১৫ জুলাই ২০২৬, বুধবার, ০৪:৫৫:০৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
স্ন্যাপ সুবিধাভোগীদের ভাতা চুরি রোধে বড় পদক্ষেপ ২০২৭ সালে সোশ্যাল সিকিউরিটি ভাতা বাড়তে পারে ৪.৭ শতাংশ যৌন নিপীড়নের মামলায় ক্যারলকে ৫.৬ মিলিয়ন দিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঢালিউডের দু’জন চিত্রনায়িকার বক্তব্যে নিয়ে অনেক প্রশ্ন তরুণ স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা ‘জামানত ছাড়া ঋণ পাবেন’ রাজধানীর বুক থেকে নদী গায়েবের চেষ্টা রুখে দিল পরিবেশবাদিরা বাংলাদেশি অভিবাসীরা কি যুক্তরাষ্ট্রের বোঝা? নেতৃবৃন্দ নীরব কেন ৩১ অঙ্গরাজ্যে মারাত্মক ডায়রিয়া সৃষ্টিকারী পরজীবীর প্রাদুর্ভাব ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯৩ জন মানুষের মৃত্যু বারবার দেশে ফেরার ঘোষণায় হালকা হচ্ছেন হাসিনা


ফেভারিট ফ্যান্সের বিদায়, স্পেন ফাইনালে
হাইভোল্টেজ ফাইনালের অপেক্ষা, কে হবে চ্যাম্পিয়ন
মাসউদুর রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৫-০৭-২০২৬
হাইভোল্টেজ ফাইনালের অপেক্ষা, কে হবে চ্যাম্পিয়ন এই মাঠে ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে


সবে চলছে সেমিফাইনাল। খুব বেশি দূরে নেই হাইভোল্টেজ সেই ম্যাচ। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনাল সেই ম্যাচটি ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে। টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচ বা ফাইনালটি স্থানীয় সময় বিকেল ৩ টায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে (ফিফা কর্তৃক “নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম” নামে পরিচিত) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যে ম্যাচটি হবে বিশ্বসেরার মুকুট পরার ম্যাচ। ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত প্রথম সেমিফাইনালে ফেভারিট ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে স্পেন। দ্বিতীয় সেমিফাইসাল খেলবে আর্জোন্টিনার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড।

আমেরিকার মাটিতে চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ এখন তার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়ে। ৪৮টি দল নিয়ে শুরু হওয়া এই মহাযজ্ঞ এক মাস পার করে এসে দাঁড়িয়েছে চারটি দলে- ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ইতিহাসে এই প্রথমবার ফিফা র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ চারটি দলই বিশ্বকাপের শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে। আর ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম, শেষ চারের প্রতিটি দলই অতীতে অন্তত একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

এক নজরে টুর্নামেন্ট 

এবারের আসরে অংশ নিয়েছে রেকর্ড ৪৮টি দেশ, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো, এই তিন দেশ যৌথভাবে আয়োজন করছে এই বিশ্বকাপ। বর্ধিত ফরম্যাটের কারণে মোট ম্যাচ সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪-এ, যা আগের যেকোনো আসরের চেয়ে বেশি। গ্রুপ পর্ব, রাউন্ড অব থার্টি-টু, রাউন্ড অব সিক্সটিন, কোয়ার্টার ফাইনাল পেরিয়ে এখন টুর্নামেন্ট দাঁড়িয়েছে সেমিফাইনালে শিরোপা জয়ের পথে। তথা চ্যাম্পিয়নদের এখন বাকি মাত্র দুটি ধাপ। সেমির দুই ম্যাচ পার হয়ে শেষ ম্যাচ তথা ফাইনাল। ইতিমধ্যে এ রিপোর্ট যখন পাঠকের হাতে ততক্ষনে দুই সেমির প্রথমটিও শেষ। 

চমকে ভরা বিদায়ের গল্প

এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় সম্ভবত ব্রাজিলের বিদায়। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এবার নকআউট পর্বেই থেমে গেছে, যা লাতিন আমেরিকার ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বড় কষ্টের, কান্নার। একইভাবে জার্মানিও ছিটকে গেছে অপ্রত্যাশিতভাবে, প্যারাগুয়ের কাছে হেরে রাউন্ড অব থার্টি-টু থেকেই বিদায় নিতে হয় তাদের। গ্রুপ পর্বে সাত গোলের বড় জয় দিয়ে শুরু করা জার্মানি শেষ পর্যন্ত ছোট দলের কাছে হোঁচট খেয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় যা দেখিয়ে দেয়, বর্ধিত ফরম্যাটে অখ্যাত দলগুলোও কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

সেমিফাইনালের চিত্র : স্পেন ২, ফ্রান্স ০

ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নদের দাপট এবার বিশ্বকাপের মঞ্চেও। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের আরলিংটনের ডালাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছে স্পেন। এটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্পেনের দ্বিতীয় ফাইনাল। এর আগে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবার শিরোপা জিতেছিল স্পেন।

ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল, আক্রমণ গঠন এবং সুযোগ তৈরিতে ফ্রান্সকে ছাপিয়ে যায় স্পেন। ২২তম মিনিটে তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালকে বক্সের ভেতরে ফাউল করেন ফরাসি ডিফেন্ডার লুকা দিন। রেফারি সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির নির্দেশ দেন। স্পট কিক থেকে নিখুঁত শটে গোল করে স্পেনকে এগিয়ে দেন মিকেল ওয়ারজাবাল। এটি ছিল চলতি বিশ্বকাপে তার পঞ্চম গোল। 

গোল হজমের পর ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স। তবে স্পেনের সুসংগঠিত রক্ষণভাগ এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণের সামনে কার্যকর আক্রমণ গড়ে তুলতে পারেনি তারা। এমবাপ্পে কয়েকবার সুযোগ পেলেও স্পেনের রক্ষণ এবং গোলরক্ষক উনাই সিমোন তাকে হতাশ করেন। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৮তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে স্পেন। দানি ওলমোর দারুণ পাস ধরে দ্রুত বক্সে ঢ়ুকে জোরালো শটে গোলরক্ষক মাইক মেইনিয়ানকে পরাস্ত করেন পেদ্রো পোরো। সেই গোলের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় স্পেন। 

চোট কাটিয়ে ফেরা ১৯ বছর বয়সী লামিন ইয়ামাল পুরোপুরি ছন্দে না থাকলেও আক্রমণ ও রক্ষণ-দুই দিকেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ম্যাচের এক পর্যায়ে এমবাপ্পেকে থামাতে ফাউল করেন তিনি। অন্যদিকে শেষ দিকে এমবাপ্পে হলুদ কার্ডও দেখেন। 

ম্যাচটি দেখতে ডালাস স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন ৭০ হাজার ১৭৬ জন দর্শক। স্টেডিয়ামটির বিশ্বকাপ ধারণক্ষমতা ৭০ হাজার ৬৪৯ হওয়ায় মাত্র ৪৭৩টি আসন খালি ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, টিকিটের তুলনামূলক উচ্চ মূল্যের কারণেই কিছু আসন ফাঁকা ছিল, যদিও পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দর্শক উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সন্তোষজনক। 

এই জয়ে স্পেন এখন বিশ্বকাপ শিরোপা থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে। আগামী রোববারের ফাইনালে তারা মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড ও বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মধ্যকার দ্বিতীয় সেমিফাইনালের বিজয়ী দলের। অন্যদিকে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙে বিদায় নিল ফ্রান্স।

ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা

আটলান্টায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে দ্বিতীয় সেমিফাইনাল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি ইংল্যান্ড, যারা ১৯৬৬ সালের পর আর কখনো বিশ্বকাপ জেতেনি। লিওনেল মেসির সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা বেশ কয়েকটি নাটকীয় ম্যাচ পার করে এসেছে কেপ ভার্দে ও মিশরের বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন তার বড় উদাহরণ। অন্যদিকে জুড বেলিংহাম ও হ্যারি কেইনের নেতৃত্বে ইংল্যান্ডও প্রতিটি নকআউট ম্যাচে লড়াই করে জিতেছে। দুই দলই টানা অতিরিক্ত সময়ের ম্যাচ খেলে এই পর্যায়ে পৌঁছেছে, ফলে শারীরিক ধকলও এই লড়াইয়ে একটা বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।

গোল্ডেন বুটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

ব্যক্তিগত সেরা গোলদাতার লড়াইও এবার সমান উত্তেজনাপূর্ণ। সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত কিলিয়ান এমবাপে ও লিওনেল মেসি যৌথভাবে আট গোল নিয়ে গোল্ডেন বুট তালিকার শীর্ষে। মজার বিষয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এই দুজনই একমাত্র খেলোয়াড় যারা কমপক্ষে বিশটি বিশ্বকাপ গোলের মালিক। তাদের পেছনে আছেন নরওয়ের আর্লিং হালান্ড, যিনি সাত গোল নিয়ে দলের বিদায়ের পরও তালিকায় টিকে আছেন। ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহাম ছয় গোল নিয়ে লড়াইয়ে আছেন। উল্লেখযোগ্য যে, ফিফার নিয়ম অনুযায়ী গোলসংখ্যায় সমতা হলে অ্যাসিস্টের সংখ্যা এবং তারপর কম মিনিট খেলার হিসাব বিবেচনা করা হয়— তাই বাকি দুই ম্যাচে সামান্য ব্যবধানও এই লড়াইয়ের ফলাফল বদলে দিতে পারে।

ইতিহাসের আয়নায়

এবারের সেমিফাইনাল লাইনআপ ফুটবল ইতিহাসের বিরল কিছু কাকতালীয় ঘটনার সাক্ষী। এর আগে মাত্র দুইবার ১৯৭০ ও ১৯৯০ সালে— শেষ চারের সবকটি দলই প্রাক্তন চ্যাম্পিয়ন ছিল। আর ১৯৯২ সাল থেকে ফিফা র‍্যাংকিং প্রবর্তনের পর এই প্রথম শীর্ষ চার র‍্যাংকড দলই সেমিফাইনালে পৌঁছাল। ফ্রান্স ও স্পেনের এটি সপ্তম ও যথাক্রমে মাত্র তৃতীয় সেমিফাইনাল, যেখানে স্পেন এর আগে মাত্র দুবার (১৯৫০ ও ২০১০) শেষ চারে পৌঁছেছিল। এমবাপের হ্যাটট্রিকে ফ্রান্সকে হারিয়ে ২০২২ সালে শিরোপা জেতা আর্জেন্টিনা এবার হাঁটছে টানা দ্বিতীয় শিরোপার পথে, যা করতে পারলে ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর তারাই হবে প্রথম দল। 

ফাইনালের পথে

সেমিফাইনালের পরাজিত দুই দল মায়ামি গার্ডেন্সে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হবে, আর বিজয়ী দুই দল নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে লড়বে শিরোপার জন্য। শক্তি, অভিজ্ঞতা আর মোমেন্টাম- তিন বিচারেই এই চার দল প্রায় সমানে সমান, তাই চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। কেউ বাজি ধরছেন ফরাসি আক্রমণভাগের ধারালো ছন্দের ওপর, কেউ স্প্যানিশ রক্ষণের নিশ্ছিদ্র ওয়ালের ওপর, আবার কারো চোখ মেসির শেষ বিশ্বকাপ রূপকথার দিকে। মাঠের লড়াই যা-ই বলুক, ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এই বিশ্বকাপ ইতিমধ্যে উপহার দিয়েছে ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় নকআউট পর্ব এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 

শেয়ার করুন