১২ জুন ২০২৬, বুধবার, ০৩:১৬:০৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
মাদকজনিত মৃত্যুহার কমলেও ফেন্টানিল এখনো প্রধান হুমকি ৩৮ মিলিয়ন মেডিকেইড জালিয়াতির অভিযোগে নেতাসহ ৮ জন গ্রেফতার নারী স্বাস্থ্যকর্মী কর্তৃক ২ মুসলিম নারীকে হয়রানি ও হুমকি রিপাবলিকান কনভেনশনে মুসলিম ডেলিগেটদের ‘যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার’ পরামর্শ ইসরায়েলি বন্ড থেকে ৮৫ শতাংশ বিনিয়োগ প্রত্যাহার মেরিল্যান্ডের মেডিকেইড ও ওবামাকেয়ার থেকে এক বছরে বাদ ৫০ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব আবেদনের ফি ১৩৩০ ডলার বাতিল হতে পারে ফি মওকুফ ২০৩৪ সালের পর সোশ্যাল সিকিউরিটি পেনশন সুবিধা কমার আশঙ্কা এক ফোটা রক্তেই মিলবে ৫০ ধরনের ক্যানসারের ইঙ্গিত গ্রিন কার্ডধারীকেও বহিষ্কারের ক্ষমতা ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের


তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিমের সম্পর্কের এক নতুন দিগন্তের সূচনা
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৪-০৬-২০২৬
তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিমের সম্পর্কের এক নতুন দিগন্তের সূচনা তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিম


বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম আনুষ্ঠানিক মালয়েশিয়া সফর দুই দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মালয়েশিয়ার আধুনিক রূপকার মাহাথির মোহাম্মদের মধ্যকার ঐতিহাসিক পারিবারিক ও রাজনৈতিক বন্ধুত্বের সূত্র ধরে বর্তমান দুই নেতার এই বৈঠক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এক অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। 

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে হাবিব ওয়াহিদের জনপ্রিয় বাংলা গান ‘মহাজাদু’ আবহ হিসেবে ব্যবহার করে প্রকাশ করা একটি ভিডিও চিত্রটি দুই দেশের জনগণের মধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। মানুষ আশা করছে দুই দেশের এ দুই নেতা পারস্পারিক সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে দুই দেশকে আরো কাছে নিয়ে আসবে। 

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম কোনো দেশ সফরে মালয়েশিয়াকে কেন বেছে নেয়া এ নিয়ে অনেক বিশ্লেষণ থাকতেই পারে। তবে এ সফরটা তারেক রহমানের জন্য অন্য এক অনুভূতিরও। একই দেশের সঙ্গে বাবা জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্টতা, মা খালেদা জিয়ারও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পর সে দেশে পা রাখলেন তারেক রহমান, তাও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। নিজের সরকারী প্রথম এ সফর। ফলে এটা অন্য এক অনুভুতিও।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরটি কেবল একটি সাধারণ কূটনৈতিক সফর ছিল না, বরং এর পেছনে জড়িয়ে ছিল এক গভীর আবেগ এবং ঐতিহাসিক যোগসূত্র। মালয়েশিয়ার কিংবদন্তি নেতা আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার ড. মাহাথির মোহাম্মদ একসময় বাংলাদেশের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। দুই নেতার হাত ধরেই ঢাকা-কুয়ালালামপুর সম্পর্কের মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল।

এ দুইয়ের মধ্যে গভীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বন্ধুত্বও ছিল। তাঁদের এই সুসম্পর্ক মূলত গড়ে উঠেছিল উন্নয়ন দর্শন, পররাষ্ট্রনীতি এবং ইসলামি রাষ্ট্রগুলোর ঐক্য ও জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রতি তাঁদের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে। দুই নেতাই নিজ নিজ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত নিবেদিত ছিলেন। অনেকেই মনে করেন, ড. মাহাথির মোহাম্মদের মালয়েশিয়াকে একটি অনুন্নত দেশ থেকে আধুনিক ও শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরের দর্শনে জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি বড় প্রভাব ছিল। জিয়াউর রহমান যখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে মুসলিম বিশ্ব ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করছিলেন, তখন ড. মাহাথিরের সাথে তাঁর আদর্শিক মিল তৈরি হয়। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সাথেও ড. মাহাথিরের চমৎকার ও উষ্ণ সম্পর্ক বজায় ছিল, যার ফলে পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির বড় সুযোগ সৃষ্টি হয়। 

এবার তারেক রহমানের পালা। তবে মাহাথির নয় সেখানে মালয়েশিয়ার আরেক ঝানু পলিটিশিয়ান আনোয়ার ইব্রাহিম। যতক্ষন ছিলেন তারেক রহমান দুই প্রধানমন্ত্রীর চলাফেরা, বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা এক নতুন বন্ধুত্ব মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। 

এই সফর থেকে দুই দেশ কী পেল?

দুই দিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে কেবল আনুষ্ঠানিকতাই ছিল না, বরং বেশ কিছু বাস্তবসম্মত ও কৌশলগত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে: বৈঠকে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংকট সমাধানে কাজ করবেন। একই সাথে আসিয়ানের পরিমণ্ডলে এবং দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মাধ্যমে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির বিষয়েও কথা হয়েছে।

শ্রমবাজারের জন্য সুসংবাদ

এই সফরের পরপরই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর পথ শিগগিরই আরও সুগম হতে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স খাতের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি। আনোয়ার ইব্রাহিম যুবনেতা হিসেবে জিয়াউর রহমানের সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি এবং পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কথা স্মরণ করেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ সম্মান ও আস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

ভবিষ্যতে এই বন্ধুত্ব কতটা অগ্রসর হতে পারে?

তারেক রহমান ও আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যকার এই ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক রসায়ন আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ককে বহুদূর এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৬ সালে এসে আসিয়ান জোটে মালয়েশিয়ার অবস্থান অত্যন্ত সুদৃঢ়। মালয়েশিয়ার সাথে এই গভীর বন্ধুত্ব আঞ্চলিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মালয়েশিয়াকে একটি শক্তিশালী মিত্র হিসেবে পাশে পাবে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিশ্ব দরবারে মর্যাদা ও অর্থনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করার যে লক্ষ্য, তা অর্জনে মালয়েশিয়া বড় অংশীদার হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা (ঋঞঅ) এবং সরাসরি বিনিয়োগ (ঋউও) বৃদ্ধির সম্ভাবনা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি।

সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বন্ধন

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর অফিশিয়াল ভিডিওতে বাংলা গান ব্যবহারের যে অনন্য নজির দেখা গেল, তা প্রমাণ করে যে আগামীতে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল টেবিল-বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং শিক্ষা, পর্যটন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের স্তরেও এই বন্ধুত্ব এক নতুন মাত্রা পেতে পারে। 

সবশেষ

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া এবং সেখানে আনোয়ার ইব্রাহিমের উষ্ণ আতিথেয়তা সব মিলিয়ে এটি পরিষ্কার যে, বিগত প্রজন্মের হাত ধরে তৈরি হওয়া এই বন্ধুত্ব বর্তমান প্রজন্মের হাত ধরে এক “মহাজাদুকরী” ও কৌশলগত রূপ নিতে যাচ্ছে। এই সম্পর্ক আগামী দিনে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়।

শেয়ার করুন