২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, বুধবার, ০৯:১৩:৫১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :


দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
কিয়োটোর হৃৎপিণ্ডে একদিন
হাবিব রহমান
  • আপডেট করা হয়েছে : ২৫-০২-২০২৬
কিয়োটোর হৃৎপিণ্ডে একদিন টেম্পলের সামনে লেখক


কিয়োটোর আরাশিয়ামার সবুজ পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীর ইতিহাস বুকে নিয়ে এক অনন্য স্থাপত্য-টেনরিউ-জি জেন মন্দির। ইউনেস্কো হেরিটেজের অন্তর্ভুক্ত এই মন্দিরটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়; এটি জাপানের জেন দর্শনের এক গভীর নিঃশ্বাস, যেখানে নীরবতা কথা বলে, আর প্রকৃতি ধ্যানের ভাষা হয়ে ওঠে। আমি সেদিন সকালে কিয়োটো স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে আরাশিয়ামার পথে রওনা দিলাম। জানালার বাইরে কাতসুরা নদীর জল চিকচিক করছিল। আমার পাশে বসে ছিল নিকিতা-আমার গাইড, আমার সহযাত্রী। সে বললো-আজ তুমি কিয়োটোর হৃদয় দেখতে চলেছো। ট্রেন থেকে নেমে আমরা হাঁটছি টেনরিউ-জি জেন মন্দিরের দিকে। নিকিতা বলে, টেনর্রিউ- জি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৩৩৯ সালে, মুরোমাচি যুগে। শোগুন Ashikaga Takauji সম্রাট Emperor Go-Daigo-এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই মন্দির নির্মাণ করেন। এটি রিনজাই জেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রধান মন্দিরগুলোর একটি। দুর্ভাগ্যবশত, টেনর্রিউওজি বহুবার অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়েছে। তবুও প্রতিবারই এটি নতুন করে পুনর্নির্মিত হয়েছে-যেন ফিনিক্স পাখির মতো ছাই থেকে উঠে দাঁড়ানো এক প্রতীক। আজকের স্থাপত্যের অনেকাংশই পরবর্তী পুনর্নির্মাণের ফল, কিন্তু তার আত্মা রয়ে গেছে সেই প্রাচীন যুগেই। ১৯৯৪ সালে এটি “Historic Monuments of Ancient Kyoto” শিরোনামে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়-কিয়োটোর ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হিসেবে। মন্দিরের প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢ়ুকতেই একটা গাম্ভীর্য আমাদের ঘিরে ধরলো। নিকিতা বলে, ১৩৩৯ সালে নির্মিত এই মন্দিরের মূল আকর্ষণ হলো এর সিলিংয়ে আঁকা DbwiD-Ry (Unryu-zu) বা মেঘের ড্রাগন। নিকিতা আমাকে হলের ছাদের দিকে তাকাতে বললো। দেখলাম, বিশাল বৃত্তাকার পটে আঁকা এক রুদ্ররূপী ড্রাগন। সে ফিসফিস করে বললো-জানো, একে বলা হয় সব দিক দেখা ড্রাগন। তুমি হলের যে প্রান্তেই যাও না কেন, মনে হবে ড্রাগনটি ঠিক তোমার চোখের দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি কয়েক পা পিছিয়ে পরীক্ষা করলাম। সত্যিই! ড্রাগনের তীক্ষ্ণ চোখ দুটো যেন আমাকেই অনুসরণ করছে। নিকিতা একটু হেসে যোগ করলো-জেন দর্শনে ড্রাগন হলো সুরক্ষার প্রতীক। এই ড্রাগনটি কেবল মন্দিরের রক্ষক নয়, এটি মানুষের অন্তরের সত্যকেও পাহারা দেয়। ড্রাগনের সেই অপলক দৃষ্টি আর নিকিতার শান্ত উপস্থিতি মিলে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি হলো হলের ভেতর। এরপর আমরা এলাম সোগেনচি পুকুরের ধারে। সাতশ বছর আগের সেই বাগানটি এখনো অবিকল তেমনই আছে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা পাথর আর জলের খেলা দেখতে দেখতে নিকিতা আমার খুব কাছে এসে দাঁড়ালো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম-নিকিতা, এই শান্ত বাগান আর ড্রাগনের রহস্য- সব মিলিয়ে যেন অন্য কোনো যুগে চলে এসেছি। নিকিতা সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো- তুমি তো সবসময় ইতিহাস খুঁজো। কিন্তু জাপানিরা এই মুহূর্তের অনুভুতিকে খুব গুরুত্ব দেয়। মন্দিরের উত্তর গেট দিয়ে যখন বের হচ্ছি, তখন সামনেই সুবিশাল সাগানো বাঁশবন (Bamboo Forest)। বাঁশগাছের ফাঁক দিয়ে আসা বিকেলের রোদে নিকিতার মুখটা সোনার মতো জ্বলজ্বল করছিলো। নিকিতা হাঁটতে হাঁটতে জাপানী ভাষায় একটা কবিতা আবৃত্তি করছিলো। আমি ওর হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে বললাম-নিকিতা, টেনরিউ-জি’র এই ড্রাগন বা বাগান হয়তো চিরকাল থাকবে, কিন্তু তোমার মুখে এই কবিতা শোনার স্মৃতিটা আমার কাছে সবচেয়ে বড় হেরিটেজ হয়ে থাকবে। নিকিতা মুখ নামিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। কিয়োটোর টেনরিউ-জি’র সেই ড্রাগন আর শান্ত পুকুরকে পেছনে ফেলে আমরা যখন ’ফিলোসফার্স পাথ’ বা ’তেৎসুগাকু-নো-মিচি’-তে পৌঁছালাম, তখন বিকেলের আলোটা আরও মায়াবী হয়ে উঠেছে। নিকিতা বল্লো-এটি কেবল একটি হাঁটার পথ নয়, এটি যেন নিজের সাথে নিজের কথা বলার এক নির্জন আয়না। নিকিতা বলে, বিখ্যাত দার্শনিক নিশিনো কিতারো প্রতিদিন এই পথে হাঁটতেন আর জীবন নিয়ে ভাবতেন। হেইয়ান শ্রাইনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট খালের পাড় ঘেঁষে এই দুই কিলোমিটারের পথটি আজ আমাদের। আমি তার কথার কোন জবাব দেই না। নিকিতা আজ একটু চুপচাপ। ওর কিমোনোর আঁচলটা ঘাসের ওপর দিয়ে আলতো করে ঘষে চলেছে। খালের জলে দু-একটা ঝরা পাতা ভেসে যাচ্ছে। আমি নীরবতা ভেঙে বললাম-নিকিতা, দার্শনিকরা এখানে হাঁটতেন পরম সত্যের খোঁজে। আমি তো এখানে শুধু তোমার হাঁটার ছন্দ দেখছি। নিকিতা থামলো। খালের ধারের একটা পাথুরে বেঞ্চে বসে ও জলের দিকে তাকিয়ে বললে-সত্যিই তো, তুমি কি জানো? জাপানিরা বিশ্বাস করে, প্রবহমান জল আমাদের শেখায় যে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। এই যে আমরা হাঁটছি, এই মুহূর্তটাও একদিন স্মৃতি হয়ে ভেসে যাবে। সে কারণেই এই পথটা এত সুন্দর। আমি ওর পাশে বসলাম। চারপাশটা এতই নিঃশব্দ যে বাতাসের ঝিরঝির শব্দও শোনা যাচ্ছে। নিকিতা হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললো-নিশিনো কিতারো বলতেন, নিজেকে চেনার জন্য মাঝেমধ্যে হারিয়ে যেতে হয়। তুমি কি এই পথে আমার সাথে হারিয়ে যেতে রাজি? ওর চোখের কোণে এক চিমটি দুষ্টুমি আর এক আকাশ গভীরতা। আমি ওর হাতটা আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললাম-এই পথে যদি হারাই, তবে সেই হারিয়ে যাওয়াটাও হবে আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি। নিকিতা মৃদু হাসলো। গিনকাকু-জি মন্দিরের কাছাকাছি যখন পৌঁছালাম, তখন আকাশের রঙ বদলে বেগুনি হয়ে গেছে। আমাদের ছায়া দুটো খালের জলে মিলে মিশে একাকার। মনে হলো, এই ফিলোসফার্স পাথ আমাদের কেবল গন্তব্যে পৌঁছে দেয়নি, আমাদের দুজনকে আরও একটু কাছে এনে দিয়েছে। গিনকাকু-জি বা ’সিলভার প্যাভিলিয়ন’-এর সেই রূপালি বালুর বাগান যখন বিকেলের শেষ আলোটুকু শুষে নিলো চারপাশটা এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় ডুবে গেলো। পর্যটকদের ভিড় কমে এসেছে, পাহাড়ি ঢাল থেকে নেমে আসা শীতল হাওয়া নিকিতার কিমোনোর হাতা উড়িয়ে দিচ্ছে বারবার। আমরা দুজনে মন্দিরের বিখ্যাত ’চন্দ্র দর্শন’ মঞ্চের (Moon Viewing Platform) কাছে এসে দাঁড়ালাম। নিচে সাদা বালুর নিখুঁত কারুকাজ, যা চাঁদের আলো প্রতিফলিত করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। নিকিতা আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে তারপর আমার দিকে ফিরলো। ওর চোখের মণি দুটো এই মায়াবী আলোয় ঠিক যেন দুটি কালো হীরে। নিকিতা বলে-জানো, এই মন্দিরটার নাম ’সিলভার প্যাভিলিয়ন’ হলেও এখানে কোথাও রূপো নেই। এর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর অসম্পূর্ণতায়। জাপানিরা একে বলে ‘Wabi-sabi’- যা কিছু পুরনো, যা কিছু অসম্পূর্ণ, তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে পরম যত্ন। আমার কাছেও অসম্পূর্ণতাই বেশি সুন্দর, নিকিতা। যেমন এই বিকেলটা যদি কোনোদিন শেষ না হতো, তবে হয়তো এর পূর্ণতার কদর থাকতো না। কিন্তু তুমি পাশে আছো বলেই এই শূন্যতায় ভরা বাগানটাও আমার কাছে কানায় কানায় পূর্ণ মনে হচ্ছে। নিকিতা একটু কাছে সরে এলো। ওর শরীর থেকে চেরি ব্লসম আর চন্দনের খুব হালকা একটা সুবাস আসছে। ও নিচু স্বরে বলল-সবাই কিয়োটোতে আসে ছবি তুলতে, কিন্তু তুমি এসেছো, মুহূর্তগুলো ছুঁতে। এই যে আমরা আজ সারাটা দিন হাঁটলাম- টেনরিউ-জি থেকে ফিলোসফার্স পাথ হয়ে এখানে- তোমার কি একবারও মনে হয়নি যে আমরা আসলে কোনো একটা গল্পের ভেতরে ঢ়ুকে পড়েছি? আমি অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থাকি। কিন্তু কোন জবাব দিই না। গিনকাকু-জি’র সেই রূপালি মায়া কাটিয়ে আমরা যখন কিয়োটোর গলিঘুঁজিতে ঢ়ুকলাম, তখন চারপাশটা সেজেছে লাল লণ্ঠনের মায়াবী আলোয়। সরু গলি, দুপাশে কাঠের পুরনো বাড়ি, আর মাঝে মাঝে সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ। নিকিতা আমাকে নিয়ে এলো পাড়ার এক লুকানো ’ইজাকায়া’-তে (জাপানিজ পানশালা)। দরজায় নীল রঙের পর্দা (Noren) ঠেলে ভেতরে ঢ়ুকতেই নাকে এল গ্রিল করা ইয়াকিতোরি (Yakitori) আর সয় সসের মন মাতানো সুবাস। ভেতরের পরিবেশটা বেশ উষ্ণ। কাঠের কাউন্টার, দেয়ালজুড়ে জাপানি ক্যালিগ্রাফি আর পেছনের শেলফে সাজানো মাটির সব পাত্র। আমরা কোনার একটা টেবিলে বসলাম। নিকিতা বলে-জানো, ইজাকায়া মানে শুধু খাওয়া নয়, এটা হলো মনের আগল খুলে দেওয়ার জায়গা। এখানে মানুষ আসে দিনের সব ক্লান্তি ধুয়ে ফেলতে। তুমি কি আজ ক্লান্ত? তোমার সাথে হাঁটলে কি আর ক্লান্তি থাকে? আমি বললাম। খানিকবাদেই আমাদের সামনে এল ধোঁয়া ওঠা উষ্ণ সাকে (Atsukan)। ছোট ছোট মাটির কাপে (Choko) সাকে ঢালতে ঢালতে নিকিতা এক অদ্ভুত নিয়ম শেখালো। বললো, জাপানে নিজের কাপ নিজে পূর্ণ করতে নেই। এটা হলো সম্মানের আর ভালোবাসার চিহ্ন। আমি তোমার কাপ ভরে দিচ্ছি, আর তুমি আমারটা। কাপ দুটো আলতো করে ছোঁয়াতেই একটা টুং করে শব্দ হলো। নিকিতা চোখের ইশারায় বললো- ’কানপাই!’ (চিয়ার্স)। সাকের প্রথম চুমুকটা গলার ভেতর দিয়ে নামতেই এক অদ্ভুত উষ্ণতা শরীর ছাপিয়ে মনে গিয়ে লাগলো। আমি বললাম, নিকিতা, এই যে চেরি ব্লসমের মতো তোমার হাসি, আর এই সাকের ওম- সবটা যেন একটা স্বপ্নের মতো। নিকিতা এবার একটু ঝুঁকে এল আমার দিকে। লাল লণ্ঠনের আলো ওর মুখে পড়ে এক মায়াবী ছায়া তৈরি করেছে। ও নিচু স্বরে বলল, সাকুয়া (Sakuya) বলে একটা শব্দ আছে আমাদের এখানে। যার মানে হলো কাল রাতের ফোটা ফুল। কিন্তু আমি চাই আমাদের এই মুহূর্তটা যেন ঝরে না যায়। আমি ওর হাতটা টেবিলের ওপর নিজের হাতের ওপর টেনে নিলাম। সাকের নেশার চেয়েও ওর চোখের নেশা তখন অনেক বেশি গাঢ়। নিকিতা ওর কাপটা তুলে ধরে বললো-আজ রাতটা শেষ হওয়ার আগে একটা প্রতিজ্ঞা করো। কিয়োটোর এই অলিগলি আর আমার এই হাসি- কখনো ভুলে যাবে না তো? বাইরে তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ইজাকায়ার কাঁচের জানালায় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মুক্তোর মতো জমছে, আর ভেতরে আমরা দুজন- সাকের উষ্ণতায় আর হৃদয়ের নিবিড়তায় একে অন্যের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছি। 

কিয়েটোর কিয়োমিজু-দেরা

সকালের হালকা রোদে আমি টোকিও স্টেশনে পৌঁছলাম। গাইড নিকিতা আমার জন‍্য অপেক্ষা করছিলো। আমরা বুলেট ট্রেনে চেপে কিয়োটোর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ট্রেনের নরম কম্পনের সঙ্গে আমাদের হাসি আর কথাবার্তা মিলেমিশে যেন আনন্দের সুর তুলছিল। প্রায় দুই ঘণ্টার ট্রেনযাত্রার পর কিয়োটো পৌঁছলাম। কিয়োটোর পুরোনো শহরটা সকালবেলায় যেন আরও নীরব মনে হচ্ছিলো।। হিগাশিয়ামার ঢালু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল-এই পথ শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইতিহাস নিজেই এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছে। হঠাৎ করেই চোখের সামনে ভেসে উঠল Kiyomizu-dera Temple-কিয়োটোর সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রাচীন বৌদ্ধমন্দিরগুলোর একটি। অষ্টম শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দির শুধু ধর্মীয় আস্থার প্রতীক নয়, জাপানি স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। ১৯৯৪ সালে এটি UNESCO World Heritage Site হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, আর সেই স্বীকৃতির ওজন অনুভব করা যায় মন্দির প্রাঙ্গণে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই। নিকিতা জানায় মন্দিরের মূল আকর্ষণ তার বিশাল কাঠের মঞ্চ, যা পাহাড়ের ঢালে ঝুলে আছে অথচ একটিও লোহার পেরেক ব্যবহার করা হয়নি। নিচে তাকালে দেখা যায় সবুজ বন আর দূরে কিয়োটো শহর। এখানে দাঁড়ালে মনে হবে শহরটা আমাদের নিচে শুয়ে আছে। এই মঞ্চ থেকেই এসেছে জাপানের বিখ্যাত প্রবাদ- “Kiyomizu no butai kara tobi oriru”, অর্থাৎ জীবনে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস। একসময় মানুষ সত্যিই এখান থেকে লাফ দিত, বিশ্বাস ছিল বেঁচে গেলে ইচ্ছা পূরণ হবে।এখন আর কেউ লাফ দেয় না, কিন্তু সাহসের সেই প্রতীকটা রয়ে গেছে। মন্দিরের ভেতরটা আমরা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। প্রতিটি প্রাচীন চিত্র, কাঠের খোদাই, লণ্ঠন-সবকিছু যেন অতীতের কথা বলছে। নিকিতা বললো,আগে সাহসী মানুষ কিয়োমিজুর প্ল্যাটফর্ম থেকে লাফ দেয়। তুমি পারবেতো? আমি হেসে উত্তর দিই-তোমাকে আমি সঙ্গী হারা করতে চাই না। নিকিতা হাসে। দুপুরে আমরা কিয়েটোর একটি ঐতিহ্যবাহী কাফেতে বসে সুশি আর হরিয়ার মতো স্থানীয় খাবার উপভোগ করলাম। মন্দিরের নিচে রয়েছে Otowa ঝর্ণা। তিন ধারায় নেমে আসা এই জলকে পবিত্র মনে করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই জল পান করলে স্বাস্থ্য, সাফল্য ও দীর্ঘায়ু লাভ হয়। নিকিতা জানায় তিনটি পৃথক প্রবাহে পানি পড়ে-প্রত্যেকটির একটি আলাদা অর্থ। সে এক চুমুক জল নিয়ে হেসে বলল, “তিনটার মধ্যে একটাই নেওয়া যায়-লোভ করলে নাকি কাজ হয় না। আমি জীবনের সৌভাগ্য কামনা করে পানি নিলাম। নিকিতা স্বাস্থ্য কামনা করল। তারপর আমরা একত্রে জল চুমুক দিলাম। চারপাশে পর্যটক, ক্যামেরার ক্লিক, প্রার্থনার শব্দ।নিকিতা বলে, বসন্তে চেরি ফুল আর শরতে লাল পাতার সৌন্দর্যে কিয়োমিজু-দেরা আরও মোহময় হয়ে ওঠে। এটি শুধু দেখার জায়গা নয়, অনুভব করারও স্থান। পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নামতে নামতে আমাদের চোখে পড়ল মন্দিরের বিশাল কাঠের ওহান্না প্ল্যাটফর্ম। এর নির্মাণশৈলী আমাদেরকে মুহূর্তে অতীতের জাপানে নিয়ে গেল। আমরা ধীরে ধীরে উপরে উঠলাম। প্ল্যাটফর্ম থেকে কিয়োটো শহরের দৃশ্য যেন এক জীবন্ত চিত্রকলা। আমরা এরড়হ-এর ঐতিহ্যবাহী রাস্তায় হাঁটলাম, যেখানে পুরনো কাঠের বাড়ি, চায়ের ঘর এবং গেইশার ছায়া চোখে পড়ে। বিকেলে আমরা আবার Kiyomizu-Dera-তে ফিরে এলাম। এবার মন্দিরের আলো জ্বলে উঠেছে, এবং সূর্যাস্তের সঙ্গে মন্দিরের আলোর রঙ মিশে যেন স্বপ্নের আভা তৈরি করছে। শহরের আলোতে আমাদের ছায়া দীর্ঘ হয়ে গেছে। সন্ধ‍্যার ট্রেন ধরেই আমরা টোকিওর পথে রওনা হলাম। 

টোকিওর গিনজা

কিছু শহর আছে, যাদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হয় ছবির মতো-দেখা যায়, ভালো লাগে আর সহজে ভুলে যাওয়া যায় না। আর কিছু শহর আছে, যারা ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে ঢ়ুকে পড়ে। টোকিও তেমনই এক শহর। আর টোকিওর গিনজা-সে যেন সেই শহরের হৃদপিণ্ড, যেখানে আলো ধড়ফড় করে, আর অনুভূতি কথা বলতে শেখে। সকালের গিনজা শান্ত। চুয়ো-দোরি অ্যাভিনিউ তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কাঁচে মোড়া বিলাসী শোরুমগুলো যেন রাতের স্বপ্ন ভেঙে দিনের দিকে তাকাচ্ছে। নিকিতা পাশে হেঁটে বলছিল, গিনজা শব্দটা এসেছে ‘রূপার মুদ্রা’ থেকে। এখানেই একসময় রূপার বাজার বসতো। চুয়ো দোরি অ্যাভিনিউ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো আমরা যেন আলোয় মোড়া কোনো রানওয়েতে চলেছি। দু’পাশে লুই ভুইতোঁ, শ্যানেল, ডিওর, গুচ্চির শোরুম-সবাই কাঁচের দেয়ালে নিজেদের গল্প সাজিয়ে রেখেছে। নিকিতা হঠাৎ থামিয়ে দিল আমাকে। বললো -এই রাস্তা রবিবারে গাড়িমুক্ত থাকে। তখন গিনজা হাঁটে-ঠিক মানুষের মত। আমি তাকিয়ে ছিলাম কাঁচে ভেসে ওঠা আমাদের প্রতিচ্ছবির দিকে-টোকিওর বিলাসী আয়নায় দু’জন পথিক, চোখে কৌতূহল আর নীরব আবেগ। নিকিতা হঠাৎ থামিয়ে দিল। এই জায়গাটা রাতে অন্যরকম, সে বলল-তখন গিনজা আলোয় কথা বলে। আমি হালকা হেসে বললাম-আর দিনে? দিনে গিনজা তাকিয়ে থাকে-সে উত্তর দিল। কথার ভেতরেও যেন একটা অদৃশ্য রোমান্টিক বিরতি। গিনজা সিক্সে ঢ়ুকতেই আধুনিক শিল্প আর বিলাস একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। ছাদের বাগান থেকে পুরো গিনজাকে দেখা যায়-উঁচু থেকে শহরকে দেখলে মানুষ নিজের কথাও বুঝতে পারে। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত লাগছিলো। একটি ছোট ক্যাফেতে বসে কফি খেলাম। জানালার বাইরে আলো, ভেতরে নিকিতার হাসি।সে জিজ্ঞেস করল, গিনজা কেমন লাগছে? আমি বললা-গিনজা নয়- তোমার সঙ্গে গিনজা কেমন লাগছে, তা জিজ্ঞেস করতে পারো! নিকিতা শুধু হাসলো-কোন উত্তর দিলোনা। একটি ছোট, মার্জিত ক্যাফে। জানালার বাইরে শহর, ভেতরে কফির উষ্ণতা। নিকিতা কাপের ধারে আঙুল ছুঁইয়ে বলল, তুমি জানো, অনেক ট্যুরিস্ট গিনজা দেখে, কিন্তু বোঝে না। আমি বললাম-কারণ তারা সঙ্গী ঠিক পায় না। নিকিতা হেসে চোখ নামিয়ে নিল। কফির ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে গেল সেই হাসি। গিনজার মাঝেই দাঁড়িয়ে কাবুকিজা থিয়েটার-শতাব্দীর ঐতিহ্য বুকে নিয়ে। নিকিতা জানাল কাবুকির গল্প, অভিনয়ের রং, মুখোশ আর আবেগের ইতিহাস। আধুনিক শহরের বুকে অতীতের এমন দৃঢ় উপস্থিতি আমাকে মুগ্ধ করল। নিকিতা বললো, টোকিও তার অতীত ভুলে যায়নি। সে শুধু এগিয়ে চলেছে। সন্ধ্যা নামতেই গিনজা বদলে গেল। আলো আরও উজ্জ্বল, মানুষ আরও জীবন্ত। রাস্তার বাতিতে নিকিতার মুখে নরম ছায়া পড়ছিল। হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো-এই শহরটা যতটা না লাক্সারির, তার চেয়ে বেশি অনুভবের। নিকিতা ধীরে বলল, টোকিও একা ঘোরার শহর নয়। আমি তাকালাম তার দিকে। বুঝলাম-কিছু শহর মানুষকে কাছাকাছি আনে, কিছু মানুষ শহরকে। 

লেক বিওয়ার ধারে

কিয়োটো থেকে মাত্র কয়েক মিনিট দূরে, অথচ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভবের নাম লেক বিওয়া। এটি জাপানের সবচেয়ে বড় মিঠা পানির হ্রদ। সকালের কিয়োটো স্টেশন তখনও ব্যস্ত। ট্রেনের ভিড়, পর্যটকের কোলাহল, শহরের চিরচেনা গতি। ঠিক এই শহর থেকেই নিকিতাকে সাথে করে শুরু হয় আমাদের যাত্রা। JR লাইনের ট্রেন ছুটে চলতেই কিয়োটোর নগরচিত্র পেছনে পড়ে যায়, সামনে ধীরে ধীরে খুলে যেতে থাকে সবুজ পাহাড় আর শান্ত জনপদ। ট্রেনে বসে নিকিতা জানালার দিকে তাকিয়ে বলে- আজ খুব বেশি কিছু দেখবো না। আমি হেসে উত্তর দিলাম-তাহলে আজ বেশি কিছু মনে থাকবে। আমরা tsu স্টেশনে নামলাম। কিছুদূর হাঁটতেই চোখে পড়লো লেক বিওয়ার বিস্তৃত জলরাশি, দূরে পাহাড়ের ছায়া। হ্রদের নীল জল দুর থেকে যেন আমাদের ডাক দিচ্ছিলো। লেকের ধারে দাঁড়িয়ে নিকিতা জানায়, এই হ্রদ হাজার বছরের ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছে। প্রাচীন কিয়োটোর পানির প্রধান উৎস ছিল এই বিওয়া। শুধু প্রকৃতি নয়, জাপানের সভ্যতারও নীরব সাক্ষী এটি। তার কথার ফাঁকে ফাঁকে হ্রদের জল যেন সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে দেয়। আমরা দুজন লেক বিওয়ার পাড় ধরে হাঁটতে লাগলাম। পর্যটকের তেমন ভিড় নেই। শুধু জল, আকাশ আর হালকা বাতাস। নিকিতা থেমে থেমে আমার ছবি তোলে, আবার কখনো ক্যামেরা নামিয়ে রেখে দুষ্টুমিভরা চোখে বলে-কিছু দৃশ্য চোখে রেখে দিলেই ভালো। দুপুরের দিকে লেকের ধারে ছোট একটি ক্যাফেতে বসি। কাচের জানালা পেরিয়ে হ্রদের জল দেখা যায়। কফির কাপে ভাপ ওঠে, বাইরে জল স্থির। এই ক্যাফের মুহূর্তটা যেন বুঝিয়ে দেয়, লেক বিওয়া শুধু দেখার নয়, অনুভবের ও। আমাদের দুজনের হাতেই গরম কফির কাপ। কাচের জানালার ওপারে লেক বিওয়া-স্থির, গভীর। নিকিতা মুচকি হেসে বলল, এই কফির স্বাদটা আলাদা, কারণ সামনে জল আছে। আমি দুষ্টুমি করে বললাম, আমার কাছেওএই কফির স্বাদটা আলাদা। কারণ আমার সাথে তুমিও আছো। সে চোখ নামিয়ে নিল। হালকা লজ্জা আর হাসি একসাথে। নিকিতা কাপের ভাপের দিকে তাকিয়ে বলে, কিছু সম্পর্ক কফির মতো-চুপচাপ, কিন্তু জাগিয়ে রাখে। আমি তাকাই তার দিকে। বলি, আর কিছু সম্পর্ক হ্রদের মতো-গভীর, কিন্তু শান্ত। সে কিছু বলে না, শুধু হালকা হাসে। ওই হাসিটাই তার কথার জায়গা নিয়ে নেয়। বিকেলের আলো গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। সূর্যাস্তের সময় লেক বিওয়ার জল রঙ বদলায়-নীল থেকে সোনালি। নিকিতা পাশে দাঁড়িয়ে বললো, এই রঙটা কিয়োটোতে নেই। কিয়োটো ইতিহাস শেখায়, আর লেক বিওয়া অনুভব করতে শেখায়। আমি মনে মনে বললাম- আর তুমি আমাকে দুটোই একসাথে শেখাচ্ছো। ধীরে ধীরে দিনটা বিদায় নেয় কোনো শব্দ না করেই।জলের ওপর শেষ আলোটা ভেঙে ভেঙে পড়ে। আর আমরা দুজন সেই আলো পেছনে ফেলে হাঁটতে থাকি স্টেশনের দিকে। ট্রেন ছুটে চলে। জানালার বাইরে পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে অন্ধকারের সাথে মিশে যেতে থাকে। কিয়োটোর ঘরবাড়ির আলো একে একে জ্বলে ওঠতে থাকে। ট্রেন থামে। দরজা খোলে। কিয়োটো আমাদের ডেকে নেয় তার বুকের ভেতর। আর আমাদের ভেতর থেকে লেক বিওয়ারের এক অপরূপ সন্ধ‍্যা।

শেয়ার করুন