ভ্রমণসঙ্গীদের সঙ্গে লেখক
আধুনিক জেদ্দা মানেই আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর চকচকে শপিংমল। কিন্তু এ যান্ত্রিকতার ভিড়েও যেখানে সময় থমকে আছে, তার নাম ‘আল-বালাদ’। লোহিত সাগরের নোনা হাওয়া আর প্রাচীন চুন-সুরকির ঘ্রাণ মেখে দাঁড়িয়ে থাকা এ এলাকাটি শুধু সৌদি আরবের নয়, বরং গোটা বিশ্বের এক অনন্য সম্পদ। ২০১৪ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। জেদ্দার গুরুত্ব শুরু হয় ৭ম শতাব্দীতে। ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমান ইবনে আফফান এ শহরকে মক্কার প্রধান সমুদ্রবন্দর ঘোষণা করেন। তারপর থেকেই আফ্রিকা, ভারত, পারস্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা হজযাত্রী ও ব্যবসায়ীদের মিলনস্থল হয়ে ওঠে জেদ্দা।
সকালবেলার আলো তখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে আল-বালাদের সরু গলিতে। আমরা হাঁটছি প্রবাল পাথরের পুরোনো বাড়ির পাশে দিয়ে। বাড়িগুলোর জানালায় কাঠের কারুকাজ করা, যেন শতবছরের গল্প বলছে। আমার সঙ্গে আছে এক তরুণী আরব গাইড-লায়লা। মাথায় হালকা স্কার্ফ, চোখে মৃদু হাসি।
তুমি জানো, লায়লা বললো, জেদ্দাকে বলা হয় মক্কার দরজা।
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
সে আঙুল তুলে দূরের দিকটা দেখালো, সমুদ্রপথে যারা হজে আসতেন, তারা আগে জেদ্দা বন্দরে নামতেন, তারপর এখান থেকে যেতেন মক্কা। লায়লা জানায়, আল-বালাদের প্রধান আকর্ষণ হলো এখানকার বহুতল ভবনগুলো। ঊনবিংশ শতাব্দীতে লোহিত সাগরের প্রবাল পাথর আর কাদা দিয়ে তৈরি এ বাড়িগুলোর বারান্দায় রয়েছে কাঠের সূক্ষ্ম কারুকাজ করা ‘রোশান’ বা ঝরোকা। এ জানালাগুলো দিয়ে বাইরের মানুষ ভেতর দেখতে পেতো না, কিন্তু ভেতরের মানুষেরা বাইরের হাওয়া উপভোগ করতে পারতেন। বিকালের রোদে এ কাঠের জালিগুলোর ছায়া যখন সরু গলিগুলোতে পড়ে, তখন মনে হবে যেন আরব্য উপন্যাসের কোনো পাতায় ঢুকে পড়েছো।
গলির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছে গেলাম এক বিখ্যাত বাড়ির সামনে-নাম নাসিফ হাউস। লায়লা বললো, এ বাড়িটি ঊনিশ শতকে নির্মিত। বাড়িটির বিশাল কাঠের দরজা, উঁচু বারান্দা আর খোদাই করা জানালা যেন অতীতের সমৃদ্ধির কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি একসময় জেদ্দার সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিবারের বাড়ি ছিল, যেখানে আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা রাজা আবদুল আজিজ ইবনে সউদ। এছাড়াও রয়েছে শত বছরের পুরোনো মসজিদ আল-শাফি, যার স্থাপত্য তোমাকে মুগ্ধ করবেই।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়লাম মসলা আর কফির সুবাসে ‘হেরা’ বাজারে। আল-বালাদের প্রাণ হলো এর ‘সুক’ বা বাজার। সংকীর্ণ গলির দুপাশে সাজানো সুগন্ধি মসলা, তিল ও খেজুরের দোকান। চারদিকে মসলা, খেজুর, আতর আর কফির গন্ধ। দোকানিদের ডাকাডাকি, পর্যটকদের কৌতূহলী চোখ-সব মিলিয়ে যেন আরবীয় গল্পের শহর। আমি লায়লাকে বললাম, এ শহরটা যেন ইতিহাসের বইয়ের ভেতর হাঁটার মতো। সে হেসে বললো, জেদ্দা শুধু শহর নয়, এটা স্মৃতির বন্দর।
এরপর আমরা গেলাম আল শাফি মসজিদের সামনে। মসজিদের মিনার আকাশ ছুঁতে চায়। সূর্যের আলো পড়ে দেওয়ালে তৈরি হয়েছে মধুর ছায়া। লায়লা বললো, এ মসজিদ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছে। কত মানুষ এখানে প্রার্থনা করেছে, তার হিসাব নেই। বিকালের দিকে আমরা আবার সমুদ্রের দিকে হাঁটলাম। লোহিত সাগরের হাওয়া বইছে।
আমি লায়লাকে বললাম, আজকের দিনটা মনে থাকবে। সে মৃদু হাসলো, জেদ্দা এমনই-এখানে একদিন এলেই মানুষ বারবার ফিরে আসতে চায়। লোহিত সাগরের ঢেউ তখন ধীরে ধীরে তীরে আছড়ে পড়ছে। মনে হচ্ছিল এ শহর যেন এখনো শতাব্দীর গল্প বলে চলেছে। সন্ধ্যা নামছে জেদ্দা শহরের আকাশে। সূর্য লোহিত সাগরের ওপারে ডুবে যাচ্ছে, আর ধীরে ধীরে আলো জ্বলে উঠছে পুরোনো শহর হিস্টোরিক জেদ্দা, গেট টু মক্কার সরু গলিতে।
দিনের আলোয় যে শহরটিকে আমরা ইতিহাসের পাতা মনে করেছিলাম, সন্ধ্যার পর সেটি যেন রূপকথার শহরে পরিণত হয়েছে। কিছুদূর এগোতেই একটি ছোট ক্যাফে থেকে ভেসে এলো কফির সুবাস। লায়লা বললো, এখানে আরবীয় কফি খুব বিখ্যাত। চলো এক কাপ খেয়ে দেখি। এলো ছোট কাপভর্তি গরম আরবীয় কাহওয়া আর সঙ্গে খেজুর। কফির হালকা তিক্ত স্বাদ আর খেজুরের মিষ্টি মিলিয়ে যেন সন্ধ্যাটাকে এক অদ্ভুত সুন্দর করে তুললো। রাত একটু গাঢ় হলে আমরা চলে এলাম সমুদ্রের ধারে। লোহিত সাগরের ঢেউ ধীরে ধীরে তীরে আছড়ে পড়ছে। দূরে শহরের আলো ঝলমল করছে।
আমি লায়লাকে বললাম, আজকের দিনটা যেন একটা গল্পের মতো। কিভাবে সারাটি দিন কেটে গেলো একদম বুঝতে পারিনি। লায়লা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো, জেদ্দা আসলে গল্পের শহর। শুধু শুনতে-জানতে হয়। হালকা সমুদ্রের বাতাস বইছে। মনে হচ্ছিলো, এই শহর শুধু ইট-পাথরের নয়, এটি শতাব্দীর স্মৃতি, বাণিজ্যের ইতিহাস আর মানুষের যাত্রার এক জীবন্ত কাব্য।
যখন যাবেন : জেদ্দা ভ্রমণের সেরা সময় হলো নভেম্বর থেকে মার্চ। এ সময় আবহাওয়া বেশ মনোরম থাকে। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত আল-বালাদ এলাকাটি সবচেয়ে বেশি প্রাণবন্ত থাকে।
কেন যাবেন? যদি আপনি ইতিহাসের ধুলোমাখা পথ ভালোবাসেন, যদি কাঠের কাজের গরিমা আপনাকে টানে আর লোহিত সাগরের তীরের সূর্যাস্ত দেখতে চান, তবে জেদ্দার এ হেরিটেজ সাইট আপনার তালিকার উপরের দিকেই থাকা উচিত।