১০ জুন ২০২৬, বুধবার, ০৪:০২:১৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ফেডারেল আদালতের রায়ে সুরক্ষিত থাকছে স্ন্যাপ সুবিধা মুসলিমবিরোধী আইন প্রত্যাখ্যানে ১১৯ ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসম্যান সেন্ট্রাল পার্কে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখবে ৫০ হাজার দর্শক মামলার কারণে তিন ভাড়াটিয়ার কাছে পাওনা প্রায় এক লাখ ডলার নিউ ইয়র্ক পুলিশের বাংলাদেশি আমেরিকানদের পদোন্নতি নর্থ ক্যারোলিনার স্টেট সিনেটর হলেন বাংলাদেশী হাসিব ফাতমী নিউইয়র্ক স্টেট থেকে ৪৫ হাজার ডলারের চেক পেল বাংলাদেশ সোসাইটি গ্রেস মেংকে পুনরায় নির্বাচিত করার আহবান প্রতিবছর ৭৫ হাজার অভিবাসী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে জি কে প্রকল্পের সফলতা ভেস্তে যাবার উপক্রম


আবারো মর্টগেজ সুদের হারের ঊর্ধ্বগতি
দেশ রিপোর্ট
  • আপডেট করা হয়েছে : ১০-০৬-২০২৬
আবারো মর্টগেজ সুদের হারের ঊর্ধ্বগতি মর্টগেজ সুদের হারের ঊর্ধ্বগতি


যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন বাজারে আবারও চাপ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা সম্ভাব্য বাড়ি ক্রেতাদের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মর্টগেজ সুদের হারের ঊর্ধ্বগতি। ৯ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩০ বছরের ফিক্সড রেট মর্টগেজের জাতীয় গড় সুদের হার বেড়ে ৬.৫৭ শতাংশে পৌঁছেছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে এই হার ছিল ৬.৫৪ শতাংশ। একই সময়ে ১৫ বছরের ফিক্সড রেট মর্টগেজের গড় সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৯৪ শতাংশে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের অপ্রত্যাশিত শক্তিশালী অবস্থান এবং মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় মর্টগেজ সুদের হার কমার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। ফলে বাড়ি কেনার পরিকল্পনা করা লাখো আমেরিকানকে এখন আরও বেশি মাসিক কিস্তি পরিশোধের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

মর্টগেজ সুদের হার বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী কর্মসংস্থান পরিস্থিতি। গত ৫ জুন প্রকাশিত মার্কিন শ্রম বিভাগের প্রতিবেদনে দেখা যায়, মে মাসে দেশটির অর্থনীতিতে ১ লাখ ৭২ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে। এটি বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সঙ্গে বেকারত্বের হার ৪.৩ শতাংশে স্থিতিশীল রয়েছে। সাধারণত শ্রমবাজার শক্তিশালী থাকলে মানুষের আয় বৃদ্ধি পায় এবং ভোক্তা ব্যয়ও বাড়ে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাতে অনাগ্রহী থাকে। চাকরির প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ফলন ৪.৫ শতাংশের উপরে উঠে যায়। যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি মর্টগেজ সুদের হার সাধারণত ১০ বছরের ট্রেজারি ফলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, তাই মর্টগেজ রেটও দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যতদিন পর্যন্ত শ্রমবাজার শক্তিশালী থাকবে এবং মূল্যস্ফীতি ফেডের লক্ষ্যমাত্রা ২ শতাংশে না নামবে, ততদিন পর্যন্ত ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমানোর তেমন কোনো প্রয়োজন অনুভব করবে না। বরং বর্তমানে অনেক বিনিয়োগকারী ধারণা করছেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ফেড এক বা একাধিকবার সুদের হার বাড়াতেও পারে। ফলে যারা সুদের হার কমার আশায় বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন, তাদের জন্য ভবিষ্যৎ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।মঅর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, আজকের উচ্চ সুদের হার হয়তো আগামী কয়েক মাস পরে আরও বেশি উচ্চ মনে হবে না।

বর্তমান মর্টগেজ সুদের হার কত?

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ঋণের গড় সুদের হার নিম্নরূপ: ৩০ বছরের ফিক্সড রেট মর্টগেজ: ৬.৫৭ শতাংশ, ১৫ বছরের ফিক্সড রেট মর্টগেজ: ৫.৯৪ শতাংশ, ৫/১ অ্যাডজাস্টেবল রেট মর্টগেজ: ৫.৮১ শতাংশ, ৩০ বছরের জাম্বো মর্টগেজ: ৬.৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে রিফাইন্যান্স ঋণের ক্ষেত্রেও সুদের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। ৩০ বছরের রিফাইন্যান্স মর্টগেজ: ৬.৭২ শতাংশ, ১৫ বছরের রিফাইন্যান্স মর্টগেজ: ৬.১৫ শতাংশ, ৩০ বছরের জাম্বো রিফাইন্যান্স: ৬.৮৩ শতাংশভ এই হারগুলো এপিআর নয়, শুধুমাত্র সুদের হারকে নির্দেশ করে।

২০২৫ সালের তুলনায় পরিস্থিতি কি ভালো?

বর্তমান সুদের হার অনেক ক্রেতার কাছে বেশি মনে হলেও ২০২৫ সালের শুরুর অবস্থার তুলনায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তখন ৩০ বছরের ফিক্সড মর্টগেজের গড় সুদের হার ৭ শতাংশেরও বেশি ছিল। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে পরিস্থিতি অনেক বেশি আশাব্যঞ্জক ছিল। সে সময় মর্টগেজ হার ৬ শতাংশের নিচে নেমে গিয়েছিল, যা ছিল তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।

কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তী মাসগুলোতে হার দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং ৬.৭০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে, যা সুদের হারের ওপরও প্রভাব ফেলেছে।

ইতিহাসের আলোকে বর্তমান সুদের হার

বর্তমান হারকে অনেকেই উচ্চ মনে করলেও ঐতিহাসিকভাবে এটি সর্বোচ্চ নয়। ২০২১ সালে ৩০ বছরের ফিক্সড মর্টগেজের সুদের হার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল। তখন হার ছিল ৩ শতাংশেরও নিচে। কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে ফেডের অত্যন্ত শিথিল মুদ্রানীতির কারণে সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে ২০২৩ সালের শেষ দিকে সুদের হার ৭.৭৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়।

আরও পেছনে গেলে দেখা যায়, ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে ৩০ বছরের মর্টগেজ সুদের হার ১৬ শতাংশেরও বেশি ছিল। সে তুলনায় বর্তমান হার অনেক কম হলেও, গত কয়েক বছরের নিম্ন সুদের যুগের সঙ্গে তুলনা করলে এটি যথেষ্ট ব্যয়বহুল।

কেন বাড়ছে মর্টগেজ সুদের হার?

মর্টগেজ সুদের হার নির্ধারণে একাধিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক উপাদান কাজ করে। প্রথমত, ১০ বছরের ট্রেজারি বন্ডের ফলন। এটি মর্টগেজ বাজারের অন্যতম প্রধান সূচক। ট্রেজারি ফলন বাড়লে মর্টগেজ রেটও সাধারণত বাড়ে। দ্বিতীয়ত, মর্টগেজ ব্যাকড সিকিউরিটিজ বা এমবিএস বাজার। ব্যাংক ও ঋণদাতারা যে মর্টগেজ ঋণ দেয়, সেগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছে সিকিউরিটিজ আকারে বিক্রি করা হয়। এসব বিনিয়োগের প্রত্যাশিত মুনাফা বাড়লে ঋণের সুদের হারও বেড়ে যায়।

তৃতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের মনোভাব। অর্থনীতি, সরকারি ব্যয়, বাজেট ঘাটতি এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বাজারের ধারণা সুদের হারকে প্রভাবিত করে। চতুর্থত, ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থা। একজন ঋণগ্রহীতার ক্রেডিট স্কোর, ঋণ পরিশোধের ইতিহাস, আয় এবং ডাউন পেমেন্টের পরিমাণও তার ব্যক্তিগত মর্টগেজ রেট নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০২৬ সালের বাকি সময়ে কী হতে পারে?

বছরের শুরুতে অনেক বিশ্লেষক আশা করেছিলেন যে ২০২৬ সালে মর্টগেজ সুদের হার ৫.৭০ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য সেই প্রত্যাশাকে অনেকটাই পরিবর্তন করেছে।বর্তমানে বেশিরভাগ পূর্বাভাস বলছে, বছরের বাকি সময়ে মর্টগেজ সুদের হার ৬ শতাংশের উপরে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।ফেডারেল রিজার্ভ ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে টানা তিনবার সুদের হার কমালেও ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত তিনটি বৈঠকে হার অপরিবর্তিত রেখেছে। ফেডের কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে তারা মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের তথ্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন বাজার বর্তমানে এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির দাম এখনও অনেক এলাকায় উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, তার ওপর মর্টগেজ সুদের হারও ৬.৫ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে। ফলে নতুন বাড়ি ক্রেতাদের জন্য স্বপ্নের বাড়ি কেনা আগের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।তবুও অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থা এবং ফেডের কঠোর অবস্থানের কারণে নিকট ভবিষ্যতে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই যারা বাড়ি কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের আর্থিক সক্ষমতা বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করা, বিভিন্ন ঋণদাতার অফার তুলনা করা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক লক্ষ্য বিবেচনায় রেখে সঠিক মর্টগেজ নির্বাচন করা। এতে বর্তমান উচ্চ সুদের পরিবেশেও একটি টেকসই ও নিরাপদ আবাসন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।

শেয়ার করুন