টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর জন কর্নিন প্রাইমারির আগে মুসলিমবিরোধী ইস্যুতে প্রচারণা শুরু করেছেন
টেক্সাসে আসন্ন রিপাবলিকান প্রাইমারি নির্বাচনকে সামনে রেখে শরিয়া আইন ও ইসলামবিরোধী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রচারণা জোরদার করেছে রিপাবলিকান প্রার্থীরা। দলের প্রাইমারি নির্বাচনে ইসলামবিরোধী বক্তব্য ক্রমেই প্রচারণার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে কীভাবে আমেরিকান পরিচয় সংজ্ঞায়িত হবে, এ নিয়ে রিপাবলিকান দলের ভেতর চলমান বিতর্কের মধ্যে ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরোধিতা এখন কিছু প্রার্থীর প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে কথিত চরমপন্থী ইসলাম বিস্তারের হুমকি তুলে ধরে নিজেদের সবচেয়ে কঠোর অবস্থানধারী হিসেবে উপস্থাপন করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন তারা। বর্তমানে টেক্সাসে তিন লাখের বেশি মুসলিম বসবাস করছেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেটগুলোর মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষ পাঁচের মধ্যে। হিউস্টন ও নর্থ টেক্সাসে মুসলিমদের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত কমিউনিটিও রয়েছে।
টেক্সাসের উত্তপ্ত সিনেট প্রাইমারি থেকে শুরু করে স্থানীয় নির্বাচন পর্যন্ত, রিপাবলিকান প্রার্থীরা ডালাসের উত্তরে ইস্ট প্ল্যানো ইসলামিক সেন্টার-এর একটি মসজিদকেন্দ্রিক প্রায় ১ হাজার আবাসন ইউনিটের প্রস্তাবিত প্রকল্পকে ঘিরে তীব্র আপত্তি তুলছেন। একই সঙ্গে তারা ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায়কে ঘিরে সতর্কতামূলক ও ভীতিকর বার্তা দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন।
সিনেটর জন কর্নিন ও তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন, ওই প্রকল্প এবং আফগান শরণার্থী পুনর্বাসন কর্মসূচি নিয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আক্রমণাত্মক বিজ্ঞাপন ও বক্তব্য দিচ্ছেন। কর্নিন প্রকল্পটির বিরুদ্ধে ফেডারেল তদন্তের আহ্বান জানান, অন্যদিকে প্যাক্সটন একাধিক তদন্ত শুরু করে ডিসেম্বরে প্রতারণার অভিযোগে মামলাও দায়ের করেন।
বৈচিত্র্যপূর্ণ জনসংখ্যার টেক্সাসে অ-হিস্পানিক শ্বেতাঙ্গদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার দুই-পঞ্চমাংশেরও কম। তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও দ্রুত বেড়ে ওঠা মুসলিম জনগোষ্ঠী এখন রিপাবলিকান রাজনীতিতে একটি স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের জিওপি প্রচারণায় কোরআন পোড়ানোর ভিডিও থেকে শুরু করে সন্ত্রাসবাদের প্রসঙ্গ টেনে আনার মতো চরম বক্তব্য দেখা যাচ্ছে, যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো তীব্র বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। টেক্সাস জিওপি পরামর্শক ভিনি মিনচিলো বলেন, এই নির্বাচনী প্রচারণায় মুসলিম সম্প্রদায়কে ভয় দেখানোর প্রতীক বানানো হয়েছে। রিপাবলিকান প্রাইমারি ভোটারদের মধ্যে এই বার্তা কাজ করছে যে এটা তারা জানে। তবে মুসলিম অধিকার সংগঠন ও ডেমোক্র্যাটরা এসব প্রচারণাকে বর্ণবাদী ও বিভ্রান্তিকর বলে নিন্দা জানিয়েছেন। নর্থ টেক্সাসভিত্তিক ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ জোয়েল মন্টফোর্ট বলেন, টেক্সাস জিওপি ইসলামকে লক্ষ্য করে ভয়ভিত্তিক রাজনীতি করছে। এসব অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের শুরু থেকে অন্তত ছয়টি নির্বাচনী দৌড়ে ‘শরিয়া আইন’ উল্লেখ করে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে, যার সবগুলোই রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে। গত সপ্তাহে সিনেটর কর্নিন ‘ইভিল ফেস’ শিরোনামে একটি ব্যয়বহুল টিভি বিজ্ঞাপন চালু করেন, যেখানে তিনি ‘চরমপন্থী ইসলামকে রক্তপিপাসু আদর্শ’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং মুসলিম অধিকার সংগঠন কেয়ার এর করমুক্ত মর্যাদা বাতিলের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন। অন্যদিকে প্যাক্সটন কর্নিনের বিরুদ্ধে আফগান শরণার্থী কর্মসূচিকে সমর্থনের অভিযোগ তুলেছেন। অ্যাটর্নি জেনারেল পদপ্রার্থী অ্যারন রেইটজ এক বিজ্ঞাপনে বলেন, ইসলাম পশ্চিমা সভ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং মুসলিম অভিবাসন ঠেকানোর অঙ্গীকার করেন। একই পদপ্রার্থী মেইস মিডলটনও টেক্সাসে ‘শরিয়া আইন’ ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
সবচেয়ে বিতর্কিতভাবে, কংগ্রেস প্রার্থী ভ্যালেনটিনা গোমেজ একটি ভিডিওতে কোরআন পোড়ানোর দৃশ্য দেখিয়ে ইসলামবিরোধী বক্তব্য দেন, যা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ৯/১১ পরবর্তী সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিরোধী মনোভাব রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টেক্সাসে এটি নতুন করে তীব্রতা পেয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্প্রতি ইসলামবিরোধী মন্তব্য পুনঃপ্রচার করে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। কেয়ারের টেক্সাস শাখার নীতি সমন্বয়কারী সামিহা রিজভি কর্নিনের বিজ্ঞাপনকে অপবাদমূলক ও নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করে বলেন, আমেরিকান মুসলিমরা কোথাও যাচ্ছে না। ভোটের মাধ্যমে আমরা আমাদের শক্তি দেখাব।
এদিকে টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট সম্প্রতি ‘শরিয়া কম্পাউন্ড’ নিষিদ্ধসহ একাধিক আইন অনুমোদন করেছেন এবং কেয়ার ও মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছে কেয়ার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের প্রচারণা একদিকে রিপাবলিকান প্রাইমারি ভোটারদের উজ্জীবিত করলেও অন্যদিকে টেক্সাসের মুসলিম ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আরো সংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করে তুলতে পারে।