আইস আটক কেন্দ্র
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিকে কেন্দ্র করে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর দ্রুত সম্প্রসারিত ও ক্রমশ জবাবদিহিহীন আটক ব্যবস্থা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের সময় যেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ আইস হেফাজতে থাকতেন, সেখানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৭৩ হাজারে। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যেই আইস-এর আটককৃত মানুষের সংখ্যা ৭৫ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মধ্য জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত নতুন এক রিপোর্টে এই নজিরবিহীন বৃদ্ধির বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ইতিহাসে এক গভীর সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আইস আটক ব্যবস্থার এই বিস্তার মূলত সম্ভব হয়েছে তথাকথিত ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট-এর মাধ্যমে বরাদ্দকৃত প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বিপুল অর্থায়নের কারণে। এই আইনের আওতায় আইসিইকে অভিবাসী আটক ব্যবস্থার জন্য অভূতপূর্ব অর্থ ও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে সংস্থাটি আরো বেশি মানুষকে গ্রেফতার ও দীর্ঘমেয়াদে আটক রাখতে সক্ষম হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই সম্প্রসারণ শুধু অবকাঠামোগত নয়, বরং এটি একটি আরো কঠোর, আরো নির্দয় এবং আরো অস্বচ্ছ ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ নাগাদ আইস অভিবাসী আটক ব্যবস্থার জন্য আগের বছরের তুলনায় ১০৪টি অতিরিক্ত স্থাপনা ব্যবহার করছে, যা প্রায় ৯১ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে পুনরায় চালু করা বেসরকারি কারাগার, সম্প্রসারিত আটক কেন্দ্র এবং একেবারে নতুন ধরনের অস্থায়ী ডিটেনশন ক্যাম্প। প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ২০২৯ অর্থবছর পর্যন্ত আইসিইর কাছে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার আটক শয্যা পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ থাকবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কারা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনীয় হয়ে উঠতে পারে।
এই সময়ে আইসের গ্রেফতার কৌশলেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে লক্ষ্যবস্তু ছিল মূলত গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত বা অভিযুক্ত অভিবাসীরা, এখন সেখানে অ্যাট-লার্জ গ্রেফতারের সংখ্যা ৬০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর অর্থ, আইসিই এখন সরাসরি সাধারণ মার্কিন কমিউনিটিতে অভিযান চালিয়ে অভিবাসীদের গ্রেফতার করছে। খামার, নির্মাণস্থল, কারখানা ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চালানো হচ্ছে হঠাৎ হানা বা ওয়ার্কসাইট রেইড। এমনকি আইসিই চেক-ইন বা অভিবাসন আদালতে হাজিরার সময়ও মানুষকে পুনরায় গ্রেফতারের নতুন নীতি কার্যকর করা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই,এমন মানুষের সংখ্যা হঠাৎ করে বিপুল হারে বেড়ে যাওয়া। রিপোর্টে বলা হয়েছে, আইস আটক কেন্দ্রে প্রতিদিন যে মানুষগুলো রাখা হচ্ছে, তাদের মধ্যে অপরাধমূলক রেকর্ডবিহীন ব্যক্তির সংখ্যা ২,৪৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির একটি মৌলিক পরিবর্তন, যেখানে এখন শাস্তির লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছেন সাধারণ, কর্মজীবী ও পরিবারকেন্দ্রিক অভিবাসীরা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জারি করা নির্বাহী আদেশ, যেখানে সর্বোচ্চ মাত্রায় আটক ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কার্যত একটি নো-রিলিজ বা মুক্তির সুযোগহীন ব্যবস্থা তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে আইস-এর বিবেচনাধীন মুক্তি বা ডিসক্রেশনারি রিলিজ ৮৭ শতাংশ কমে যায়। একসময় যারা জামিনে মুক্তি পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, তারাও এখন দীর্ঘ সময় বা অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক থাকছেন। অভিবাসন বিচারকদের হাজার হাজার মামলায় জামিন প্রত্যাখ্যানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং মানবিক কারণে মুক্তির ক্ষমতা কেবল উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের হাতে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
এই কঠোর ব্যবস্থার ফলে অনেক অভিবাসী আদালতে নিজেদের অধিকার আদায়ের আশা হারিয়ে ফেলছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রতি একজন মানুষ যিনি শুনানির অপেক্ষায় মুক্তি পেয়েছেন, তার বিপরীতে ১৪.৩ জনকে সরাসরি আটক কেন্দ্র থেকেই বহিষ্কার করা হয়েছে। আইনি লড়াই দীর্ঘ, আটক অবস্থার পরিবেশ ভয়াবহ এবং মুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ। এই বাস্তবতায় অনেকেই বাধ্য হয়ে নিজেদের মামলা তুলে নিচ্ছেন।
এদিকে দ্রুত সম্প্রসারিত এই আটক ব্যবস্থার অবকাঠামোগত চাপ পড়ছে আটককৃতদের জীবনে। পর্যাপ্ত শয্যা না থাকায় ২০২৫ সালে বহু কেন্দ্রে মারাত্মক অতিরিক্ত ভিড় দেখা যায়। চিকিৎসাসেবার মান নেমে যায়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি বাড়ে এবং নির্যাতন ও অবমাননাকর আচরণের অভিযোগ বাড়তে থাকে। আইসিইর নিজস্ব মানদণ্ড লঙ্ঘনের অসংখ্য ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তদারকি ও নজরদারি ব্যবস্থার ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়া। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় ধরনের তদারকি কমে যাওয়ায় আটক কেন্দ্রগুলোর ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে গ্রেফতারের পর কয়েক দিন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ আইসিইর ডিটেইনি লোকেটর সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে না এবং ফোন ব্যবহারের সুযোগ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল ছিল আইস-এর আটক ব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। আটক অবস্থায় মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড ছুঁয়েছে এবং ২০২৬ সাল পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত না করে এই হারে আটক ব্যবস্থা বাড়ানো মানে আরো প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করা।