ওপেন হার্ট সার্জারির বড় কাটাছেঁড়া ছাড়াই হৃদরোগ চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত
যুক্তরাষ্ট্রে হৃদরোগ চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী অগ্রগতি হিসেবে নতুন এক মিনিমালি ইনভেসিভ হার্ট বাইপাস প্রযুক্তি সামনে এসেছে, যা ওপেন হার্ট সার্জারির প্রয়োজনীয়তাকে অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে। এমরি হেলথকেয়ার, এমরি স্কুল অব মেডিসিন এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ)-এর যৌথ গবেষণায় ‘ভেক্টর’ নামে এ উদ্ভাবনী পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো বুক না কেটে হার্টে রক্তপ্রবাহ পুনর্গঠন সম্ভব হয়েছে। প্রথমবারের মতো এমন এক নতুন ধরনের হার্ট বাইপাস পদ্ধতি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা ওপেন হার্ট সার্জারি ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে হার্ট সার্জারির প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে বদলে দিতে পারে। প্রচলিতভাবে করোনারি আর্টারি বাইপাস সার্জারি করতে বুকে বড় ধরনের চিরা দিয়ে হার্টে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু নতুন এই পদ্ধতিতে সম্পূর্ণ ক্যাথেটার ভিত্তিক মিনিমালি ইনভেসিভ কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে।
গত ৭ মে এমরি স্কুল অব মেডিসিন জানিয়েছে, এই নতুন প্রযুক্তির নাম দেওয়া হয়েছে ভেক্টর পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শরীরের ভেতরে একটি নতুন রক্তপ্রবাহের পথ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এতে রোগীর বুক না কেটে, পায়ের শিরা দিয়ে ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে হার্ট পর্যন্ত পৌঁছে জটিল প্রক্রিয়ায় রক্ত চলাচলের বিকল্প পথ তৈরি করা হয়। এই গবেষণা ও চিকিৎসা প্রকল্পে নেতৃত্ব দিয়েছেন এমরি কার্ডিওভাসকুলার সার্জন অ্যাডাম গ্রিনবাম এবং ভাসিলিস বাবলিয়ারোস। তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কার্ডিওলজিস্ট ক্রিস্টোফার ব্রুস এবং ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউটের গবেষক রবার্ট লেডারম্যান। চিকিৎসকদের মতে, এটি ছিল একটি সমন্বিত গবেষণা প্রচেষ্টা, যেখানে ল্যাবরেটরি গবেষণা থেকে শুরু করে প্রাণী পরীক্ষার মধ্য দিয়ে মানব চিকিৎসায় সফল প্রয়োগ পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
অ্যাডাম গ্রিনবাম বলেন, এটি এমন একটি প্রচেষ্টা যেখানে আগে থেকে অনুমোদিত না থাকা কিছু মেডিকেল ডিভাইস কমপ্যাশনেট কেয়ার বা জীবন রক্ষার জরুরি চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। যেসব রোগীর অন্য কোনো চিকিৎসা বিকল্প ছিল না, তাদের জন্যই এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। গবেষকদের মতে, এ নতুন পদ্ধতির মূল লক্ষ্য ছিল হার্টের ধমনী ব্লক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো, বিশেষ করে সেসব জটিল রোগীদের ক্ষেত্রে যাদের হার্ট ভালভ রিপ্লেসমেন্ট বা অন্যান্য জটিল অস্ত্রোপচারের পর মারাত্মক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ভেক্টর পদ্ধতিতে চিকিৎসকরা প্রথমে পায়ের শিরা দিয়ে একটি ক্যাথেটার প্রবেশ করান এবং সেটি ধীরে ধীরে হার্টের প্রধান ধমনী পর্যন্ত নিয়ে যান। এরপর একটি বৈদ্যুতিক তার বা গাইডওয়্যার ব্যবহার করে সেটিকে করোনারি আর্টারির নির্দিষ্ট অংশে পৌঁছে দেওয়া হয়। এ তারটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে একটি ছোট শাখা ধমনীতে প্রবেশ করানো হয়, যাতে নতুন একটি রুট তৈরি করা যায়। পরবর্তী ধাপে দ্বিতীয় একটি ক্যাথেটারের মাধ্যমে সেই তারটিকে শরীরের ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে একটি শিরার মাধ্যমে বাইরে আনা হয়। এর ফলে শরীরের ভেতরে একটি সম্পূর্ণ সংযুক্ত নতুন রক্ত প্রবাহের পথ তৈরি হয়, যার মাধ্যমে চিকিৎসকরা অত্যন্ত নির্ভুলভাবে স্টেন্ট বসাতে সক্ষম হন।
অ্যাডাম গ্রিনবাম ব্যাখ্যা করে বলেন, এই প্রক্রিয়ায় একটি নতুন নিরাপদ প্রবেশপথ তৈরি করা হয়, যেখানে স্টেন্ট ব্যবহার করে রক্ত চলাচলের বিকল্প রুট তৈরি করা হয়। এতে ব্লক হয়ে যাওয়া ধমনীর পাশ দিয়ে রক্ত প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয় এবং হার্টে রক্ত সরবরাহ বজায় থাকে।
এ পদ্ধতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি ফিউচার-রেডি ভাসকুলার রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে বলে গবেষকদের ধারণা। অর্থাৎ ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্যাথেটারভিত্তিক কৌশল ব্যবহার করে একাধিক ধমনী ব্লকেজ একই সেশনে চিকিৎসা করা সম্ভব হতে পারে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত এনআইএইচের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এ প্রযুক্তি শুধু বাইপাস সার্জারির বিকল্প নয়, বরং এটি ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি ক্ষেত্রকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। কারণ এতে সার্জন এবং কার্ডিওলজিস্টদের কাজের সীমারেখা আরো একীভূত হচ্ছে।
প্রাথমিক পর্যায়ের একটি মানব পরীক্ষায় এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় ৬৭ বছর বয়সী এক রোগীর ওপর, যার দীর্ঘদিনের হার্ট সমস্যার ইতিহাস ছিল। রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসা জটিল হওয়ায় তার জন্য ওপেন হার্ট সার্জারি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসকরা জানান, ছয় মাস পর ওই রোগীর অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং হার্টে নতুন কোনো ব্লকেজ দেখা যায়নি। তবে গবেষকরা এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, একক রোগীর সফল ফলাফল দিয়ে এই প্রযুক্তিকে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ঘোষণা করা যায় না। এজন্য প্রয়োজন বহু কেন্দ্রিক বড় আকারের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল, যেখানে বিভিন্ন বয়স ও জটিলতার রোগীদের ওপর এ পদ্ধতি পরীক্ষা করা হবে।
এ গবেষণার ফলাফল সার্কুলেশন: কার্ডিওভাসকুলার ইন্টারভেনশনস নামের একটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এ প্রযুক্তি ভবিষ্যতে হার্ট বাইপাস চিকিৎসার ধারণাকেই বদলে দিতে পারে। ক্রিস্টোফার ব্রুস বলেন, এই প্রকল্পটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি আউট অব দ্য বক্স চিন্তার ফলাফল। প্রাণী পরীক্ষার মাধ্যমে শুরু হওয়া গবেষণা দ্রুতই মানব চিকিৎসায় রূপান্তরিত হয়েছে, যা অত্যন্ত বিরল এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্জন।
গবেষকরা আরো জানিয়েছেন, এ প্রযুক্তির উন্নয়নের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে উন্নত ইমেজিং সিস্টেম, রিয়েল টাইম এক্স-রে ন্যাভিগেশন এবং উচ্চ নির্ভুলতার ক্যাথেটার ডিভাইস। এগুলোর সমন্বয় ছাড়া এ ধরনের জটিল রক্তনালী পুনর্গঠন সম্ভব হতো না।
এছাড়া গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইঞ্জিনিয়ারিং সাপোর্ট সিস্টেম যা ভবিষ্যতে কৃত্রিম রক্তনালী বা রিজেনারেটিভ টিস্যু ব্যবহার করে আরো উন্নত বাইপাস তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। এ অগ্রগতি শুধু হার্ট সার্জারির ভবিষ্যৎ নয়, বরং হাসপাতালভিত্তিক ইনভেসিভ চিকিৎসার ধারণাকেও বদলে দিতে পারে। কারণ ভবিষ্যতে অনেক জটিল সার্জারি হয়তো অপারেশন থিয়েটারের বদলে ক্যাথ ল্যাবেই সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই সাধারণ মানুষের জন্য এ চিকিৎসা উন্মুক্ত নয়। এটি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে এবং শুধু উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিশেষ রোগীদের ক্ষেত্রে সীমিতভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউটের গবেষকরা বলেন, এ ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে শুধু হার্ট বাইপাস নয়, বরং অন্যান্য জটিল ভাসকুলার রোগের চিকিৎসাতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, এ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো সেসব রোগীদের জন্য নতুন আশা তৈরি করা, যাদের জন্য প্রচলিত সার্জারি সম্ভব নয় বা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সব মিলিয়ে, এমরি হেলথকেয়ার ও এনআইএইচের এ যৌথ উদ্যোগ চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ওপেন হার্ট সার্জারির যুগের বিকল্প হিসেবে মিনিমালি ইনভেসিভ বাইপাস প্রযুক্তি ভবিষ্যতে হৃদরোগ চিকিৎসার ধরণ সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।