শিশুদের টিকাদান
যুক্তরাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য নীতিতে এক নজিরবিহীন ও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির স্বাস্থ্য ও মানবসেবা মন্ত্রী রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়রের নেতৃত্বে সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি ) শিশুদের জন্য সুপারিশকৃত টিকার তালিকা থেকে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ টিকা বাদ দিয়েছে। ৫ জানুয়ারী,সোমবার ঘোষিত এই সিদ্ধান্তের ফলে আগে যেখানে ১৭টি রোগের বিরুদ্ধে শিশুদের টিকা নেওয়ার সুপারিশ ছিল, সেখানে এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১টিতে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয় বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের টিকানীতি ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
ফেডারেল স্বাস্থ্য দফতরের প্রকাশিত ডকুমেন্টস অনুযায়ী, যেসব টিকা এখন আর সাধারণ শিশুদের জন্য নিয়মিতভাবে সুপারিশ করা হচ্ছে না, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে রোটাভাইরাস, হেপাটাইটিস এ, হেপাটাইটিস বি, ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফ্লু) এবং মেনিনজাইটিস। পাশাপাশি এইচপিবি টিকার ক্ষেত্রে দুই ডোজের পরিবর্তে এক ডোজের সুপারিশ করা হয়েছে। এসব টিকা বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে শিশু মৃত্যুহার ও গুরুতর সংক্রমণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছিল। ফলে তালিকা থেকে এগুলো বাদ পড়া চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সিডিসি বলছে, কিছু টিকা এখন থেকে শুধুমাত্র উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য প্রযোজ্য হবে। এর মধ্যে রয়েছে আরএসভি এবং উভয় ধরনের হেপাটাইটিস টিকা রয়েছে । কিন্তু সমালোচকদের মতে, উচ্চ ঝুঁকি নির্ধারণের এই নতুন সংজ্ঞা অস্পষ্ট এবং বাস্তবে অনেক শিশুই প্রতিরোধমূলক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবার, অভিবাসী সম্প্রদায় এবং স্বাস্থ্যসেবা সীমিত এমন এলাকায় এর প্রভাব আরো তীব্র হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল সরকার সরাসরি কোনো টিকা বাধ্যতামূলক না করলেও অধিকাংশ স্টেট স্কুলে ভর্তি ও শিশুস্বাস্থ্য নীতিতে সিডিসির সুপারিশ তালিকাকেই মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে এই পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের আইন ও নীতিতে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, অনেক রাজ্য নতুন তালিকাকে অনুসরণ করলে ভবিষ্যতে শিশুদের মধ্যে টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় সমালোচনা এসেছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংক্রামক রোগ গবেষকদের কাছ থেকে। ভ্যাকসিন ইন্টেগ্রিটি প্রজেক্টের পরিচালক মাইকেল অস্টারহোম সতর্ক করে বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা, হেপাটাইটিস ও রোটাভাইরাসের মতো রোগ প্রতিরোধকারী টিকার সুপারিশ বাতিল করলে শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি এবং প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে। তার মতে, ঝুঁকি–সুফল বিশ্লেষণ ও জনপর্যালোচনা ছাড়াই এইচপিভি টিকার ডোজ কমানো বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার প্রতি অবজ্ঞা।
এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। রবার্ট এফ. কেনেডি জুনিয়র দীর্ঘদিন ধরেই টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোনয়নে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সিডিসির টিকা সূচি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেন। গত মাসে ট্রাম্প সরাসরি এই পর্যালোচনার নির্দেশ দেন, যার ফল হিসেবে সোমবারের ঘোষণা আসে। সমালোচকদের মতে, এটি বিজ্ঞানের চেয়ে রাজনৈতিক আদর্শকে প্রাধান্য দেওয়ার একটি উদাহরণ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো,এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে টিকাপ্রতিরোধযোগ্য রোগের পুনরুত্থানের মুখে। কেনেডির দায়িত্বকালে দেশটি গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব দেখেছে। একই সঙ্গে টিটেনাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।যে দুটি রোগই শৈশবের টিকার মাধ্যমে প্রায় সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব ছিল।
যদিও সিডিসি জানিয়েছে, সুপারিশ পরিবর্তন হলেও অন্তত ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিমা কোম্পানিগুলো সব টিকার খরচ বহন করবে বলে আশা করা হচ্ছে, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এটি অস্থায়ী স্বস্তি মাত্র। দীর্ঘমেয়াদে টিকা সুপারিশ কমে গেলে অভিভাবকদের আগ্রহ ও সচেতনতা কমবে, যা সামগ্রিক টিকাদান ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলবে।
সব মিলিয়ে, সিডিসির টিকা সুপারিশ তালিকা থেকে ছয়টি টিকা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এটি শিশুস্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যৎ মহামারি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে অঙ্গরাজ্যগুলোর সিদ্ধান্ত, চিকিৎসক সমাজের অবস্থান এবং জনসাধারণের প্রতিক্রিয়ার ওপর। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বড় অংশের মতে, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরো বেশি প্রতিরোধযোগ্য রোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে।