২৫ মার্চ ২০২৬, বুধবার, ০৫:৫৮:৫৯ অপরাহ্ন


ইউনেস্কো হেরিটেজ ভ্রমণ-৩
অ্যাথেন্সের অ্যাক্রোপলিস
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৫-০৩-২০২৬
অ্যাথেন্সের অ্যাক্রোপলিস গ্রিসের জনপদে লেখক


ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে প্রাচীন শহর অ্যাথেন্সের আকাশে। দূর থেকে দেখা যায় পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক মহিমান্বিত প্রতীক Acropolis of Athens। হাজার বছরের ইতিহাস যেন নীরবে পাহারা দিচ্ছে এ পাথুরে পাহাড়। সকালবেলার হালকা বাতাসে গ্রিক অলিভ গাছের পাতাগুলো মৃদু শব্দ করছে। মনে হচ্ছে ইতিহাসের পাতা উল্টে উল্টে কেউ যেন অতীতের গল্প বলছে।

আজ গ্রিসের আকাশটা যেন একটু বেশিই নীল। আর সেই নীল ক্যানভাসে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক মহাকাব্য-অ্যাথেন্সের অ্যাক্রোপলিস। অ্যাক্রোপলিসের প্রবেশপথে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল তরুণী গাইড এলেনা। পরনে সাদা লিনেন ড্রেস, চোখে রোদচশমা আর ঠোঁটে একচিলতে অমায়িক হাসি। মনে হচ্ছিল অলিম্পাস পর্বত থেকে কোনো গ্রিক দেবী ছদ্মবেশে নেমে এসেছে পর্যটকদের পথ দেখাতে।

কালিমেরা! (শুভ সকাল)

হাত বাড়িয়ে দিয়ে এলেনা বললো, আমি আজ সারাদিনের জন‍্য তোমার গাইড। তবে আজ আমরা শুধু পাথর দেখবো না, আমরা দেখবো এক হারানো সভ্যতার হৃদস্পন্দন। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকালাম তার দিকে। বললাম, ইতিহাস যদি এমন হাসিমুখে গল্প বলে, তাহলে শুনতে তো আরো ভালো লাগবে। এলেনা একটু হেসে মাথা নাড়লো। বললো, তাহলে আজ তোমাকে এমন গল্প শোনাবো, যা দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো।

আমরা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগলাম অ্যাক্রোপলিসের দিকে। এ পাহাড়ের উপরেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন গ্রিসের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। আমরা হাঁটছি আর এলেনা গল্প শোনাচ্ছে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে অ্যাথেন্সের মহান নেতা চবৎরপষবং এ পাহাড়কে সাজিয়ে তুলেছিলেন অসাধারণ সব স্থাপত্যে। সে সময়টিকে বলা হয় গ্রিক সভ্যতার স্বর্ণযুগ। এ ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণেই ইউনেস্কো ১৯৮৭ সালে অ্যাক্রোপলিসকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এলেনা হাত তুলে সামনে দেখালো বিশাল এক মন্দির-ওটাই পার্থেনন।

সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে বিশাল সাদা মার্বেলের স্তম্ভগুলো। দেবী অ্যাথেনার উদ্দেশে নির্মিত এক মহিমান্বিত মন্দির। খ্রিস্টপূর্ব ৪৪৭ সালে নির্মাণ শুরু হয়েছিল এ মন্দিরের। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যুদ্ধ, ভূমিকম্প এবং সময়ের আঘাত সহ্য করে আজও দাঁড়িয়ে আছে গৌরবের সঙ্গে। আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম, দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো স্থাপনা, তবুও কত শক্তিশালী! এলেনা বললো, এটাই গ্রিকদের স্থাপত্য কৌশল। সৌন্দর্য আর বিজ্ঞান-দুটোরই নিখুঁত মিল।

পার্থেননের পাশেই রয়েছে আরেকটি ভিন্নধর্মী স্থাপনা (ইরেকথিয়ন)-এর বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ছয়টি নারী মূর্তি-ক্যারিয়াটিড দেখে মনে হয় তারা যেন পাথরের নয়, জীবন্ত। আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম, এরা যেন ইতিহাসের নীরব প্রহরী। এলেনা হেসে বললো, অনেকে বলে রাতের নীরবতায় তারা নাকি নিজেদের মধ্যে গল্প করে। আমি মজা করে বললাম, তাহলে হয়তো আজ রাতে তারা আমাদের কথাও বলবে।

সে হাসলো।

একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে ছোট কিন্তু সুন্দর মন্দির ঞবসঢ়ষব ড়ভ অঃযবহধ ঘরশব। এটি বিজয়ের দেবী অ্যাথেনাকে উৎসর্গ করে নির্মিত। যুদ্ধের আগে সৈন্যরা এখানে এসে প্রার্থনা করতো। এলেনা বললো, গ্রিকরা বিশ্বাস করতো, দেবী অ্যাথেনা তাদের শহরকে রক্ষা করেন। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে দেখা যায় আধুনিক অ্যাথেন্স শহর। প্রাচীন ইতিহাস আর আধুনিক জীবনের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন। সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। সোনালি আলোয় অ্যাক্রোপলিস যেন আরো রহস্যময় হয়ে উঠেছে। আমি এলেনাকে বললাম, আজ মনে হচ্ছে আমি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান দেখিনি, যেন সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে এলাম। এলেনা মৃদু হাসলো, অ্যাক্রোপলিসের জাদুই এমন। এখানে এলে সবাই ইতিহাসের প্রেমে পড়ে যায়। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে তখন মনে হচ্ছিল, সভ্যতা বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু ইতিহাসের এ পাথরগুলো চিরকাল একই গল্প বলে যাবে।

দুপুরের ইতিহাস ভ্রমণ শেষ হয়ে এসেছে। সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। পাহাড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা অপৎড়ঢ়ড়ষরং ড়ভ অঃযবহং তখন সোনালি আলোয় এক স্বপ্নময় দৃশ্য। নিচে বিস্তৃত শহর অঃযবহং প্রাচীন সভ্যতার কোলে আধুনিক জীবনের কোলাহল। এলেনা বললো, তোমার কি সন্ধ‍্যায় সময় হবে? রাতের আলোয় অ্যাক্রোপলিস একেবারেই অন্যরকম। আমি হেসে বললাম, ইতিহাস যদি রাতেও জেগে থাকে, তাহলে তো অবশ্যই আসতে হবে। এলেনা একটু হাসি দিয়ে বললো, তাহলে সন্ধ্যায় আমরা প্লাকা এলাকায় দেখা করতে পারি। ওখানকার ক্যাফেগুলো খুব সুন্দর।

সন্ধ্যা নামতেই আমরা চলে এলাম অ্যাথেন্সের পুরোনো এলাকা প্লাকাতে। সরু পাথরের গলি, ছোট ছোট দোকান, রঙিন বাতি-সব মিলিয়ে যেন এক রূপকথার শহর। ক্যাফেগুলো থেকে ভেসে আসছে কফির গন্ধ আর গ্রিক সংগীত। আমরা বসে পড়লাম একটি ছোট ক্যাফেতে। সামনে থেকে দেখা যাচ্ছে দূরের পাহাড়ে আলোয় ঝলমল করছে অ্যাক্রোপলিস। ক্যাফের ওয়েটার আমাদের সামনে এনে রাখলে ঐতিহ্যবাহী গ্রিক কফি। আমি চুমুক দিয়ে বললাম, কফিটা বেশ শক্তিশালী। এলেনা হেসে বললো, গ্রিক কফি এমনই। একটু তেতো, কিন্তু স্মরণীয়। রাত গভীর হতে লাগলো। আকাশে তারারা জ্বলছে। পাহাড়ের ওপর আলোকিত অ্যাক্রোপলিস যেন প্রাচীন গ্রীসের কোনো পৌরাণিক গল্পের দৃশ্য। এলেনা বললো- জানো আমরা গ্রিকরা বিশ্বাস করি, অ্যাক্রোপলিস শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি আমাদের আত্মার অংশ। আমি একটু চুপ করে রইলাম। তারপর বললাম, আজ মনে হচ্ছে ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়, মানুষের চোখেও বেঁচে থাকে। সে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। বললো, আপনি বেশ কবির মতো কথা বলেন। আমি হাসলাম। বললাম, ভ্রমণ মানুষকে একটু কবি বানিয়েই দেয়।

রাত বাড়ছে। ক্যাফের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। দূরে পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাক্রোপলিস এখনো আলোকিত যেন সময়ের চিরন্তন প্রহরী। বিদায়ের আগে এলেনা বললো, অ্যাথেন্স আবার এসো। এ শহরের গল্প কখনো শেষ হয় না। আমি পাহাড়ের দিকে শেষবার তাকিয়ে বললাম, হয়তো আবার আসবো। কারণ ইতিহাসের সঙ্গে দেখা হলে মানুষ বারবার ফিরে আসতে চায়।

অ্যাক্রোপলিসের ওপর থেকে পুরো এ অ্যাথেন্স শহরটাকে মনে হচ্ছিল এক মায়াবী নগরী। এলেনা আমার খুব কাছে এসে দাঁড়ালো। বিদায়ের সময় ও শুধু বললো, অ্যাক্রোপলিস চিরকাল থাকবে, কিন্তু আজকের এ দিনটা শুধু আমাদের স্মৃতির অ্যালবামে তোলা থাকলো। পার্থেননের সে প্রাচীন সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে হলো, অ্যাথেন্স কেবল দেখার জায়গা নয়, অনুভব করার জায়গা। আর সে অনুভবে যদি এলেনার মতো কেউ পাশে থাকে, তবে পাষাণ পাথরও যেন প্রেমের কবিতা হয়ে ওঠে।

শেয়ার করুন