মিনিয়াপোলিসে ৩৭ বছর বয়সী অ্যালেক্স প্রেটি ২৪ জানুয়ারি ফেডারেল কর্তৃপক্ষের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ৮ জনের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে ছয়জন মারা গেছেন আইস হেফাজতে বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে, আর দুজন নিহত হয়েছেন জনসমক্ষে আইন প্রয়োগ অভিযানের সময় গুলিতে। ২০২৫ সালে আইস হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ২০২৬ সালের শুরুতেই যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ ধারাবাহিক মৃত্যুর ঘটনায় সরকারি জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
জানুয়ারি মাসে টেক্সাস, পেনসিলভানিয়া, জর্জিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়ার ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে আইসিই হেফাজতে ছয়জনের মৃত্যু হয়। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ৫৫ বছর বয়সী কিউবান বংশোদ্ভূত বাবা জেরালদো লুনাস কাম্পোসের মৃত্যু। তিনি টেক্সাসের এল পাসোতে অবস্থিত ক্যাম্প ইস্ট মন্টানা ডিটেনশন সুবিধায় আটক ছিলেন। প্রাথমিকভাবে আইসিই দাবি করে, তিনি ‘অশান্ত আচরণ’ করার পর চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থার কারণে মারা যান। কিন্তু এল পাসো কাউন্টির মেডিকেল এক্সামিনার পরে রায় দেন, গলা ও দেহে চাপ প্রয়োগজনিত শ্বাসরোধে তার মৃত্যু হয়েছে এবং এটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে জানা যায়, তাকে হাতকড়া পরানো অবস্থায় কয়েকজন প্রহরী মাটিতে চেপে ধরেছিল এবং একজন তার গলায় চাপ প্রয়োগ করেন। এই পরস্পরবিরোধী তথ্য জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং তার পরিবার ন্যায়বিচারের দাবি জানায়।
একই মাসে আরো পাঁচজনের মৃত্যু হয় আইসিই হেফাজতে। হন্ডুরাসের ৪২ বছর বয়সী লুইস গুস্তাভো নুনেজ কাসেরেস ৫ জানুয়ারি টেক্সাসের কনরো শহরের জো করলি প্রসেসিং সেন্টারে মারা যান। ৬৮ বছর বয়সী লুইস বেলত্রান ইয়ানেজ ক্রুজ, যিনি ২৬ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন, ৬ জানুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার ক্যালেক্সিকোতে ইম্পেরিয়াল রিজিওনাল ডিটেনশন সেন্টারে মারা যান। কম্বোডিয়া থেকে শিশু বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ৪৬ বছর বয়সী পারাডি লা ৯ জানুয়ারি ফিলাডেলফিয়ার ফেডারেল ডিটেনশন সেন্টারে মৃত্যুবরণ করেন। মেক্সিকোর ৩৪ বছর বয়সী হেবের সানচেজ দোমিঙ্গেজ ১৪ জানুয়ারি জর্জিয়ার লাভজয় শহরের রবার্ট এ ডেইটন সুবিধায় মারা যান। একই দিনে নিকারাগুয়ার ৩৬ বছর বয়সী ভিক্টর ম্যানুয়েল দিয়াজ টেক্সাসের ক্যাম্প ইস্ট মন্টানায় মারা যান,যেখানে একই মাসে দ্বিতীয় মৃত্যুর ঘটনা এটি এবং ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে তৃতীয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, অনেক ডিটেনশন সেন্টারে অতিরিক্ত ভিড়, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবার অভাব, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার সংকট এবং আইনি প্রতিনিধিত্বে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব কারণ মিলিয়ে আটক ব্যক্তিদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে এবং অনেক মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
ডিটেনশন সেন্টারের বাইরেও জনসমক্ষে আইন প্রয়োগ অভিযানে প্রাণঘাতী গুলির ঘটনা ঘটেছে। মিনিয়াপোলিস শহরে পৃথক দুই ঘটনায় দুজন নিহত হন, যা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয়। ৩৭ বছর বয়সী তিন সন্তানের মা রেনি নিকোল গুড একটি বড় ধরনের অভিযানের সময় আইসিই এজেন্টের গুলিতে নিহত হন। দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর ৩৭ বছর বয়সী আইসিইউ নার্স অ্যালেক্স প্রেটি সীমান্ত টহল বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান। উভয় ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাকে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো বলে ব্যাখ্যা করে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও ভিডিও ফুটেজে প্রশ্ন উঠেছেযে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ আদৌ প্রয়োজনীয় ছিল কি না।
রেনি গুডের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ফেডারেল কর্মকর্তারা চিকিৎসাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে সহায়তা দিতে বাধা দেন। তবুও ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের সিভিল রাইটস ডিভিশন সংশ্লিষ্ট এজেন্টের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু না করে ভিন্নভাবে বিষয়টি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়, যা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে অ্যালেক্স প্রেটির ঘটনায় প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি হাতে কেবল একটি মোবাইল ফোন ধরে ছিলেন, এরপর একাধিক এজেন্ট তাকে মাটিতে ফেলে দেয় এবং তার বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার পরও গুলি চালানো হয়,এমন অভিযোগ সামনে এসেছে।
এ ধারাবাহিক মৃত্যুর পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য আইস ও ডিএইচএসের কার্যক্রমে অধিকতর নজরদারি এবং বলপ্রয়োগের স্পষ্ট সীমা নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। সমালোচকদের মতে, জানুয়ারি ২০২৬-এর ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি বৃহত্তর কাঠামোগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে। অভিবাসন নীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলতেই পারে, কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য হলো রাষ্ট্রীয় নীতির ফলে যদি অযৌক্তিক মৃত্যু ঘটে, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের শুরুতেই আইসিই হেফাজত ও আইন প্রয়োগ অভিযানে মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থার মানবিক দিক নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হল এই মৃত্যুগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায় নির্ধারণ কতটা নিশ্চিত করা হবে, এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।