২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, শুক্রবার, ১১:৫৭:০২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন স্টারমার দৈনিক সময়ের আলো‘র উপদেষ্টা সম্পাদক হয়েছেন শায়রুল কবির খান নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যানজটে সিগন্যাল মেনেই গাড়ীতে অফিস করছেন প্রধন মন্ত্রী তারেক রহমান সন্তানের ভরণপোষণ বকেয়া থাকলে পাসপোর্ট বাতিলের উদ্যোগ জোরদার দ্রুত গণনির্বাসনে নতুন বিধি জারি নিউইয়র্ক সিটির আর্থিক সংকট মোকাবিলায় দেড় বিলিয়ন ডলার সহায়তা ঘোষণা ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন মানুষের স্বাস্থ্যবীমা ঝুঁকির মুখে কোভিড তহবিল প্রতারণা : ৮ বাংলাদেশিসহ ৯ জনের দোষ স্বীকার রমজান শান্তির এক মহৎ দর্শনের প্রতীক


বাংলাদেশের ভোটে এখনো বিদেশী প্রভূদের অনুকম্পা
মাসউদুর রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৮-০১-২০২৬
বাংলাদেশের ভোটে এখনো বিদেশী প্রভূদের অনুকম্পা প্রতীকী ছবি


দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা। এটা জুলাই আন্দোলনের শক্তিশালী এক স্লোগান। বাংলাদেশকে প্রভুদেশের অনধিকার প্রভাব মুক্ত করতে ওই স্লোগান। বাংলাদেশ যাতে তার নিজস্ব সত্তার উপর দাঁড়াতে পারে। অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে বিদেশীদের প্রভাবমুক্ত থাকতে পারে, সেটাও ছিল জুলাই আন্দোলনের অন্যতম এক স্লোগান। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর কথিত উৎসবমুখর যে ভোট হতে যাচ্ছে তার আগে ভোটের মাঠে এখনও টেনে আনা হচ্ছে ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রের মত প্রভাবশালী দেশের রেফারেন্স। ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে ভোটারদের, আমাদের উপর অমুক দেশের আর্শিবাদ রয়েছে। অমুক দেশ চায় বাংলাদেশের ক্ষমতায় অমুক দল আসুক। পূর্বে আওয়ামী লীগ ইস্যুতে সবকিছুতেই ভারতের দাপট দেখিয়েছে। ভারতও নির্লজ্জ সাপোর্ট দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে বছরের পর বছর। আওয়ামী লীগ নেই কিন্তু ওই ধারা এখনও বিদ্যমান। ঐ ধরনের ছায়া আর্শিবাদ হিসেবে পেতে চায় কেউ কেউ। কেউ চায় পাকিস্তানের, কেউ ভারত বা কেউ যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশের। 

গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রাণান্ত চেষ্টা সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। ফলে এর মাধ্যমে কোন দল ক্ষমতায় বসবে সেটা নিশ্চিত নয়। কিন্তু বিভিন্ন প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতির মধ্যে চেষ্টা চালানো হচ্ছে সেই পুরানো ধারা। এক দল অন্যদলকে দিচ্ছে পাকিস্তানপন্থী হওয়ার তকমা। অন্য দল আরেক দলকে দিচ্ছে ভারত ঘেষা। কেউ জানান দেয়ার চেষ্টা করছে তাদের উপর আর্শিবাদ রয়েছে মার্কিনীদেরও। 

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ যখন নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ইচ্ছেমত ভোট প্রদান করে বেছে নেয়ার প্রত্যাশা করছে, ঠিক তখন এমন এক খবরে মানুষের মাঝে হতাশা তৈরী হয়েছে। দীর্ঘদিন ভারতের প্রভাব ছিল বাংলাদেশের নির্বাচনে। কিন্তু আবারও বিদেশীদের প্রভাব? এটা মানতে পারছেন না কেউ। জাতীয় নির্বাচনের বাকী আর দুই সপ্তাহেরও কম। এমনি মুুহূর্তে বিগত কদিনের বিভিন্ন বিতর্কমূলক কথার পাশাপাশি এবার বিশ্বের কয়েকটি প্রভাবশালী পত্রিকার বয়ান বুঝে না বুঝে আরেকটু ঘোলাটে পরিবেশ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। 

ছড়ানো হচ্ছে, বাংলাদেশে আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে জামায়াত ইসলামীকেই রাষ্ট্রক্ষমতায় চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর যুক্তিতে বিএনপিকে ভারত ঘেষা হিসেবে উল্লেখ করে, যেহেতু ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নাজুক পর্যায়ে, সেটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে একটি মহল। কেউ বলছে জামায়াত স্বাধীনতা বিরোধী, পাকিস্তানপন্থী দল। ফলে ’৭১ এর মত ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতিহত করতে হবে। 

জামায়াতের নায়েবে আমির ভারতের এক পত্রিকার রিপোর্টকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘ভারতের একটি পত্রিকা আনন্দ বাজারে একটি খবর বেড়িয়েছে, সেখানে তারা বলছে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রধানের সঙ্গে ভারতের তিনটি চুক্তি হয়েছে। তা হলো এক. ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। দুই. বাংলাদেশের আত্মরক্ষার্থে যে অস্র কিনতে হবে তা ভারতের অনুমোদন নিয়ে করতে হবে। তার বাইরে অস্র কেনা যাবে না। তিন. এ দেশের ইসলামপন্থী দলকে প্রতিহত করতে হবে। এ খবরের প্রতিবাদ কিন্তু সেই দলটি (বিএনপি) করেনি। 

জামায়াত নেতার এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে বিএনপি। গত ২৪ জানুয়ারি ওই দাবিটিকে সম্পূর্ণরূপে অপপ্রচার বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন। জামায়াত নেতার এই মন্তব্য প্রসঙ্গে প্রেস ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মাহদী আমিন বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের খুব প্রভাবশালী একজন নেতা ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে যে দাবিটি করেছেন, তিনি একটি মিডিয়ার কথা বলেছেন, স্বাভাবিকভাবে তার সপক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবেনও না।’

তারেক রহমানের উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘যে তথ্য মিডিয়ায় এসেছে বলে তিনি দাবি করেছেন, সেটির ন্যূনতম কোনো বাস্তবতা নেই। ন্যূনতম কোনো সত্যতা নেই। তাহলে কি আমরা বলতে পারি যে বিতর্ক তৈরি করার জন্য এটি একটি রাজনৈতিক অপকৌশল? আর যদি উনাকে ভুল তথ্য প্রদান করা হয় বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য করা হয়, তাহলে কি সেটা উনার অজ্ঞতা?’ 

যুক্তরাষ্ট্রের পত্রিকায় বাংলাদেশ ইস্যু 

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলের ভোটের ইতিহাসে ‘আগের তুলনায় ভালো ফল’ করতে পারে বলে ধারণা করছেন ঢাকায় মার্কিন কূটনীতিকরা। ভোট ঘিরে তাদের এ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ইসলামপন্থি দলটির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে ‘বন্ধুত্বের পথে’ হাঁটতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।

এ বিষয়ে মার্কিন কূটনীতিকদের একটি রেকর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যমটি এক সময়ে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হওয়া দলটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের যোগাযোগ বাড়ানো ও সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলছে। 

ক্ষমতায় যেতে পারলে জামায়াত যদি বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক কিছু চাপিয়ে দেয় কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ নয় এমন কোনো পদক্ষেপ নেয় তাহলে দেশটি কী ব্যবস্থা নেবে সেসবও কূটনীতিকরা ভেবে রেখেছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তার বরাতে ওয়াশিংটন পোস্টের এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ঢাকার নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে মার্কিন কূটনীতিকদের এক বৈঠকের তথ্যে এ খবর দেয় ওয়াশিংটন পোস্ট। গত ১ ডিসেম্বর হওয়া গোপন সেই বৈঠকের অডিও হাতে পাওয়ার কথা লিখেছে সংবাদমাধ্যমটি। ওয়াশিংটন পোস্টের নয়া দিল্লির ব্যুরো প্রধান প্রাণশু ভার্মার করা এ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী বেশ কয়েকবারই নিষিদ্ধ হয়েছে। সবশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও ‘নিষিদ্ধ’ হয়েছে। প্রথাগতভাবে তারা শরিয়া আইনে দেশ পরিচালনা ও সন্তানদের জন্য নারীর কর্মঘন্টা কমিয়ে আনার কথা বলে আসছে। যদিও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটি তাদের ভাবমূর্তি উদার করছে। দুর্নীতি নির্মূলের ওপর জোর দিয়ে দলের সমর্থন জোরালো করছে।

প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরিস্থিতিতে মার্কিন কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা ‘পুনরুত্থিত ইসলামপন্থি আন্দোলন’ বা ‘নবোদ্যমে’ ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। গত ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশি নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে ঢাকায় এক মার্কিন কূটনীতিক বলেন, দেশ ‘ইসলামি ধারায় ফিরেছে’। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তার ইতিহাসের সব থেকে ভালো ফল করতে পারে। “আমরা তাদের (জামায়াত ইসলামী) বন্ধু হিসেবে চাই,” বলেন সেই মার্কিন কূটনীতিক।

পরে তিনি বৈঠকে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, তারা জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনের সদস্যদের (ছাত্রশিবির) টকশো বা প্রোগ্রামে আমন্ত্রণ জানাতে ইচ্ছাপোষণ করেন কিনা। ওই কূটনীতিক সাংবাদিকের বলেন, “আপনারা কি তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন? তারা কি আপনাদের শো-তে যাবে?” ‘নিরাপত্তাজনিত’ কারণে সেই কূটনীতিকের নাম প্রকাশ না করার কথা লিখেছে ওয়াশিংট পোস্ট।

জামায়াতে ইসলামী শরিয়া আইনের ব্যাখ্যা ‘চাপিয়ে দিতে পারে’- এমন ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না এ কূটনীতিক। তবে তিনি বলছেন, ওয়াশিংটনের হাতে ‘প্রভাব খাটানোর মত’ এমন কিছু আছে, যা প্রয়োজনে তারা ব্যবহারের জন্যও প্রস্তুত। তিনি বলেন, “সহজ কথায়, আমি মনে করি না যে জামায়াত শরিয়া চাপিয়ে দেবে। আর যদি দলটির নেতারা উদ্বিগ্ন হওয়ার মত পদক্ষেপ নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র পরদিনই ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিতে পারে।”

এ বিষয়ে ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া বিবৃতিতে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বলেন, “ডিসেম্বরের মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে রুটিন বৈঠক ও অপ্রকাশযোগ্য আলোচনা হয়েছিল। “তখন অনেক রাজনৈতিক দল নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্র কোনো একটি দলের পক্ষে নয়। বাংলাদেশের জনগণ যাকেই বেছে নিক, তার সঙ্গেই কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।”

জামায়াতের মুখপাত্রের মন্তব্য 

এ ব্যাপারে জামায়াতের ইসলামীর মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, “গোপন কূটনৈতিক বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে আমরা মন্তব্য করতে চাই না।” এ প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে জামায়াতের প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মিডিয়াকে বলেন, “এগুলো তো একটি পত্রিকা ও তাদের একজন সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ। দেশের পরিস্থিতি একটি প্রতিবেদনে কার্যত উঠে আসে না।

“সামনে জাতীয় নির্বাচন, আমাদের মাঝ থেকে ফ্যাসিবাদ বিদায় নিয়েছে, সংস্কার হয়েছে, বিচারের কার্যক্রম চলছে, সব মিলিয়ে অনেকেই এ ধরনের প্রতিবেদন করেছে। আল জাজিরাও করেছে, তাদের প্রতিবেদনেও চোখ বুলিয়েছি। কিন্তু দিনশেষে মানুষের অবস্থানই মূল।”

প্রতিবেদনের প্রতিবাদ বা নিন্দা জানানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা বিষয়টি পুরো দেখে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন। 

খালেদা জিয়ার মৃত্যু ইস্যু 

খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের প্রভাবশালী প্রায় সব দেশ শোক জানায়। কেউ কেউ ওই সব দেশে স্থাপন করা শোক বইয়ে স্বাক্ষরও করেন। শেষ যাত্রা বা জানাজায়ও যোগ দেন কেউ কেউ। 

কবর দেয়ার আগে দিল্লী থেকে উড়ে এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্কর। পাকিস্তানের স্পিকার ও প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দও উপস্থিত হন। দিল্লিতে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। টুইটারে শোক জানান নরেন্দ্র মোদীও। এটা ব্যাক্তি খালেদা জিয়ার জন্য নয়। দেশে আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তায় থাকা সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও সংসদে বেশ কয়েকবারের বিরোধী দলীয় নেত্রীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তার প্রতি শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন তারা। 

ঢাকায় যেহেতু তারেক রহমান ছিলেন, তাই বিএনপির এ চেয়ারম্যানের সঙ্গে এস জয়শঙ্করের সাক্ষাত বা অন্যদের সাক্ষাত করাটা নির্বাচনের প্রচারণায় নামার আগে খালেদা জিয়ার মৃত্যু ও তারেক রহমানের সঙ্গে ওইসকল নেতৃবৃন্দের সাক্ষাত কাকতালীয়। এর অর্থ এই নয়, ওইসব দেশের আর্শিবাদ নিয়ে বিএনপি এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু এটাও অনেকে ভাল চোখে দেখেনি।

ঢাকায় বেন ক্রিষ্টেনসেনের ব্যস্ততা 

এদিকে ২০১৯ থেকে ২০২১ সন পর্যন্ত ঢাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুতাবাসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষায়ক কাউন্সিলর হিসেবে নিয়োগ দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। গত সেপ্টেম্বরে ক্রিস্টেনসেনকে বাংলাদেশে ‘অ্যাম্বাসেডর এক্সট্রাঅর্ডিনারি অ্যান্ড প্লেনিপটেনশিয়ারি’ হিসেবে মনোনয়ন দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এরপর গত মাসে মার্কিন সেনেটের অনুমোদন পান তিনি। 

ওই সূত্র ধরে গত ১২ জানুয়ারি ঢাকায় পৌছে প্রথমে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেন তিনি ১৫ জানুয়ারি। এরপরই ছুটে যান তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনি ভাবনা জানার জন্য তার কার্যালয়ে। সেটা ছিল গত ১৯ জানুয়ারির কথা। তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যানের দৃষ্টিভঙ্গী কী সেটা জানতে চেয়েছেন। ওই বৈঠকের পর তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর মার্কিন দূতাবাসের ফেইসবুক পেইজে দেওয়া এক পোস্টে রাষ্ট্রদূত এ প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন। 

সাক্ষাতের পর রাতে মার্কিন দূতাবাসের ফেইসবুক পেইজে এক পোস্টে ক্রিস্টেনসেন বলেন, “আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে আমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। “যুক্তরাষ্ট্র শান্তি ও সমৃদ্ধির অভিন্ন লক্ষ্যকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।”

ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ঢাকায় আসেন গত ১২ জানুয়ারি। ঢাকায় আসার পর বিএনপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে এটাই ছিল তার প্রথম সাক্ষাৎ। পরবর্তিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ২৩ জানুয়ারী সাক্ষাত করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে। 

এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। কৃষিপণ্যের বাণিজ্য সম্প্রসারণ দুই দেশের আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রয়ে গেছে। রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে যারাই সরকার ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের সঙ্গে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহী। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত সংস্কার উদ্যোগ এবং সদ্য প্রণীত শ্রম আইনের প্রশংসা করেন। বাংলাদেশে আশ্রিত দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিমের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চলমান মানবিক সহায়তার প্রশংসা করেন প্রধান উপদেষ্টা।

বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এবং সরকারপ্রধানের এসডিজি-বিষয়ক দূত লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন। তবে জানা গেছে, জামায়াতের আমির ডাঃ শফিকুর রহমানের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বেন ক্রিস্টেসেন। 

সবশেষ 

কথিত আছে ওয়ান ইলেভেন সৃষ্টি হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিনদেশীদের ইচ্ছায়। দেশে ক্ষমতার লোভে আদৃষ্ট হওয়া কতিপয় দল ওয়ান ইলেভেন তৈরিতে পেক্ষাপট সৃষ্টি ও বাস্তবায়িত করে অবশেষে দেশে নজীরবিহীন এক পরিস্থিতির অবতারণা ঘটায়। এরপর থেকে সব ঘটনাই সবার জানা! দীর্ঘ ১৬ বছরে ওয়ান ইলেভেন সুফলভুগি আওয়ামী লীগ চেপে বসে ক্ষমতায়। নীলনক্সার রাজনীতি ও ইলেকশন করে একের পর এক ক্ষমতা আঁকড়ে থাকে। ওয়ান ইলেভেনের পর হওয়া নির্বাচনে জয় নিয়ে এরপরও তিন তিনটি নির্বাচন করে তারা নিজেদের ইচ্ছেমত। সংবিধান সংশোধন করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করে ক্ষমতায় থাকে তারা কাউকে তোয়াক্কা না করেই। 

বাংলাদেশের মানুষের ভোটের মূল্য ছিলনা। বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাস হয়ে যেতো সরকার গঠন করতে যে কটা আসনের প্রয়োজন সেসকল আসনসমূহে। মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখেছে। এরপর ওই চব্বিশের জুলাইয়ের ওই আন্দোলন। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ও পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশে যে অন্তর্বর্তী সরকারের উপস্থিতি সেটা বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রের বিজয় হিসেবে অভিহিত হচ্ছে। দেড় বছরের অধিক সময় পেরিয়ে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর নির্বাচনের প্রতীক্ষায় এখন বাংলাদেশ নিয়মতান্ত্রিকভাবে। কিন্তু বাস্তবিকার্থেই কী একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করতে পারছে বাংলাদেশের মানুষ? 

আমার ভোট আমি দিয়ে আমার নেতৃত্ব নির্বাচন করবো- এটাই গণতন্ত্র। কিন্তু আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে বাংলাদেশে আবারও বিদেশীদের প্রভাব অনুভব করছে সাধারণ মানুষ। ওয়ান ইলেভেনের পর ২০১৪ থেকে প্রতিটা নির্বাচন নগ্ন হস্তক্ষেপে সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশের সাধারন মানুষ যখন প্রত্যাখান করতো, তখন সর্বপ্রথম পার্শ্ববর্তী এক বড় দেশ সর্বপ্রথম সমার্থন দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল আওয়ামী লীগকে অভিনন্দন জানিয়ে বিশ্বব্যাপী জায়েজ করার ফতোয়া দিয়ে দিতো। প্রতিবারই দেখা গেছে ওই চিত্র। 

বাংলাদেশে সর্বক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশের কতটা প্রভাব ছিল সর্বক্ষেত্রে সেটা সবার জানা! ভোটেও ছিল ওই ম্যাকানানিজম। ওই দেশের পছন্দসই দেশ আওয়ামী লীগ বলেই বাংলাদেশের আপাপর মানুষ নিঃশ্বব্দে শুধু সময় কাটাতেন। 

আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ওই দেশের কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। সেখানে এখন বিএনপিকে ভারত ঘেষা তকমা দেয়া হচ্ছে উদ্দেশ্যমূলকভাবেই। নতুবা ওয়ান ইলেভেনের পর বিএনপির উপর যে নির্যাতন হয়েছেন সেটাতে ভারত তো পাশে এসে দাঁড়ায়নি। বরং আওয়ামী লীগকে সহযোগিতা করতে যেয়ে বরং সাপোর্টই করেছে। সেখানে সে দেশের আর্শিবাদ বিএনপি কিভাবে পায় এটা একটা প্রশ্ন। 

কিন্তু মানুষ যখন উৎসব মুখর এক নির্বাচনের প্রতীক্ষায়, ঠিক তখনই নতুন আরেক ধুয়া তোলা শুরু করা হয়েছে জামায়াত ইসলামীকে নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র যখন দেখছে ভোটে পাস করে জামায়াতও উঠে আসতে পারে ক্ষমতায়। তাদের সেই গোপন জরিপের পর তারা জামায়াতকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। বন্ধুত্ব করতে উঠে পরে লেগে গেছে। এটা স্বাভাবিক, আওয়ামী লীগের অবর্তমানে বিএনপিকে পেছনে ঠেলে জামায়াতও ক্ষমতায় আসতে পারে। তাই বাংলাদেশের যে ক্ষমতা বা রাষ্ট্রপরিচালনা করবে, তার সঙ্গে বিদেশী দেশসমূহকে সম্পর্ক রাখতেই হবে। সে দৃষ্টিকোন থেকে প্রথমারের মত যুক্তরাষ্ট্র যদি বন্ধুত্বের হাত বাড়ায় জামায়াতের প্রতি নির্বাচনের আগে, সেটা অসংলগ্ন কিছু না। বরং স্বাভাবিক ঘটনা। ফলে এটাকে বড় করে দেখার কিছু নেই। তবে জামায়াতের নায়েবে আমীর সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে বলতে শোনা গেছে যে, চরমোনাইকে জোটে নেয়ার পর মার্কিন দুতাবাসের কেউ নাকি জিজ্ঞেস করেছিল কেন চরমোনাই তাদের জোটে। এর উত্তরে যা বলেছেন সৈয়দ তাহের সেটাতে চরমোনাইকে হেয় করা হয়েছে বলে দাবি চরমোনাইর। এর প্রতিবাদও করেছে চরমোনাই। সৈয়দ তাহেরের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, জামায়াতের সব কর্মকান্ডে দৃষ্টি মার্কিনীদের। এটা গভীর কোনো সখ্যতা থেকেও হতে পারে। এরপর পরই ওয়াশিংটন পোস্টের ওই খবর। তবে যে যাই বলুক, এটা হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি। তাই বলে জামায়াতকে যুক্তরাষ্ট্র বা পাকিস্তান বা তুরস্ক সবকিছু পাশ কাটিয়ে, এমনকি মানুষের ম্যান্ডেট উপেক্ষা করে ক্ষমতায় নিয়ে আসবে অন্য কোনো এক মা’জেজায় সেটা কী এ মুহূর্তে কল্পনা করা সঠিক হবে? 

শেয়ার করুন