অভিযুক্ত শাহিদুল ইসলাম নিহত ও মণিকা ইসলাম
ফ্লোরিডার লেক কাউন্টিতে বাংলাদেশের একটি সম্পত্তি বিরোধের জেরে ভাবি মণিকা ইসলাম হত্যা মামলায় ৪৪ বছর বয়সী দেবর শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত প্রথম-ডিগ্রি হত্যা ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে গ্র্যান্ড জুরি অভিযোগপত্র অনুমোদন করেছে। মামলার গুরুত্ব, অপরাধের ধরন এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের ওপর এর গভীর প্রভাব বিবেচনা করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্লোরিডার পঞ্চম জুডিশিয়াল সার্কিট স্টেট অ্যাটর্নির অফিস। ফ্লোরিডার পঞ্চম জুডিশিয়াল সার্কিটের স্টেট অ্যাটর্নি বিল গ্ল্যাডসন, চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার ব্লেইস ইনগোগলিয়া এবং লেক কাউন্টি শেরিফ পেটন গ্রিনেল যৌথভাবে শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও মৃত্যুদণ্ড চাওয়ার বিষয়টি ঘোষণা করেন।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ মে শাহিদুল ইসলাম তার ভাবী (ভাইয়ের স্ত্রী) মণিকা ইসলামকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, হত্যার সময় তিনি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেন এবং গুলি চালান। গ্র্যান্ড জুরি তদন্তকারীদের উপস্থাপিত প্রাথমিক প্রমাণ পর্যালোচনা করে তার বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত প্রথম-ডিগ্রি হত্যা ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ আনার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৪৪ বছর বয়সী মণিকা ইসলাম ফ্লোরিডার ইউস্টিস এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি শাহিদুল ইসলামের বড় ভাই রাশেদুল ইসলামের স্ত্রী ছিলেন। অর্থাৎ, শাহিদুল ইসলাম ছিলেন মণিকা ইসলামের দেবর। ২০২৫ সালের ২ মে মণিকার মেয়ে তাকে নিখোঁজ হিসেবে পুলিশকে জানানোর পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনুসন্ধান শুরু করে। তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, মণিকা ইসলাম তার কর্মস্থল একটি কনভেনিয়েন্স স্টোর থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন। পরে লেক কাউন্টির মাউন্ট ডোরা এলাকার উলফ ব্রাঞ্চ ড্রাইভ ও সিনিক হিলস ড্রাইভের কাছে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীরা জানান, তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন।
লেক কাউন্টি শেরিফের তদন্তকারীদের দাবি, মণিকা ইসলাম কর্মস্থল থেকে বের হওয়ার পর শাহিদুল ইসলামের সঙ্গে ছিলেন। নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে শাহিদুল ইসলামের গাড়ির দিকে যেতে দেখা গেছে বলে তদন্তকারীরা জানান। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যার পর শাহিদুল ইসলাম ফ্লোরিডা ছেড়ে নিউইয়র্কে পালিয়ে যান। পুলিশ আরো জানিয়েছে, তার গাড়ি তল্লাশির সময় রক্তের দাগ পাওয়া যায় এবং ওই রক্তের নমুনা মণিকা ইসলামের ডিএনএর সঙ্গে মিলে গেছে বলে তদন্তকারীরা দাবি করেন। এছাড়া গাড়ির যাত্রী পাশের জানালায় ক্ষতির চিহ্ন এবং একটি গুলির অংশ পাওয়া গেছে বলেও জানানো হয়। তদন্তকারীরা দাবি করছেন, বাংলাদেশে থাকা সম্পত্তি, সম্পত্তির কাগজপত্র এবং গয়না নিয়ে পারিবারিক বিরোধ এ হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
পুলিশ ২০২৪ সালের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেছে। তাদের অভিযোগ, ওই সময় মণিকার স্বামী রাশেদুল ইসলাম তার ওপর হামলা করেন এবং গয়না ও সম্পত্তির কাগজপত্র নিয়ে যান। তদন্তকারীদের দাবি, ওই ঘটনার সময় শাহিদুল ইসলাম বন্দুক দেখিয়ে তার ভাবী মণিকাকে ৯১১ নম্বরে ফোন না করার হুমকি দেন। তবে এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
এছাড়া মণিকার স্বামী রাশেদুল ইসলাম ও শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে মণিকার ওপর পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ উঠেছিল বলে জানা গেছে। ওই ঘটনার পর রাশেদুল ইসলাম বাংলাদেশে চলে যান এবং শাহিদুল ইসলামকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয় বলে প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের পর শাহিদুল ইসলাম আবার অবৈধভাবে দেশে ফিরে আসেন এবং পরে পরিকল্পিতভাবে মণিকা ইসলামকে হত্যা করেন। আদালত ও অভিবাসন সংক্রান্ত রেকর্ড অনুযায়ী, শাহিদুল ইসলাম এর আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। পরে তিনি অবৈধভাবে আবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। একটি অভিবাসন সংক্রান্ত অপরাধে তিনি ১০ মাসের ফেডারেল কারাদণ্ড ভোগ করেন এবং পরে নজরদারির শর্তে মুক্তি পান।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, মুক্তির পর তিনি তার তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ না করে আত্মগোপনে চলে যান এবং বিভিন্ন নামে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে চলাফেরা করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানে শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্ক থেকে শাহিদুল ইসলামকে শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে ফেডারেল অভিবাসন মামলায় গ্রেফতার করা হয় এবং লেক কাউন্টি, ফ্লোরিডায় ফিরিয়ে এনে হত্যা মামলায় বিচারের মুখোমুখি করা হয়।
তদন্তকারীরা আরো জানান, রাশেদুল ইসলাম পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে চলে গেছেন এবং এখনো ফিরে আসেননি। তদন্তের সময় কর্মকর্তারা জানতে পারেন, শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ প্রবেশ সংক্রান্ত একটি ফেডারেল অভিবাসন ওয়ারেন্ট রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ৬ মে ২০২৫ নিউইয়র্কে ইউএস মার্শাল সার্ভিস শাহিদুল ইসলামকে গ্রেফতার করে। তাকে গ্রেফতারের পর অভিবাসন সংক্রান্ত প্রক্রিয়া শেষে হত্যা মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতে লেক কাউন্টি, ফ্লোরিডায় ফিরিয়ে আনা হয়। বর্তমানে শাহিদুল ইসলাম লেক কাউন্টি ডিটেনশন ফ্যাসিলিটিতে বিনা বন্ডে আটক রয়েছেন।
ফ্লোরিডার পঞ্চম জুডিশিয়াল সার্কিট স্টেট অ্যাটর্নির অফিস জানিয়েছে, অপরাধের গুরুতরতা এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের ওপর এর প্রভাব বিবেচনা করে তারা শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করছে। স্টেট অ্যাটর্নি বিল গ্ল্যাডসন বলেন, কোনো বিচারই মণিকা ইসলামের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারবে না বা তার পরিবারের কষ্ট দূর করতে পারবে না। তবে আইনের সর্বোচ্চ সীমার মধ্যে অভিযুক্তকে জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য প্রসিকিউশন কাজ করবে। লেক কাউন্টি শেরিফ পেটন গ্রিনেল বলেন, মণিকা ইসলামের হত্যা একটি অর্থহীন ও ভয়াবহ সহিংস ঘটনা। তিনি তদন্তকারী কর্মকর্তাদের পরিশ্রম এবং বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতার প্রশংসা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অভিযুক্তকে বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া মণিকার পরিবারের জন্য কিছুটা হলেও শান্তি ও ন্যায়বিচারের অনুভূতি নিয়ে আসবে। চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার ব্লেইস ইনগোগলিয়া বলেন, সহিংস অপরাধের বিরুদ্ধে ফ্লোরিডা কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
মামলার চূড়ান্ত রায় এখনো ঘোষণা করা হয়নি। প্রথম-ডিগ্রি হত্যা মামলায় আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া, উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক, প্রমাণ উপস্থাপন এবং জুরি বা আদালতের সিদ্ধান্তের পরই শাহিদুল ইসলামের দোষ বা নির্দোষের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। শাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বর্তমানে প্রথম-ডিগ্রি হত্যা ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। প্রসিকিউশন মৃত্যুদণ্ড চাইলেও আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইন অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত নন।