৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৬:৫৩:৩৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
শাহানা হানিফ ও চি ওসে ডেমোক্রে‍টিক সোশালিস্টসের সিটি কাউন্সিল ব্লকে যোগের জন্য আবেদন নিউইয়র্কে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ফেডারেল ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে হোচুলের নতুন আইন প্রস্তাব নিউইয়র্কে বন্দুক সহিংসতা রেকর্ড সর্বনিম্নে, গুলি ছোড়ার ঘটনা কমেছে ৬১ শতাংশ নিউইয়র্কে অসুস্থ ব্যক্তিদের স্বেচ্ছামৃত্যুর আইন চূড়ান্ত তিন নীতি পরিবর্তনে বয়স্কদের হেলথ কেয়ারে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে মহানবীর হিজরতের গল্প শোনালেন মামদানি চাঁদ দেখাসাপেক্ষ ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পবিত্র রমজান তুষার পরিষ্কার না করায় বাড়ির মালিকদের জরিমানা সীমান্ত নজরদারি ছাড়িয়ে নাগরিক পর্যবেক্ষণে ডিএইচএসের এআই প্রযুক্তি অভিবাসীদের সুরক্ষায় নির্বাহী আদেশে সই মামদানির


দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
সুমিদা নদীর ক্রুজে এক রাত
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ১১-০২-২০২৬
সুমিদা নদীর ক্রুজে এক রাত


নিউইয়র্কে ফেরার সময় এসে গেছে, কিন্তু বিদায়ের ঠিক আগ মুহূর্তে টোকিও যেন আরেকটি স্মৃতি আলতো করে আমার হাতে তুলে দিতে চাইলো। একদিনের অপরিচিত ট্যুর গাইড নিকিতা, যার সঙ্গে পথচলার ফাঁকে ফাঁকে গড়ে উঠেছিল অদ্ভুত এক সখ‍্য-সে হঠাৎই প্রস্তাব দিলো-চলো, এই শহরটাকে নদীর বুক থেকে দেখি। সুমিদায় ভেসে থাকুক আমাদের শেষ রাতটা।

আমি মাথা নেড়ে সায় দিই। সেদিন আকাশে চাঁদটা যেন ইচ্ছে করেই দেরি করে উঠেছিল। সুমিদা নদীর বুকে ক্রুজ শিপটি ধীরে ধীরে ভেসে চললো, নগরের কোলাহল পেছনে ফেলে এক শান্ত, দীপ্তিময় নীরবতার দিকে। পানির ওপর চাঁদের আলো ভেঙে ভেঙে পড়ছে; ঢেউয়ের গায়ে রুপালি আঁচড়। নদীর দুই তীরে টোকিও শহরটি আলোয় আলোয় সাজানো।

আমাদের ক্রুজ শিপটি যখন ধীর লয়ে নদীর বুক চিরে এগোতে শুরু করলো, মনে হলো আমরা কোনো এক স্বপ্নপুরীর দিকে যাত্রা করছি। দুপাশের তীরের ঝকঝকে আধুনিকতা আর জলের নিস্তব্ধতা মিলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করছিল। দূর আকাশে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়েছিল টোকিও স্কাই-ট্রি, যার আলোকসজ্জা সুমিদার জলে প্রতিফলিত হয়ে এক মায়াবী নীল আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। একটু দূরেই ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা টোকিও টাওয়ার তার লালচে-কমলা আলোয় জানান দিচ্ছিল তার অস্তিত্ব। নদীর দুই ধারের আকাশচুম্বী দালানগুলো যেন একেকটি আলোকস্তম্ভ, যারা রাতের অন্ধকারকে যেন শাসন করছিল।

আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল নিকিতা। ক্রুজশিপের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। বাতাসে তার চুল উড়ছিল, কণ্ঠে নরম আবেগ। সে বললো, জানো টোকিও দিনে ব্যস্ত। কিন্তু রাতে এই শহর নিজের কথা বলে। আমি হাসলাম। বললাম, আজ রাতে শহরটা আমাদের কথাই শুনছে মনে হয়। সে চোখ তুলে তাকায়, চাঁদের আলোয় সেই দৃষ্টিতে ছিল বিদায়ের মায়া। মাত্র কিছুদিনের পরিচয়ে সে কখন যে এত আপন হয়ে উঠেছিল, তা বোধহয় এই বিদায় বেলার বিষণ্নতা ছাড়া বোঝা সম্ভব ছিল না।

ক্রুজ এগোতে থাকে। সেতুর নিচে দিয়ে যাওয়ার সময় আলো-ছায়ার খেলা, পানিতে প্রতিফলনের নাচ। নিকিতা বললো- আজকের রাতটা মনে রেখো-নিউইয়র্কের ব্যস্ততায়ও যেন এই নদীর ঢেউ শুনতে পাও। আমি চুপ করে থাকলাম। কিছু কথার জবাব হয় না, শুধু মনে গেথে রাখতে হয়।

নিকিতা বলে, জানো, টোকিও খুব ব্যস্ত শহর। আমিও হয়তো একদিন সব ভুলে যাবো। তুমি হারিয়ে যাবে নিউইয়র্কের ব‍্যস্ততায়। তুমি এ সুমিদা নদী সবাই একদিন আমাকেও ভুলে যাবে। হয়তো আজকের এ স্মৃতিটাই আমার মনে উজ্জল হয়ে বেঁচে থাকবে। ওর গলার স্বরে একটা চাপা আবেগ ছিল, যা রাতের নিস্তব্ধতাকে আরো গাঢ় করে তুলছিল। আমি বললাম, কিছু স্মৃতি ভোলা যায় না নিকিতা, বিশেষ করে যখন তাতে সুমিদার জল আর তোমার মতো একজন মানুষের ছায়া থাকে।

আমার কথা শুনে নিকিতার মুখে যে স্মিত হাসি ফুটে উঠেছিল, তা ছিল টোকিও টাওয়ারের আলোর চেয়েও উজ্জ্বল। ক্রুজ যখন ঘাটে ফিরে এল, তখন মধ্যরাত। টোকিওর আকাশ তখন চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে। আমি জানি, আমি ফিরে যাবো যান্ত্রিক শহর নিউইয়র্কে। কিন্তু সুমিদা নদীর সেই শান্ত জল আর নিকিতার সেই বিষণ্ণ অথচ সুন্দর বিদায় সম্ভাষণ আমার হৃদয়ের এক কোণে জাপানের এক টুকরো নীল জোছনা হয়ে রয়ে যাবে চিরকাল।

সাগানো ব‍্যাম্বো ফরেস্ট

জাপানের প্রাচীন রাজধানী কিয়েটো তার মন্দির, রাজকীয় ইতিহাস আর ঋতুভিত্তিক সৌন্দর্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে শহরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত সাগানো ব‍্যাম্বো ফরেস্ট এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার নাম যেখানে স্থাপত্য নয়, প্রকৃতিই প্রধান চরিত্র। কিয়েটো স্টেশন থেকে জেআর সাগানো (San-in) লাইনে মাত্র ১৫-২০ মিনিটের যাত্রা। Saga-Arashiyama স্টেশনে নামার পর অল্প হাঁটলেই শুরু হয় বাঁশবনের রাজ্য। আমরা যাচ্ছি সেই বাঁশ বন দেখার, সঙ্গে গাইড নিকিতা।

আমরা রওনা দিলাম কিয়েটো স্টেশন থেকে। জেআর সাগানো (San-in) লাইনের ট্রেনে বসে জানালার বাইরে তাকালে শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। মাত্র পনেরো-বিশ মিনিটের পথ, কিন্তু মনে হয় যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করছি। আরাশিয়ামা স্টেশনে নেমে নিকিতা হালকা হাসি দিয়ে বললো, কিয়েটোর অনেক মন্দির আছে। কিন্তু আজ আমরা এমন এক জায়গায় যাচ্ছি যেখানে দেবতা নেই, অথচ আত্মা আছে।

সাগানো ব‍্যাম্বো ফরেস্ট, যা অনেকের কাছে আরাশিয়ামা ব‍্যাম্বো গ্রোভ নামেও পরিচিত-কিয়েটোর পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত। এখানে ঢোকার মুহূর্তেই শব্দ বদলে যায়। মানুষের কথা, পায়ের শব্দ-সবকিছু যেন বাঁশের উঁচু কাণ্ডে আটকে নরম হয়ে ফিরে আসে। সাগানো ব‍্যাম্বো ফরেস্ট মূলত লম্বা ও ঘন বাঁশগাছের প্রাকৃতিক পথ। শত শত বাঁশ আকাশের দিকে সোজা উঠে গিয়ে তৈরি করেছে সবুজ করিডর। সূর্যের আলো এখানে সরাসরি পড়ে না; আলো ভেঙে নেমে আসে, ছায়া আর সবুজের মিশেলে এক অনন্য পরিবেশ তৈরি করে। বাতাস বইলেই বাঁশের কাণ্ডগুলো পরস্পরের গায়ে ঘষা খেয়ে যে শব্দ তোলে, তা জাপানে প্রাকৃতিক সাউন্ডস্কেপ হিসেবে স্বীকৃত। এ শব্দকে জাপানের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সংরক্ষণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। কারণ এটি শুধু শব্দ নয়, এটি মানসিক প্রশান্তির অংশ।

আকাশ ছুঁয়ে থাকা শত শত মোটা বাঁশ একে অপরের গায়ে হেলে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাস বইলে তারা একসঙ্গে দুলে ওঠে-মনে হয় যেনএকটি প্রাকৃতিক সিম্ফনি। জাপানের সংস্কৃতিতে এই বাঁশের শব্দকে বলা হয় ‘শুদ্ধতার ধ্বনি’। ইউনেসকো পর্যন্ত এই শব্দকে জাপানের সংরক্ষিত প্রাকৃতিক শব্দের তালিকায় রেখেছে।

নিকিতা ফিসফিস করে বললো, ‘শোনো, মনে হয় না যেন বাঁশেরা নিজেদের মধ্যে গল্প করছে? আমি হেসে উত্তর দিলাম- ‘হয়তো আমাদের কথাই বলছে। নিকিতা বলে, এই ব‍্যাম্বো ফরেস্ট শুধু প্রকৃতির নয়, ইতিহাসেরও অংশ। হেইয়ান যুগে (৮ম-১২শ শতক) কিয়েটো ছিল জাপানের রাজকীয় রাজধানী। সেই সময় অভিজাত পরিবার, কবি ও জেন সাধকেরা এখানে আসতেন ধ্যান আর নির্জনতার খোঁজে। পাশেই অবস্থিত তেনর‍্যু-জি মন্দিও একটি জেন বৌদ্ধমন্দির, যা এ বনভূমির গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বাঁশবনের ভেতরের পথ সমতল ও পরিচ্ছন্ন। নিকিতা বলে ভোরবেলা বা বিকালের শেষদিকে এলে পর্যটকের চাপ কম থাকে। হাঁটতে হাঁটতে বোঝা যায়, এটি শুধু ছবি তোলার জায়গা নয়; এটি ধীরে হাঁটার, থেমে দাঁড়ানোর, ভাবনার জায়গা।

জাপানি সংস্কৃতিতে বাঁশ শক্তি ও নমনীয়তার প্রতীক। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাঁশ সহজে ভেঙে পড়ে না, বরং নুয়ে পড়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। সেই দর্শনই যেন এ বনভূমির প্রতিটি গাছে লেখা। আমরা বাঁশবনের মধ‍্য দিয়ে হাঁটকে থাকি। এক সময় পথ সরু হয়ে আসে। পর্যটকের ভিড় একটু কমে গেলে নিকিতা থেমে দাঁড়ায়। সবুজ আলোয় তার চোখের রঙ বদলে যায়। তুমি এখানে কতবার এসেছো? আমি জিজ্ঞেস করি। সে বলে, অনেকবার, কিন্তু প্রতিবার আলাদা লাগে। জায়গা বদলায় না, কিন্তু মানুষ বদলায়।

ফিরতি পথে সূর্য হেলে পড়ে। বাঁশবন পেছনে রেখে আমরা যখন আরাশিয়ামার ছোট রাস্তায় হাঁটছি, নিকিতা হঠাৎ বললো- কিয়েটোর সৌন্দর্য সব সময় চোখে ধরা পড়ে না। কখনো কখনো সেটা নীরবতায় লুকিয়ে থাকে। সাগানো ব‍্যাম্বো ফরেস্ট সেই নীরব সৌন্দর্যেরই একটি স্থায়ী ঠিকানা। সাগানো ব‍্যাম্বো ফরেস্টের সবুজ ছায়া পেছনে রেখে আমরা ধীরে হাঁটতে থাকি আরাশিয়ামার দিকে। দিনের আলো তখন নরম হতে শুরু করেছে। নিকিতা বলে, কিয়েটোর সন্ধ্যা হঠাৎ নামে না-এখানে সন্ধ্যা আসে, থেমে থেমে।

দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিলে আরাশিয়ামা ব্রিজ-তোগেতসুক্যো। এই নামের অর্থ ‘চাঁদ পার হওয়া সেতু’। হেইয়ান যুগে সম্রাট কামেয়ামা নাকি পূর্ণিমার রাতে এই সেতু দেখে বলেছিলেন, চাঁদ যেন সেতুর ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সেই থেকেই নামটি থেকে গেছে। নিকিতা বলে, বর্তমান তোগেতসুক্যো ব্রিজ আধুনিক কাঠ ও কংক্রিটে নির্মিত হলেও এর ইতিহাস বহু শতাব্দী পুরোনো। প্রথম সেতুটি তৈরি হয়েছিল নবম শতকে। বহুবার বন্যা ও সময়ের আঘাতে ভেঙেছে, আবার তৈরি হয়েছে ঠিক কিয়েটোর মতোই, ভেঙে আবার দাঁড়ানো শহর।

আমি সেতুর রেলিংয়ে হাত রাখি। নিকিতা পাশে এসে দাঁড়ায়। বলে-এ নদীটা কিয়েটোর মেজাজ জানে। শীতকালে চুপ, বসন্তে কোমল, আর শরতে গম্ভীর। সন্ধ্যা ঘনালে কাতসুরা নদীর রঙ বদলাতে থাকে। নীল থেকে ধূসর, ধূসর থেকে হালকা রুপালি। দূরের পাহাড়ের ছায়া জলে পড়ে একধরনের জলরঙের ছবি তৈরি করে। আমরা দুজন সামনে হাঁটতে থাকি।

ফুশিমি ইনারীর শিন্তো মন্দির

জাপানের প্রাচীন রাজধানী কিয়েটোর আকাশে তখন শরতের সোনা রোদ। ট্রেনের জানালা দিয়ে দ্রুতবেগে সরে যাচ্ছে জাপানি স্থাপত্যের ছাদগুলো। আমাদের গন্তব্য-ফুশিমি ইনারী-তাইশা। আমার পাশে বসে গাইড নিকিতা, যার চোখের মণি জাপানের সমুদ্রের মতোই গভীর। সে এক মনে দেখছিল ট্রেনের জানালার বাইরে। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে এক মায়াবী হাসিতে বলল, জানো, ফুশিমি ইনারীর এই লাল তোরণগুলো আসলে মানুষের বিশ্বাসের রঙ। হয়তো আজ সেই রঙে আমাদের দিনটাও রাঙিয়ে দিবে। আমি হাসলাম।

জেআর ইনারী স্টেশনে নামতেই চোখে পড়লো বিশাল এক লাল ‘তোরি গেট’। ভিড় ঠেলে আমরা যখন মূল মন্দিরের সামনে দাঁড়ালাম, নিকিতা বুঝিয়ে দিলো এর মাহাত্ম্য। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই মন্দিরটি মূলত শস্য ও সমৃদ্ধির দেবতা ‘ইনারী’র আবাসস্থল। মন্দিরের যত্রতত্র পাথরের শেয়াল বা ‘কিটসুন’ (Kitsune) মূর্তিগুলো যেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাদের দেখছে। জাপানি বিশ্বাসে এই শেয়ালরাই দেবতার বার্তাবাহক। নিকিতা তার কিমোনোর আঁচল সামলে নিয়ে বললো, ‘এ শেয়ালগুলোর মুখে যে চাবিটা দেখছ, ওটা হলো শস্যভান্ডারের চাবি। মানুষের ভাগ্য আর সমৃদ্ধি আসলে তাদের নিজের পরিশ্রম আর বিশ্বাসের মধ্যেই লুকানো থাকে।’ নিকিতা বলে, শিন্তো বিশ্বাসে প্রকৃতি আর দেবতা আলাদা নয়। পাহাড়, গাছ, বাতাস-সবকিছুর মধ্যেই দেবতার উপস্থিতি। তাই ফুশিমি ইনারি শুধু একটি স্থাপনা নয়, পুরো পাহাড়টাই একটি মন্দির। সে আরো বলে, এখানে মানুষ শুধু প্রার্থনা করতে আসে না। নিজের ভয়, আশা, ব্যর্থতা-সবকিছু রেখে যেতে আসে। মন্দিরের মূল আকর্ষণ ‘সেনবোন তোরি’ বা হাজার তোরণ। পাহাড়ের ওপর দিকে উঠে যাওয়া এই পথটি যেন এক মায়াবী সুড়ঙ্গ। হাজার হাজার উজ্জ্বল কমলা-লাল রঙের তোরণ সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। নিকিতার হাত ধরে যখন সেই সুড়ঙ্গে প্রবেশ করলাম, মনে হলো আমরা সময়ের কোনো এক অজানা বাঁশে হারিয়ে গেছি। ভিতরের আলো-ছায়ার খেলা আমাদের দুজনের মুখেই অদ্ভুত এক আভা তৈরি করছিল। নিকিতা থামল। একটি বড় তোরনের গায়ে খোদাই করা জাপানি হরফগুলো ছুঁয়ে দেখে বললো, এই প্রতিটি তোরণ কারো না কারো প্রার্থনা বা কৃতজ্ঞতার প্রতীক।

এই গেটগুলো কোনো রাজা বা সম্রাট বানাননি। এগুলো এসেছে মানুষের কাছ থেকে ব্যবসায়ী, পরিবার, প্রতিষ্ঠান, যারা সফলতার আশায় বা কৃতজ্ঞতায় একটি করে গেট দান করেছেন। প্রতিটি গেটের পেছনে লেখা আছে দাতার নাম আর সময়কাল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তৈরি হয়েছে এই লাল নদী। পাহাড়ের যত উপরে উঠছিলাম, পর্যটকদের কোলাহল ততই কমে আসছিল। এক সময় আমরা পৌঁছলাম ‘ইওতসুজি’ ইন্টারসেকশনে। সেখান থেকে পুরো কিয়েটো শহরটাকে মনে হচ্ছিল শিল্পীর আঁকা কোনো ছোট ক্যানভাস। সূর্যাস্তের শেষ রশ্মিটা যখন শহরের গায়ে আছড়ে পড়ছে।

সে ফিসফিস করে বললো, জাপানিরা বিশ্বাস করে পাহাড়ের এই চূড়ায় এসে কোনো ইচ্ছা করলে তা কখনো বৃথা যায় না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কী চাইলে? সে মৃদু হেসে বলল, সব কথা মুখে বলতে হয় না। কিছু কথা লাল তোরনের নিস্তব্ধতায় মিশে থাকাই সুন্দর। নামার পথে নিকিতা একটি কাঠের ইমা কিনলো। বললো, এটা প্রার্থনার ফলক। এখানে মানুষ নিজের আশা, স্বপ্ন, ভয় লিখে রেখে যায়। নিকিতা কিছুক্ষণ চুপ করে লিখল। আমি জিজ্ঞেস করলাম কী লিখেছো? ও বললো, তোমাকে না। কিছু কথা না হয় দেবতারাই জানুক। নিচে নামার সময় আমরা স্থানীয় ‘ইনারী সুকিষ্টর স্বাদ নিলাম। মিষ্টি ভাজা তোফুর আবরণে মোড়ানো এই ভাত নাকি দেবতা ইনারীর খুব প্রিয়। বিকেলের আলোয় টোরি গেটগুলো আরো গাঢ় লাল হয়ে উঠেছে। মনে হলো, পাহাড় নিজেই আমাদের বিদায় জানাচ্ছে।

ট্রেন ছাড়লো। জানালার বাইরে ফুশিমি ইনারির শেষ লাল দরজাটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। আমরা ফিরে এলাম কিয়েটো শহরে। আর ফুশিমি ইনারি রয়ে গেল-বিশ্বাস, নীরবতা আর হাজার দরজার স্মৃতিতে।

নিযো ক্যাসেলে একদিন

কিয়োটোর সকালটা আজ ছিল একটু অন্যরকম। কুয়াশাভেজা বাতাসের সঙ্গে মিশে ছিল নাম না জানা কোনো বুনো ফুলের ঘ্রাণ। আজ আমাদের গন্তব্য-ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, নিযো ক্যাসেল। সঙ্গে গাইড নিকিতা, যার হাসিতে জাপানের বসন্ত খেলা করে। ট্রেন থেকে নেমে শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে আমরা এগোই নিযো ক্যাসেলের দিকে। সাবওয়ে থেকে উঠে প্রশস্ত রাস্তা ধরে হাঁটতেই দূরে ভেসে ওঠে উঁচু পাথরের দেয়াল আর খালের জল। নিকিতা বলে-এই পথটাই একসময় সামুরাইদের চলার রাস্তা ছিল।

নিযো ক্যাসেল: ক্ষমতার প্রতীক থেকে বিশ্ব ঐতিহ‍্য

নিকিতা বলে, ১৬০৩ সালে টোকুগাওয়া শোগুনাতের প্রতিষ্ঠাতা টোকুগাওয়া ইয়েয়াসু নিযো ক্যাসেল নির্মাণ করেন। এটি ছিল শোগুনের কিয়োটো বাসভবন-সম্রাটের শহরে সামরিক ক্ষমতার নিঃশব্দ ঘোষণা। ১৮৬৭ সালে এখানেই শেষ শোগুন টোকুগাওয়া ইয়োশিনোবু ক্ষমতা সম্রাটের হাতে ফিরিয়ে দেন-জাপানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। আজ নিযো ক্যাসেল ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ-ক্ষমতা, শিল্প আর রাজনীতির এক অনন্য দলিল। নিযো ক্যাসেলের পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, আমরা শুধু দুইজন মানুষ নই আমাদের সঙ্গে হাঁটছে চারশো বছরের ইতিহাস।

নাইটিংগেল ফ্লোর : মেঝের হৃদস্পন্দন। নিনোমারি প্রাসাদের ভেতরে ঢ়ুকতেই মেঝে কথা বলে উঠল। চি-চি-চি-চি- নিকিতা আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে বললো-‘শুনছো? এটা নাইটিংগেল ফ্লোর। কেউ লুকিয়ে ঢ়ুকলে মেঝেই তাকে ধরিয়ে দিতো।’ আমি হাঁটি সাবধানে। মনে হলো, মেঝেটা শুধু গুপ্তচর নয়-আমাদের অনুভূতিও টের পাচ্ছে। ‘এই মেঝে কি প্রেমিকদের কথাও বলে দেয়?’ আমি হাসতে হাসতে বললাম। নিকিতা চোখ নামিয়ে উত্তর দিলো-‘প্রেম লুকানো যায় না-কাঠও জানে।’

নিনোমারি প্রাসাদ: শিল্পে মোড়া রাজনীতি:নিনোমারি প্রাসাদে শোগুন বসে প্রশাসনিক কাজ চালাতেন। সোনালি পাতায় আঁকা বাঘ, পাইন গাছ, আর রাজকীয় পর্দা-সবই ক্ষমতার ভাষা। বাঘের চোখে চোখ রেখে নিকিতা বলে/শিল্প এখানে শুধু সৌন্দর্য নয়, ভয়ের বার্তাও।’

হোনমারু প্রাসাদ: নিকিতা বলে, হোনমারু ছিল দুর্গের কেন্দ্র-আগুনে পুড়ে বহুবার পুনর্নির্মিত। আজও তার ভিত্তি আর প্রহরার কাঠামো বলে দেয় প্রতিরক্ষার গল্প। এখানে দাঁড়িয়ে নিকিতা ধীরে বলে-সব ক্ষমতারই একদিন অবসান হয়, কিন্তু স্মৃতি থাকে।

হোনমারু প্রাসাদ ও নয়নাভিরাম বাগান

এরপর আমরা এগোলাম হোনমারু প্রাসাদের (Honmaru Palace) দিকে। যদিও এটি মূল দুর্গের ভেতরের অংশ, কিন্তু এর রাজকীয় ভাব গাম্ভীর্য এখনো অম্লান। এর চারপাশে থাকা বাগানটি যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। নিকিতা জানাল, এই বাগানের নকশা করা হয়েছে এমনভাবে যাতে কোনো ঋতুতেই এর সৌন্দর্য ফিকে না হয়। পুকুরের জলে মাছের খেলা দেখতে দেখতে নিকিতা হঠাৎ করেই বলে উঠলো, ‘জীবনটাও কি এই বাগানের মতো নয়? কখনো পাতা ঝরে যায়, আবার কখনো নতুন কুঁড়ি গজায়।’

বিকেলের আলো ফিকে হয়ে এলে আমরা বেরিয়ে আসি ক‍্যাসেল থেকে। খালের জলে নিযো ক্যাসেলের ছায়া কাঁপে। নিকিতা বলে, আজ তুমি শুধু একটি দুর্গ দেখোনি-একটা যুগ ছুঁয়ে এলে। আমি হাসি। কিয়োটোর পথে হাঁটতে হাঁটতে বুঝি-ভ্রমণ মানে কেবল জায়গা বদল নয়, সময়ের সঙ্গে একটু কথা বলা।

টেম্পোজান হারবার ভিলেজ, ওসাকা

ওসাকার মানচিত্রে টেম্পোজান হারবার ভিলেজ খুব বড় কোনো জায়গা নয়। ইতিহাসের ভার এখানে তেমন নেই, প্রাচীন মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনিও শোনা যায় না। তবু এই জায়গাটার একটা আলাদা ভাষা আছে-সে ভাষা কথা বলে জল, আলো আর নীরবতার মাধ্যমে। সেদিন বিকেলে আমরা ওসাকা-কো স্টেশন থেকে বের হলাম।। নিকিতা হালকা করে শ্বাস নিয়ে বললো-‘এই জায়গাটা শহরের ক্লান্তি নামিয়ে রাখার জন্য।’ ওসাকা উপসাগরের জল তখন শান্ত। ঢেউ নেই বললেই চলে-শুধু আলো ভাঙছে জলের গায়ে। বন্দরে নোঙর করা জাহাজগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারাও বুঝি কোথাও যাওয়ার তাড়া অনুভব করছে না। আমি রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালাম। নিকিতা পাশে এসে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কিছু বলল না। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে বললো-‘ভ্রমণে কিছু জায়গা থাকে, যেগুলো ছবি তোলার জন্য নয়, মনে রাখার জন্য।’

আমরা টেম্পোজানের ফেরিস হুইলে উঠলাম। হুইল ধীরে ঘুরতে থাকে-তাড়াহীন, প্রদর্শনহীন। কেবিনে উঠে যখন উপরের দিকে উঠছি, ওসাকাকে আস্তে আস্তে ছোট হতে দেখলাম। আলো, রাস্তা, মানুষ-সব মিলিয়ে নিচে একটা জীবন্ত মানচিত্র। উপরে বাতাস ঠান্ডা। কেবিনের কাঁচে শহরের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে। নিকিতা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল- ‘উচ্চতা মানুষকে বড় করে না, মানুষকে চুপ করায়।’ আমি বুঝলাম, এই নীরবতাই হয়তো টেম্পোজানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

নেমে এসে হারবার ভিলেজের আলোয় হাঁটতে লাগলাম। বাজারের ভেতর রেস্টুরেন্ট, দোকান, মানুষের চলাচল-সবই আছে, কিন্তু কোথাও অস্থিরতা নেই। সাগরের হাওয়া সব কিছুকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। আমরা জানালার ধারে একটা ছোট রেস্টুরেন্টে বসি। বাইরে জল, ভেতরে উষ্ণ আলো। খাবারের গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকে সাগরের লবণাক্ত বাতাস।

নিকিতা ধীরে বললো-‘ভ্রমণ শেষে মানুষ জায়গা ভুলে যায়, কিন্তু অনুভূতি ভুলে না।’ নিকিতা বলে, রাত নামলে টেম্পোজান অন্য রূপ নেয়। ফেরিস হুইলের আলো জ্বলে ওঠে, বন্দরের বাতিগুলো জলে ছায়া ফেলে। ফেরার আগে শেষবারের মতো পেছনে তাকালাম। নিকিতা পাশে দাঁড়িয়ে শুধু বললো-‘এই জায়গাটা মনে থাকবে।’ আমি জানতাম, সে ঠিকই বলেছে।

ওসাকার রাত

ওসাকা দিনে যতটা কর্মব্যস্ত, রাতে ততটাই উজ্জ্বল। এখানে রাত মানে বিশ্রাম নয়-রাত মানে আলো জ্বলে ওঠা, মানুষ বেরিয়ে আসা, আর শহরের নিজের মতো করে কথা বলা। টেম্পোজান থেকে ফেরার পর বুঝলাম, ওসাকাকে বুঝতে হলে তার রাতটা দেখা জরুরি। নাম্বার দিকে হাঁটতে হাঁটতে চারপাশে নীয়ন আলো জ্বলে উঠছে। সাইনবোর্ড, দোকানের কাচ, রাস্তার ভেজা পিচ-সবকিছুতেই আলো ভাঙছে। নিকিতা পাশে হাঁটছে, কোলাহলের মাঝেও অদ্ভুতভাবে শান্ত। সে বললো, ‘ওসাকা শব্দ ভালোবাসে, কিন্তু শব্দে হারায় না।’ দোতোনবরি নদীর ধারে এসে দাঁড়াতেই মনে হলো শহরটা একটু জোরে শ্বাস নিচ্ছে। বিশাল গ্লিকো ম্যানের আলো, খাবারের দোকান থেকে ভেসে আসা গন্ধ, মানুষের হাসি-সব মিলিয়ে এক ধরনের উৎসব।

আমি বললাম, ‘এখানে কেউ একা থাকে না।’ নিকিতা হেসে উত্তর দিলো-‘এখানে মানুষ একা এলে শহর তাকে সঙ্গ দেয়।’ নদীর জলে আলো ভেঙে পড়ছে। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকলাম। এই শহরে নীরবতা খুঁজতে গেলে ঠিক এমন জায়গাতেই খুঁজে পাওয়া যায়-কোলাহলের মাঝখানে। ওসাকাকে বলা হয় ‘জাপানের রান্নাঘর’। রাতে সেটা আরো সত্যি। তাকোইয়াকির গরম ধোঁয়া, ওকোনোমিয়াকির ঝাঁঝালো গন্ধ-সবকিছুই মানুষকে টানে। আমরা একটা ছোট দোকানে দাঁড়িয়ে তাকোইয়াকি নিলাম।

নিকিতা গরম বলটা সাবধানে ধরে বললো-‘ওসাকায় খাবারও কথা বলে।’ গরম, সহজ, আন্তরিক-ওসাকার খাবারের মতোই শহরটা। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা শিনসাইবাশির দিকে হাঁটতে থাকি। দোকানগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হচ্ছে, কিন্তু শহরের আলো এখনো ক্লান্ত হয়নি। জানালার কাচে আমাদের ছায়া পড়ছে-দুইজন পথচলা মানুষ, একই রাতের ভেতর। হোটেলে ফেরার পথে রাস্তা একটু ফাঁকা। আলো কম, শব্দ কম। দিনের ও রাতের ওসাকা-দুটো আলাদা, তবু একে অন্যের পরিপূরক।

লিফটে উঠবার আগে নিকিতা থেমে বললো, ‘ভ্রমণে কিছু রাত থাকে, যেগুলো ঘুমানোর জন্য নয়, মনে রাখার জন্য।’ আমি জানতাম, ওসাকার এই রাত ঠিক তেমনই এক রাত।

শেষদিনের ট্রেন

আমি জাপান ছেড়ে যাচ্ছি। তবে কবে কখন এই কথাটা নিকিতার সামনে এখনো স্পষ্ট করে বলিনি। তবু সে জানে। আমার সময় হয়েছে ফেরার। কিছু কথা উচ্চারণ না করলেও চোখে, থেমে যাওয়া নিঃশ্বাসে, চুপ করে থাকা সময়ের ফাঁকে ফাঁকে সব বলা হয়ে যায়। আজ আমাদের অফিসিয়াল কোন ট্যুর প্রোগ্রাম ছিল না। নিকিতাকে নিয়ে বের হয়েছি একটু অলস সময় কাটাতে। বলা যায় উদ্দেশ্যবিহীন ঘোরাঘুরি। টোকিওর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমরা দু’জন। ট্রেন ছাড়তেই টোকিও পিছিয়ে যেতে থাকে। জানালার বাইরে শহর, সেতু, নদী, সবকিছু দ্রুত পাল্টে যায়ম কিন্তু নিকিতা পাশের সিটে বসে একদৃষ্টে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকায়, আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়।

আমরা কথা বলছিলাম, খুব সাধারণ কথা। কোথায় আগে গিয়েছিলাম, কোন ক্যাফেতে কফি ভালো, কোন জায়গায় ও বেশি হেসেছিলইত্যাদি। নিকিতা হেসেছিল। আমি সেই হাসিটা বুকের ভেতর তুলে রেখেছিলাম পরের দিনগুলোর জন্য। ট্রেনের কাচে আমাদের দুজনের প্রতিচ্ছবি একসঙ্গে ভেসে উঠছিল। আমি ভাবছিলাম, এই কাচের মতো যদি সময়টাকেও ধরে রাখা যেত! নিকিতা আমাকে নিয়ে নামলো কারুইজাওয়াতা নামক একটি স্টেশনে। পাহাড়ি হাওয়ার মধ্যে একধরনের নরম বিষণ্নতা থাকে। স্টেশন থেকে একটু হাঁটতেই ছোট একটা ক্যাফে-কাঠের দরজা, ভেতরে কফির গন্ধ আর ধীরে বাজতে থাকা জাপানি জ্যাজ। নিকিতা কফির কাপটা দুই হাতে ধরে বসে থাকে।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে ভাবি-কত জায়গায় আমরা একসঙ্গে গেছি; টোকিওর আলো, নারার হরিণ, ওকুতামার নদী, কামাকুরার মন্দিরের সিঁড়ি-সব জায়গায় ও ছিল গল্পের ভেতরের চরিত্র নয়, গল্পটাই ছিল। দুপুরের খাবারে আমরা খুব বেশি কথা বলি না। ও মাঝেমধ্যে হাসে, আবার হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। আমি বুঝতে পারি-এই চুপ করাটাই ওর বলা সবচেয়ে বড় কথা। বিকেলে ক্যাফের বাইরে বসে আমরা আড্ডা দিই। কিছু পুরোনো স্মৃতি, কিছু হাসি, কিছু না বলা ভবিষ্যৎ। নিকিতা হঠাৎ বলে, তুমি আবার আসবে তো?

আমি উত্তর দিতে দেরি করি। কারণ জানি, আমার হ্যাঁ-এর ভেতরে অনিশ্চয়তা আছে, আর আমার না-এর ভেতরে নিষ্ঠুরতা। সন্ধ্যায় ফেরার ট্রেনে আমরা পাশাপাশি বসে থাকি। শিনকানসেন আবার ছুটে চলে, এবার যেন সময়টাই আমাদের বিপরীতে দৌড়ায়। নিকিতা ঘুমানোর ভান করে, মাথা জানালার দিকে হেলিয়ে। আমি দেখি, জানালার কাচে ওর চোখের কোণে জমে থাকা আলো, যেটা হয়তো অশ্রু, হয়তো বিদায়ের প্রতিফলন। টোকিও স্টেশনে নামার সময় নিকিতা আমার হাত ধরেছিল। এই প্রথম, এই শেষবার। খুব শক্ত করে নয়, যেন ছেড়ে দেওয়ার জন্যই ধরেছিল। ও বললো না ‘থেকে যাও।’ আমি বলিনি- ‘ফিরে আসবো।’ কিন্তু আমরা দুজনেই জানতাম, মিথ্যে আশ্বাসের চেয়ে নীরবতাই বেশি মানবিক।

আমি হাঁটা শুরু করেছিলাম। পিছনে তাকাইনি। কারণ তাকালে হয়তো দেখতাম, নিকিতা দাঁড়িয়ে আছে, আর আমার দিকে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। আর সেই দৃশ্যটা সারাজীবন বুকে নিয়ে বাঁচতে হবে। আমি জানি, কাল জাপান ছেড়ে চলে যাবো। কিন্তু শিনকানসেনের জানালায়, কারুইজাওয়ার কফির কাপে আর নিকিতার নীরব চোখে আমি থেকে যাবো চিরকাল।

জাপানের শেষ সন্ধ্যা

জাপানে প্রায় তিন সপ্তাহের যাত্রা-কত শহর, কত পথ, কত দৃশ্য। টোকিওর ঝলমলে রাত, কিয়োটোর মন্দিরের নীরবতা, হিরোশিমার আকাশে ভাসা অব্যক্ত বিষাদ, নারার শান্ত হরিণেরা, মাউন্ট ফুজির সাদা-মেঘ-ঢাকা চূড়া, লেক আশির জলের প্রতিচ্ছবি-সবকিছুর মাঝেই একটিই ছায়া ছিল আমার পাশে, নিকিতা। স্থানীয় ট্যুর গাইড, কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই হয়ে উঠেছিল আমার যাত্রার নীরব সঙ্গী। নিকিতা কখনো সামনে হাঁটতো, কখনো পাশে। কখনো পথ দেখাতো, কখনো স্রেফ আমার নিঃশ্বাসের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতো। সামুরাই ভিলেজের কাঠের পথ থেকে শুরু করে জাপানিজ আল্পসের বরফ-ছোঁয়া ঢাল-সব জায়গাতেই তার উপস্থিতি ছিল নরম, অদৃশ্য, অথচ স্পষ্ট।

আজ সেই শেষদিন। ফিরে যাওয়ার আগের সন্ধ্যা। টোকিওর একটি ছোট ক্যাফের কোণে বসেছি দু’জন। জানালার বাইরে ম্লান আলো, ভেতরে কফির মিষ্টি গন্ধ। আমাদের দু’জনের চোখেই ক্লান্তি নয়, ছিল এক ধরনের নীরব ব্যথা। নিকিতা কাপ ধরে বসে আছে। তার আঙুলের কাছে ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে। আমি বললাম, এই কটা দিন তুমি তো ছায়ার মতো ছিলে আমার পাশে। সে একটু হাসলো-একটু ভাঙা হাসি, যা চোখ পর্যন্ত পৌঁছায়নি। তোমার যাত্রা সুন্দর হোক, এটাই আমার কাজ, সে বলল। কিন্তু কণ্ঠে কাজের পেশাদারিত্ব ছিল না- ছিল এক অদ্ভুত কাঁপুনি।

দু’জনই চুপ। ক্যাফের টেবিলের ওপর রাখা দু’টি কফির কাপের চেয়েও বেশি বাষ্প যেন উঠছিল আমাদের বুকের ভেতর থেকে। মনে পড়ে যাচ্ছিল, ফুশিমি ইনারীর লাল টোরি গেটের নিচে হাঁটা সেই বিকেল-মাউন্ট মিতাকের চূড়ায় নিকিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া, শিরাকাওয়া-গোর তুষার ভেজা কুঁড়েঘরগুলোর সামনে তার নীরব দৃষ্টি-গোতেমবার ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে তার বলা সেই ছোট বাক্য-Japan feels different when someone sees it the way you do. জাপানিজ আল্পসে হাঁটতে হাঁটতে সে আমার হাত ধরে বলেছিল, Careful, the snow is slippery. এই যত্নমাখা শব্দগুলো এখনো আমার কানে বাজে। এখন সেই মানুষটাই আমার সামনে বসে, আর আমার ভেতরে জমছে বিদায়ের শীতলতা। আমি বললাম, আবার দেখা হবে, হয়তো? নিকিতা একটু চুপ করে থেকে বললো, হয়তো হবে. হয়তো হবে না। কিছু মানুষ শুধু যাত্রার একটা অংশ হয়ে থাকে। তারা পুরো গল্প হয় না, কিন্তু কখনো কখনো জীবনের গল্পটাকেই বদলে দেয়। আমরা দু’জনই জানি-সময়ের নদী কারো জন্য থেমে থাকে না। কিছু বন্ধুত্ব, কিছু অনুভূতি-শুরু হয় ঠিক যখন শেষের সময়টা কাছে এসে দাঁড়ায়। ক্যাফের ভেতর স্নিগ্ধ আলো। কফির সুগন্ধ যেন ঘরের ভেতরটাকে আরো নরম করে তুলেছে। আমাদের কথা কমে গেছে। কিন্তু নীরবতাই যেন অনেক না বলা কথা বলে যাচ্ছে। আমি নীরবতা ভেঙে বললাম, নিকিতা-তুমি ছিলে আমার যাত্রার সবচেয়ে সুন্দর অংশ। সে কিছু বললো না।

ক্যাফের মৃদু আলোয় জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি হচ্ছে। টোকিওর উজ্জল আলোভিজে উঠছে সন্ধ্যার নরম বৃষ্টিতে। দু’জনের সামনে দু’টি কফির কাপ-কিন্তু আমাদের চোখের সামনে কেবলই স্মৃতির দৃশ্যগুলো নড়াচড়া করছে। অনেকক্ষণ পর নিকিতা নীরবতা ভেঙে বললো, তুমি এলে এ দেশটা আমার কাছে নতুন হয়ে উঠলো। তোমার চোখ দিয়ে আমি আবার জাপানকে দেখলাম।

আমি উত্তরে কিছুই বলতে পারলাম না। একটা বেদনাবিধুর কিন্তু উষ্ণ নীরবতা যেন ঘিরে ধরলো আমাকে। কফির কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। নিকিতা আমার পাশে এসে থামল। মৃদুকণ্ঠে বললো, এই বিদায়টাই হয়তো আমাদের গল্পের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে বেদনাময় অধ্যায়। তারপর অনুচ্চ কণ্ঠে বললো-Some roads never cross twice....But some memories keep waking with you.

Safe journey… and thank you.

তার কণ্ঠে যেন হাজার অনুচ্চারিত কথা জমে ছিল।

ক্যাফের বাইরে তখন বৃষ্টি আরো জোরে নেমে আসছে। টোকিওর সড়কে আলো গলে যাচ্ছে জলের রঙে। আর কোন কথা না বলে নিকিতা তার ছোট্ট গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। বৃষ্টি থামলে আমিও হাঁটতে শুরু করলাম। মনে হচ্ছিলো টোকিওর কোনো রাস্তায়, কিয়োটোর কোনো গলিতে বা মাউন্ট ফুজির কোনো মেঘের আড়ালে নিকিতা এখনও আমার সঙ্গে হাঁটছে। জাপানে এসে তার সঙ্গে সময় কাটানোটা ছিল আমার এক সুন্দর অভিজ্ঞতা। কিন্তু আজকের এই বিদায় মুহূর্তটা ছিল আরো বেশি মর্মস্পর্শী, আরো বেশি দুঃখ আর বেদনার।

আমি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াই। কত মানুষের সঙ্গে দেখা-পরিচয় হয়। কত ট্যুর গাইডের সেবা নিই। কিন্তু প্রতিটি ভ্রমণের শেষে কিছু মানুষ চলে যায় না-তারা রয়ে যায় হৃদয়ের গহীনে ঠিক সেই ছায়ার মতো, যাকে আর কখনও ছুঁতে না পারলেও ভুলে থাকা যায় না।

সায়েনারা জাপান, বিদায় নিকিতা

টোকিওর আকাশে তখন সন্ধ্যার নরম আলো। শহরের বাতাসে অদ্ভুত এক বিষন্নতা। যেন পুরো নগরী হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে আমাকে বিদায় জানাতে। আমি আজ ফিরে যাচ্ছি নিউইয়র্কে। গাড়ি ছুটে চলেছে হানেদা এয়ারপোর্টের দিকে। জানালার বাইরে আলো জ্বলা শুরু করেছে। রাস্তাগুলো ঝলমল করছে, তবু মনে হচ্ছে পৃথিবীটা নিস্তব্ধ হয়ে আছে। পাশে বসে আছে নিকিতা। আমাকে বিদায় জানাতে সেও চলেছে এয়ারপোর্টে।

জাপান ভ্রমনের পথচলার প্রতিটি মুহূর্তের সে ছিল নীরব সাক্ষী। কিন্তু আজ সে আমার পাশে থেকেও যেন দূরে। কারণ আমরা দুজনেই জানি, আজকের যাত্রা অন্য যাত্রার মতো নয়, আজ আমি ফিরে যাচ্ছি নিউইয়র্ক, পেছনে রেখে যাচ্ছি জাপানকে, আর সঙ্গে নিকিতাকেও। গাড়ির ভেতরে আমরা চুপচাপ। শুধু দু’জনের শ্বাস-প্রশ্বাসের ভারী ছন্দ। নিকিতার দিকে চেয়ে দেখছিলাম হালকা কমলা আলো তার মুখে পড়ে যেন এক ধরনের বিষণ্ন সৌন্দর্য সৃষ্টি করছিল। গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। টোকিওর স্কাইস্ক্র্যাপারগুলো ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে, দূরে সরে যাচ্ছে সেই শহর, যেখানে আমরা একসঙ্গে হেসেছি, ঘুরেছি, গল্প করেছি।

নিকিতা নীরবতা ভেঙে বললো-রাতের ফ্লাইটগুলো খুব লোনলি হয়, তাই না! তার কণ্ঠে এমন এক কাঁপুনি ছিল, যা আমায় ভিতর পর্যন্ত নাড়িয়ে দিলো। আমি তার দিকে তাকালাম। ম্লান আলোয় তার চোখ কেমন চকচক করছিল, হয়তো আলো, হয়তো অশ্রু। আমি নরম স্বরে বললাম, তোমাকে রেখে রাতের আকাশে উড়ে যাওয়াটা- খুব কঠিন লাগছে। নিকিতা হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু সেই হাসি পুরোটা পৌঁছতে পারল না তার চোখে।

গাড়ি ধীরে ধীরে হানেদার দিকে মোড় নিল। চোখে পড়ছিল এয়ারপোর্টের আলো দূর থেকে জ্বলজ্বল করছে। গাড়ি থামার পরে আমরা নামলাম। রাতের ঠান্ডা বাতাস শরীরে কাপন ধরিয়ে দিচ্ছিলো। আমি স্যুটকেস নামিয়ে নিকিতার দিকে তাকালাম। এই প্রথম সে সরাসরি আমার চোখে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল অসহায়তা, আকুলতা, আর না বলা হাজার কথা।

তুমি গেলে-টোকিও আমার কাছে খুব ভাল লাগবে না- ‘নিকিতা ফিসফিস করে বললো। তার চোখ ভিজে উঠলো। মনে হলো, রাতের আলোয় এক ফোঁটা অশ্রু যেন চিকচিক করে উঠলো। দূরে লাউড স্পিকারে বোর্ডিং টাইমের ঘোষণা শোনা গেল। আমার বুকের ভেতরটা টনটন করে উঠলো। নিকিতা এগিয়ে এসে খুব ধীরে, প্রায় শ্বাসের মতো নরম স্বরে বললো, Its not a goodbye, See you again.

আমি মাথা নেড়ে বললাম-না, গুড বাই নয়। তুমি তো আমার জাপান ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি। আর স্মৃতিগুলো কখনো জীবন থেকে মুছে যাবে না, বিদায় নেবে না কখনো। আমি হেঁটে যেতে লাগলাম গেটের দিকে। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ভারী হয়ে যাচ্ছিল। একবার পিছনে তাকালাম। দেখলাম নিকিতা দাঁড়িয়ে আছে ঠিক আগের সেই জায়গায়। রাতের বাতাসে তার চুল উড়ছে, এয়ারপোর্টের উজ্জ্বল নিয়ন আলোয় তার চোখ মুখ চিকচিক করছে। মনে মনে ভাবছিলাম, জাপান শুধু একটা দেশ নয়, নিকিতা শুধু একজন গাইড নয়, বরং এমন এক অনুভূতি- যাকে রেখে যাওয়া যায়, কিন্তু ভুলে থাকা যায় না।

শেয়ার করুন