কোনো গুরুতর অঘটন ঘটলেই ব্লেম গেম বাংলাদেশে মজ্জাগত হয়ে গেছে। খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনরোষ বিক্ষোভে রূপ নিলেই সব সরকার পূর্ববর্তী সরকারগুলোকে দায়ী করে। এমনকি অর্থনৈতিক দুরবস্থা, জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটের জন্য একে অপরকে দায়ী করে। ১৯৯০ থেকে এখন পর্যন্ত দুদফায় দুবার সীমিত সময়ের জন্য অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার ছাড়া বাকি পুরোটা সময় সরকার পরিচালনা করেছে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল-আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। তাই দুর্নীতি বা অপশাসনের ব্যর্থতার দায় দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই আওয়ামী লীগ বা বিএনপির। অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশ আছে নানা সংকটে। অর্থনীতি ভঙ্গুর, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক, হাম সংক্রমণ মহামারির রূপ নিয়েছে, জ্বালানি বিদ্যুৎ সংকটে জন জীবন বিপর্যস্ত। দেশে সৃষ্ট নতুন মব সন্ত্রাস স্তিমিত হলেও এখনো নিঃশেষ হয়নি। এরই মাঝে হঠাৎ করেই বেড়েছে নারী নির্যাতন, শিশু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড। নির্বাচিত সরকারকে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবেই সব সংকটের মোকাবিলা করতে হবে। অতীতের সরকারগুলোর ব্যর্থতার অজুহাত ছেড়ে সরকারকে জনজীবন স্বস্তিকর করার জন্য দৃশ্যকর সাফল্য দেখাতে হবে।
নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে চার মাস হতে চললো। আওয়ামী সরকার বা অন্তর্বর্তী সরকারগুলোর ব্যর্থতা এবং দুর্নীতির জন্য দায় দায়িত্ব নির্ধারণ করে আইন অনুযায়ী শাস্তি বিধান করার দায় বর্তমান সরকারের ওপর বর্তায়। দুর্নীতি বলেন অথবা জ্বালানি বিদ্যুৎ সেক্টরে সংকটের বিষয়ে ২০০১-০৬ কার্যকালের অভিজ্ঞতা শুভকর নয়। সব সরকার সঠিক পেশাদারদের উপেক্ষা করে তাঁবেদার সুবিধাভোগী আমলাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। বর্তমান সরকার প্রধান দীর্ঘ দেড় দশক প্রবাস জীবনের পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর দেশে এসে ঘোষণা দিয়েছিলেন ‘আমার একটি পরিকল্পনা আছে’। অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে স্বৈরাচারি আখ্যা দিয়ে নির্বাচনের বাইরে রেখে কিছু মহলের মতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় আসা বিএনপি জোট সরকার কিন্তু প্রশাসনে মৌলিক পরিবর্তন আনতে পেরেছে দাবি করা যাবে না।
২০২৪ আওয়ামী সরকার বিরোধী আন্দোলনের মূল দাবি ছিল সমাজের সব স্তর থেকে বৈষম্য দূর করে মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন। কিন্তু চার মাস সময়ে নতুন সরকার প্রায় সকল ক্ষেত্রেই নিজেদের পছন্দের মানুষদের (শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ) নিয়োগ দিয়ে গতানুগতিক ধারা বজায় রেখেছে। বিগত সরকারগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ থাকলেও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষকে বিচারহীনভাবে কারারুদ্ধ রাখা হয়েছে। সরকার এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহঅবস্থান বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন পূর্ব বেশ কিছু সম্মত সংস্কার প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার সরে এসেছে বলে দাবি উঠছে।
এমনি অবস্থায় আসছে বাজেটের সময়, সরকার কিন্তু বাজেটের আগেই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এমনিতেই নানা কারণে সীমিত আয়ের সাধারণ জনসাধারণের প্রাত্যহিক জীবনে নুন আনতে পান্তা ফুরোনো অবস্থা। এমতাবস্থায় প্রায় অপারগ অবস্থায় থেকে বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধি হলে চক্রাকার প্রতিক্রিয়ায় বেড়ে যাবে দ্রব্যমূল্য, বেড়ে যাবে মূল্য স্ফীতি। অনেকের মতে সবকিছু বিচার বিবেচনা না করে জ্বালানি এবং বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় পরোক্ষভাবে দুর্নীতি উৎসাহিত হয়।
সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, ক্রীড়া কার্ড চালু করেছে, দেশব্যাপী চলছে খাল খনন। এগুলো ভালো উদ্যোগ। সঠিক পরিকল্পনা এবং পেশাদারি বাস্তবায়ন হলে বছরখানেকের মধ্যে শুভ ফল ফেলবে।
আমি বাংলাদেশের মানুষের সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি। তাই অনুরোধ করবো সরকার যেন অতীত বিশেষত নিজেদের অতীত ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাস্তবমুখী এবং বর্তমাননির্ভর থাকবে। সংকট সময়ে দেশের সৃজনশীল তরুণ সমাজকে উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত রাখবে। ব্লেম গেম না করে আপনি আচরি ধর্ম দর্শনে এগিয়ে যাবে।