সিটি ২০২৫ সালে অপরাধ দমন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। শুটিং ও বন্দুকসহিংসতা, প্রধান অপরাধ, হাউজিং ডেভেলপমেন্ট এবং সাবওয়ে অপরাধে ইতিহাসে সর্বনিম্ন স্তর লক্ষ্য করা গেছে। পুলিশি পদক্ষেপ, লক্ষ্যভিত্তিক টেকসই কৌশল, সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সব মিলিয়ে সিটির নাগরিকদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও নীতি নিউ ইয়র্ককে দেশের সবচেয়ে নিরাপদ বড় শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা ভবিষ্যতেও শহরের বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অব্যাহত থাকবে।