১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:১৫:২৬ পূর্বাহ্ন


সংসদের ভেতরে-বাইরে হার্ডলাইনে থাকবে জামায়াত-এনসিপি
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৮-০২-২০২৬
সংসদের ভেতরে-বাইরে হার্ডলাইনে থাকবে জামায়াত-এনসিপি


১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এককভাবে ২০৯টিতে জয়ী হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে সব মিলিয়ে এখন বিএনপি জোটের আসন সংখ্যা ২১২। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী,-এনসিপির জোট পেয়েছে ৭৭টি। জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয়ী হয়েছে। এ-ই জোটের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামী মনে করে তারা আরও অনেক আসন পেতো। তাদের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা-ও মনে করে আরো আসন পেতে পারে। কিন্তু কোথাও কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং হয়ে সব লন্ডভন্ড করে দেওয়া হয়েছে। তা-ই এমন দাবিতে ভবিষ্যতে এই ইস্যুকে সামনে রেখে দলটি কঠোর অবস্থান নেবে। একিই সাথে জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র-জনতার ত্যাগের ফসল বলে দাবিদার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নেও জামায়াত কঠোর ভূমিকায় থাকবে। থাকবে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিএনপির দিকে তীক্ষ্ম নজরদারি। বিএনপি ভূমিধস বিজয়ের সুযোগে যেনো চাদাবাজ, দখল আর দুর্নীতিতে মাতোয়ারা না হয়ে উঠে সেদিকে থাকবে দলটির কঠোর নজরদারি। এসব তথ্য জানা গেছে, জামায়াতের বিভিন্ন সূত্র থেকে। 

বিএনপির ভূমিধস বিজয়ে শান্তিতে রাখা হবে না দলটিকে। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে দলটির বিরুদ্ধে যে কোনো ইস্যুতে মাঠ কাঁপাতে চাইবে জামায়াতে ইসলামী। এ-লক্ষ্য নিয়েই এখন জামায়াতে ইসলামী সামনের দিকে এগুচ্ছে। জামায়াত মনে করে এসব করে দলটি তাদের অতীত নানান ধরনের অপবাদ দূর করা সহজ হবে। 

৩০ আসন নিয়ে মাঠ কাঁপাবে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩২ আসনে ভোট পুনঃগণনার দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে দেখা করে তারা এ দাবি জানায় তারা। গত রোববার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সভাকক্ষে ইসির সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ডা. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। জামায়াতের অভিযোগ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো বিভিন্ন উপাদান সক্রিয় ছিল। যেমন-অবৈধ অস্ত্র, কালো টাকা, হুমকি-ধমকি ও জাল ভোটের মতো ঘটনা ঘটেছে। জামায়াত মনে করে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। তারা কিছু কেন্দ্রে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সিল মারার অভিযোগ আনতে নিজেদের অবস্থান পত্র তৈরি করছে। জামায়াতের প্রাথমিক অভিযোগ হচ্ছে তারা এ বিষয়টি বারবার কমিশনকে জানানো হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এমনকি জামায়াতের সবচেয়ে বড়ো অভিযোগ হচ্ছে নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট তড়িঘড়ি প্রকাশ করা হয়েছে। দ্রুত গেজেট প্রকাশের কারণে অনেক প্রার্থী যথাসময়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানাতে পারেননি। আর একারনণে জামায়াত এই আসনগুলির জন্য আহনি লড়াইয়ে নামতে মরিয়া হয়ে উঠবে। আসনগুলো হলো-ঢাকা ৭, ৮, ১০, ১৩ ও ১৭; পঞ্চগড়-১; ঠাকুরগাঁও ২; দিনাজপুর-৩ ও ৫; লালমনিরহাট-১ ও ২; গাইবান্ধা-৪; বগুড়া-৩; সিরাজগঞ্জ-১; যশোর-১; খুলনা-৩ ও ৫; বরগুনা-১ ও ২; ঝালকাঠি-১; পিরোজপুর-২; ময়মনসিংহ-১, ৪ ও ১০; কিশোরগঞ্জের-৩; গোপালগঞ্জ-২; ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫; চাঁদপুর-৪; চট্টগ্রাম-১৪ এবং কক্সবাজার-৪।

খোঁজ নিয়ে জানা গেলো যেসব আসনে এ ধরনের নির্বাচনি অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও আচরণবিধি মানা হয়নি, সেই আসনগুলোর ব্যাপারে স্থানীয়ভাবে আমরা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছে জামায়াত। এসময় তারা ভোট পুনর্গণনার জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বানও জানায়। তারা আরও জানায় এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে আমরা জানাব এবং সম্ভাব্য সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেব। ফলে দেখা যাচ্ছে এধরণের ইস্যুত ছাড় দেবে না জামায়াত। কারো কারো মতে, বিষয়টি জামায়াত প্রেস্টিজ ইস্যু হিসাবে নিয়েছে বলে কারো কারো অভিমত। 

জুলাই সনদ সংস্কারে মাঠ গরম রাখবে

এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়েও জামায়াত ভূমিকা রাখবে। এটা করে জামায়াত মনে করছে তারা জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণার জামায়াতের কাতারে থাকবে। ইতোমধ্যে দেখা গেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপির নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। তবে তাঁরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার কিছু আগে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানো হয়। শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায় অনুষ্ঠানে শপথের জন্য নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি ফরম দেওয়া হয়। এর একটি ছিল সাদা রংয়ের, যেটি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফরম। অন্যটি ছিল নীল রংয়ের, যেটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফরম। শপথ অনুষ্ঠান শুরুর আগে কক্সবাজার-১ আসনে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ শপথ কক্ষে উপস্থিত দলীয় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে একটি নির্দেশনা দেন। নির্দেশনায় সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়ে দেন, তাঁরা সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি। এদিকে জুলাই সনদ ইস্যুকে যে জামায়াত প্রাধান্য দেবে তা স্পস্ট হয়ে উঠেছে গত মঙ্গলবার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে এধরনের পরিস্থিতি তৈরির মধ্য দিয়ে। এতে দেখা গেলো বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলে জামায়াতে ইসলামীর জয়ী সংসদ সদস্যরা কোনো শপথই নেবেন না দলটির শীর্ষ নেতারা। দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের মঙ্গলবার সকালে গণমাধ্যমকে এই তথ্য দিয়েছেন। জামায়াত নেতা আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেছিলেন, দুপুর ১২টায় তাঁদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারিত রয়েছে। তাঁরা সেখানে যাবেন। তবে বিএনপি যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেন, জামায়াতের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা কোনো শপথই নেবেন না। কারণ তাঁরা মনে করেন, সংস্কারবিহীন সংসদ অর্থহীন। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নাও নিতে পারেন বলে ওই সময়ের পরিস্থিতিতে দেখা গেছে। বিএনপির জয়ী সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় এ কথা ভাবছেন তাঁরা। বিষয়টি সেসময়েও চূড়ান্ত কিছু বলেননি এই সংসদ সদস্যরা। তবে এই সব ঘটনায় একটি বিষয় চলে আসে যে বিএনপি এখন কোনোভাবেই জুলাই সনদের বাইরে যেতে পারবে না। গেলেই জামায়াত সংসদের ভেতরে বাইরে অন্যরকম পরিস্থিতি তৈরি করবে। পরে দেখা গেছে যে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে নেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নবনির্বাচিতরা। জামায়াতের সঙ্গে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরাও শপথ নেন। এরপরপরই জামায়াতের পর শপথ নিলেন এনসিপির সংসদ সদস্যরা। 

হুঙ্কার তুলবে দখল চাদাবাজ দুর্নীতির বিরুদ্ধে

এদিকে সূত্র আরো জানায় জামায়াত এনসিপি জোট বিএনপির কেউ চাদাবাজি, দর্নীতি করলে জামায়াত সোচ্চার থাকবে। এছাড়া জামায়াত বিএনপির অতীতের চাদাবাজি দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরেও বি এন পি রাজনৈতিকভাবে খায়েলের চেষ্টা করবে। 

তবে লক্ষণ ভালো না

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যভুক্ত দলগুলো গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার রাজধানীতে যে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে, তার সমালোচনা করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, এটা ভালো লক্ষণ নয়। সারা দেশে জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, নির্যাতন, নিপীড়ন, হত্যা, ধর্ষণের প্রতিবাদে’ গত সোমবার বিকেলে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করবে বলে ১১ দল যে ঘোষণা দিয়েছিল সে-ই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এসব কথা বলেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতো শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর চতুর্থ দিনের মতো আগের বিকেল থেকে গত সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় ১০ জন আহতের খবর মিলেছে। এর মধ্যে পিরোজপুরে দুই বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে জখম করেছে দুর্বৃত্তরা। গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক বিএনপি সমর্থককে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের বিরুদ্ধে। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্টের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও বাগেরহাটে এক যুবদল নেতার বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। মুখোশধারীরা পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছে ছাত্রশিবির কর্মী ও মসজিদের এক ইমামকে। এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আট জেলায় ১০টির বেশি আসনে নির্বাচন-পরবর্তী সংঘাতে একজন নিহত ও শতাধিক আহত হন। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের ১৩ জেলার ১৮টির বেশি আসনে সহিংসতায় একজন নিহত ও ১৪২ জন আহত হন- যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করে এই বিষয়গুলো সামনের দিনে অনেক প্রশ্ন তৈরি করবে। তাছাড়া গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াত আমিরের বাসায় তারেক রহমান (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী) সৌজন্য সাক্ষাৎ এ গেলে এর পর দলটির এই নেতা ফেইসবুকে কিছু বক্তব্য দেন। এতে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে আমরা নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করবো, তবে একটি আদর্শিক বিরোধী দল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আমরা আপসহীন থাকবো।

শেয়ার করুন