১৪ জানুয়ারী ২০২৬, বুধবার, ০৮:২৮:৫৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
মধ্যবর্তী নির্বাচন পরিচালনার নিয়ম বদলাতে মরিয়া ট্রাম্প জামায়াতের সাথে মার্কিন প্রতিনিধিদের বৈঠক নিয়ে নানা গুঞ্জন এক বাসায় অনেক পোস্টাল ব্যালটের ভিডিও ভাইরাল, ব্যবস্থা চায় বিএনপি বাংলাদেশ গাজার জন্য ট্রাম্প প্রস্তাবিত বাহিনীতে থাকতে চায় বাংলাদেশের সঙ্গেও ক্রিকেটে ভারতীদের ভূ-রাজনীতি ২০১৮ সালের নির্বাচনে ৮০ শতাংশ ভোট রাতে পড়ে : তদন্ত কমিশন ২০২৫ কর বছরে যুক্তরাষ্ট্রে করদাতাদের জন্য নতুন সুবিধা ও ডিডাকশন শুল্ক ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টের রায় বিপক্ষে গেলে সংকটে পড়ার শঙ্কায় ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের নয়া তত্ত্বে অন্যরকম শঙ্কা নিউইয়র্কে স্বাস্থ্যসেবায় এক বাংলাদেশির নজিরবিহীন জালিয়াতি


সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই যথেষ্ট নয় : বদিউল আলম
বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৪-০১-২০২৬
সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই যথেষ্ট নয় : বদিউল আলম


বাংলাদেশের জন্য আজ একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, দরকার গণতান্ত্রিক উত্তরণ। যার জন্য কতগুলো আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার এবং রাজনৈতিক নীতি ও মূল্যবোধের পরিবর্তন দরকার বলে মন্তব্য করেছেন সুজন এর প্রধান নির্বাহী ড. বদিউল আলম মজুমদার।

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’ আয়োজিত ‘গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্খা, সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক বিভাগীয় সংলাপে এই মন্তব্য করেন। সংলাপটি , মঙ্গলবার, এটিএম শামসুল হক মিলনায়তন, সিরডাপ, ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে রাজনীতিবিদদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি, জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর ড. মো. হেলাল উদ্দিন, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, গণফোরাম এর সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নেয়ামূল বশির, বাসদের (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য রাগিব আহসান মুন্না, নাগরিক ঐক্যের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাকিব আনোয়ার, গণঅধিকার পরিষদের মুখমাত্র ফারুক হাসান প্রমুখ।

আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. রাশেদ আল তিতুমীর, অধ্যাপক ড. জসীম উদ্দিন খান ও অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, আদিবাসী নেতা ও লেখক সঞ্জীব দ্রং, গবেষক ড. আব্দুল আজিজ প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘বহু প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন এবং পরবর্তী সময়ে বহু আন্দোলন-সংগ্রামের পরও বিগত ৫৪ বছরে বাংলাদেশে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নির্বাচনী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পেক্ষাপটে বিগত ১৫ বছর দেশে গেড়ে বসেছিল এক ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা। তাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায় বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন।’

তিনি বলেন, ‘আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনকে সামনে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন, ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে নির্বাচনী প্রচারণা। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই দল বা জোটগুলোকে নিয়ে জনগণের আগ্রহ বাড়ছে, জনগণ জানতে চায় নির্বাচনে জয়ী হলে তারা কী কী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবেন, কীভাবে করবেন এবং কখন বাস্তবায়ন করবেন। আমাদের তরুণরা আর অবিচার, বৈষম্য ও জবাবদিহিহীনতার উত্তরাধিকার বহন করতে চায় না। তারা চায় অংশগ্রহণ, মর্যাদা ও একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ।’

ড. বদিউল আলম মজুমদার তাঁর বক্তব্যে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্খায় রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে কী কী বিষয় ও প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত থাকা দরকার তা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে: ১. জুলাই জাতীয় সনদ ও সংস্কার কমিশনসমূহের সুপারিশ বাস্তবায়নের ব্যাপারে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার; ২. রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি; ৩. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া; ৪. সাংবিধানিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা; ৫. গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক দল; ৬. দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই; ৭. মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার; ৮. সহনশীল ও টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো; ৯. চরম দারিদ্র্য দূরীকরণে দৃঢ় অঙ্গীকার; ১০. নারী ক্ষমতায়নের অগ্রাধিকার; ১১. শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা; ১২. ন্যায়সংগত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা; ১৩. পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান; ১৪. পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রেক্ষাপটে অবস্থান; ১৫. গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন, ইত্যাদি।

সাবেক সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী এবারের জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দল থেকে ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা। কিন্তু দলগুলো মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। তাছাড়া অনেকে পুরুষের কোটায় মনোনয়ন পেয়েছেন। আমরা দেখেছি, এবারের নির্বাচনেও কোটিপতিদের মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আর মাত্র ২৯ দিন। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে? চব্বিশের ৫ আগস্ট থানা থেকে ১ হাজার ৩৬৫টি লুট অস্ত্র এখনও উদ্ধার করা হয়নি। এগুলো যে ভোটকেন্দ্রে ব্যবহার হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে? ভোটকেন্দ্রে সকালে যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে ভোটাররা আর ভোটকেন্দ্রে যাবে না।’ তখন নির্বাচনের সার্বিক পরিবেশ নষ্ট হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর ড. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী সবসময় সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আমরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে জনমত তৈরি করার চেষ্টা করছি। আমরা দ্রুতই নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে আগামীর বাংলাদেশ কেমন দেখতে চাই তার রূপরেখা তুলে ধরবো।’

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘নির্বাচনের আর ২৯ দিন থাকলেও এখনও নির্বাচনের আমেজ তৈরি হয়নি। জনগণের মধ্যে এখনও এই প্রশ্ন রয়েছে- নির্বাচন হবে কিনা। অতীতে যারা পেশিশক্তি ও অর্থনির্ভর হয়ে নির্বাচন করেছেন, তারা এবারও আগের স্টাইলেই প্রচারণা করছেন। ফলে আমরা যারা রাজনীতিতে নতুন তারা নির্বাচনের মাঠে পিছিয়ে রয়েছি। কিন্তু যারা পেশিশক্তি ব্যবহার করছেন, ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছেন- তাদের উদ্দেশ্যে বলি, নতুন বাংলাদেশে তাদের পরিণতি ভালো হবে না।’ যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে, তাই গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য দলগুলোর ক্যাম্পেইন করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। সারোয়ার তুষার বলেন, ‘প্রশাসন এখনও একটা দলের দিকে হেলে আছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের নামে নিরীহ ও ছোট দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে, কিন্তু চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ধরা হচ্ছে না। এরফলে নির্বাচনের মাঠে একটা ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে।’ 

সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য রাগিব আহসান মুন্না বলেন, ‘আজকে ছাত্র রাজনীতির ব্যাপারে অনেকে নেতিবাচক কথা বলছেন। অতীতে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ছাত্র রাজনীতি ধ্বংস করেছেন আমাদের রাজনীতিবিদরা। তারা নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য ছাত্রদের অপব্যবহার করছে। আমি মনে করি, এমন একটা ব্যবস্থার জন্য লড়াই করা উচিত যেখানে দেশের আপামর জনতা, শ্রমিক, কুলি-চাষা-মজুর সবাই তার অধিকার পাবে।’

অধ্যাপক ড. জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘আমরা চাই রাজনৈতিক দলগুলো যেন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়, যাতে দেশে কর্মক্ষম ও দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। বন ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়েও দলগুলোর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা দরকার বলে মনে করি।’

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য আমাদের অবশ্যই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দরকার। নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো মব সন্ত্রাস। সরকারের নীরবতা ও দুর্বলতার কারণে মব সংস্কৃতির অবসান ঘটছে না। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্য সমস্যাগুলো হলো কালো টাকার ব্যবহার, প্রার্থীদের হলফনামা যাচাই না করা। এজন্য নির্বাচনী ব্যয় মনিটরিং কমিটি থাকা দরকার।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় অপতথ্য ও ভুল তথ্য রোধে ফ্যাক্ট চেকিং সেল তৈরি করা দরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা করাও দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

ড. রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, ‘ভোটাররা নির্বাচন ও প্রার্থী সম্পর্কে যথাযথ তথ্য পাচ্ছেন না। যা পাওয়া যাচ্ছে তা হলো অপতথ্য। অথচ অপতথ্য নির্বাচনের পরিবেশকে নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, যেমনটা হয়েছিল যুক্তরাজ্যে বেক্সিটের সময়। কিন্তু অপতথ্য চিহ্নিত করার জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনের দিক থেকে কোনো উদ্যোগ দেখছি না। ভুল তথ্য, অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্য চিহ্নিত করা এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের উচিত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা।’

অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটানো। কিন্তু শুধু নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। এর জন্য কতগুলো সংস্কার দরকার, যাতে নতুন বন্দোবস্ত কার্যকর হয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে দেশে নেতা তৈরি হয়।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণের ক্ষেত্রে একটি বাধা হলো আমলারা আইন প্রণয়ন করে। অথচ আইন প্রণয়ন করার কথা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। আরেকটি বাধা হলো দায়িত্বশীল বিরোধ দলী না থাকা। শক্তিশারী বিরোধ দল থাকলে মাঠের পরিবর্তে সংসদে আলাপ-আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয় এবং তারা গণতান্ত্রিক উত্তরণে ভূমিকা রাখতে পারেন।

সঞ্জিব দ্রং বলেন, ‘নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির আগে কাঠামোগত কারণে যারা পিছিয়ে আছেন তাদের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করা দরকার। দরকার তাদের জীবনধারা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা।’ এজন্য আদিবাসীদের উন্নয়নে একটি কমিশন গঠন করা দরকার বলেও মন্তব্য করেন।

শেয়ার করুন