ইয়ামানাকা লেকের পাড়ে লেখক
আমি ট্যুর গাইড নিকিতাকে বললাম-আজ কোনো মিউজিয়াম বা কোনো ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন নয়। আজ টোকিওর স্ট্রিট ফুড খেতে চাই। হালাল হলে ভালো, না হলে ভেজিটেরিয়ান বা অন্যকিছু। তুমি তোমার পছন্দমতো খাবে। নিকিতা একটু ভেবে বললো-তাহলে সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। টোকিওর স্ট্রিট ফুড দিনের আলোতে নয়, আলো জ্বলার পরই কথা বলে।
সন্ধ্যা নামতেই আমরা ঢুকে পড়লাম শিনজুকুশিবুয়ার মাঝামাঝি এক গলিতে। রাস্তার দুপাশে ছোট ছোট ইয়াতাই-অস্থায়ী খাবারের দোকান। লাল কাগজের লণ্ঠন, কাঠের কাউন্টার, ধোঁয়া ওঠা গ্রিল। বাতাসে সয়া সস, আদা আর ভাজা তিলের গন্ধ। টোকিও তখন আর ব্যস্ত মহানগর নয়-সে এক বিশাল রান্নাঘর।
প্রথমেই নিকিতা থামলো এক ছোট্ট স্টলের সামনে। এখানে ভেজিটেরিয়ান ইয়াকিসোবা আছে। নিশ্চিন্তে খেতে পারবে-বললো সে। গরম লোহার চুলায় নুডুলস ছটফট করছে, সয়াসসের ঘ্রাণে চারপাশ ভরে উঠছে। হাত বাড়িয়ে খাবার নিলাম। প্রথম কামড়েই বুঝলাম-টোকিওর স্বাদ শুধু জিভে নয়, হৃদয়েও ছোঁয়া দেয়। আরো একটু এগোতেই হালাল-ফ্রেন্ডলি এক স্টল। চিকেন স্কিউয়ার, আলাদা গ্রিলে রান্না। বিক্রেতা ভাঙা ইংরেজিতে বোঝাল সব। নিকিতা নিজের জন্য নিল তাকোয়াকি-গরম, আর গোল বল, ভেতরে নরম, ওপরে মায়োনিজ আর বনিতো ফ্লেক্স নড়ছে বাতাসে।
আমার দিকে তাকিয়ে নিকিতা বললো-ফাস্ট ফুডে শহরের আসল চরিত্রটা ধরা পড়ে। শহরের সত্যিকারের মুখটা দেখা যায়। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাচ্ছিলাম। কোনো টেবিল নেই, কোনো চেয়ার নেই। তবু অস্বস্তি নেই। পাশে অফিস-ফেরত মানুষ, পর্যটক, অচেনা মুখ। আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে-লণ্ঠনের আলো আর চাঁদের আলো মিলে পুরো গলিটাকে রূপকথার মতো করে তুলেছে।
পরের গলিতে পেলাম হালাল-ফ্রেন্ডলি চিকেন স্কিউয়ারের স্টল। আলাদা গ্রিল, আলাদা তেল। নিকিতা নিজেই বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত করল। আরেক স্টলে ছিল দোরায়াকি, লাল বিনের পেস্ট ভর্তি মিষ্টি প্যানকেক। আমরা ভাগ করে খেলাম। মিষ্টির সঙ্গে সন্ধ্যাটা আরও নরম হয়ে উঠলো।
আমি চুপ করে তাকিয়ে ছিলাম। তুমি এমন করে দেখছো কেন? নিকিতা জিজ্ঞেস করলো। আমি বললাম-কারণ কেউ যদি ভ্রমণে এত যত্ন নেয়, সেটা মনে থাকে। সে কিছু বললো না। শুধু তাকিয়ে রইলো-টোকিওর আলো তার চোখে ভেঙে পড়ছিল।
আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে-লণ্ঠনের আলো আর চাঁদের আলো মিশে রাস্তা যেন রূপকথা। হাঁটতে হাঁটতে স্ট্রিট ফুডের গলিটা শেষ হলো। কিন্তু ভেতরে জমে রইল স্বাদ, গন্ধ আর কিছু না বলা কথা।ফিরতি পথে আমি বুঝলাম-টোকিওর স্ট্রিট ফুড শুধু খাবার নয়। এটা এক ধরনের অনুভূতি।
ফিরতি পথে চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনে হলো-এই সন্ধ্যায় আমরা শুধু স্ট্রিট ফুড খাইনি। আমরা টোকিওকে অনুভব করেছি-আলোয়, স্বাদে, আর নিকিতার সঙ্গে ভাগ করা এক নিঃশব্দ মুহূর্ত। আর সেই মুহূর্তটাই হয়ে রইল। টোকিওর সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি। হঠাৎ করে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো। নিকিতা বল্লো, টোকিওতে বৃষ্টি এমনইি আসে-কোনো ঘোষণা ছাড়াই। স্ট্রিট ফুডের গলি পেছনে ফেলে আমরা যখন মূল রাস্তায় উঠলাম, তখন আকাশের আলো বদলে গেছে। নিয়ন সাইনবোর্ডগুলো ভিজে রাস্তায় দ্বিগুণ হয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। ফুটপাথে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, মানুষের তাড়াহুড়া, ছাতার সারি-সব মিলিয়ে শহরটা যেন আরও নীরব হয়ে উঠলো।
নিকিতা থামলো। ব্যাগ থেকে একটা ছাতা বের করলো। ছাতার নিচে জায়গা খুব বেশি ছিল না। তবু আমরা দু’জন ঠিকমতো ঢুকে গেলাম। বৃষ্টি তখন শুধু আকাশ থেকে নামছে না-শহরের সব শব্দ ধুয়ে নিচ্ছে।
আমি বললাম-বৃষ্টিতে টোকিওকে আলাদা লাগে। নিকিতা ধীরে হাঁটতে হাঁটতে উত্তর দিল-বৃষ্টিতে শহরটা নিজের আসল রঙ দেখায়। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় স্ট্রিট ফুডের গলিটা পেছনে পড়ে রইলো। আলো ধীরে ধীরে স্লান, ভিড় পাতলা। শুধু আমাদের পায়ের শব্দ আর দূরের ট্রেনের হালকা গুঞ্জন। টোকিওর আকাশের দিকে তাকালাম। চাঁদ তখনো সেখানে-নীরব, স্থির।
কিয়েটোর কিয়োমিজু-দেরা
সকালের হালকা রোদে আমি টোকিও স্টেশনে পৌঁছলাম। গাইড নিকিতা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমরা বুলেট ট্রেনে চেপে ডশয়োটোর উদ্দেশে রওনা দিলাম। ট্রেনের নরম কম্পনের সঙ্গে আমাদের হাসি আর কথাবার্তা মিলেমিশে যেন আনন্দের সুর তুলছিল।
প্রায় দুই ঘণ্টার ট্রেনযাত্রার পর কিয়োটো পৌঁছলাম। কিয়োটোর পুরোনো শহরটা সকালবেলায় যেন আরো নীরব মনে হচ্ছিল। হিগাশিয়ামার ঢালু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল-এ পথ শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইতিহাস নিজেই এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছে। হঠাৎ করেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো Kiyomizu-dera Temple-কিয়োটোর সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রাচীন বৌদ্ধমন্দিরগুলোর একটি। অষ্টম শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির শুধু ধর্মীয় আস্থার প্রতীক নয়, জাপানি স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। ১৯৯৪ সালে এটি UNESCO World Heritage Site হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, আর সেই স্বীকৃতির ওজন অনুভব করা যায় মন্দির প্রাঙ্গণে পা রাখার সঙ্গেসঙ্গেই। নিকিতা জানায় মন্দিরের মূল আকর্ষণ তার বিশাল কাঠের মঞ্চ, যা পাহাড়ের ঢালে ঝুলে আছে অথচ একটিও লোহার পেরেক ব্যবহার করা হয়নি। নিচে তাকালে দেখা যায় সবুজ বন আর দূরে কিয়োটো শহর। এখানে দাঁড়ালে মনে হবে শহরটা আমাদের নিচে শুয়ে আছে।
এই মঞ্চ থেকেই এসেছে জাপানের বিখ্যাত প্রবাদ ‘Kiyomizu no butai kara tobi oriru’, অর্থাৎ জীবনে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস। একসময় মানুষ সত্যিই এখান থেকে লাফ দিত, বিশ্বাস ছিল বেঁচে গেলে ইচ্ছা পূরণ হবে। এখন আর কেউ লাফ দেয় না, কিন্তু সাহসের সেই প্রতীকটা রয়ে গেছে।
মন্দিরের ভেতরটা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। প্রতিটি প্রাচীন চিত্র, কাঠের খোদাই, লণ্ঠন-সবকিছু যেন অতীতের কথা বলছে। নিকিতা বললো, আগে সাহসী মানুষ কিয়োমিজুর প্ল্যাটফর্ম থেকে লাফ দেয়। তুমি পারবেতো? আমি হেসে উত্তর দিই-তোমাকে আমি সঙ্গী হারা করতে চাইনা।
নিকিতা হাসে। দুপুরে আমরা কিয়েটোর একটি ঐতিহ্যবাহী কাফেতে বসে সুশি আর হরিয়ার মতো স্থানীয় খাবার উপভোগ করলাম। মন্দিরের নিচে রয়েছে Otowa ঝরনা। তিন ধারায় নেমে আসা এই জলকে পবিত্র মনে করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই জল পান করলে স্বাস্থ্য, সাফল্য ও দীর্ঘায়ু লাভ হয়। নিকিতা জানায় তিনটি পৃথক প্রবাহে পানি পড়ে-প্রত্যেকটির একটি আলাদা অর্থ। সে এক চুমুক জল নিয়ে হেসে বলল, “তিনটার মধ্যে একটাই নেওয়া যায়-লোভ করলে নাকি কাজ হয় না।
আমি জীবনের সৌভাগ্য কামনা করে পানি নিলাম, নিকিতা স্বাস্থ্য কামনা করলো। তারপর আমরা একত্রে জল চুমুক দিলাম। চারপাশে পর্যটক, ক্যামেরার ক্লিক, প্রার্থনার শব্দ। নিকিতা বলে, বসন্তে চেরি ফুল আর শরতে লাল পাতার সৌন্দর্যে কিয়োমিজুদেরা আরো মোহময় হয়ে ওঠে। এটি শুধু দেখার জায়গা নয়, অনুভব করারও স্থান। পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নামতে নামতে আমাদের চোখে পড়লো মন্দিরের বিশাল কাঠের ওহান্না প্ল্যাটফর্ম। এর নির্মাণশৈলী আমাদের মুহূর্তে অতীতের জাপানে নিয়ে গেল। আমরা ধীরে ধীরে উপরে উঠলাম। প্ল্যাটফর্ম থেকে কিয়োটো শহরের দৃশ্য যেন এক জীবন্ত চিত্রকলা। আমরা Gion-এর ঐতিহ্যবাহী রাস্তায় হাঁটলাম, যেখানে পুরোনো কাঠের বাড়ি, চায়ের ঘর এবং গেইশার ছায়া চোখে পড়ে।
বিকালে আমরা আবার Kiyomizu-Dera-তে ফিরে এলাম। এবার মন্দিরের আলো জ্বলে উঠেছে এবং সূর্যাস্তের সঙ্গে মন্দিরের আলোর রঙ মিশে যেন স্বপ্নের আভা তৈরি করছে। শহরের আলোতে আমাদের ছায়া দীর্ঘ হয়ে গেছে। সন্ধ্যার ট্রেন ধরেই আমরা টোকিওর পথে রওনা হলাম।
টাটিয়ামা কোরোবি আলপাইন রোড ও টোয়ামা
(Tateyama Kurobe Alpine Route I Toyama)
ভোরের টোকিও তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। ToKzo Station-এর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে নিকিতা আর আমি। যাচ্ছি Tateyama. হালকা হাসি দিয়ে নিকিতা বল্লো, আজ পাহাড় আমাদের ডাকছে, তুমি কি শুনতে পাচ্ছো? আমি বললাম-পাহাড় নয়, আজ তুমি আমাকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছ ওখানে। সে হাসলো।
Hokuriku Shinkansen ছুটে চলে Toyama-এর দিকে। জানালার বাইরে শহর ধীরে ধীরে গ্রাম, তারপর পাহাড়ে রূপ নেয়। প্রায় ২ ঘণ্টা ১০ মিনিটে আমরা পৌঁছে যাই Toyama-জাপানের আল্পসের প্রবেশদ্বার। একটি শান্ত শহর, যার চারপাশে পাহাড় আর বাতাসে লবণের গন্ধ। Toyama থেকে লোকাল ট্রেনে Tateyama Station। নিকিতা উচ্ছ্বাস নিয়ে বললো, এখান থেকেই শুরু সেই বিখ্যাত আলপাইন রুট-একটি নয়, একসঙ্গে ৬ ধরনের বিভিন্ন পরিবহনে উঠবো। দারুণ রোমাঞ্চ হবে। এগুলোর মধ্যে আছে ক্যাবল কার, হাইল্যান্ড বাস, স্নো ওয়াল ওয়াক, রোপওয়ে এবং ট্রলি বাস। এই ভ্রমণটা তুমি দারুণ উপভোগ করবে।
নিকিতা বলে, এখান থেকেই শুরু হয় সেই কিংবদন্তির মতো পথ-এটি শুধু রাস্তা নয় বরং প্রকৃতির ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাওয়া এক অভিজ্ঞতা। কেবল কারে উঠতেই নিকিতা ফিসফিস করে বলে-
আমি তো গাইড। সারাক্ষণ বকবক করতে না পারলে দম বন্ধ হয়ে আসে। এত উঁচুতে উঠে গেলে যদি কথা বলতে না পারি? আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলি-কথা বলতে হবে না। তুমি পাশে থাকলেই হবে। এরপর নিকিতা আমাকে নিয়ে গেলো একটি ওয়ালের কাছে। বলে, এখন বরফ পড়ার সময় নয় তাই দেখাতে পারছি না। এপ্রিল থেকে জুন-এ সময় Tateyama যেন বরফের রাজ্য।
দুপাশে ১৫-২০ মিটার উঁচু সাদা দেওয়াল।
এরপর আমরা গেলাম জাপানের সবচেয়ে বড় বাঁধ Kurobe Dam দেখতে। Dam এর কাছে কানে এলো জলের গর্জন, দেখলাম পাহাড়ের বুক চিরে নামা শক্তি। নিকিতা অনেকক্ষণ কিছু বলেনি। এবার হেসে বললো-ভালোবাসা যদি কখনো শব্দ করে, তাহলে এমনিভাবেই করে। আমি কিছু বললাম না। কারণ সব কথার জবাব দিতে নেই। আমরা ড্যামের পাশের ক্যাফেতে হালকা লাঞ্চ করে সামনে অগোই। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য Toyama Castle Park।
এটি শহরের মাঝখানে সবুজে ঘেরা একটি পার্ক। রোববারের বিকাল। মানুষ কম কিন্তু পাখির ডাক বেশি। কফির কাপ হাতে পার্কের মধ্য দিয়ে হালকা হাঁটা আর গল্পের মধ্য দিয়ে পার্ক ভ্রমণ শেষ করি। এরপর আমরা গেলাম Toyama Glass Art Museum দেখতে। আধুনিক স্থাপত্যে তৈরি Glass Art Museum-শিল্প আর আলোয় ভরা। আলো আর কাচের খেলায় চোখ জুড়িয়ে যায়। এরপর স্থানীয় রেস্তোরাঁয় Toyama Sushi খেলাম। সমুদ্রের স্বাদ একেবারে টাটকা। খাওয়া শেষে আমরা গেলাম সমুদ্রের ধারে। ওখানে দাঁড়িয়ে দূরে দেখা যায় Northern Alps।
সমুদ্র আর পাহাড়-এক ফ্রেমে।
নিকিতা আমার দিকে তাকিয়ে বলে-এই দৃশ্যটা যদি ছবি হতো, নাম দিতাম-‘দুজন’। দিন শেষে আবার Toyama-তে ফেরা। হোটেলের জানালা দিয়ে পাহাড়ের অন্ধকার ছায়া। নিকিতা বলে, Toyama পরিচিত তার টাটকা সামুদ্রিক খাবার আর সুশির জন্য। তা থেকে আমরা বঞ্চিত হবো কেন?
আমরা একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকি। খাবার টেবিলে বসে নিকিতা হাসতে হাসতে বলে-
আমার ট্যুরিস্টরা নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়েও আমাকে বলে, ভ্রমণের অনেক জায়গাই ভুলে যাই কিন্তু তোমার সঙ্গে খাওয়ার কথা ভুলে যাই না। তুমি ভুলে যাবেনা তো?
আমি বললাম, শুধু খাবার জায়গা নয়-তোমাকেও ভুলবো না। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে। নিকিতা আবারও বলে-আজকের দিনটা আলাদা ছিল। আমি মাথা নেড়ে বলি-কিছু দিন আলাদা হয় বলেই অন্যান সব দিন সহ্য করা যায়। সন্ধ্যায় Toyama ফিরে আসা। একটা ক্যাফেতে বসে কফির অর্ডার করি। ঘরে আলো কম। জানালার বাইরে পাহাড়ের ছায়া। চায়ের কাপ হাতে নিকিতা বলল-আজকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, আমরা কোথায় ছিলাম-
তুমি কী বলবে?
আমি বললাম-উঁচুতে।
দিন শেষে আমরা ফিরে এলাম টোকিওতে।
শেন, সিঁড়ি, আলো-সবকিছু আগের মতোই ছিল। কিন্তু ট্রেন থামার সময় ভিড়ের শব্দটা হঠাৎ খুব জোরে মনে হলো। কারণ পাহাড়ে শব্দ ছিল প্রকৃতির, এখানে শব্দ মানুষের। হাজার গলা, হাজার তাড়া। আমরা যে রাস্তা দিয়ে হেঁটেছিলাম যাওয়ার দিন, সেই রাস্তা দিয়েই ফিরছি। কফিশপটা এখনো খোলা। সিগন্যালটা এখনও লাল-সবুজ বদলায়, ফুটপাতে সেই একই ভিখারি বসে আছে। কিন্তু নিকিতা চুপচাপ। মনে হচ্ছিলো আমাদের মাঝখানে আলপস পর্বতটা দাঁড়িয়ে আছে।
টোকিও থেকে ইয়ামানাকা লেক
টোকিও শহরটা যেন সব সময় তাড়া দেয়। সময়কে, মানুষকে, অনুভূতিকে। সেই তাড়া থেকে একটু দূরে সরে যাওয়ার ইচ্ছে নিয়েই এক সকালে আমি আর নিকিতা রওনা দিলাম Yamanaka Lake দেখতে। এটা মাউন্ট ফুজির পায়ের কাছে নীল জলের এক শান্ত আশ্রয়।
আজ ফুজি দেখা যাবে তো? আমি জিজ্ঞেস করি। নিকিতা চোখ টিপে হাসে। বলে, ফুজি মাউন্টেন খুব লাজুক। তবে ভালো ভালো মুডে থাকলে ও বেরিয়েও আসতে পারে। বল্লাম, আর আমি যদি খারাপ মুডে থাকি?—তাহলে আমি থাকব। নিকিতা বলে। আমরা টোকিওর শিনজুকু বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি হাইওয়ে বাসে উঠলাম। জানালার পাশে বসে নিকিতা। বাস শহর ছাড়িয়ে হাইওয়েতে উঠতেই দৃশ্য বদলে যেতে থাকে। কংক্রিটের বদলে সবুজ এসে ধরা দেয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর বাস থামে Yamanaka Lake এলাকায়।
নিকিতা বলে Yamanaka Lake জাপানের Fuji Five Lakes-এর মধ্যে সবচেয়ে বড়। এখান থেকেই মাউন্ট ফুজির সবচেয়ে খোলার আর প্রশান্ত দৃশ্য দেখা যায়। লেকের ধারে দাঁড়াতেই বোঝা যায়-এটা শুধু দেখার জায়গা নয়, এটা অনুভব করার জায়গা। নীল জল, দূরে ফুজির নিঃশব্দ উপস্থিতি, আর বাতাসে এক ধরনের শান্ত সুর। নিকিতা বলে, Yamanaka Lake থেকে ফুজির পুরো অবয়ব দেখা যায়-বিশেষ করে সকাল আর বিকেলে। সূর্যের আলো বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের রঙও বদলে যায়।
লেকের চারপাশে হাঁটার পথ আর সাইকেল ট্র্যাক। রাজহাঁস আর হাঁসেরা লেকের পানিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিকিতা একটা হাঁসের দিকে তাকিয়ে বলে-ওদের কোনো গাইড লাগে না, তবু পথ হারায় না।—‘মানুষের সমস্যা এখানেই,’ আমি বলি। Yamanaka Lake ঝলমলে পর্যটন কেন্দ্র নয়। এখানে বড় শপিং নেই, নেই কোলাহল। আছে নীরবতা আর ফুজির ছায়া। নিকিতা বিদায়ের সময় বলে-সব ভ্রমণ গল্প হয় না। কিছু ভ্রমণ অনুভূতি হয়ে থেকে যায়। সূর্য ফুজির পেছনে ঢুকে যায়। লেকের জল কমলা হয়ে ওঠে। আমি বলি, তুমি এই দৃশ্যটা কতবার দেখেছো। নিকিতা একটু ভেবে বলে-অনেকবার। কিন্তু আজকে আলাদা।
‘কেন?’
কারণ আজ আমার সঙ্গে একজন বিশেষ লোক।
সে বাকিটা বলে না। আমি জিজ্ঞেসও করি না।
বাস চলতে শুরু করলে টোকিওর আলো আবার দূরে দেখা দেয়। নিকিতা জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে।
টোকিও থেকে Magome-juku
টোকিও শহর সব সময় তাড়াহুড়োয় থাকে। কাচ আর ইস্পাতের ভিড়, ট্রেনের ছুটে চলা শব্দ-সব মিলিয়ে এক আধুনিক বাস্তবতা। সেই বাস্তবতা থেকে খানিকটা দূরে, ইতিহাস আর প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে আছে জাপানের এক অনন্য গ্রাম-Magome-juku। আজ যাচ্ছি ওখানে। সঙ্গে নিকিতা। গায়ে হালকা রঙের কোট, চোখে সেই চেনা শান্ত হাসি। সে গাইড, আবার ঠিক গাইডও নয়, বরং পথের গল্প জানা একজন নীরব সঙ্গী। আজ আমরা আধুনিক জাপান ছেড়ে ধীরে ধীরে চলে যাবো পুরোনো শতাব্দীতে, নিকিতা নরম গলায় বলল। একটু পর আবার বলে, শহর মানুষকে ব্যস্ত বানায়, কিছু জায়গা মানুষকে চুপ করিয়ে দেয়। আমি বাধ্য ছাত্রের মতো শুনি, কিন্তু কোনো জবাব দিই না। আমি তখনো জানতাম না, Magome-juku ঠিক সেটাই করবে।
টোকিও থেকে নাগোয়া-শিনকানসেনে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। ট্রেন যখন নাগোয়ার দিকে ছুটে চললো, জানালার বাইরে দৃশ্য বদলাতে শুরু করলো। উঁচু দালান পেছনে পড়ে গেল, সামনে এলো মাঠ, নদী আর পাহাড়। নাগোয়া স্টেশন থেকে জাপান রেলওয়ের (HR) চুও লাইনের ট্রেনে নাকাতসুগাওয়া শহর। এখানে পৌঁছাতেই বোঝা যায়, শহরের ব্যস্ততা অনেক পেছনে পড়ে গেছে। শেষ অংশে বাস। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা। গাছের ফাঁক দিয়ে আলো ঢোকে, ঝরনার শব্দ শোনা যায়। খানিকক্ষণ পাহাড়ি পথে এগোতেই দেখা মেলে Magome-juku-এর।
নিকিতাআমার আগেই বাস থেকে নামলো। বললো-স্বাগত এদো যুগে। সে জানায়, Magome-juku গিফু প্রিফেকচারের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক ঐতিহাসিক পোস্ট টাউন। একসময় এই গ্রাম দিয়েই যাতায়াত করতেন সামুরাই, সরকারি দূত, বণিক আর পথিকেরা-ঐতিহাসিক Nakasend সড়ক ধরে। আজও সেই পথ আছে। পাথরের ঢালু রাস্তা, দুপাশে কাঠের বাড়ি, কাগজের লণ্ঠন। বাতাসে কাঠ আর মিসোর গন্ধ। হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, পায়ের নিচে শুধু পাথর নয়-শতাব্দীর স্মৃতি জমে আছে। নিকিতা বলে-এই রাস্তাগুলো শুধু পায়ের ছাপ নয়, গল্প বহন করে।
আমি বলি-এখানে হাঁটতে গেলে কথা কমে যায়। সে হালকা হেসে জবাব দেয়, কারণ জায়গাটা নিজেই কথা বলে। নিকিতা খুব ধীরে হাঁটে। যেন জায়গাটাকে তাড়াহুড়ো করে দেখতে চায় না। বলে, এই গ্রামটা ছবি তোলার জন্য নয়। এটা অনুভব করার জন্য। গ্রামের ভেতরে Honjin আর Wakihonjin-একসময় দাইমিও আর উচ্চপদস্থ সামুরাইদের থাকার জায়গা। টাটামি মেঝে, কাঠের দরজা, আলো-ছায়ার নিঃশব্দ খেলা। টাটামি মেঝে আর কাঠের দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া আলো এদো যুগের জীবনযাত্রার কথা মনে করিয়ে দেয়। আরেক প্রান্তে Shimazaki Toson Memorial Museum-বিখ্যাত সাহিত্যিকের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। সাহিত্য আর গ্রামের সম্পর্ক এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিকিতা বলে, যাদের সময় আছে, তাদের জন্য রয়েছে Mag-সব থেকে Tsumag-পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ ঐতিহাসিক হাঁটার পথ। বন, পাহাড়, ঝরনা আর পাখির ডাক-এই ট্রেইল যেন এদো যুগের পথিকদের নিঃশব্দ সঙ্গী। এই পথ জাপানের অন্যতম সুন্দর হেরিটেজ ট্রেইল হিসেবে পরিচিত। আর একটু এগোলেই Shimazaki Toson Memorial Museum। Toson-যিনি এই গ্রাম থেকেই জাপানি সাহিত্যের এক নতুন ভাষা খুঁজে পেয়েছিলেন। তার লেখার মতোই গধম-সব-নীরব, গভীর, ধীর।
নিকিতা বলল-কিছু গ্রাম মানুষকে লেখক বানিয়ে দেয়।
আমি কিছু বললাম না।
হাঁটার ক্লান্তি ভাঙাতে আমরা একটা ছোট খাবার দোকানে থামি। কাঠের চুলায় ভাজা হচ্ছিল এ-hei-mochi-মিসো সসে ভেজানো চালের কেক। আমরা তৃপ্তি করে খেলাম। নিকিতা হালকা হাসি দিয়ে বলে, ভ্রমণের স্মৃতি অনেক সময় খাবারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
শহরে ফিরে গেলে এ স্বাদটাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়বে। বিদায়ের সময় নিকিতা শুধু বলে, কিছু জায়গা চোখে নয়, মনে ধরা দেয়। Mag-me-juku ঠিক তেমনই-একটি গ্রাম, যা ভ্রমণ শেষ হওয়ার পরও মনে থেকে যায় দীর্ঘদিন। ফেরার ট্রেন যখন পাহাড় ছুঁয়ে শহরের দিকে ছুটে চলে, জানালার কাচে ভেসে ওঠে Mag-me-juku-এর পাথরের রাস্তা, কাঠের ঘর, আর সেই নীরবতা-যা শব্দ ছাড়াই কথা বলেছিল। টোকিও আবার সামনে আসছে, আলো জ্বলছে, গতি বাড়ছে।
নিকিতা জানালার বাইরে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকে।
টোকিওর গিনজা
কিছু শহর আছে, যাদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হয় ছবির মতো-দেখা যায়, ভালো লাগে আর সহজে ভুলে যাওয়া যায় না। আর কিছু শহর আছে, যারা ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে ঢুকে পড়ে। টোকিও তেমনই এক শহর। আর টোকিওর গিনজা-সে যেন সেই শহরের হৃৎপিণ্ড, যেখানে আলো ধড়ফড় করে, আর অনুভূতি কথা বলতে শেখে।
সকালের গিনজা শান্ত। চুয়ো-দোরি অ্যাভিনিউ তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কাচে মোড়া বিলাসী শোরুমগুলো যেন রাতের স্বপ্ন ভেঙে দিনের দিকে তাকাচ্ছে। নিকিতা পাশে হেঁটে বলছিল, গিনজা শব্দটা এসেছে ‘রুপার মুদ্রা’ থেকে। এখানেই একসময় রুপার বাজার বসতো। চুয়ো দোরি অ্যাভিনিউ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো আমরা যেন আলোয় মোড়া কোনো রানওয়েতে চলেছি। দুপাশে লুই ভুইতোঁ, শ্যানেল, ডিওর, গুচ্চির শোরুম-সবাই কাচের দেওয়ালে নিজেদের গল্প সাজিয়ে রেখেছে। নিকিতা হঠাৎ থামিয়ে দিলো আমাকে। বললো-এই রাস্তা রবিবারে গাড়িমুক্ত থাকে। তখন গিনজা হাঁটে-ঠিক মানুষের মত। আমি তাকিয়ে ছিলাম কাচে ভেসে ওঠা আমাদের প্রতিচ্ছবির দিকে-টোকিওর বিলাসী আয়নায় দুজন পথিক, চোখে কৌতূহল আর নীরব আবেগ।
নিকিতা হঠাৎ থামিয়ে দিলো।
এই জায়গাটা রাতে অন্যরকম, সে বললো-তখন গিনজা আলোয় কথা বলে। আমি হালকা হেসে বললাম-আর দিনে? দিনে গিনজা তাকিয়ে থাকে, সে উত্তর দিলো। কথার ভেতরেও যেন একটা অদৃশ্য রোমান্টিক বিরতি। গিনজা সিক্সে ঢুকতেই আধুনিক শিল্প আর বিলাস একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করলো। ছাদের বাগান থেকে পুরো গিনজাকে দেখা যায়-উঁচু থেকে শহরকে দেখলে মানুষ নিজের কথাও বুঝতে পারে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত লাগছিল। একটি ছোট ক্যাফেতে বসে কফি খেলাম। জানালার বাইরে আলো, ভেতরে নিকিতার হাসি। সে জিজ্ঞেস করলো, গিনজা কেমন লাগছে? আমি বললাম-গিনজা নয়, তোমার সঙ্গে গিনজা কেমন লাগছে, তা জিজ্ঞেস করতে পারো!
নিকিতা শুধু হাসলো, কোনো উত্তর দিলো না। একটি ছোট, মার্জিত ক্যাফে। জানালার বাইরে শহর, ভেতরে কফির উষ্ণতা। নিকিতা কাপের ধারে আঙুল ছুঁইয়ে বললো, তুমি জানো, অনেক ট্যুরিস্ট গিনজা দেখে, কিন্তু বোঝে না।
আমি বললাম, কারণ তারা সঙ্গী ঠিক পায় না। নিকিতা হেসে চোখ নামিয়ে নিল। কফির ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে গেল সেই হাসি। গিনজার মাঝেই দাঁড়িয়ে কাবুকিজা থিয়েটার-শতাব্দীর ঐতিহ্য বুকে নিয়ে। নিকিতা জানাল কাবুকির গল্প, অভিনয়ের রঙ, মুখোশ আর আবেগের ইতিহাস। আধুনিক শহরের বুকে অতীতের এমন দৃঢ় উপস্থিতি আমাকে মুগ্ধ করলো।
নিকিতা বললো, টোকিও তার অতীত ভুলে যায়নি।
সে শুধু এগিয়ে চলেছে।
সন্ধ্যা নামতেই গিনজা বদলে গেল। আলো আরো উজ্জ্বল, মানুষ আরো জীবন্ত। রাস্তার বাতিতে নিকিতার মুখে নরম ছায়া পড়ছিল। হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, এ শহরটা যতটা না লাক্সারির, তার চেয়ে বেশি অনুভবের। নিকিতা ধীরে বললো, টোকিও একা ঘোরার শহর নয়। আমি তাকালাম তার দিকে। বুঝলাম, কিছু শহর মানুষকে কাছাকাছি আনে, কিছু মানুষ শহরকে।
লেক বিওয়ার ধারে
কিয়োটো থেকে মাত্র কয়েক মিনিট দূরে, অথচ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভবের নাম লেক বিওয়া। এটি জাপানের সবচেয়ে বড় মিঠা পানির হ্রদ। সকালের কিয়োটো স্টেশন তখনো ব্যস্ত। ট্রেনের ভিড়, পর্যটকের কোলাহল, শহরের চিরচেনা গতি। ঠিক এই শহর থেকেই নিকিতাকে সঙ্গে করে শুরু হয় আমাদের যাত্রা। JR লাইনের ট্রেন ছুটে চলতেই কিয়োটোর নগরচিত্র পেছনে পড়ে যায়, সামনে ধীরে ধীরে খুলে যেতে থাকে সবুজ পাহাড় আর শান্ত জনপদ। ট্রেনে বসে নিকিতা জানালার দিকে তাকিয়ে বলে-
আজ খুব বেশি কিছু দেখবো না।
আমি হেসে উত্তর দিলাম-তাহলে আজ বেশি কিছু মনে থাকবে।
আমরা tsu স্টেশনে নামলাম। কিছুদূর হাঁটতেই চোখে পড়লো লেক বিওয়ার বিস্তৃত জলরাশি, দূরে পাহাড়ের ছায়া। হ্রদের নীল জল দুর থেকে যেন আমাদের ডাক দিচ্ছিলো। লেকের ধারে দাঁড়িয়ে নিকিতা জানায়, এই হ্রদ হাজার বছরের ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছে। প্রাচীন কিয়োটোর পানির প্রধান উৎস ছিল এই বিওয়া। শুধু প্রকৃতি নয়, জাপানের সভ্যতারও নীরব সাক্ষী এটি। তার কথার ফাঁকে ফাঁকে হ্রদের জল যেন সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে দেয়। আমরা দুজন লেক বিওয়ার পাড় ধরে হাঁটতে লাগলাম। পর্যটকের তেমন ভিড় নেই। শুধু জল, আকাশ আর হালকা বাতাস। নিকিতা থেমে থেমে আমার ছবি তোলে, আবার কখনো ক্যামেরা নামিয়ে রেখে দুষ্টুমিভরা চোখে বলে-কিছু দৃশ্য চোখে রেখে দিলেই ভালো।
দুপুরের দিকে লেকের ধারে ছোট একটি ক্যাফেতে বসি। কাচের জানালা পেরিয়ে হ্রদের জল দেখা যায়। কফির কাপে ভাপ ওঠে, বাইরে জল স্থির। এই ক্যাফের মুহূর্তটা যেন বুঝিয়ে দেয়, লেক বিওয়া শুধু দেখার নয়, অনুভবের ও। আমাদের দুজনের হাতেই গরম কফির কাপ। কাচের জানালার ওপারে লেক বিওয়া-স্থির, গভীর। নিকিতা মুচকি হেসে বললো, এই কফির স্বাদটা আলাদা। কারণ সামনে জল আছে। আমি দুষ্টুমি করে বললাম, আমার কাছেও এই কফির স্বাদটা আলাদা। কারণ আমার সঙ্গে তুমিও আছো। সে চোখ নামিয়ে নিল। হালকা লজ্জা আর হাসি একসঙ্গে। নিকিতা কাপের ভাপের দিকে তাকিয়ে বলে,
কিছু সম্পর্ক কফির মতো চুপচাপ, কিন্তু জাগিয়ে রাখে। আমি তাকাই তার দিকে। বলি আর কিছু সম্পর্ক হ্রদের মতো-গভীর, কিন্তু শান্ত। সে কিছু বলে না, শুধু হালকা হাসে। ওই হাসিটাই তার কথার জায়গা নিয়ে নেয়। বিকেলের আলো গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। সূর্যাস্তের সময় লেক বিওয়ার জল রঙ বদলায়-নীল থেকে সোনালি। নিকিতা পাশে দাঁড়িয়ে বললো, এই রঙটা কিয়োটোতে নেই। কিয়োটো ইতিহাস শেখায় আর লেক বিওয়া অনুভব করতে শেখায়। আমি মনে মনে বললাম-আর তুমি আমাকে দুটোই একসঙ্গে শেখাচ্ছো। ধীরে ধীরে দিনটা বিদায় নেয় কোনো শব্দ না করেই। জলের ওপর শেষ আলোটা ভেঙে ভেঙে পড়ে। আর আমরা দুজন সেই আলো পেছনে ফেলে হাঁটতে থাকি স্টেশনের দিকে। ট্রেন ছুটে চলে। জানালার বাইরে পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে অন্ধকারের সঙ্গে মিশে যেতে থাকে। কিয়োটোর ঘরবাড়ির আলো একে একে জ্বলে ওঠতে থাকে।
ট্রেন থামে। দরজা খোলে। কিয়োটো আমাদের ডেকে নেয় তার বুকের ভেতর। আর আমাদের ভেতর থেকে লেক বিওয়ারের এক অপরূপ সন্ধ্যা।