মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বই হাতে কবি ও অতিথিবৃন্দ
আড়াই দশক আগেই কবি আল মাহমুদ, কবি ফজল শাহাবুদ্দীন এবং কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ যার কবিতা নিয়ে দু'কলম লিখে ফেলেছেন আজ তাকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা হবে এটিই স্বাভাবিক। গত বছরের শেষের দিকে এশিয়া পাবলিকেশন্স বের করেছিল সোহেল মাহমুদের গবেষণা গ্রন্থ ’কাজী জহিরুল ইসলামের নির্বাচিত ৩০ কবিতা ও বিশ্লেষণ’। বইটি নিয়ে বোদ্ধা মহলে বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ঈর্ষান্বিত প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নেই, তারাও এখানে-সেখানে নানান কথা বলতে শুরু করেছিলেন। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই আবু তাহের সরফরাজ লিখে ফেললেন ’কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতা শৈল্পিক সৌন্দর্য ও কৃৎকৌশল’। বইটির নান্দনিক প্রচ্ছদ এঁকেছেন মোমিন উদ্দীন খালেদ, প্রকাশ করেছে প্রতিবিম্ব প্রকাশ। গত সপ্তাহে কিছু কপি, যার কবিতা এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু, সেই কবি কাজী জহিরুল ইসলামের হাতে এসে পৌঁছায়। নিউইয়র্কে নিবন্ধিত শিল্প-সাহিত্যের সংগঠন ঊনবাঙালের সভায় গত ২৪ জানুয়ারি এর একটি ছোটোখাটো মোড়ক উন্মোচনও হয়ে যায়। ঘরোয়া, অনাড়ম্বর হলেও এই আয়োজনে ছিল প্রাণের ছোঁয়া, প্রিয়জনদের ভালোবাসার উষ্ণতা।
আশি পৃষ্ঠার স্বল্প পরিসরের এই গ্রন্থে আবু তাহের সরফরাজ ৯টি প্রবন্ধ লিখে কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতায় নিষিক্ত শৈল্পিক সৌন্দর্য ও তার কৃৎকৌশল উন্মোচন করেন। প্রথম প্রবন্ধে তিনি নৈর্ব্যক্তিকভাবে শিল্পের সৌন্দর্য বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। এর পরেই প্রবেশ করেন কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতার জগতে। শুরু করেন তার ছন্দের কারুকাজ দিয়ে। এই প্রবন্ধে তিনি লেখেন, বেশিরভাগ কবিতার সাথে পাঠক সহজেই যোগসূত্র তৈরি করতে পারেন। পাঠক ও কবির অন্তর্জগতের সাথে এই সাঁকো খুবই জরুরি।...ছন্দের শৈল্পিক বিন্যাসে কাজী জহিরুল বিচিত্র নিরীক্ষার অভিযাত্রী।...শব্দের অর্থগত দ্যোতনার ভেতর শব্দের স্বকীয় স্বাধীনতা থাকে। এটা স্বতঃস্ফূর্ত। খুব কুশলী শিল্পী না হলে শব্দের এই গূঢ় রহস্যের সাথে একাত্ম হওয়া সম্ভব নয়। কাজী জহিরুল ইসলাম সেই কবি যার অন্তঃকরণের সাথে শব্দের গভীর যোগসূত্র রয়েছে।
এরপর তিনি আলোকপাত করেন কবির ভাষাশৈলী নিয়ে, লেখেন গ্রন্থের দ্বিতীয় প্রবন্ধ কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতার ভাষাশৈলী। মহাকালের ঘড়ি কবিতার ভাষাশৈলী বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রাবন্ধিক লেখেন, ’সন্ধ্যার এই নির্জন সমাহিত রূপ দেখে কবির হঠাৎ মনে হয় কোথায় যেন ঘন্টা বাজাচ্ছে মহাকালের এক ঘড়ি।...এই প্রতীকের আড়ালে মৃত্যুর কথাই বলতে চেয়েছেন কবি।’
এভাবে তিনি কবির কবিতায় ব্যবহৃত উপমার সুষমা, চিত্রকল্পের অভিনবত্ব, চিন্তার আন্তর্জাতিকতা, মরমী ও সুফি দর্শন, দেশাত্মবোধ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলাদা আলাদা প্রবন্ধ লেখেন। একজন দক্ষ গবেষকের মতই তিনি কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতার গভীরে ঢ়ুকে তুলে এনেছেন দুর্লভ সব মণি-মানিক্য। সবশেষে বাংলা সাহিত্যে কাজী জহিরুল ইসলামের সিগনেচার কাজ যেটি, তার উদ্ভাবিত ক্রিয়াপদহীন কবিতা, এই বিষয়টি নিয়ে আলাদা একটি প্রবন্ধ লেখেন।
গ্রন্থটি একদিকে যেমন অ্যাকাডেমিক মূল্য ধারণ করে অন্যদিকে প্রাঞ্জল ভাষার কারণে সুখপাঠ্যও। গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচনে যুক্ত হবার জন্য কবি কাজী জহিরুল ইসলাম বন্ধু, সুহৃদ যারা উপস্থিত ছিলেন সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান এবং বইটি ঢাকা থেকে বহন করে নিয়ে আসার জন্য ঊনবাঙালের অন্যতম সদস্য মুন্না চৌধুরীর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।