০৭ মে ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ০৫:৩৮:২১ অপরাহ্ন


৩৯ দেশের অভিবাসন আবেদন স্থগিত নীতি বাতিল ফেডারেল আদালতে
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৬-০৫-২০২৬
৩৯ দেশের অভিবাসন আবেদন স্থগিত নীতি বাতিল ফেডারেল আদালতে অভিবাসন আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিত


যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিকে ঘিরে নতুন আইনি মোড় তৈরি হয়েছে। ম্যাসাচুসেটসের একটি ফেডারেল আদালত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিতের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এ রায়ের ফলে অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা খেল ট্রাম্প প্রশাসন। ৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে মার্কিন জেলা বিচারক জুলিয়া কবিক বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতি বৈষম্যমূলক এবং আইনের পরিপন্থী। তিনি এই নীতির ওপর অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, যার ফলে হাজার হাজার আবেদনকারী দীর্ঘদিন ধরে যে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন, তা থেকে স্বস্তি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন তার ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা তালিকাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য অভিবাসন আবেদন প্রক্রিয়া কঠোর করে তোলে। এই নীতির আওতায় গ্রিন কার্ড, আশ্রয়, ওয়ার্ক পারমিট এবং নাগরিকত্বের আবেদন কার্যত স্থগিত রাখা হয়। প্রশাসনের যুক্তি ছিল জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করা এবং কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। বিশেষ করে ওয়াশিংটন ডিসিতে এক আফগান নাগরিকের হামলায় ন্যাশনাল গার্ডের এক সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

এই ঘটনার পর প্রশাসন দাবি করে, নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেশি, তাই তাদের আবেদন আরও কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন এবং সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হুমকি প্রতিরোধে সাময়িকভাবে আবেদন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা দরকার। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস একটি বিতর্কিত নীতি চালু করে, যেখানে এসব দেশের নাগরিকদের আবেদনকে গুরুত্বপূর্ণ নেতিবাচক কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল।

এই নীতির আওতায় প্রভাবিত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, ইরিত্রিয়া, মিয়ানমার, তানজানিয়া, কিরগিজস্তান, উত্তর কোরিয়া, ভেনেজুয়েলা, হাইতি, কিউবা, চাদ, কঙ্গো (ডিআরসি), ইথিওপিয়া, মালি, গিনি, সিয়েরা লিওন, ক্যামেরুন, বুরকিনা ফাসো, বুরুন্ডি, লেবানন, মউরিতানিয়া, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আজারবাইজান, আলজেরিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া, জর্ডান এবং মিশর। বিভিন্ন সময়ে এই তালিকা আংশিক পরিবর্তন বা ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

তবে বিচারক কোবিক তার রায়ে বলেন, দুটি বিচ্ছিন্ন সহিংস ঘটনার সঙ্গে ৩৯টি দেশের হাজার হাজার আবেদনকারীর ওপর এই ধরনের নীতি প্রয়োগের কোনো যৌক্তিক সংযোগ নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকার প্রমাণ করতে পারেনি যে এই দেশগুলোর নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উল্লেখযোগ্য হুমকি সৃষ্টি করছে।

আদালত রায়ে বলা হয়, এই নীতি জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের পরিপন্থী। বিশেষ করে ইউএসসিআইএস-এর কার্যক্রম নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে বিচারক বলেন, সংস্থাটি তাদের মূল দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে এবং আবেদনগুলোকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঝুলিয়ে রেখেছে। আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি।

এই মামলা দায়ের করেন প্রায় ২০০ জন অভিবাসী, যারা ৩৯ টি বিভিন্ন দেশের নাগরিক। তাদের মধ্যে ইরান, হাইতি, ভেনেজুয়েলা ও সিরিয়ার নাগরিকরাও রয়েছেন। তারা অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির কারণে তাদের আবেদন দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে এবং তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।বাদীপক্ষের আইনজীবী জিম হ্যাকিং এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন, কংগ্রেস কখনোই জাতীয়তার ভিত্তিতে অভিবাসন সুবিধা সীমিত করার অনুমতি দেয়নি, অথচ ইউএসসিআইএস সেটাই করার চেষ্টা করেছে।

বিচারক কোবিক প্রাথমিকভাবে ২২ জন আবেদনকারীর ক্ষেত্রে এই নীতি কার্যকর না করার নির্দেশ দিয়েছেন, যারা তাদের ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ আদালতে জমা দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, এই রায় বাকি আবেদনকারীদের ওপরও প্রযোজ্য হবে কি না, তা নিয়ে উভয় পক্ষ আলোচনা করবে।

এই রায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এটি শুধু আবেদন প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর পথই খুলে দিচ্ছে না, বরং জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তাও দিচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের নীতির সমালোচনা করে আসছিল, যেখানে বলা হচ্ছিল অভিবাসীদের প্রতি অন্যায় আচরণ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, ফেডারেল আদালতের এই রায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এটি শুধু হাজারো অভিবাসীর জন্য স্বস্তির খবর নয়, বরং ভবিষ্যতে অভিবাসন নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে আইনের শাসন, যুক্তিসংগততা এবং বৈষম্যহীনতার গুরুত্ব আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছে।

শেয়ার করুন