ইউএস সিটিজেনশিপ ও ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস)
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই জটিল, ধীরগতিসম্পন্ন এবং নীতিগত টানাপোড়েনের মধ্যে আবদ্ধ এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক এক বিস্তৃত ডেটা বিশ্লেষণ ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ড্যাশবোর্ড এই সমস্যাকে আরো স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। এই ড্যাশবোর্ডে ২০১৬ অর্থবছর থেকে ২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ইউএস সিটিজেনশিপ ও ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস)-এর ১৯০ টিরও বেশি ধরনের আবেদন ও পিটিশনের অন্তত ২০ হাজার ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্থাটির কার্যক্ষমতা কমেছে, আবেদন জট বেড়েছে এবং প্রত্যাখ্যানের হারও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী, গত এক দশকে ইউএসসি আইএস-এর পেন্ডিং বা ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০১৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে যেখানে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন, ২০২৫ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৬ মিলিয়নে। অর্থাৎ প্রতি বছরই আবেদন জমা পড়ছে, কিন্তু সেই হারে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই জটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রশাসনিক অদক্ষতা, নীতিগত পরিবর্তন, এবং কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব। ২০২০ ও ২০২১ সালে মহামারির কারণে প্রসেসিং ধীর হয়ে পড়ে, একই সময়ে আগের প্রশাসনের কঠোর নীতিমালা সংস্থার কাজের গতি আরো কমিয়ে দেয়।
২০২০ সালের জুন থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর এই ১৫ মাসে ইউএসসি আইএস এর ব্যাকলগ বেড়েছে প্রায় ২.৩ মিলিয়ন। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে সংস্থাটির দক্ষতা সূচক নেমে আসে শূন্য দশমিক ৬৬ এ, যা রেকর্ড সর্বনিম্ন। ওই সময়ে ২ দশমিক ৬ মিলিয়ন আবেদন জমা পড়লেও নিষ্পত্তি হয় মাত্র ১ দশমিক ৭ মিলিয়ন। ফলে মাত্র তিন মাসেই অতিরিক্ত ৮ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি আবেদন জটে যুক্ত হয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সময়ের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো বিশেষ করে আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কঠোরতা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত ডকুমেন্ট চাওয়ার প্রবণতা প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
ডেটা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ দিকে ইউএসসি আইএস-এর তৎকালীন কাজের গতিতে পুরো ব্যাকলগ পরিষ্কার করতে প্রায় ৯ দশমিক ৪ মাস সময় লাগত। কিন্তু ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। ওই বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়কালে হিসাব করলে দেখা যায়, একই কাজ শেষ করতে লাগবে প্রায় ১৩ দশমিক ৮ মাস। ২০২৫ সালে নতুন করে আরো ২ মিলিয়ন আবেদন জটে যুক্ত হয়েছে। বছরের শুরুতে নতুন আবেদন বেড়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে প্রসেসিং কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।
উচ্চ ভলিউমের আবেদনগুলোর মধ্যে টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস)-এর আবেদন সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে যেখানে এই আবেদন ঝুলে ছিল ৪ লাখ ৬৫ হাজার, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১২ লাখে। অর্থাৎ ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সময়ে গ্রিন কার্ড আবেদনকারীদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট সংক্রান্ত আবেদনের জটও দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এছাড়া অস্থায়ী ও স্থায়ী কর্মীদের জন্য বিভিন্ন পিটিশনের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
শুধু জট নয়, আবেদন প্রত্যাখ্যানের হারও বেড়েছে। ২০১৬ সালের শুরুতে যেখানে গড় প্রত্যাখ্যান হার ছিল ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, তা ২০২২ সালে বেড়ে সর্বোচ্চ ১৪ দমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২৫ সালের শেষে তা কিছুটা কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে এলেও এখনো তা আগের তুলনায় বেশি। বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে, কিছু আবেদন ক্যাটাগরিতে প্রত্যাখ্যানের হার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। যেমন-মানব পাচারের শিকারদের জন্য করা টি -ভিসা আবেদন (আই-৯১৪)-এর ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যান হার ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এছাড়া পরিবারভিত্তিক অভিবাসন, ট্রাভেল ডকুমেন্ট এবং বিভিন্ন ওয়েভার আবেদনেও প্রত্যাখ্যানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিবর্তনের পেছনে সরাসরি নীতিগত প্রভাব রয়েছে। ২০১৭ সালে ‘আমেরিকান পণ্য কিনুন এবং আমেরিকানদের নিয়োগ দিন’ নীতির পর ইউএসসি আইএস আবেদন যাচাইয়ে কঠোরতা বাড়ায়। এর ফলে বিশেষ করে এইচ-১বি ভিসার ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যানের হার দ্রুত বেড়ে যায়। একই সময়ে রিকোয়েস্ট ফর এভিডেন্স (আরএফই) বা অতিরিক্ত তথ্য চাওয়ার হারও দ্বিগুণ হয়ে যায়। ফলে আবেদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই আবেদনকারীরা নিরুৎসাহিত হন।
এ দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়ায় অনেকেই চাকরি, শিক্ষা বা পারিবারিক পরিকল্পনায় বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ প্রসেসিং টাইমের কারণে অনেক আবেদনকারী বাধ্য হয়ে পুনরায় আবেদন করেন, যা আবার নতুন করে জট বাড়ায়। ফলে একটি চক্র তৈরি হয়, যা ভাঙা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইউএসসিআইএস কর্মীদের উপরও এই জট বড় চাপ তৈরি করছে। নতুন আবেদন নিষ্পত্তির পরিবর্তে তাদের অনেক সময় ব্যয় হচ্ছে পুরনো জট সামলাতে। ফলে সংস্থার সামগ্রিক দক্ষতা আরো কমে যাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, পর্যাপ্ত জনবল না থাকা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অস্থিরতা, সব মিলিয়ে ইউএসসি আইএস বর্তমানে চাহিদার তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
এই ড্যাশবোর্ডের অন্যতম বড় অবদান হলো এটি অভিবাসন নিয়ে আবেগপ্রবণ বিতর্কের বাইরে এসে তথ্যভিত্তিক আলোচনা সম্ভব করছে। নীতিনির্ধারক, গবেষক, সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষ সবাই এখন একই তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন নীতির কার্যকারিতা বোঝার জন্য এই ধরনের স্বচ্ছ ডেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায়, কীভাবে নীতিগত সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রশাসনিক দক্ষতা এবং আবেদনকারীদের জীবনে প্রভাব ফেলে।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইউএসসিআইএস এ জনবল বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, আবেদন প্রক্রিয়া সরলীকরণ এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে একটি সুসংগঠিত অভিবাসন সংস্কার প্রয়োজন, যা বর্তমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা যে গভীর সংকটে রয়েছে, তা এই ডেটা বিশ্লেষণ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ক্রমবর্ধমান আবেদন, ধীর প্রসেসিং এবং বাড়তে থাকা প্রত্যাখ্যান সব মিলিয়ে এটি একটি কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। এই পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত। ফলে কার্যকর, মানবিক এবং তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এখন সময়ের দাবি।