স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ তিন বছর পেছানোর প্রস্তাবে জোরালো সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। সংগঠনটি মনে করে, উত্তরণ পেছানো হলে টেকসই ও মসৃণ উত্তরণের জন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ প্রণয়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করা সহজ হবে।
গত ৩ এপ্রিল বিজিএমইএ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে একযোগে কাজ করার মাধ্যমে শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে সামগ্রিক অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
এর আগে বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করে সরকার। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) অধীন কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন।
চিঠিতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে এলডিসি উত্তরণ-প্রস্তুতির সময়কাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ হবে চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর। চূড়ান্ত উত্তরণের আগে তৃতীয় পর্যালোচনা প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা ও কয়েকজন অর্থনীতিবিদের আহ্বানে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার নেপাল ও লাওসের মতো একই সময়ে উত্তরণে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, নতুন সরকার এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার চিঠিতে যুক্তি দিয়েছে, সময়সীমা বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কারগুলো সংহত করা এবং স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির (এসটিএস) অধীন অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ পাওয়া যাবে। চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, এলডিসি উত্তরণে পাঁচ বছরের প্রস্তুতি সময়কাল একের পর এক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংকটে ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে।
এলডিসি কী? কেন বাংলাদেশ এলডিসিতে উন্নয়ন চায়
এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ হলো জাতিসংঘের দেওয়া একটি বিশেষ মর্যাদা। কোনো দেশের মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ (শিক্ষা ও স্বাস্থ্য) এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার ওপর ভিত্তি করে এই তালিকা তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে এই তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার বা ‘উন্নীত’ হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। কেন বাংলাদেশ এই উন্নয়ন বা এলডিসি থেকে উত্তরণ চায়, তার প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো-
১. দেশের মর্যাদা ও আস্থা বৃদ্ধি
এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে আসা একটি দেশের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে বিশাল মাইলফলক। এটি বিশ্বদরবারে প্রমাণ করে যে, দেশটি দারিদ্র্য কাটিয়ে একটি শক্তিশালী অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর ফলে: বৈদেশিক বিনিয়োগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ে। ক্রেডিট রেটিং: দেশের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং উন্নত হয়, যা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঋণ পাওয়া সহজ করে।
২. অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ
দীর্ঘদিন এলডিসি হিসেবে থাকলে বিশ্বের কাছে দেশটি ‘সাহায্য-নির্ভর’ হিসেবে পরিচিত থাকে। বাংলাদেশ এখন নিজেকে ‘বাণিজ্য-নির্ভর’ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এ উন্নয়ন দেশের সক্ষমতার একটি বড় স্বীকৃতি।
৩. টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য
বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এলডিসি থেকে উত্তরণ সে দীর্ঘ যাত্রার একটি অপরিহার্য প্রাথমিক ধাপ। এটি না হলে পরবর্তী পর্যায়ের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব নয়।
৪. চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি
এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে কিছু সুযোগ (যেমন- শুল্কমুক্ত সুবিধা) কমে যাবে। বাংলাদেশ এ উন্নয়ন চায়, যাতে এখন থেকেই নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার প্রস্তুতি নিতে পারে। অর্থাৎ অনুদান বা বিশেষ সুবিধার চেয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্ববাজারে নিজের যোগ্যতায় প্রতিযোগিতা করতে আগ্রহী।
সংক্ষেপে: বাংলাদেশ একটি আত্মনির্ভরশীল মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় এবং এলডিসি থেকে উত্তরণ হলো সেই স্বপ্ন পূরণের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
একনজরে কারণগুলো
জানা গেছে, এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণ তিন বছর পেছনোর শুনানিতে বাংলাদেশের সময়সীমা বাড়াতে চাওয়ার কারণ জানতে চেয়েছিল ইউএনসিডিপি। বাংলাদেশের উল্লেখ করা কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ঘাটতি, মূল সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের মন্থর গতি এবং ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব। এছাড়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বিনিয়োগ পরিবেশের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে স্বল্প সময়ে উত্তরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলোও উল্লেখ করা হয়।
বিজিএমইএর পক্ষ থেকে উপস্থাপনায় বলা হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধার আওতায় সেফগার্ড শর্তের কারণে ভবিষ্যতে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পর্যাপ্ত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি না থাকাকেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এ সময় রুলস অব অরিজিনের শর্ত পূরণে সক্ষমতা বাড়াতেও অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। এছাড়া ব্যবসার খরচ কমানো, নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এলডিসি উত্তরণ হলে রফতানি আয়, কর্মসংস্থান ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এর আগে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা করে একটি সমন্বিত অবস্থান তৈরি করে। সভা শেষে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন, সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক এ উদ্যোগ বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।