জাপান সফরে লেখক
ভ্রমণে সময়টা খুবই মূল্যবান। তাই আমি যে দেশেই যাই দিনের ভ্রমণ শেষে অনেক সময় রাতাকেও কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। যদিও এতে শরীরের ওপর অনেক ধকল যায়। তারপরও ভ্রমণের আনন্দ তা মিটিয়ে দেয়। বিদেশ বিভুঁয়ের অচেনা পরিবেশে ভ্রমণে, বিশেষ করে নৈশভ্রমণে ট্যুর গাইডের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সব ট্যুর গাইড একরকম হয় না। দিনের ভ্রমণ শেষে অনেকেই প্রয়োজনীয় ফি দিলেও রাতের ভ্রমণের সঙ্গী হতে চায় না। তবে আমার জাপান ভ্রমণে যে ক’জন ট্যুর গাইড পেয়েছি তারা সবাই ছিল এক কথায় অনন্য। তবে সবার সেরা ছিল নিকিতা। বলা যায় পুরো জাপান ভ্রমণে সে আমাকে সঙ্গ দিয়েছে একজন প্রিয় বন্ধুর মতো। সেছিল জাপানে আমার অভিভাবক, একান্ত স্বজন। আমি যখনই যা দেখতে চেয়েছি দিনে বা রাতে হাসি মুখে সে তা পালন করেছে একজন অনূগত এবং বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো। আমার জাপান ভ্রমণ সমাপ্ত হয়েছে। টোকিওতে কয়েকটা দিন নিজের মত ঘুরবো বলে রেখে দিয়েছি। তবে অফিসিয়াল ভ্রমণ শেষ হলেও নিকিতা আমার ফ্রি সময়েও সঙ্গ দিচ্ছে আগের মতই।
সারাদিন কোথাও বেরোইনি। হোটেল রুমেই বিশ্রাম নিয়েছি। দুপুরে একবার নিকিতাকে ফোন করে জানিয়েছিলাম রাতের টোকিও ভ্রমণে সে আমাকে সঙ্গ দিতে পারবে কি না! সে এক কথায় রাজী হয়ে যায়। যদিও আমি তাই জানতাম। বললো, সন্ধ্যায় সে হোটেল লবিতে অপেক্ষা করবে। লবিতে আমার আগেই নিকিতা এসে অপেক্ষা করছিল। জাপানিদের সময় জ্ঞান এমনিতেই বেশি। আর নিকিতা যেন আরো এক ডিগ্রি ওপরে। সময়ের আগেই সে সব জায়গায় পৌঁছে যায়।
নিকিতাকে নিয়ে হাঁটছি। কথা বলছে নিকিতাই। আমি শুধু শুনছি।
নিকিতা বলে, সূর্য ডুবে গেলে এই শহর ঘুমায় না।
বরং ধীরে ধীরে নিজের আসল রূপটা খুলে দেয়-
নিয়ন আলোর ভেতর, অন্ধকার গলির নীরবতায়,
আর রাতজাগা মানুষের চোখে।
আমরা পৌঁছে গেলাম শিবুয়া স্টেশনের বাইরে।
নিকিতা খানিকটা ধমকের সুরে বললো-রাতের টোকিও বুঝতে হলে, তাড়াহুড়ো করা যাবে না কিন্তু! আমি বাধ্য ছাত্রের মত মাথা নেড়ে সায় দিলাম। নিকিতা গলা নামিয়ে আবার ফিসফিস করে বলে- ‘This city speaks in silence at night.’ (এই শহর রাতে নিঃশব্দে কথা বলে)। আমরা হাঁটতে হাঁটতে শিবুয়া ক্রসিংয়ে পৌঁছলাম। হাজারো মানুষ একসঙ্গে রাস্তা পার হচ্ছে। নিয়ন সাইনবোর্ড, বিশাল স্ক্রিন, আলোয় ভেসে থাকা মুখগুলো উঁকি দিচ্ছে সামনে। নিকিতা ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বলে, এটা শুধু রাস্তা পার হওয়া নয়-এটা টোকিওর হৃদস্পন্দন।
আমি লক্ষ করি-এই ভিড়ের মাঝেও কেউ কাউকে ধাক্কা দিচ্ছেনা। একটা ছন্দের তালে সবাই রাস্তা পারাপার হচ্ছে। কোন বিশৃঙ্খলা নেই। সবাই যেন একটা নিয়মের শৃঙ্খলে বাঁধা। লিফটে উঠে শিবুয়া স্কাইতে পৌঁছাই। শহরটা নিচে বিস্তৃত-নীরব, কিন্তু আলোয় ভরা। কাচের ফ্লোর, খোলা আকাশ, নিচে আলোয় ভরা টোকিও।
নিকিতা রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়ায়। বলে-উপরে উঠলে শহরটা ছোট আর মানুষের ভেতরটা বড় হয়। আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকি। এই উচ্চতায় শব্দ থাকে না। থাকে শুধু নিঃশ্বাস আর না বলা কিছু অনুতাকেতি।
শিবুয়া থেকে ট্রেনে চেপে পৌঁছাই শিনজুকু। একদিকে আকাশছোঁয়া ভবন, অন্যদিকে সরু গলি-ওমোইদে ইয়োকোচো। ধোঁয়া ওঠা ইয়াকিতোরি, ছোট বার, অচেনা মানুষের হাসি। আমরা একটা ছোট বারে বসি। কাঠের কাউন্টার, মৃদু আলো। নিকিতা আমার দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি হাসি দিয়ে বললো-রাতের টোকিওতে মানুষ নিজের কথা কম বলে, শুধু অন্যের কথা শুনে।
আমি কোন জবাব দিই না।
কয়েক ধাপ এগোলেই গোল্ডেন গাই। ছোট ছোট বার-দরজা খুললেই যেন অন্য এক পৃথিবী। একটা বারে ঢুকি। মাত্র ছয়জন বসার জায়গা। মৃদু আলো, দেওয়ালে পুরোনো পোস্টার। নিকিতা ফিসফিস করে বলে-এখানে মানুষ গল্প বলে না গল্প রেখে যায়। সে আমার দিকে তাকায়। আমার মনে হচ্ছিল এই দৃষ্টিটাই আজ সবচেয়ে বড় গল্প। এরপর আমরা গিয়ে দাঁড়াই টোকিও টাওয়ারের নিচে। উপরের আলোটা যেন আকাশ ছুঁতে চায়। আমি শহরের দিকে তাকিয়ে ভাবি-এই আলোয় কত গল্প, কত না বলা কথা ঘুমিয়ে আছে! রাত বাড়ে। রাস্তা ফাঁকা হয়। আমরা টোকিওর রাস্তায় পাশাপাশি হাঁটতে থাকি। নিকিতা আমার দিকে তাকায়। রাতটা যেন আরো নীরব হয়ে যায়। আমরা একটা ক্যাফেতে বসি। কাচের বাইরে শহরটা যেন ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। নিকিতা বলে-যারা টোকিওর রাত দেখেনি, তারা শহরটাকে অর্ধেকই দেখেছে। বললাম, আমি সত্যিই ভাগ্যবান। আর তা সম্ভব হয়েছে তোমার মতো একজন সঙ্গী পেয়েছিলাম বলে।
সে আমার কথার জবাব দেয় না। এবার ট্রেন নয়। একটা ট্যাক্সি ডেকে পৌঁছাই রপ্পোঙ্গি। এখানে রাতটা অন্যরকম। ক্লাবের দরজা খুললেই শব্দের ঢেউ এসে লাগে। বিদেশি আর জাপানি মানুষের মিশেল, গ্লাসে আলো ভাঙে। নিকিতা কানে কানে বলে-টোকিওর এক এক স্থানের রাত এক এক রকম। আর সব রাত এক রকমও হয় না। প্রত্যেক রাতের নিজস্ব একটা চরিত্র আছে। রপ্পোঙ্গির রাত শুধু নাচতে চায়। তুমি কি আজ রাতে আমার সঙ্গে নাচবে? আমি হাত জোড় করে তাকে থামালাম। সে মৃদু হেসে বললো, শুধু আজকের মতো ক্ষমা করে দিলাম।
আমরা রপ্পোঙ্গি হিলসের ওবজার্ভেশন ডেকে উঠলাম। উপর থেকে শহর যেন এক বিশাল নীল মেঝে, নিয়ন আলো তখনও হালকা ঝলমল করছে। কিন্তু মানুষের ভিড় নেই। আমরা বসে আছি লোহার রেলিংয়ের কাছে। শরীর ক্লান্ত, চোখ ভারী। সারারাতের হাঁটা, আলো, নাচ-সবকিছু এখন দুই চোখে মিশে আছে। নিকিতা হঠাৎ মৃদু স্বরে জাপানি ভাষায় গান গাইতে শুরু করে। তার গানের মধ্যে রাতের ক্লান্তি মিশে ছিল।
পূর্ব দিগন্তে সূর্য তখন ধীরে ধীরে উঁকি দিচ্ছিলো।
হালকা কমলা আলো ছড়িয়ে পড়ছিল শহরের বুকে। নীল-ধূসর আকাশে প্রথম রশ্মি যেন এই শহরের নিঃশব্দ রূপকে আরো কোমল করে তুলছিল। আমরা নেমে যাচ্ছি অবজারভেশন ডেক থেকে। শিবুয়া ক্রসিংয়ের কোলাহল, শিবুয়া স্কাইয়ের উচ্চতা, শিনজুকুর আলো, টোকিও টাওয়ারের নিচে নীরব দাঁড়িয়ে থাকা-সবকিছু পেছনে পড়ে রইলো। কিন্তু নিকিতার পাশে থাকা কিছু মুহূর্ত রয়ে গেল অমলিন।
আমরা নিচে নেমে এলাম।সকালের নরম আলো আর নির্মল বাতাস দুজনের চোখে-মুখে ভালোলাগার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন রাতের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে মুছে গেল। টোকিও তখন আর শুধু একটি শহর নয়, সে হয়ে উঠল একটি রাত আরেকটি ভোরের সাক্ষী।
টোকিও থেকে ইযু ওশিম
ভোরের টোকিও তখনো আলো-আঁধারের নরম আবেশে মোড়ানো। ব্যস্ত শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে জেগে উঠছে, আর আমি এগোচ্ছি Takeshiba Pier-এর দিকে। সমুদ্রের গন্ধ, লোনা হাওয়ার ফিসফিস, আর দূরে দাঁড়ানো ফেরিগুলো যেন ডাকছে অজানার পথে। জেট ফেরিতে পা রাখতেই মনে হলো-শহরকে পেছনে ফেলে চলেছি এক রূপকথার দ্বীপে। ঢেউয়ের ছন্দ, নীল আকাশের নরম আলো, আর দিগন্ত জুড়ে ছড়ানো সমুদ্রের বিস্তার-সব মিলে এক সঙ্গীতের মতো ভ্রমণ। প্রায় দুই ঘণ্টার যাত্রায়, টোকিও ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলো দিগন্তে, আর সামনে ভেসে উঠলো এক সবুজ দ্বীপ-ইযু ওশিমা। দ্বীপে নামতেই উষ্ণ আগ্নেয়গিরির মাটি আর সাগর-বাতাসের মিলিত গন্ধে মন ভরে গেলো। সোজা এগোলাম দ্বীপের প্রাণ-মাউন্ট মিহারার দিকে। এ এক আগ্নেয়গিরি যার বুক থেকে ইতিহাসের আগুন ঝরেছে বহুবার। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে উঠতে চারদিকে ছড়িয়ে থাকা কালো লাভা আর আগ্নেয়শিলার পথ যেন বলছিল-এখানেই প্রকৃতির রূপ, ধ্বংস আর সৃষ্টির মহামিলন।
চূড়ায় পৌঁছে দাঁড়ালাম, নিচে নীল সমুদ্রের অসীমতা, চারপাশে বাতাসের উন্মুক্ত খেলা। দূরে টোকিওর আকাশরেখা কুয়াশার মতো ঝাপসা। মুহূর্তে মনে হলো-আমি যেন পৃথিবীর কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি। দুপুরে নামলাম দ্বীপের উষ্ণ প্রস্রবণে। শরীর জুড়ে জলের উষ্ণতা আর মন জুড়ে প্রকৃতির শান্তি। এরপর সমুদ্রতীরে হেঁটে চললাম, কালো বালির সৈকতে ঢেউয়ের ধাক্কা শুনতে শুনতে। বিকেলে ফের জেট ফেরিতে চেপে টোকিওর পথে রওনা দিলাম। সূর্যাস্তের লাল আলো সমুদ্রের গায়ে ঝরে পড়ছে, ঢেউগুলো রঙিন হয়ে উঠছে, আর মনে হচ্ছিলো- আজকের এই ভ্রমণ কোনো এক স্বপ্নের মতো।
একদিনে এসেও মনে হলো যেন শত বছর থেকে গেলাম এই দ্বীপে। ইযু ওশিমা, তুমি এক জাদু, যে জাদু ভোলার নয়।
কিন্তাই কিও সেতু
হিরোশিমা স্টেশন প্রায় ভোর ৭টা। আমি নিকিতার সঙ্গে JR Sanyo Line-এর একটি ট্রেনে চড়ি। প্রায় ৪৫ মিনিটের ট্রেনপথ শেষে আমরা পৌঁছাই Iwakuni Station। স্টেশন থেকে বাসে করে মাত্র ২০ মিনিটে চোখের সামনে আসে KintaiKzo Bridge। পাঁচটি বাঁকানো আর্ক, কাঠের গঠন, নদীর স্বচ্ছ পানি- সবকিছুই এক সঙ্গে মিলিয়ে নিখুঁত শিল্পকর্ম। আমরা ধীরে ধীরে হাঁটি। নদীর ধারে ছোট ছোট পাথর, বাতাসে হালকা ঠান্ডা। আমি নিকিতার হাসি ধরে রাখার জন্য ক্যামেরায় একটা শট নিই।
দুপুরে স্থানীয় একটি খাবারের দেকানে ঢুকি। নদীর ধারে ছোট কাঠের দোকানগুলোতে ভিড় নেই। আমরা বসি একটি ছোট ইযাকায়াতে। নিকিতা অর্ডার দেয় উরামাকি সুশি, টেম্পুরা এবং স্থানীয় চা-সবই নতুন স্বাদ নিয়ে আসে। খাবারের পরে আমরা নদীর ধারে হাঁটি। নদী শান্ত, আকাশ নীলচে, পাহাড়ের গা থেকে হালকা বাতাস বইছে। নিকিতা হঠাৎ বলে: চলো, এই মুহূর্তটা ক্যামেরা বন্দি করে রাখি।
আমি ক্যামেরায় ক্লিক করি-নদী, ব্রিজ, আলো, আর নিকিতার হাত ধরে হাঁটা-সবকিছু এক ফ্রেমে। সূর্য ধীরে নদীর ওপর থেকে নেমে আসে। ব্রিজের কাঠের আর্ক সোনালি আলোয় ঝলমল করে। আমরা শেষবার নদীর ধারে তাকাই। নিকিতা বলে—এখানকার আলো আর পানি আমাদের স্মৃতি হয়ে থাকবে।
জাপানি শিশুদের ভ্রমণ ট্রিপ
সকালবেলার নরম আলো কিয়োটোর অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। হালকা কাঁচা রোদ আর পাখির কোলাহল-মুখে হাসি, হৃদয়ে উত্তেজনা নিয়ে আমি শহরের ব্যস্ত স্টেশনের দিকে হেঁটে চলেছি। চোখে পড়ল এক অদ্ভুত দৃশ্য-স্কুল ড্রেস পরা ছাত্রছাত্রীরা, গাইডের পেছনে দাঁড়িয়ে, নোটপ্যাড হাতে তথ্য সংগ্রহ করছে, ক্যামেরা হাতে শহরের সৌন্দর্য ধরে রাখছে। টোকিওর উঁচু স্কাইস্ক্র্যাপার আর কিয়োটোর শান্ত অলিগলি-প্রতিটি স্থান যেন তাদের জন্যই গড়ে তোলা। গাইডের কথায় জানা গেল, এরা স্কুল ট্রিপে এসেছে। জাপানের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষামূলক ট্রিপে অংশ নেয়। এই ভ্রমণ শুধু পর্যটন নয়, এটি শিক্ষার এক জীবন্ত পাঠ, যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং শহরের জীবনধারা একসঙ্গে শেখা হয়।
শহরের রঙিন আলো আর সমুদ্রের নরম বাতাসে মিলেমিশে প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে কাব্যিক। কিয়োটোর পুরোনো গলি ও বাগান, হিরোশিমার মেমোরিয়াল সাইট এবং টোকিওর মিউজিয়াম ও পার্ক-সব জায়গায় একই দৃশ্য: শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধ হয়ে হেঁটে যাচ্ছে, ছবি তুলছে, একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করছে। প্রতিটি হাসি, প্রতিটি নোট, প্রতিটি ছবি যেন শহরের সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে এক নতুন রোমান্টিক গল্প গড়ে তুলছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ-প্রায় সব খরচ শিক্ষার্থীদের বা তাদের পরিবারের দায়িত্বে। সরকারি সাহায্য সীমিত। তবুও প্রতিটি ধাপ, প্রতিটি কার্যক্রমে তাদের উচ্ছ্বাস, আনন্দ ও কৌতূহল যেন শহরের সৌন্দর্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। বিকেল বেলায় হিরোশিমার সমুদ্রতীর বা কিয়োটোর পাহাড়ি গলি-সবকিছু যেন রঙিন ক্যানভাসে ভেসে উঠে। সূর্যাস্তের রঙ, বাতাসের নরম স্পর্শ, শহরের লাইটের প্রতিফলন-এগুলো এক সঙ্গে মিলে দাঁড়িয়ে এই রোমান্টিক দৃশ্যকে চিরন্তন করে দেয়।
কিয়েটো থেকে কানাজাওয়া
সকালটা কিয়েটো স্টেশনের ভোরের আলোয় শুরু। নিকিতাকে সঙ্গে নিয়ে বুলেট ট্রেনে ওঠি কানাজাওয়ার উদ্দেশ্যে। জানালার বাইরে ছুটে চলে পাহাড়, ছোট ছোট গ্রাম আর সবুজ বন। মনে হচ্ছে, প্রতিটি দৃশ্য আমাদের জন্যই সাজানো। দূরত্ব যতই দীর্ঘ হোক, তোমার সঙ্গে থাকলে পথও সুন্দর হয়ে যায়। ফিসফিস করে নিকিতা। আমি হেসে তাকে দেখি, চোখে আলো, মুখে মৃদু হাসি।
দু’ঘণ্টার ট্রাভেলের পর আমরা কানাজাওয়া পৌঁছাই। শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে কিছুক্ষণ হেঁটে Kenrokuen Garden-এর প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে দেখি জাপানের ঐতিহ্যবাহী Three Great Gardens-এর এক অপূর্ব দৃশ্য। ঝরনা, পুকুর, কাঠের ব্রিজ, সাদা বেইজ পাথুরে পথ, ফুলে ছেয়ে যাওয়া বসন্তের দৃশ্য, হালকা কুয়াশা আর নীরব বাতাস। আমরা দুজন নদীর ধারে ধীরে হাঁটি। হালকা বাতাসে নিকিতার চুল উড়ে যায়। মুহূর্তটিকে আমি ক্যামেরায় বন্দি করে রাখি। Garden-এ হেঁটে হেঁটে আমরা ছোট চা ঘরে বসি। নিকিতা অর্ডার দেয় Jibuni (Kanazawa-এর স্থানীয় মুরগির স্টু), Kaga vegetables tempura Avi Matcha (সবুজ চা)। চোখে পড়ে Garden-এর এক কোণে ছোট নৌকা ও সেতু। আমরা সেখানে হেঁটে হেঁটে ছবি তুলি। নিকিতার হাসি, নীল জল, ও ঝরনার প্রতিফলন-সবকিছু যেন এক ফ্রেমে বন্দি হয়ে যায়। সূর্য ধীরে Kenrokuen-এর পাথুরে পথ ধরে ঢলে আসে। নদীর ধারে, ঝরনার পাশে আমরা দাঁড়িয়ে বিদায় নেই। নিকিতা ফিসফিস করে বলে-এখানকার আলো, জল সব আমাদের সঙ্গে থাকবে স্মৃতি হয়ে।
জাপানের দশ শহরের দশ স্বাদ
ভ্রমণে প্রতিটি শহরের রাস্তাঘাট, স্টেশন কিংবা মন্দির যেমন গল্প বলে, ঠিক তেমনি আমার জাপান ভ্রমণে হোটেলের সকালের খাবারও আমার জন্য হয়ে উঠেছিল আলাদা এক অভিজ্ঞতা। টেবিলে সাজানো প্রতিটি পদ যেন বলছিল-জাপানকে চেনার এক নতুন অধ্যায়। জাপানে আমার এ ১৩ দিনের সকালের টেবিল যেন এক টুকরো মানচিত্র-যেখানে প্রতিটি শহর তার আলাদা পরিচয় তুলে ধরেছে খাবারের মাধ্যমে। কোথাও ঐতিহ্য, কোথাও আধুনিকতা, কোথাও বা দুইয়ের মিশ্রণ। ভ্রমণের শেষে মনে হলো, জাপানের ইতিহাস যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি তার ব্রেকফাস্টও প্রতিদিন নতুন চমক। জাপানিরা বিশ্বাস করে, খাবার শুধু পেট ভরার উপকরণ নয়, বরং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক মাধ্যম। জাপানের খাবারের কেন্দ্রবিন্দু হলো ভাত (গোহান)। সকালের নাশতা থেকে রাতের খাবার পর্যন্ত ভাত অনিবার্য। এর সঙ্গে থাকে আচার, মিসো স্যুপ আর মাছ-যা একে ভারসাম্যপূর্ণ করে।
সুশি: ভিনেগার মেশানো ভাতের ওপর কাঁচা মাছ, সবজি বা ডিম। সাশিমি: একেবারে খাঁটি কাঁচা মাছ বা সামুদ্রিক খাবার, পাতলা কেটে পরিবেশন। এগুলো শুধু স্বাদ নয়, বরং দৃশ্যমান সৌন্দর্যেরও প্রতীক-খাবার পরিবেশনের মধ্যে থাকে শিল্প।
নুডল সংস্কৃতি-রামেন: গরম স্যুপে ডিম, মাংস, সবজি, নুডলসের এক দারুণ সংমিশ্রণ। সোবা: বাকউইট আটা দিয়ে তৈরি পাতলা নুডলস, যা ঠান্ডা বা গরম দুইভাবেই খাওয়া হয়। মাছ ও সামুদ্রিক খাবার-জাপান একটি দ্বীপরাষ্ট্র, তাই মাছ ও সামুদ্রিক খাবার এখানকার প্রধান প্রোটিনের উৎস। গ্রিলড মাছ, টেম্পুরা (তেলে ভাজা সামুদ্রিক খাবার ও সবজি) বিশেষ জনপ্রিয়।
ঋতুভিত্তিক খাবার-জাপানি রান্নায় ঋতু অনুযায়ী পরিবর্তন আনা হয়। বসন্তে চেরি ব্লসম কেক, গ্রীষ্মে ঠান্ডা নুডলস, শরতে মাশরুম, শীতে হটপট (নাবে)।
চা সংস্কৃতি-গ্রিন টি (ম্যাচা) জাপানি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু পানীয় নয়, এটি এক ধরনের ধ্যান ও সংস্কৃতির প্রতীক। একটি পূর্ণাঙ্গ আচার, যেখানে শান্তি ও সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে।
জাপানের হোটেলে ব্রেফফাস্ট: জাপানে ১৩ দিন ঘুরে বিভিন্ন শহরের হোটেলে থেকেছি, আর প্রতিদিনের সকাল শুরু হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ব্রেকফাস্ট দিয়ে। ভ্রমণের কোলাহলের মাঝে এই প্রাতরাশগুলো যেন প্রতিদিন আমাকে নতুন করে চমকে দিয়েছে। প্রতিটি সকাল আমার জন্য খুলে দিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের দরজা।
টোকিও: সকালবেলা টেবিলে সাজানো থাকতো ভাত, মিসো স্যুপ, গ্রিলড মাছ আর আচার। পাশেই ছিল ছোট্ট এক কাপ গ্রিন টি। দিনের শুরুতেই মনে হতো-জাপানি সংস্কৃতি স্বাদে ধরা দিলো।
ইয়োকোহামা-এখানে পেয়েছি পাশ্চাত্য ধাঁচের ব্রেকফাস্ট- টোস্ট, বাটার, ডিমভাজি আর কফি। মনে হতো শহরের আধুনিকতাও খাবারে মিশে আছে।
নাগোয়া-ব্রেকফাস্টের প্লেটে ছোট ছোট বক্সে সাজানো থাকতো ভাত, সামুদ্রিক শৈবাল, টোফু আর ডিম। খাবারের উপস্থাপনাটাই মনে হতো এক শিল্পকর্ম। কিয়েটো-হোটেলের ব্রেকফাস্টে পেতাম সিদ্ধ সবজি, উডন নুডলস আর এক পাত্র মাচা চা। যাকে কিয়েটোর ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠতো।
নারা-নারায় হোটেল ব্রেকফাস্টে থাকতো গ্রিলড সালমন, আচার, মিসো স্যুপ আর ভাত। মনে হতো প্রাচীন শহরের মতোই খাবারটিও শান্ত আর সাদামাটা। ওসাকা-ওখানে পেতাম ফিউশন স্বাদ-ডিমভাজি, সসেজ, সঙ্গে ছোট্ট এক বাটি ভাত আর মিসো স্যুপ। ওসাকা যেভাবে খাবারের শহর হিসেবে বিখ্যাত, সেখানে সেই বৈচিত্র্য মিলতো।
হিরোশিমা-সকালের টেবিলে সাজানো থাকতো তাজা সবজি সালাদ, ছোট এক টুকরো টোফু, আর গ্রিন টি। খাবারে থাকতো হালকা ও স্বাস্থ্যকর স্বাদ। ফুকুওকা-এখানে পেতাম একেবারে ভিন্ন আয়োজন- পাউরুটি, ক্রোসা, জ্যাম আর কফি। দক্ষিণের এই শহরটি যেন ইউরোপীয় ছোঁয়া দিতো। কানাজাওয়া-হোটেলের ব্রেকফাস্টে থাকতো কাঁকড়া দিয়ে রান্না করা ছোট্ট সাইড ডিশ, সঙ্গে ভাত ও মিসো স্যুপ। সমুদ্রের ঘ্রাণ যেন সকালেই অনুতাকেত হতো। জাপানের হোটেল ব্রেকফাস্ট কখনো ছিল ঐতিহ্যবাহী, কখনো পাশ্চাত্য, আবার কখনো দুইয়ের মিশ্রণ। তবে প্রতিটি খাবারেই ছিল যত্ন, ভারসাম্য আর সৌন্দর্যের ছাপ। মনে হতো জাপানে প্রাতরাশ শুধু দিনের শুরু নয়, বরং সংস্কৃতির স্বাদ নেওয়ার এক বিশেষ মুহূর্ত।
নেই ডাস্টবিন-তবু ঝকঝকে শহর জাপান
জাপানে প্রথমবার পা রাখলে যে বিষয়টি সবার নজর কাড়ে, তা হলো-রাস্তায় ডাস্টবিন নেই! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তবু কোথাও ময়লা দেখা যায় না। ফুটপাত, পার্ক, ট্রেনস্টেশন-সব যেন সদ্য পরিষ্কার করা। যেন কেউ অদৃশ্য হাতে সারাক্ষণ শহরটাকে ধুয়ে-মুছে রাখছে। আসলে রহস্যটা অন্য জায়গায়। জাপানিরা নিজেদের ময়লা নিজেরাই বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যায়। যেখানেই খাওয়া বা কিছু ব্যবহার করুক না কেন, তা ফেলার জন্য তারা নিজস্ব ব্যাগ রাখে। পরে আলাদা আলাদা করে-প্লাস্টিক, কাগজ, ক্যান, বোতল-সব নিখুঁতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জমা দেয়।
এই অভ্যাস জন্মেছে তাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি থেকে। ছোটবেলা থেকেই স্কুলে শেখানো হয়-নিজের জায়গা পরিষ্কার রাখো, তবেই সমাজ পরিষ্কার থাকবে। এমনকি স্কুল শেষে শিশুরা নিজেরা ক্লাসরুম পরিষ্কার করে, ঝাড়ু দেয়, ময়লা সংগ্রহ করে। এতে দায়িত্ববোধের শিক্ষা যেমন হয়, তেমনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে ওঠে। টোকিও বা কিয়োটোর মতো ব্যস্ত শহরেও মানুষ নিজের ময়লা ব্যাগে রাখে যতক্ষণ না সঠিক জায়গা পায়। কোথাও কফি পান করে শেষ হলে কাপটি ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়, এমনকি চুইংগাম বা টিস্যুও। এ কারণেই রাস্তায় ফেলে দেওয়া কোনো কাগজ বা বোতল দেখা প্রায় অসম্ভব। জাপানের পরিচ্ছন্নতা কেবল নান্দনিকতার জন্য নয়, এটি তাদের জাতিগত পরিচয়ের অংশ। শিন্তো ধর্মের একটি মৌলিক ধারণা হলো-পরিষ্কার মানেই পবিত্রতা। এই বিশ্বাসই তাদের জীবনযাপনে গভীরভাবে প্রোথিত। জাপানের শহরগুলো তাই শুধু আধুনিকই নয়, নান্দনিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধও। ডাস্টবিন নেই, কিন্তু আছে সচেতনতা, ও দায়িত্ববোধ।
টোকিও থেকে ওকিনাওয়া
ভোরের টোকিও তখনো পুরো জেগে ওঠেনি। হানেদা এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে আছি। পাশে গাইড নিকিতা। তার মুখে হালকা হাসি, চোখে ভ্রমণের চেনা উচ্ছ্বাস। আমরা যাচ্ছি জাপানের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের একটি দ্বীপ ওকিনাওয়া। বিমান আকাশে উঠতেই নিচে ছড়িয়ে পড়লো নীল সমুদ্র আর ছিটেফোঁটা দ্বীপ-মনে হচ্ছিল কেউ নীল ক্যানভাসে সবুজ তুলির আঁচড় কেটে দিয়েছে। মাত্র তিন ঘণ্টার ফ্লাইট, কিন্তু এই তিন ঘণ্টাই যেন আমাদের নিয়ে আসলো জাপানের একেবারে ভিন্ন জগতে, দক্ষিণের রূপসী দ্বীপ ওকিনাওয়ায়। ওকিনাওয়ায় নামতেই শরীর টের পেল আবহাওয়ার বদল-টোকিওর শীতলতা নেই, আছে উষ্ণ সামুদ্রিক বাতাস।
আমাদের প্রথম গন্তব্য শুরি ক্যাসল।
লালচে ছাদ, পাথরের প্রাচীর আর রাজকীয় নীরবতা-র্যাকু রাজবংশের ইতিহাস যেন এখনো দেওয়ালে দেওয়ালে আটকে আছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে শহরের দিকে তাকিয়ে নিকিতা ফিসফিস করে বললো-এতো শতাব্দীর ইতিহাসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তুমি কেমন অনুভব করছো?
আমি বললাম, মনে হচ্ছে ইতিহাস আজ আমাদের দুজনকে দেখছে।
ও হাসলো।
দুপুরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই কোকুসাই ডোরি। রঙিন দোকান, হাসিখুশি মানুষ, খাবারের গন্ধে ভরা রাস্তা। সব মিলিয়ে এক জীবন্ত ওকিনাওয়া। ওকিনাওয়া সোবা আর গোইয়া চাম্পু খেতে খেতে নিকিতা হেসে বলে, এই তেতো স্বাদটাই নাকি এখানকার বিশেষত্ব।
আমি উত্তর দিই, সব বিশেষ জিনিসই তো একটু আলাদা হয়। সে চোখ তুলে আমার দিকে তাকায়, কিন্তু কথা বলেনা।
বিকালে আমরা সমুদ্রের তীরে বসি। সামনে নীল জল, ঢেউয়ের শব্দ আর ডুবে যাওয়া সূর্য। বাতাসে লবনের গন্ধ, দূরে পাখির ডাক। নিকিতার হাতটা আমার হাত ছুঁয়ে থাকে।
আমরা কেউ হাতটা সরাই না।
কিছু স্পর্শের কোনো নাম লাগে না।
একটু পর নিকিতা হালকা গলায় বলে,
ভ্রমণ যদি একটা অনুতাকেতি হয়, তবে এই মুহূর্তটাই তার সংজ্ঞা। আমি শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাই। কিছু অনুতাকেতির কোনো ভাষা হয় না।
কিছুক্ষণ পর আবার সে বলে,
ভ্রমণগুলো সুন্দর হয় জায়গার জন্য নয়, সঙ্গীর জন্য।
আমি বললাম-ঠিক তাই। তুমি আমার সঙ্গে ছিলে বলেই আমার জাপান ভ্রমণটা এমন রঙিন হয়েছে। নিকিতা কোনো উত্তর দেয় না।
রাতটা কাটে নাহার এক ছোট হোটেলে-খোলা বারান্দা, দূরে ঢেউয়ের শব্দ।
নিকিতা চেয়ারে বসে আকাশ দেখে। আমি তার পাশে দাঁড়াই। সে ধীরে বলে,
আমাদের ট্যুর গাইডদের জীবনটা কত বৈচিত্র্যময় তাই না?
ভ্রমণ শেষ হলে মানুষগুলো চলে য়ায় কিন্তু কিছু মানুষকে কখনো ভোলা যায় না।
আমি উত্তর দিই না। কিছু প্রশ্ন উত্তর চায় না।
সকালে রওনা হই চুরামি অ্যাকোয়ারিয়ামের দিকে। বিশাল ট্যাংকে হোয়েল শার্ক সাঁতার কাটছে, মনে হয় সমুদ্র নিজেই দেওয়ালের ভেতর ঢুকে পড়েছে।
নিকিতা ধীরে বলে, মানুষের জীবনও কি এমন না? বিশাল- কিন্তু স্বচ্ছ কাচে ঘেরা!
আমি তাকিয়ে থাকি-মাছের দিকে না, তার মুখের দিকে। ফেরার পথে এক ছোট ক্যাফেতে বসে কফি খাই। জানালার বাইরে পাম গাছ দুলছে।
আমি বলি,
সময়টা কত দ্রুত পেরিয়ে গেল।
নিকিতা মুচকি হেসে উত্তর দেয়,
ভালো জায়গা আর ভালো সঙ্গ দুটোর সময়ই কম মনে হয়।
সন্ধ্যায় আবার বিমান। নিচে নীল সমুদ্র ছোট হয়ে আসে। নিকিতা জানালার দিকে তাকিয়ে বলে, ওকিনাওয়া আমরা রেখে যাচ্ছি, কিন্তু পুরোটা না।
আমি বলি, হ্যাঁ, কিছু অংশ তো আমাদের সঙ্গেই ফিরছে।
টোকিওর আলো কাছে আসে। ভ্রমণ শেষ হয়, কিন্তু দক্ষিণের এই দ্বীপ আমাদের ভেতরে রেখে যায় নীল সমুদ্র, আর ইতিহাসের গন্ধ।
ওমোইদে ইয়োকোচো
টোকিও প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। পুরনো ভবন ভেঙে উঠছে নতুন আকাশচুম্বী দালান, প্রযুক্তি আর গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শহর এগোচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে। এই পরিবর্তনের ভেতরেও শিনজুকু স্টেশনের পশ্চিম প্রান্তে টিকে আছে একটি সরু গলি- Omoide Yokocho, যা যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই সময়ের স্রোতকে অস্বীকার করে দাঁড়িয়ে আছে। আমি আর নিকিতা যাচ্ছি এমোইদে ইয়াকোচু ঘুরতে। শিনজুকু স্টেশনের পশ্চিম গেট পেরোতেই টোকিও যেন হঠাৎ থমকে যায়। কংক্রিটের উঁচু ভবন, নিয়ন আলো আর ব্যস্ত মানুষের ভিড় ছাপিয়ে একটি সরু গলি ডেকে নেয়- moide Yokocho, বাংলায় বললে স্মৃতির গলি।
নিকিতা হালকা হাসি দিয়ে বলে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর খাদ্যসংকট আর বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল সামাল দিতে শিনজুকু এলাকায় গড়ে ওঠে অস্থায়ী খাবারের দোকান। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে ওমোইদে ইয়োকোচোর জন্ম। এই গলি একসময় শ্রমজীবী মানুষের সস্তা খাবার আর সন্ধ্যার আশ্রয়স্থল ছিল। আমরা হাঁটছিলাম। লাল কাগজের লণ্ঠন ঝুলছে মাথার ওপর। সরু পথের দুই পাশে সারি সারি ছোট ছোট ইযাকায়া-দরজাগুলো আধখোলা, ভেতর থেকে ভেসে আসছে হাসির শব্দ, চপস্টিকের ঠুকঠাক, আর গ্রিল করা মাংসের গন্ধ।
নিকিতা বলে-এখানে মানুষ একা আসে না। মানুষ এখানে গল্প খেতে আসে।
ওমোইদে ইয়োকোচোর প্রাণ হলো তার খাবার। এগুলো হচ্ছে, ইয়াকিতোরি-কয়লার আগুনে ধীরে ধীরে গ্রিল করা মুরগির স্কিউয়ার। লবণ আর সসের হালকা মিশ্রণে এক কামড়েই জিভে লেগে থাকে ধোঁয়ার স্বাদ। মোৎসুয়াকি- গরুর নাড়িভুঁড়ির ঝাল-মিষ্টি গ্রিল, সাহসী স্বাদের প্রেমিকদের জন্য।
রামেন ও সোবা-রাত বাড়লে শরীরকে উষ্ণ করে তোলে।
আর সঙ্গে অবশ্যই এক গ্লাস সাকে কিংবা হাইবল।
আমি বলি,
খাবারগুলো ছোট, কিন্তু তৃপ্তি বড়।
নিকিতা হেসে জবাব দেয়, ঠিক আমাদের দিনের মতো- সময় কম, স্মৃতি বেশি। নিকিতা বলে, এখানে আলাদা করে কোনো মিউজিয়াম নেই, কোনো টাওয়ার নেই, কোনো টিকিট কাউন্টারও নেই। তবু ওমোইদে ইয়োকোচো দর্শনীয়। কারণ এখানে দেখা যায় মানুষ। কাজ শেষে ক্লান্ত স্যালারিম্যান, বিদেশি পর্যটকের কৌতূহলী চোখ, এক কোণে বসে থাকা বৃদ্ধ দম্পতি- যাদের হাতে হাত, চোখে বহু বছরের অভ্যাস।
দিনের আলো ফুরোতেই গলির আলো বদলে যায়। লণ্ঠনের আলো আরও উষ্ণ হয়, শব্দ আরও কাছের লাগে। রাত যত গভীর হয়, গল্পগুলো তত ব্যক্তিগত হয়ে ওঠে।
আমি বলি, টোকিওর এত আলো, এত শব্দের মাঝেও এখানে এসে মনে হয় আমরা আলাদা একটা শহরে। নিকিতা বলে, ওমোইদে ইয়োকোচো আজ নিঃসন্দেহে টোকিওর একটি জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ। তবে এটি সেই ধরনের জায়গা নয়, যেখানে ছবি তুলে চলে যেতে হয়। এখানে বসতে হয়, খেতে হয়, শুনতে হয়।