২০২৫ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৯৯টি ঘটনায় সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৫৬০৪ জন। তাদের মধ্যে ৮৬ জন নিহত ও ৫৫১৮ জন আহত হন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) এর পক্ষ থেকে এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এম এস এফ প্রতিমাসে নিয়মিত দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে উপস্থাপন করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কেমন ছিল তার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল।
এমএসএফ ওই রিপোর্টে আরও বলা হয় যে, রাজনৈতিক সহিংসতার ৫৯৯টি ঘটনায় সহিংসতায় আহতদের মধ্যে ৯৭ জন গুলিবিদ্ধ। নিহতদের মধ্যে ৬৫ জন বিএনপি, ৮ জন আওয়ামী লীগ, ৩ জন জামায়াতে ইসলাম এবং ১০ জন বিভিন্ন শ্রেণী, পেশা ও বয়সের সাধারণ নাগরিক, যাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। এ সকল সহিংসতার ঘটনার মধ্যে নির্বাচনের ঘোষণা হওয়ার পর মনোনয়ন ও প্রচারণাকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ২৬টি ঘটনায় হতাহত হয়েছেন ২৫২ জন। যাদের মধ্যে ৩ জন নিহত ও ২৪৯ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের উপর দুষ্কৃতিকারীদের হামলা, নিহত এবং অপমৃত্যুর বিষয়টিও এমএসএফ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের উপর দুষ্কৃতিকারিদের হামলার ১৬৯টি ঘটনা ঘটেছে এবং এ সকল ঘটনায় সহিংসতার শিকার হয়েছেন ২৩৪ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে ৪৭ জন নিহত এবং ১৮৭ আহত হয়েছেন।
এদিকে এমএসএফ এই প্রতিবেদন পেশ করে তাদের অভিমতে বলা হয় যে, ২০২৫ সালের প্রথমদিকে রাজনৈতিক কর্মকান্ড তেমন না থাকলেও নির্বাচন আসন্ন এই ধারণায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে অন্ত:দ্বন্দ্ব ও সহিংসতায় হতাহতের এবং দুষ্কৃতিকারীদের হাতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সরকার ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পরদিন ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামে সারোয়ার হোসেন বাবলা গুলিবিদ্ধ ও গাজীপুরে তানজির আহমদ আবিদ সংঘর্ষে মারা যান। এই প্রেক্ষিতে সরকার সম্ভাব্য সহিংসতা প্রতিরোধে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীকে গণগ্রেফতার করছে, যা চলমান রাখা হয়েছে। এছাড়া গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ ফলে সাধারণ মানুষ গভীর শংকা, উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার মধ্যে দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে। ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ এনে ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার মত ন্যাক্কারজনক ঘটনা ও রাজশাহীর ওমর ফারুককে পিটিয়ে হত্যা করে পরবর্তীতে গণপিটুনির নাম দিয়ে কারাগারে প্রেরণ ও চিকিৎসাধী অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনাদ্বয় জনজীবনে নিরাপত্তা বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
এরপর এমএসএফ এর পক্ষ থেকে বলা হয় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কর্তৃক গোপালগঞ্জে সমাবেশ প্রসঙ্গে। সমাবেশে যে সহিংসতা ও প্রাণহানি ঘটেছে তা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত ও নিন্দনীয়। এ সময় পুলিশ ও সেনাসদস্যদের সঙ্গে হামলাকারীদের সংঘর্ষ বাঁধে। এ ঘটনায় মোট পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন ও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন আরও ৮ জন। এ ঘটনার দায় সরকার এড়াতে পারে না। উল্লেখ্য, সরকার স্বীকার করেছে তাদের কাছে গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল তবে এতবড় ঘটনা ঘটবে তা জানা ছিল না।
এমএসএফ’র তথ্যানুসন্ধান এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মোতাবেক ২০২৫ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বন্দুকযুদ্ধ, আইনবর্হিভূত হত্যাকান্ড, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে। অপহরণ বা তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে দেশের সীমান্তগুলিতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী নাগরিক হতাহতের ঘটনা ঘটছে। সাংবাদিক হত্যা ও শারীরিকভাবে তাদের লাঞ্ছিত ও অবিরত হুমকি প্রদান প্রায়শ: ঘটছে। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের অপব্যবহার করে সাধারণ নাগরিকের বস্তুনষ্ঠ ও স্বাধীন চিন্তা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং মতামত প্রকাশের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার প্রয়োগের পথ রুদ্ধ করার মত ঘটনা ঘটেছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
এমএসএফ এর পক্ষ থেকে আরও জানানো হয় যে, নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনাসমূহ অধিক সংখ্যায় ঘটেছে যা ছিল ২০২৫ সালের অন্যতম একটি উদ্বেগের বিষয়। ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণজনিত হত্যা, যৌন হয়রানি, নির্যাতন, আত্মহত্যা ও হত্যার ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মাজারে হামলা ও অগ্নিসংযোগ, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার, সংখ্যালঘু নির্যাতন, গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসের ঘটনা ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে যা মানবাধিকারের চরম লংঘন।
এ বছর ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায় শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব, সরকার এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকা সম্পর্কে অস্পষ্টতার কারণে নাগরিকরা পার করছে এক অনুমাননির্ভর জীবন। মানবাধিকারের মূল বিষয়ই হচ্ছে জনগণ যেন শান্তিপূর্ণ, ভয়শূন্য এবং নিশ্চিত জীবন যাপন করতে পারেন। মানুষ নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিবে, নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে তার জীবন অতিবাহিত করতে হবে না। মানবাধিকারের ব্যত্যয় ঘটলেই এ সকল ঘটনা ঘটতে থাকে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে এক অসাড় সমাজব্যবস্থা। এ অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ করে নাগরিকরা আগামি বছর একটি নিশ্চিত ও ভয়শূন্য জীবন যাপন করবে এবং রাষ্ট্র তার দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথ পালন করবে সেই প্রত্যাশা করছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন।
এমএসএফ এর পক্ষ থেকে বলা হয় যে, বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ২০২৫ সময়ে রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার সর্বোপরি মানবাধিকারের ক্ষেত্রে কার্যত: কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সময়কালে, দেশে বিরাজমান সামগ্রিক রাজনৈতিক, সামাজিক, গণতান্ত্রিক, আইনি পরিবেশ ও মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়ভাবে উদ্বেগজনক।
এমএসএফ-এর পক্ষ থেকে তাদের ওই প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলা হয় যে, ২০২৫ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রবণতায় দেখা গেছে যে, গত বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতির বিশ্লেষণে অন্যতম উদ্বেগের বিষয় ছিল রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তার অজুহাতে সময়িকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কর্মীদের গণগ্রেফতার এবং নির্বাচনী সহিংসতা। পুরানো মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। এর ফলে নাগরিকের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও রাজনীতিতে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করার অধিকার খর্ব করা হয়েছে। গতবছরে রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে অন্ত:দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় নিজেদের মধ্যে অন্তঃদ্বন্দ্ব ও সহিংসতা, হানাহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গণপিটুনি/মব সন্ত্রাস সৃষ্টির মত আইন হাতে তুলে নেয়ার ঘটনা দিনদিন ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া ও বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ হয়নি। পুলিশ ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানকালে নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার এড়াতে ধাওয়া খেয়ে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে। সাংবাদিক নির্যাতন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে মামলা দায়েরের ঘটনা অব্যহত রয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি, হতাহত, নির্যাতন, আটক ও নতুন আকারে শুরু হওয়া পুশইন এর ঘটনা বেড়েই চলেছে। সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। নারী, শিশু ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের ঘটনার ধারাবাহিকতা রয়েছে। ধর্মীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান মাজারে হামলা, ভাংচুর ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।