ইউনাইটেড স্টেটস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট ফর দ্য সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্ক
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতিকে আরো কঠোর করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের গৃহীত ‘বাধ্যতামূলক আটক’ নীতি এখন ব্যাপক আইনি প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। দেশজুড়ে ফেডারেল আদালতগুলোতে এই নীতির বিরুদ্ধে একের পর এক রায় আসছে, যেখানে বিচারকরা প্রশাসনের অবস্থানকে অবৈধ কিংবা সংবিধানবিরোধী বলে আখ্যায়িত করছেন। আদালতের নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইতোমধ্যে ৩০০-এর বেশি ফেডারেল বিচারক ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতির বিরোধিতা করেছেন এবং ১,৬০০-এরও বেশি মামলায় অভিবাসীদের মুক্তি বা জামিন শুনানির নির্দেশ দিয়েছেন। এই বিচারকদের মধ্যে রয়েছেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের প্রেসিডেন্টদের মনোনীত বিচারকরা। রোনাল্ড রিগ্যান থেকে শুরু করে জো বাইডেন পর্যন্ত সব প্রশাসনের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকরাই এই নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। বিচারকদের মতে, নির্বিচারে প্রায় সকল অভিবাসীকে আটক রাখার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অভিবাসন আইনি কাঠামো ও মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
ট্রাম্প প্রশাসন গত ৮ জুলাই আইস-এর নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। নতুন ব্যাখ্যায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে অবস্থানরত প্রায় সবাই অ্যাপ্লিক্যান্ট ফর অ্যাডমিশন হিসেবে গণ্য হবে এবং তাদের কোনো ধরনের জামিন বা মুক্তির সুযোগ না দিয়েই বহিষ্কার প্রক্রিয়া চলাকালে আটক রাখা যাবে। এটি আগের ৩০ বছরের চর্চার সম্পূর্ণ বিপরীত, যেখানে শুধু বিপজ্জনক বা পালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের আটক রাখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো।
এই নীতির ফলে আদালতগুলোতে প্রতিদিন শতাধিক জরুরি মামলা দায়ের হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিবাসীদের রাস্তাঘাট থেকে, কর্মস্থল থেকে কিংবা বহু বছর ধরে নিয়ম মেনে হাজিরা দেওয়া আইসিই চেক-ইন বা ইমিগ্রেশন কোর্টে উপস্থিত হওয়ার সময় হঠাৎ আটক করা হচ্ছে। অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রে দশকের পর দশক বসবাস করছেন, পরিবার-পরিজন ও সন্তান রয়েছে, তবু কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ ছাড়াই তাদের দূরবর্তী ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে।
নিউইয়র্কের ইউনাইটেড স্টেটস ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট ফর দ্য সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউ ইয়র্কের বিচারক অরুণ সুব্রামানিয়ান ২৩ ডিসেম্বর দেওয়া এক রায়ে এই পরিস্থিতিকে অমানবিক ও ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেন। তিনি লেখেন, এ ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে অসংখ্য আবেদন জমা পড়ছে। তাদের পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, যারা কোনো ঝুঁকি নয় তাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা হচ্ছে এবং সরকার নিজেই আদালতে এসে ব্যাখ্যা দিতে পারছে না কেন তাদের দূরের ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হলো। তিনি আরো বলেন, আইন অনুযায়ী সরকার বহিষ্কার প্রক্রিয়া চালাতে পারে-এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। কিন্তু আমরা অন্য মানুষদের কীভাবে আচরণ করছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মামলাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত ৩০৮ জন বিচারক ট্রাম্প প্রশাসনের গণআটক নীতির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। এর বিপরীতে মাত্র ১৪ জন বিচারক প্রশাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যাদের মধ্যে ১১ জনই ট্রাম্প মনোনীত। এমনকি ট্রাম্পের মনোনীত ৩৩ জন বিচারকও এই নীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। সংখ্যাগতভাবে সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা এসেছে বাইডেন (১০৩ জন), ওবামা (৯৭ জন) ও বিল ক্লিনটন (২৭ জন) আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকদের কাছ থেকে। পাশাপাশি জর্জ ডব্লিউ বুশ, জর্জ এইচ. ডব্লিউ বুশ ও রিগ্যান আমলের ৪৮ জন বিচারকও এই নীতির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন।
তবে এত বিপুল আইনি পরাজয়ের পরও এখনো এই নীতির ওপর কোনো জাতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো ,অধিকাংশ মামলা ব্যক্তিগতভাবে, জরুরি ভিত্তিতে দায়ের করা হচ্ছে, যেখানে বৃহৎ পরিসরের ক্লাস অ্যাকশন মামলা গড়ে তোলার সময় ও সুযোগ খুব কম। ফলে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করতে আপিল আদালত কিংবা সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা মাসের পর মাস সময় নিতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তারা এমন ক্ষমতা প্রয়োগ করছে যা আইনেই ছিল, কিন্তু আগের প্রশাসনগুলো তা ব্যবহার করেনি। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ট্রিশিয়া ম্যাকলাফলিন বলেন, এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আগেও বিচারিক অ্যাক্টিভিজমকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আইস আইনের মধ্যেই কাজ করছে এবং শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ আদালতে গিয়ে আমরা জয়ী হবো।
এ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে অভিবাসন আইনের একটি পুরনো জটিলতা। আইন অনুযায়ী, সদ্য সীমান্ত অতিক্রমকারী অ্যাপ্লিক্যান্ট ফর অ্যাডমিশনদের বাধ্যতামূলকভাবে আটক রাখা যায়। কিন্তু বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অভিবাসীদের ক্ষেত্রে কেবল তারা বিপজ্জনক বা পলায়ন ঝুঁকিতে থাকলেই আটক করার বিধান ছিল এবং তাদের জামিন শুনানির অধিকার ছিল। ট্রাম্প প্রশাসন এখন বলছে, দীর্ঘদিন বসবাস করলেও তারা এখনও অ্যাপ্লিক্যান্ট ফর অ্যাডমিশন হিসেবেই গণ্য।
অক্টোবরে বোর্ড অব ইমিগ্রেশন অ্যাপিলস (বিআইএ) প্রশাসনের এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এর পরপরই দেশজুড়ে ফেডারেল আদালতগুলোতে মামলার ঢল নামে। যদিও ক্যালিফোর্নিয়ার বিচারক সানশাইন সাইকস একটি জাতীয় পর্যায়ের ক্লাস অ্যাকশন রায় দেন, সেই রায়ের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকায় প্রশাসন গণআটক অব্যাহত রেখেছে।
কিছু ট্রাম্প মনোনীত বিচারক প্রশাসনের পক্ষে রায় দিলেও তারাই স্বীকার করেছেন, এ সিদ্ধান্তের মানবিক প্রভাব ভয়াবহ। ওকলাহোমার বিচারক জোডি ডিশম্যান বলেন, আদালতের প্রথম দায়িত্ব আইন রক্ষা করা, যদিও এর ফলে মানবিক কষ্ট তৈরি হয় কিন্তু এ বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না।
এদিকে গণআটক নীতির পাশাপাশি আরেকটি বিষয়েও আদালতগুলো ট্রাম্প প্রশাসনকে বারবার বাধা দিচ্ছে। তা হলো-যেসব অভিবাসীর বহিষ্কার আদেশ বহু বছর আগে জারি হয়েছে, কিন্তু যাদের নিজ দেশ ভ্রমণ নথি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা। সুপ্রিম কোর্টের মতে, ছয় মাস পর্যন্ত আটক ‘যৌক্তিক’ ধরা হলেও তার বেশি সময় বেআইনি। তবুও বহু ক্ষেত্রে আইসিই এই সীমা লঙ্ঘন করছে বলে বিচারকরা মত দিয়েছেন।
ওয়াশিংটনের বিচারক রবার্ট লাসনিক সম্প্রতি এক ভিয়েতনামি নারীকে মুক্তির নির্দেশ দেন, যাকে ২৬ বছরেও নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায়নি। নিউইয়র্কের বিচারক সুব্রামানিয়ানের রায়ে গিনির নাগরিক আইসাতু দিয়াল্লোর ঘটনাও আলোচিত হয়। ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর লাগার্ডিয়া বিমানবন্দরে তাকে কোনো নোটিশ ছাড়াই গ্রেফতার করে লুইজিয়ানায় পাঠানো হয়। বিচারক লিখেছেন-‘এগুলোর কোনোটি ঘটার প্রয়োজন ছিল না। সবকিছুই বেআইনি।’
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই গণআটক নীতি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন সংঘাত সৃষ্টি করেছে। যতদিন না উচ্চ আদালত এ বিষয়ে চূড়ান্ত রায় দিচ্ছে, ততদিন হাজার হাজার অভিবাসী অনিশ্চয়তা, ভয় এবং আটক জীবনের মুখোমুখি হতে থাকবেন-এমনটাই মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা।